শুক্রবার ২১ মে ২০১০
Online Edition

রবার্ট ব্রাউনিং ও প্রকৃতি -শামস্ রুমি

‘‘আই সো গড এ্যাভরীহয়্যার’’ আমি ঈশ্বরকে সর্বত্র প্রত্যক্ষ করলাম। চির সত্য এবং অপরূপ প্রকৃতিমনা, রবার্ট ব্রাউনিং। ঐতিহাসিক এই মে মাসের ৭ই মে ১৮১২ সালে লন্ডনের কেমবার ওয়েলে জন্মে। ব্রাউনিংয়ের সঠিক পরিচয় জানতে হলে, চলে যেতে হবে রবি ঠাকুরের ‘‘জন্ম কথা’’ কবিতায়, ‘ইচ্ছা হয়েছিলি মনের মাঝারে।' শিল্পমনা মায়ের, স্বপ্ন পূরণের জন্যই ব্রাউনিংয়ের জন্ম। মা'র হয়ে, ব্রাউনিং দ্যুতি জড়িয়েছিলেন শিল্প, সঙ্গীত এবং ইংরেজি সাহিত্যে। লোহা লক্করের চাপে সাহিত্য যখন কুকড়িয়ে যাচ্ছিল, সেই ভিক্টোরীয় যুগেই সাহিত্যে সুবাতাস বহান। ভিক্টোরীয় যুগের কঠিন হৃদয়ের লোকদেরকে পরিচয় করিয়ে দেন ‘প্রকৃতি'র সঙ্গে। ব্রাউনিং প্রকৃতির অতি নিকটে যেতেন। উৎঘাটন করেছেন ; স্রষ্টা প্রকৃতি এবং মানুষ। এই তিনের মিশ্রণেই রচিত, তার কাব্যগ্রন্থ ; বেলস এ্যান্ড পোম গ্রেন্টস, (১৮৪১-৪৬) ড্রামাটিক লিরিকস (১৮৪২), পলিন (১৮৩৩), ম্যান এ্যান্ড উইমেন (১৮৫৫) ইত্যাদি। ব্রাউনিংয়ের প্রকৃতি দর্শন মানেই ছিল স্রষ্টাকে অবলোকন করা। তার ‘এ গ্রামারিয়ান ফুনারেল' নামক কবিতায় কবি বলেন ; ‘সীক উয়ী সিপালচার, ওন এটল মাউনটেন, সাইটেড টু দ্য টপ, ক্যা রাউডেড উয়ীথ কালচার ‘‘খুঁজে বেড়াই গোরস্থান পর্বতমালা নগরীর উপরে ভিড়ময় সংস্কৃতিতে।’’ মৃত্যু তৎপরবর্তী অবস্থান বর্ণনায়ও প্রকৃতি উপস্থিত। শুধু তাই নয় সমভাবে স্রষ্টার উপস্থিতিও টের পাওয়া যাচ্ছে। ব্রাউনিংয়ের ‘ পোরফিরিয়া লাভার' কবিতায়ও প্রকৃতির বর্ণনা দৃশ্যমান। রাত-বৃষ্টি এবং বায়ু তিনের সমন্বয়ে অংকন করেছেন শৈল্পিক ক্যানভাস ; ‘দ্য রেইন সেট আরলী ইনটু নাইট, দ্য সুলেন উয়ীন্ড ওয়াজ সুন এওয়াক, ‘‘রাতের প্রথম প্রহরের বৃষ্টিতে প্রকাশ হলো অন্তঃকোপী বায়ুতে।’’ অত্র কবিতাটির ত্রিশ নং পংক্তিতে কবি আরও বলেন; ‘‘ফর লাভ অফ হার এ্যান্ড ওল ইন ভেন সো, সি ওয়াজ কাম থ্ররো উয়ীন্ড এ্যান্ড রেইন’’ ‘‘তার ভালবাসার জন্য সব ধ্বংস যাই হোক উপস্থিত ছিল, বৃষ্টি বায়ুর মতো। ভালোবাসার ক্ষণিকতা বর্ণনায় কবি প্রকৃতির সাহায্য নিয়েছে। স্ত্রী এলিজাবেথ ব্যারেটকে কবি খুব ভালোবাসতেন। ব্রাউনিংয়ের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে চিররোগা ব্যারেট সজীবতা ফিরে পায়। হৃদয়ের শ্বেত পাথরের চির প্রস্থানে কবি বলেছেন : ‘গড টুক হার হিমসেলফ' সৃষ্টিকর্তা তাকে নিয়ে গেল স্রষ্টার ডাকে প্রিয়তমা সাড়া দিয়েছে। কবির কোন অস্থিরতা নেই। গভীর অনুভূতিময় ব্রাউনিং তাই অন্যদের থেকে ভিন্ন। শুধু প্রকৃতিই নয়, গীতি কবিতা, শিল্প, নন্দনতত্ত্ব, মানসিক বিশ্লেষণে তার সমসাময়িক সাহিত্যে দৃষ্টিগোচর হয় না। কবির ড্রামাটিক মনোলোগ বা নাটকীয় স্বগতোক্তির উপস্থাপনার ভঙ্গি জীবন্ত। ‘মাই লাস্ট ডাচেস' তেমনই একটি কবিতা যার প্রতিটি বর্ণনা কল্পনা থেকে বাস্তবতায় রূপ নেয়। চরিত্র নির্বাচনে, ব্রাউনিং বেছে নিয়েছিল ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব, চিত্রশিল্পী বিখ্যাত নাটকের সুপরিচিত নাম। এমনকি কবিতার নামকরণের ক্ষেত্রেও। বৃটিশ নাট্যকার শেকস্পিয়ার, যার শ্রেষ্ঠ ট্রাজেডি নাটক ‘কিং লেয়ার' সাহিত্যের অমূল্য রত্ন। এই নাটকটির একটি গীত যা কিনা ইডগার গায় ‘‘চাইল্ড রোওল্যান্ড টু দ্য ডার্কটাউয়ার কেইম’’, থেকে ব্রাউনিং নিজের কবিতার নামকরণ করেছেন। কবিতাটির পঁচিশ নং শ্লোকে কবির মৃত্যু পথযাত্রীর চলমান সেলুলয়েড ফুটে ওঠে। প্রচন্ড রুগ্ন-ব্যক্তি বাকরুদ্ধ অশ্রুসিক্ত চোখে ভাষণ দিচ্ছে। ‘বিদায় বন্ধু বিদায়'; ‘‘রুগ্ন ব্যক্তি যে রূপ মৃত্যু পথযাত্রী তরান্বিত মহাপ্রলয়ে আসা যাওয়ার অনুভবে, অশ্রুর বিদায় সম্ভাষণে সকল সহপাঠি’’ মহান এই কবির হাত থেকে বের হয়ে এসেছিল ‘‘প্রিন্স হোহেনস্টিয়েল শাওয়ান গার্ড (১৮৭৮) কাব্য। পাঁচদিনে যার কাটতি ছিল পনেরশত কপি। তৎকালিন সময়ের বেষ্ট সেলার। এরই এগার বৎসর পর ১৮৮৯ সালের ১২ ই ডিসেম্বর কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আজীব স্রষ্টা ভক্ত ছিলেন না। কবি শেলী দ্বারা প্রভাবিত হয়ে স্রষ্টা বিমুখ হয়ে পড়েছিলেন। পরক্ষণে জ্ঞান প্রাপ্তির পরই জীবনচাকা স্রষ্টামুখী করেন। স্রষ্টার পরম প্রশান্তি খুঁজে পেয়েছেন সফলতা ব্যর্থতার মাঝে। তাই তো ব্রাউনিং ধর্মযাজকদের মতো আওড়ান ‘‘সে জীবনে যা পেয়েছি যা পাইনি, যা হতে চেয়েছি, যা হইনি তার জন্য কোন ক্ষোভ রাখা ঠিক নয়। না পাওয়ার মধ্যেই আছে সুখ আর আনন্দ।’’ রবার্ট ব্রাউনিং জন্ম শতবার্ষিকী আজ ৭ ই মে, ১৮১২ খ্রীষ্টাব্দের এই দিনটিতে জন্মেছিল, ইংরেজি সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র রবার্ট ব্রাউনিং। সাইকিক, আর্টিস্ট, কাব্যিক, ভ্রমণপ্রিয়, সঙ্গীতপ্রিয় নক্ষত্রটির জন্ম লন্ডনের অন্তর্গত কেমবারওয়েল। স্কুলবিমুখ ব্রাউনিং কিন্তু ভিক্টোরিয় যুগের শ্রেষ্ঠ কবি। যুগের বিপরীতে পাল তুলেন ব্রাউনিং। সাহিত্যের এই নাবিক আহরণ করে; ড্রামাটিক মনোলোগ বা নাটকীয় স্বগতোক্তি, আত্ম-বিশ্লেষণমূলক কাব্য, ইংরেজি সাহিত্যে যা আজও অদ্বিতীয়। কিছুকাল লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন। পরে ব্যস্ত হয়ে পড়েন কবিতা ও গান নিয়ে। সবে বয়স কুড়ি, ১৮৩৪ খ্রীষ্টাব্দে রাশিয়া ঘুরে এলেন। তারপর ১৮৩৮ খ্রীষ্টাব্দে ইতালি এবং ১৮৪৬ খ্রীষ্টাব্দে চৌত্রিশ বৎসর বয়সে বিবাহের গ্রন্থিবন্ধনে আবদ্ধ হলেন ইতালীতেই। ইতালীর ধনিক দুহিতা এলিজাবেথ ব্যারেট কে নিয়ে ব্রাউনিং ঘর বাঁধলেন। বাইশ বৎসরের সাংসারিক জীবনের ইতি টেনে চির বিদায় নেয় এলিজাবেথ ১৮৬৮ খ্রীষ্টাব্দে। প্রেমময় এবং ব্যথিত ব্রাউনিংয়ের হাত হতে বের হয়ে আসে ; পলিন (১৮৩৩), পারসেলসাস (১৮৩৫), ড্রামাটিক লিরিকস (১৮৪২), ড্রামাটিক রোমেন্স (১৮৪৫) মেন এন্ড উইমেন (১৮৫৫) ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থ। তার কাব্য গুলোতে ড্রামাটিক মনোলোগ বা নাটকীয় স্বগতোক্তি ছিল ভিন্ন ধারার। তার ‘‘মাই লাস্ট ডাচেস (My Last Duchess) শুরুটাই প্রমাণ করে সিদ্ধহস্ততা : ১. দ্যাট ইজ মাই লাস্ট ডাচেস পেইন্টেড ওন দা ওয়াল (That is my last duchess painted on the wall) দেয়ালে ঝুলানো শিল্প কর্মটিই আমার শেষ স্ত্রী, লুকিং এজ ইফ সি ওয়্যার এলাইভ (Looking as if she were alive) তাকিয়ে আছে জীবন্তের মত। কবিতাটির কাব্যিকভঙ্গি এতোটাই বাস্তব সম্মত যে হৃদয় স্পর্শ করে। ডিউক ফেরার স্বগতোক্তিতে মৃত স্ত্রীর বর্ণনা রূপ নিয়েছে জীবন্ত বর্ণনায়। কবিতাটির পচিশ নং শ্লোকে ফুটে ওঠেছে স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা ; Sir, it was all one! My favor at her breast) স্যার, ইট ওয়াজ ওল ওয়ান ! মাই ফেইবর এ্যাট হার ব্রেস্ট। সম্মানিত, ইহা ছিল হাজারে একটা ! অতিপ্রিয় ছিল তার বক্ষ The dropping of the day light in the west) দ্য ড্রপিং অফ দা ডেলাইট ইন দা ওয়েস্ট যে রূপ, পশ্চিম আকাশে হেলে পড়া দিবালোকের সখ্য। ব্রাউনিংয়ের নাটকীয় স্বগতোক্তি পরিলক্ষিত হয় Fra Lippo Lippi কবিতায়। ২. ফারা লিপ্পু লিপ্পি এর শুরুতে; আই এম ব্রাদার লিপ্পু, বাই ইউর লিভ; ইউ নিউ নট ক্লিপ ইউর টর্চেস টু সাই ফেস তোমার প্রস্থানে আমি সহোদর লিপ্পু প্রয়োজন নেই তোমার টচয়ের করতালী মুখে ফেলার।’’ ব্রাউনিং সুনিপুণভাবে অতীত বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ এর বর্ণনা করত ড্রামাটিক মনোলোগে। ‘দা লাস্ট রাইড টুগেদার' কবিতাটিও শুরু হয়েছে অনবদ্য ড্রামাটিক মনোলোগে। ব্রাউনিং অন্যদের থেকে আলাদা। কেননা ব্রাউনিংয়ের কবিতাগুলো আত্ম বিশ্লেষকমূলক। তার কবিতার চরিত্রগুলো মানসিক যন্ত্রণায় অস্থির। আর তা প্রকাশ পায় ‘‘আনড্রেয়া ডিল সারটো’’ কবিতার লু করে জিয়াতে। দা লাস্ট রাইড টুগেদার এর লাভার। ‘প্রফিরিয়াস লাভার'-এর বিকারগ্রস্ত লাভার। এবং এর সঙ্গে যোগ হয় ডিউক ফেরার চরিত্র। মধ্যযুগ এবং রেনাইসাস যুগের বিভিন্ন স্থান, কাল পাত্র থেকে চরিত্রগুলো আগত। চরিত্রগুলো ফুটিয়ে তুলতে ব্রাউনিং ব্যবহার করত, প্লট, চরিত্র এবং চিত্র। একজন চরিত্রই তিনটি উপাদান বহন করত। যা দ্বারা বের হয়ে আসত, আশাবাদী, নৈরাশ্যবাদী, বিষণ্ণ, বিকারগ্রস্ত আত্মার আকুতির জীবন্ত চিত্রনাট্য। ভালোবাসাই উত্তম নীতির দার্শনিক ছিলেন ব্রাউনিং। ক্ষমতা, জ্ঞান এবং ভালোবাসা তৈরি করে নিবিড় সম্পর্ক স্রষ্টা এবং সৃষ্টির মধ্যে। যা সফলতার মাপকাঠি। কবির দার্শনিকতার ছাপ বহন করছে প্রতিটি কবিতা। তাই ভালোবাসার কবি হিসেবে ব্রাউনিংয়ের স্থান জন ডানের পর। ব্রাউনিংয়ের সুখ্যাতি বিশ্বময় বিরাজমান। জন্মের একশত আটনববই বৎসর পরও, কবিতাগুলোর গ্রহণযোগ্যতা আকাশচুম্বী। নিভৃতচারী এ মহান কবি ১৮৮৯ খৃস্টাব্দের ১২ ই ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। তার কবিতা গ্রামারিয়ান ফুনারেল এর কিছু পংক্তিই হতে পারে। কবির জন্মের শুভেচ্ছা ‘‘নীচুমনা সন্তুষ্ট খুঁজে, নিছক কাজে অবলোকন এবং কর্মে উঁচুমনা মহৎ কর্মে প্ররোচিত আলিঙ্গন করে নেয় মৃত্যু।’’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ