ঢাকা, সোমবার 1 January 2018, ১৮ পৌষ ১৪২৪, ১৩ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

চাল-পেঁয়াজের অগ্নিমূল্যে নাকাল ভোক্তা অসহায় ছিল সরকার

এইচ এম আকতার : বছরজুড়ে চাল-পেঁয়াজের অগ্নিমূল্যে নাকাল ছিল ভোক্তা। শক্তিশালী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কাছে অনেকটা অসহায় ছিল সরকার। বাজারে এখনো লাগামহীন চাল আর পেঁয়াজের দাম। নিত্য প্রয়োজনীয় এ পণ্য দুইটি কিনতে গিয়ে সারা বছর হিমশিম খেয়েছেন সাধারণ মানুষ। চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে অবৈধ মজুদকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চললেও শেষ পর্যন্ত তা ব্যর্থ হয়। বাজার মনিটরিং না থাকায় শক্তিশালী সিন্ডিকেটের এখনও বহাল তবিয়তে রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ বছর দুই দফা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় এক লাখ ৭০ হাজার হেক্টর জমির ফসল। কমে আসে সরকারি গুদামের চালও। এরপর থেকেই বাড়তে শুরু করে চালের দাম। চলতি বছরের প্রথমভাগে মোটা চালের দাম ছিল ৩৬ থেকে ৩৮ টাকা। মধ্যভাগে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪২ থেকে ৪৪ টাকায়। আর বছর শেষে এখন তা কিনতে হচ্ছে ৪৮ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ- টিসিবির হিসেবে, এক বছরে দেশে চালের দাম বেড়েছে ২৩ থেকে ৩০ শতাংশ।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সবশেষ হিসাব বলছে, সরকারের কাছে চালের মজুদ আছে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মেট্রিক টন। আগের বছর একই সময়ে যা ছিল প্রায় আট লাখ মেট্র্রিক টন। এসবই আতপ চাল বলে জানা গেছে।
খাদ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রথমে রাজধানীতে ১০৯টি ট্রাকে চাল বিক্রি করা হলেও মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে বিক্রি করা ট্রাকের সংখ্যা কমে এসেছে ৩০ এর কোটায়। দিন দিনই কমছে চাল বিক্রির পরিমাণ। গত এক সপ্তাহে সারা দেশে মোট চাল বিক্রি হয়েছে মাত্র ১৪ হাজার ৪শ ৪৫ টন। এর বেশিরভাগ চালই বিক্রি হয়েছে রাজধানী ঢাকার বাইরে। ঢাকা শহরে বিক্রি হয়েছে খুবই কম।
সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে আমদানি শুল্ক দুই দফায় ২৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করে। কিন্তু ফল হয়েছে উল্টো দাম না কমে বেড়েছে। প্রশ্ন হলো সরকার কেন ২শ’ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে এ চাল আমদানি করলো। সরকারের মন্ত্রী বলছেন,খাদ্য অভ্যাস পরিবর্তন করতে। মানুষ কেন খাদ্য অভ্যাস পরিবর্তন করবে। মন্ত্রী এমপিরা কি কেউ খাদ্য অভ্যাস পরিবর্তন করেছেন। মানুষ কি চাইলেই তার খাদ্য অভ্যাস পরিবর্তন করতে পারে।
গত জুন থেকে চলতি মাস পর্যন্ত বিদেশ থেকে যে চাল আমদানি করা হচ্ছে তারও বেশিরভাগ আতপ চাল। ভিয়েতনাম থেকে আড়াই লাখ টন চাল দেশে এসেছে। এর মধ্যে দুই লাখ টনই আতপ। কম্বোডিয়া থেকে যে আড়াই লাখ টন চাল আসছে সেটাও আতপ। এছাড়া মিয়ানমার থেকে যে চাল আমদানি হবে তাও আতপ।
এদিকে চালের দাম সহনীয় রাখতে গেলো তিন মাসে সরকার প্রায় দুইশো কোটি টাকার রাজস্ব ছাড় দিয়েছে। অথচ এর সুফল পায়নি ভোক্তারা। উল্টো বাড়তি দামেই চাল কিনতে হয়েছে তাদের। বিশ্লেষকরা বলছেন, সাধারণ মানুষের জন্য এ সুবিধা দেয়া হলেও বাস্তবে তা গেছে মিল মালিক ও আমদানিকারকদের পকেটে। সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবির হিসাবে, এখনো সরু চাল বিক্রি হচ্ছে আগের দামেই।
আগাম বন্যা, হাওরে ফসলহানি এবং সরকারের মজুদ কমে যাওয়ায় বাজার নিয়ন্ত্রণে গত ২০ জুন চালের আমদানি শুল্ক ২৮ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এরপরও বাজার স্বাভাবিক না হওয়ায় ঠিক একমাস পরই ডিসেম্বর পর্যন্ত বাকিতে চাল আমদানির সুযোগ করে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতেও কাজের কাজ কিছু না হলে আগস্ট মাসে ১০ শতাংশ শুল্ক নামিয়ে আনা হয় ২ শতাংশে।
 এনবিআর সূত্রে জানা যায়, জুন এবং জুলাই এই দুই মাসেই সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয় ১৩৫ কোটি টাকা। দ্বিতীয় দফায় শুল্ক ছাড়েরর ফলে সাময়িক হিসাবে আরো ৬৫ কোটি টাকা রাজস্ব হারায় সরকার। সবমিলে রাজস্ব ক্ষতি প্রায় ২শ কোটি টাকা। কিন্তু বিপরীতে বাজার দাম তো কমেইনি বরং দফায় দফায় তা বেড়েছে।
সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে চাল আমদানিতে এই সুবিধা দেয়া হলেও বাস্তবে এর সুফল গিয়েছে আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের পকেটে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানি পর্যায়ে চালের শুল্ক প্রত্যাহারের ফলে পণ্যটির দাম কমেছে সামান্য। সরকারের পক্ষ থেকে খোলাবাজারে চাল বিক্রি হলেও দাম তুলনামূলক বেশি। আর তা আতপ চাল হওয়ার কারণে ক্রেতারা কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
একইভাবে সরকারের তিন মন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সিদ্ধ চাল আমদানির ফলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এবার বাণিজ্যমন্ত্রী স্বীকার করলেন চাল সিন্ডিকেট খুবই শক্তিশালী। তাদের কাছে সরকার অসহায়। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে বাজার উল্টো আরো অস্তির হয়ে উঠে না নিলে নিজেদের ইচ্ছা মত দামে বিক্রি করে থাকেন। তাহলে সরকার আসলে কি করবে।
এ বিষয়ে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকাশ করছেন। পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইকারি পর্যায়ে চালের দাম যথেষ্ট কমেছে। এর সঙ্গে সমন্বয় করে খুচরা ব্যবসায়ীরা চালের দাম কমাননি। অন্যদিকে খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইকারি পর্যায়ে চালের দাম সামান্য কমেছে। বেশি দাম দিয়ে কিনে এনে খুচরা পর্যায়ে দাম কমানোর সুযোগ নেই বলে তারা জানান।
পাইকারি ব্যবসায়ীরা দাম না কমার জন্য সরকারের মনিটরিং ব্যবস্তাকে দায়ী করেছেন। তারা বলছেন পাইকারিতে চালের দাম কমলেও খুচরায় তেমন কমেনি। কারণ হিসেবে তারা বলেন,বাজারে সরকারের কোন মনিটরিং টিম নেই। আর এ কারনেই পাইকারিতে দাম কমলেও খুচরায় দাম কমেনি। এর সুফল পাচ্ছে না সাধারণ ক্রেতারা। শুধু তাই নয় খুচরা বিক্রেতারা বলছেন দাম আর কমবে না। বাজার এখন স্থিতি রয়েছে। দাম কমাতে কিংবা বাড়াতে আমাদের কোন হাত নেই। আমরা বেশি দামে কিনলে বেশিতে বিক্রি করে থাকি। আর কম দামে কিনলে কমে বিক্রি করে থাকি। আমাদের ওপর দায় চাপিয়ে কোন লাভ নেই।
 পেঁয়াজের দামও আকাশছোঁয়া। বছরের প্রথমভাগে রাজধানীর বাজারে এক কেজি ভারতীয় পেঁয়াজ কেনা যেত ২০ টাকায়। বছর শেষে একই পেঁয়াজ কিনতে হলে গুণতে হচ্ছে ৮০ টাকা। আর দেশি পেঁয়াজের দাম এখনও ১২০ টাকা। টিসিবির হিসেবে এক বছরে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে রেকর্ড প্রায় আড়াইশ ভাগ।
 অথচ দেড় মাস আগে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকায়। আমদানি করা পেঁয়াজ ৩৫ থেকে ৪০ টাকায়। সে হিসাবে গত দেড় মাসের ব্যবধানে কেজিতে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ৫০ টাকা। গত তি সপ্তাহে ব্যবধানে দুই দফায় দাম বেড়েছে ২৫ থেকে ৩০ টাকা। এক মাস আগে দাম ছিল ৪৫ থেকে ৫০ টাকা।  দেড় মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ১০০ শতাংশ। এছাড়া বছরের তুলনায় দাম বেড়েছে ২০০ শতাংশ। অন্যদিকে আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকা, যা এক মাস আগে ছিল ৫০ থেকে ৫৫ টাকা।
তবে দেশি পুরাতন পেয়াজের দাম ১২০ হলেও নতুন পেয়াজের দাম ৭০-৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পেয়াজের মওসুম শুরু না হলেও দাম বেশি হওয়ার কারনে কাচা পেঁয়াজ বাজার বিক্রি হচ্ছে। গত বছর এ সময় পেয়াজ বিক্রি হয়েছে ২৫-৩০ টাকায়। সে হিসেবে এখনও দিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে কাঁচা পেয়াজ।
শ্যাম বাজারের পাইকারি পেঁয়াজ ব্যবসায়ী সুজন বলেন, বাজারে পুরান পেঁয়াজ শেষের দিকে। নতুন পেঁয়াজে এখন বাজার সয়লাব। দামও কমেছে। তবে গত বছরের তুলনায় এখনও দ্বিগুন দামে পন্যটি বিক্রি হচ্ছে।
আমদানি করা পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বড় ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মুনাফার লোভের অভিযোগ সামনে আনছেন আড়ৎদাররা। তারা বলছেন, মূলত আমদানি করা পেঁয়াজের দাম বাড়ার কারণে বড় ব্যবসায়ীরা দেশি পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। সঠিকভাবে বাজার মনিটরিংয়ের অভাব এই জন্য দায়ী বলে মনে করছেন তারা।
বছরের শুরুতে পেয়াজের দাম সহনীয় থাকলেও মাঝখানে এসে আতঙ্ক বাড়িয়েছে বাজারে। লাগামহীন দামে জনজীবনে অস্তিরতার নতুন মাত্রা যোগ করে চলছে এই ঝাঁজ। আর বাজারে দাম বাড়ার প্রতিযোগীতায়ও এখন শীর্ষে রয়েছে পণ্যটি।
 গেল তিন থেকে চার মাসের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম কেজিতে বেড়েছে তিনগুণেরও বেশি। জানা গেছে,সারা বছরজুড়েই পেয়াজের সিন্ডিকেট স্বক্রিয় ছিল। আগাম বন্যার অজুহাতে চালের পর এবার তিনগুণ হারে বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে পেয়াজের দাম। বাজার নিয়ন্ত্রণে নেই সরকারের কোন উদ্যোগ। এতে করে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে পেয়াজের বাজার। মজুদ সিন্ডিকেট ভাঙ্গতে না পাড়ায় এই বাজার আরও লাগামহীন হয়ে পড়বে।
বাজার ইতোমধ্যে নতুন পেয়াজ আসতে শুরু করেছে। এসময় পেয়াজের দাম বৃদ্ধি কোন কারণ নেই। তাহলে কি কারণে পেয়াজের দাম বাড়লে তা কেউ বলতে পারছেনা। তারা ভারতের বাজারে পেয়াজে দাম বৃদ্ধিকে দায়ী করছেন। আসলে এটি কোনভাবেই ঠিক নয়। দেশে এখন পেয়াজ গাছসহ বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা। তাহলে কেন পেয়াজে দাম বাড়বে। আসলে এটি সিন্ডিকেটের কারসাজি।
জানা গেছে,ভারতই বাংলাদেশের পেয়াজ,রসুন,আধা মরিচসহ মসলার বাজার নির্ভর করে। ভারতের বাজারে এসব পন্যের দাম বাড়লেই বাংলাদেশের বাজারেও বাড়তে থাকে। ব্যাখ্যা একটাই ভারতের বাজারে দাম বেড়েছে। একটি দেশ এভাবে একটি প্রতিবেশি দেশের ওপর নির্ভর করতে পারে না। আর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতার কারণেই তাদের ইচ্ছা মত দাম বাড়ে দাম কমে।
চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার নানা উদ্যোগ নিলেও পেঁয়াজ নিয়ে ছিল উদাসিন। এতে করে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠে এ সিন্ডিকেট। সরকার যদি বাজার মনিটরিং করতে পারতো তাহলে বাজার এতটা লাগামহীন হতো না।
 পণ্য দুটির অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারসাজি বলে মনে করে কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ক্যাব। বাজার নিয়ন্ত্রণে আমাদের কিছুই করার নেই। তবে সরকার চাইলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কিন্তু আমরা দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি দেখতে পাইনি।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, সার্বিকভাবে ভালোই গেছে ২০১৭ সাল। তবে চালের বাড়তি দাম গরিব মানুষসহ মধ্যবিত্তকেও বেশ দুর্ভোগে ফেলেছে। এক্ষেত্রে সরকারের ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা ছিল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ