শুক্রবার ২১ মে ২০১০
Online Edition

নিভৃত নিকুঞ্জ -তমসুর হোসেন

কদিন থেকে একটা বিষয় বেখাপ্পা লাগছে রুমানার। তা হল পারভেজের মোবাইলে কথা বলা। কৃষি ব্যাংকের মাঠ পর্যায়ে সুপারভিশনের চাকরি তার। এখন কৃষকদের ইরি-বোরোর ভর্তুকির টাকা ব্যাংক একাউন্টে পেমেন্ট করা হবে। এ নিয়ে তার কাছে সারাদিন অনেক মোবাইল আসে। এখন এটা একটা গা সয়ে যাওয়া ব্যাপার। কিন্তু রুমানা লক্ষ্য করছে অন্য জিনিস। মাঝে মাঝে পারভেজ কথা বলার জন্য বাইরে কোথাও যায়। সারাটা দিন সে তো অফিসে অথবা ফিল্ডে কাটায়। সেখানে সে কার সাথে কথা বলল না বলল তাতো রুমানা ওয়াচ করতে পারে না। কিন্তু যখন সে বাসায় থাকে বিশেষ করে সকাল এবং রাত আটটার পরে এই সামান্য সময়টুকুতে সে বার চারেক মোবাইল নিয়ে নানান অজুহাতে ঘরের বাইরে যায়। খুব সজাগ হয়ে রুমানা লক্ষ্য করে কোন কোন সময় পারভেজের মোবাইলে মিস কল আসে। এতে তার ভাবগতি বদলে যায়। বাইরে যাওয়ার জন্য সে তখন ছুঁতো খুঁজতে থাকে। পারভেজের মোবাইল সেট হাতড়িয়ে মিসকল অপসন থেকে নাম্বারটি উদ্ধার করল রুমানা। নাম্বারটির শেষে ট্রিপল সিক্স অংকগুলো এমনকি সম্পূর্ণ নাম্বারটিই তার স্মৃতির রাজ্যে মুহূর্তে খোদাই হয়ে গেল। বিষয়টি দারুণ অস্বস্তিতে ফেলল রুমানাকে। কার সাথে কথা বলে পারভেজ। কী এমন অনুরাগ অপর প্রান্তের ব্যক্তিটির সাথে তার। যার কারণে তার শ্রবণ এতটা উৎকর্ণ থাকে। অন্ততপক্ষে তার পরিচয় জানা থাকা দরকার রুমানার। নাম্বারটি উদ্ধার করার পর খুব ব্যস্ত হয়ে পড়ল সে। কীভাবে কোন কায়দায় সে কথা বলবে এই নাম্বারে। ওদিকের মানুষটি যদি পুরুষ হয়। হতেও তো পারে, কোন বিশেষ কাজ বা অফিসিয়াল গোপন লেনদেনের বিষয়ে পারভেজ কারও সাথে কথা বলে। রুমানার মন এসব খোঁড়া যুক্তি নস্যাত করে দিল। তার মন অপর প্রান্তে কোন ছলনাময়ীর অস্তিত্ব সনাক্ত করল। কোন কৌশলে সে তার সাথে কথা বলতে এই নিয়ে অনেক কথোপকথন করল সে নিজের সাথে। হাইকোর্টের একজন ঝানু আইনজ্ঞ অথবা কোন সফল নাট্যনির্মাতা যেমন করে জটিল বিষয়কে নিজের পথে নিয়ে আসে সুচিন্তিত আলাপচারিতার মাধ্যমে। তেমন করে প্রতিপক্ষের সাথে লড়বার জন্য নিজকে সুনিপুণভাবে প্রস্তুত করল রুমানা। বিদ্যালয়ের প্রথমার্ধের ঝামেলা শেষ হলে সে তার কাঙ্ক্ষিত নাম্বারে রিং করল ইতস্তত চিত্তে। ওপাশ থেকে ধ্বনিত হল নারীকণ্ঠের কোমল আওয়াজ। ‘হ্যলো, কে বলছেন'? ‘আমি একজন মানুষ। বলতে পারেন আপনার হিতাকাঙ্ক্ষী। দয়া করে চিনে রাখুন। একদিন উপকারে লাগবে।' ‘উপকার, কি উপকারে লাগবেন আপনি আমার?' ‘আরে লাগবে। কার দ্বারা কী উপকার হয় বলা যায় না তো। ‘অমন না বলে একটু খুলে বলুন। আমি আপনার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না।' ‘ভেবে দেখুন তো, কার সাথে দিনের পর দিন কথা বলছেন। সমস্যা তো সৃষ্টি করেছেন একখানা। না জেনেশুনে কথা বলে। এখন বুঝেছেন কোন উপকারে লাগব আমি।' ‘না, না, অসম্ভব। আমি তো কারও সাথে কথা বলি না।' ‘আমি তো হাওয়া থেকে এ নাম্বার পাইনি। যার সাথে কথা বলেন সেই আমাকে দিয়েছে। শেষে ফাইভ নাইন সিক্স, দেখুন তো চেনেন কিনা?' ‘আপু মাফ করবেন। কামরান ভাই আপনার কি হয়?' ‘উনি আমার খালাত ভাই। এখন বুঝেছেন কোথাকার বাতাস কোথায় লাগছে।' মেয়েটির নাম সীমা। তার সাথে কথা বলে রুমানা সব তথ্য জেনে নিল। বাড়ি পায়রাবন্দ। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের ছাত্রী। হোস্টেলে থেকে পড়াশুনা করছে। কামরান তথা পারভেজের সাথে তার দুই বছরের চেনাজানা। তার বিয়ের আলাপও চলছে অন্যখানে। পাত্র সরকারি কলেজের লেকচারার। কিন্তু তাকে পছন্দ হয়নি সীমার। ওর চেয়ে কামরান কত স্মার্ট আর হ্যান্ডসাম। তাদের সম্পর্কের বিষয়ে পরিবারকে এখনও জানায়নি সীমা। কামরান বলেছে সময় হলেই সেই প্রস্তাব নিয়ে যাবে। এ নিয়ে তাকে একটুও ভাবতে হবে না। সীমা একথাও বলল, মাঝে মাঝে তাদের দেখা সাক্ষাৎ হয়। কামরান আসে তার সাথে দেখা করার জন্য। সে ভাবছে একদিন হুট করে চলে যাবে কামরানের বাড়িঘর দেখতে। চিরদিন যেখানে থাকতে হবে তা আগেভাগে দেখে নেয়াই ভাল। এ কথাগুলো শোনার পর কার মেজাজ ঠিক থাকে। সীমার কাছে পারভেজ এখন কামরান। ঘরে নবোদ্ভিন্না স্ত্রী এবং অবোধ শিশু রেখে এসব নাটক সৃষ্টি করার কোন দরকার আছে তার। সীমার জন্য বড় দুঃখ হল রুমানার। আহা বেচারী, কতটা স্বপ্নের পেছনে ছুটছে বোবা অন্ধের মত। যতই তার সাথে বাহানা করুক, পারভেজ কী তাকে স্বপ্নের মনজিলে পৌঁছে দিতে পারবে। কেন এ লুকোচুরি! কেন একজনের বিশ্বাসের ভিত্তিভূমি নষ্ট করার মিথ্যা খেলায় মেতে ওঠা। রুমানার মন বলে পারভেজ সত্যিই একটা বিশ্বাসঘাতক! দু'বছরের অধিক দাম্পত্য জীবনে সে তো তাকে পেয়েছে প্রাণোচ্ছল এক সঙ্গী হিসেবে। রুমানার সব মতামতের মূল্য দিয়ে সে তাকে আত্মবিশ্বাসী হতে সাহায্য করেছে। আজ ওসব কোথায় গেল। রুমানার দুশ্চিন্তা এত বেড়ে গেলো যে, সে অস্থির হয়ে পড়ল। কোন কাজেই সঠিকভাবে মন বসাতে পারল না। তারও তো একটা জব আছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা সে। স্কুলে প্রথম সাময়িকী পরীক্ষা শুরু হয়েছে। সেখানে একগাদা কাজ। কাজের মেয়েটা অজুহাত দেখিয়ে চার পাঁচদিন থেকে কাজে আসছে না। আর সাকীটা যে এত পাজি হয়েছে তা বলে শেষ করা যাচ্ছে না। স্কুল থেকে এসে রুমানা দেখল সাকী ধুলোকাদায় একাকার হয়ে আছে। সাকীর দাদী তো সংসারের কাজ নিয়ে ব্যস্ত। আর ওর দাদু, আজ পর্যন্ত কোলে নিয়ে দেখল না ছেলেটার কতটুকু ওজন। সাকীকে গোসল করিয়ে রুমানা বাথরুমে ঢুকেছে ময়লা কাপড় কেঁচে দেয়ার জন্য। বের হয়ে তার মাথা ঘুরে যাওয়ার উপক্রম। টেবিল থেকে কার্টার নিয়ে সাকী তার হাত জখম করে বসে আছে। রক্তের দাগে লাল হয়ে আছে জামা কাপড় বিছানা বালিশ। কী করবে রুমানা এখন। তাড়াতাড়ি কাপড় ছিঁড়ে ব্যান্ডেজ করে দিল। ওদিকে রান্নাঘরেও তো না গেলে হচ্ছে না। তাড়াতাড়ি সবজি কাটতে যেয়ে চাকুতে আংগুল কেটে গেল রুমানার। কাটা জায়গা থেকে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঝরতে লাগল। রক্ত দেখে একটুও ঘাবড়ালো না সে। বন্ধ করার কোন ব্যবস্থাও নিল না। এর চেয়ে অনেক বেশি খুন ঝরে যাচ্ছে তার বুকের ক্ষত হতে। শাশুড়ি তার এ অবস্থা চেয়ে চেয়ে দেখল। একটি কথাও বলল না। সবজি কাটতে যে আংগুল জখম করে তার প্রতি সমবেদনার কী ভাষা থাকতে পারে। গায়ে জ্বর উঠল রুমানার। কোন কিছুই সে মুখে তুলল না। সাকীকে খাইয়ে বিছানায় নুয়ে পড়ল। গা গুলিয়ে বমি আসতে চাচ্ছে তার। রক্ত সে মোটেই দেখতে পারে না। ব্যথানাশক একটা ট্যাবলেট অন্ততপক্ষে খাওয়া লাগতো। সাকীকে দুই চামুচ প্যারাসিটামল খাইয়ে দিয়েছে সে। ঘা সারানোর ওষুধও দেয়া লাগতো। কিন্তু কে করবে ওসব। এ বাড়ির লোকেরা তো তার মাসের মাইনের অপেক্ষা করে থাকে। তার জন্য কার অন্তরে কতটুকু ভালবাসা আছে সে কথা রুমানা অনেক আগে টের পেয়েছে। অন্য সময় হলে পারভেজকে কল দিত রুমানা ডাক্তার নিয়ে আসার জন্য। কিন্তু আজ দিল না। কি হবে ওসব চিকিৎসা টিকিৎসা করে। পারভেজের সাথে কি করে সে কথাবার্তা বলবে এই নিয়ে ভাবছে। তার কাছে যখন স্ত্রীর চেয়ে অন্য কারও আবেদন বেশি তখন কি আশায় সে বেঁচে থাকবে। এখনই মৃত্যু এলে তাকে খুশী মনে বরণ করবে রুমানা। একবার তার মন বলল সব ছেড়ে যেদিকে দু'চোখ যায় সেদিকে চলে যেতে। চাদরে মুখ লুকিয়ে অনেক অশ্রু ঝরাল সে। ব্যথায় আক্ষেপে সে এতটা ভেঙ্গে পড়ল যে একখন্ড শুকনো মৃত্তিকার মতো নিঃশব্দে বিছানায় পড়ে থাকল। নিজকে নিয়ন্ত্রণ করার অনেক চেষ্টা করল সে। তীব্র ঝড়ো বাতাসে নীড়চ্যুত বিহঙ্গের মত একটু আশ্রয় খুঁজবার জন্য সে পার হল অনেক বাত্যাহত প্রান্তর। তাকে তো মুষড়ে পড়লে চলবে না। তাকে অবশ্যই জয়ী হতে হবে। রাত ১০টার পর বাসায় ফিরল পারভেজ। রুমানা এবং সাকীর ইনজুরির কথা শুনে সে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ঘরে এসে রুমানাকে কোমল কণ্ঠে ডাকল সে। সাড়া দেবার ইচ্ছে ছিল না তার। একটি কথা ভেবে সে স্বাভাবিক হল। সে মুখ গোমরা করে থাকলে পারভেজ কারণ অনুসন্ধান করবে। উঠে বসার চেষ্টা করল রুমানা, কিন্তু পারল না। এত যে দুর্বল হয়েছে তার শরীর। মুখ দিয়ে কথাও বের হল না। রুমানার চোখে মুখে হাত বুলিয়ে সাকীর নিদ্রাচ্ছন্ন নিাপ মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে ডাক্তারকে আসার জন্য অনুরোধ করল পারভেজ। কল পেয়ে তড়িঘড়ি চলে এল ডাক্তার। ঘুমন্ত সাকীকে না জাগিয়ে রুমানারই ব্যান্ডেজ দিল সে। খুব আন্তরিকভাবে ব্যবস্থাপত্র লিখে রুমানার মনে একগুচ্ছ সোহাগ ছড়িয়ে চলে গেল সে। ডাক্তার আসায় অনেক সুস্থতা বোধ করল রুমানা। ডা. সবুজের সান্নিধ্য তাকে কেন যে এতটা উল্লসিত করে ভেবে পায় না রুমানা। একদিনের কথা তার মনে পড়ল। সাকীর বয়স তখন সবেমাত্র পাঁচ মাস। হঠাৎ করে প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট এবং কাশি হতে লাগল। দিনের বেলা তেমন সমস্যা না হলেও রাতে সাকীর অবস্থা খারাপের দিকে গেল। তখন ডাক্তারের সাথে ততটা জানাশুনা ছিল না তাদের। পারভেজ ফোন করল তাকে। রুমানার বিশ্বাস হয়নি অত রাতে অমন ঘন ঘোর কুহেলিকায় আরামের শয্যা ছেড়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য কেউ ঘর থেকে বের হবে। সবুজ এসে শুধু চিকিৎসাপত্র দিল না ওষুধ সংগ্রহ করে দিয়ে সাকীর দ্রুত নিরাময়ের সব ব্যবস্থাই করল। সেদিন থেকে সবুজ পরিবারের শুধু প্রিয় চিকিৎসকই হল না, মনের অজান্তে রুমানার প্রিয় বন্ধুতে পরিণত হল। প্রায় দু'বছর ধরে চলছে হৃদ্যতাপূর্ণ আলাপচারিতা। কিন্তু কখনও সে রুমানাকে বুঝতে দেয়নি তার ভেতরে আছে বিপরীত লিঙ্গের এক সত্তা। রুমানার নারীত্বের দিকে কামনামদির কোন বাক্যই তিনি নিক্ষেপ করেননি আজ পর্যন্ত। সবুজ তার সাথে সম্পর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করলে বার বার স্তব্ধ করে দিয়েছিল রুমানা। পরিবারের তিনি একজন চিকিৎসক মাত্র। এর চেয়ে তো বেশি কিছু নন। কেন তিনি তার কর্মের বলয় পেরিয়ে হৃদয়কে নাড়া দিতে আসেন। তার এই আদিখ্যেতা তো কোনক্রমেই মেনে নেয়া যায় না। আবার মাঝে মাঝে রুমানা আত্মবিস্মৃত হয়ে তার সাথে অনেক কথা বলেছে। সান্দ্র বর্ষণের মতো নিবিড়। দূরাগত সুমিষ্ট সংগীতের মত অনুনয় ব্যাকুল তার বাণীর রম্যতা রুমানাকে টেনে নিয়ে গেছে এক ছায়াচ্ছন্ন প্রান্তরে, যেখানে কচি ঘাসের মসৃণ চাদরে পা ফেলে সে অচেনা আনন্দে ভেসে গেছে। সবুজের অবারিত আকর্ষণের অনতিক্রম্য দেয়ালে আটকা পড়ে সহসা অস্বস্তি বোধ করতে থাকে রুমানা। হঠাৎ সে তার মোবাইল বন্ধ করে দেয়। এভাবে এক নাগাড়ে সে চারমাস মোবাইল বন্ধ করে রাখে। রুমানা জানে এতে করে কতটা দুঃখ পাচ্ছে সবুজ। তবু তাকে কষ্টের নদীতে নিক্ষেপ করেছে সে। অথচ সেই একদিন সবুজকে বলেছে, ‘আবার কথা হবে যেদিন আকাশে জাগবে সুনির্মল চাঁদ, ঝিরঝির বাতাসে নির্জনা বারান্দায় নাচবে নারকেল ছায়া।' কিন্তু গগনে চাঁদ জাগলেও কথা আর হয়নি দু'জনের। চেষ্টা করে করে ব্যথিত মনে এক সময় সবুজও কল করা বন্ধ করেছিল। এ নিয়ে রুমানা তেমন কিছু ভাবেনি। তার ব্যবহারে কে কষ্ট পেল এ নিয়ে তার কোন মাথাব্যথা নেই। কিন্তু এক সময় তার নিজেরই খারাপ লাগতে শুরু করল। যখন আকাশে শান্ত জোসনার নিঃশব্দ বিভোর সকল হৃদয়ে আলো ঢেলে দিল তখন সে সবুজের কথা ভেবে কষ্ট পেল। যার কথাগুলো স্নিগ্ধ সমীরণ হয়ে তার অবরুদ্ধ হৃদয়ের কড়া নেড়েছিল। কৃষ্ণচুড়ার ডালে বিরহী বিহংগ হয়ে যায় উচ্চাশা হৃদয়বৃন্তে ঢেলে দিয়েছিল স্বপ্নকুঁড়ি তাকে খুব করে মনে পড়ল রুমানার। মোবাইল তুলে সে প্রথম যাকে কল করল সে হল সেই বঞ্চিত মানুষ যার অন্তর জুড়ে রুমানার নামটিই অনুরণিত হয়। কদিন থেকে রুমানার মনে যে ঝড় বয়ে যাচ্ছে সবুজকে তার কিছুই জানতে দেয়নি রুমানা। এমনকি তার কোন কলই সে রিসিভ করেনি। খুব একটা ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল সে। এখন সে যে এত সব তথ্য উদ্ধার করল তা কাকে জানাবে। এমন আপন তো কেউ নেই তার। সবুজ ছাড়া এমন বন্ধু কে আছে তার যার কাছে সে সার্বিক সুন্দর। চাঁদেও তো কৃষ্ণতিলক আছে। কিন্তু সবুজের কাছে রুমানা নির্দোষ এবং অতুলনীয়া। রুমানাকে আহত করে একটি শব্দও উচ্চারণ করে না সে। অমন করে রুমানাকে তো কেউ ভালবাসে না। সবুজের কাছে অবশেষে কল করল রুমানা। ‘হ্যালো স্লামালেকুম'। ‘ওয়ালাইকুম আছছালাম। কী ব্যাপার কল রিসিভ করছ না কেন?' ‘হারিয়ে গেছি। এদিকে অনেক ঘটনা হয়ে গেছে। অন্যখানে কথা বলতে হয়েছে।' ‘আরেবাশ। সেজন্য অধমকে এত শাস্তি দেয়া হচ্ছে।' ‘শুনুন আজ আমি আপনার সাথে দেখা করতে চাই। অনেক কথা। মোবাইলে বলা যাবে না।' ‘আচ্ছা। তাহলে কখন আসছ। আমার যে তাড়া আছে।' ‘তাড়া সেরে নিন। বিকেলে আসছি।' বিকেলে রেস্তোরাঁয় বসে সবুজকে সব কথা খুঁটে খুঁটে বলল রুমানা। কদিনেই তার চেহারার উজ্জ্বলতা উবে গেছে। কেন এমন হল তার জীবনে। এখন সে ত পারভেজের সাথে স্বাভাবিক হতে পারছে না। তাকে অনেক সান্ত্বনা দিল সবুজ। মেঘপুঞ্জ থেকে সতেজ হাওয়া এনে তার গোলাপী অধরে ছুঁয়ে দিল। সাগরের বিস্তীর্ণ বেলাভূমি থেকে উর্মিমালার উল্লাস এনে মেখে দিল তার বিষণ্ণ অবয়বে। বৃষ্টির ছোঁয়ায় মৃত্তিকা যেমন প্রাণময় হয়ে উঠে তেমন সুখময় উচ্ছাস রুমানার সত্তার গভীরে তরঙ্গিত হল। তার দুমড়ে যাওয়া অনুভূতি আবার সরব হয়ে উঠল। ‘সেই কবিতাটি। কিন্তু এখনও দেননি।' ‘কোন কবিতা!' ‘ঐ যে যখন আকাশে চাঁদ উঠবে- কথা বলে কথার অরণ্য হবে।' ‘ও আচ্ছা, দেব অবশ্যই দেব। ওটাতো তোমাকে নিয়েই লেখা।' ‘দেখেছেন, আমার দেয়া একটু কষ্টে কত সুন্দর কবিতা হয়েছে।' ‘সীমা পারভেজের বন্ধুত্ব তো এমনই।' ‘অবশ্যই নয়। আপনার বন্ধুত্ব বৃষ্টির মত স্বচ্ছ। রোদের মত অবারিত।' ‘থাক, আর কাব্য করতে হবে না।' ‘কবি কি আমি। কবি তো আপনি।' সবুজের কাব্যপ্রতিভার সন্ধান পেয়েছে রুমানা। পাঁচ বছর আগে প্রকাশিত একটি কবিতাগ্রন্থে রুমানার দেহসৌষ্ঠবের বাস্তব স্ফুরন ঘটেছে। আশ্চর্য না হয়ে পারা যায় না, সেখানে তার নাম ব্যবহার করে একটি কবিতাও আছে। কী করে এটা সম্ভব। ‘‘রুমানার সোনালী অধরে পাখি ওড়ে, হাসি ঝরে সারাক্ষণ বোশেখী ঝড়ে বিদ্যুৎ নাচে ফনা তোলে কালো মেঘ অগণন’’ কী করে তিনি এমন আশ্চর্য কবিতা লিখতে পারলেন। উনি বলেন, রুমানা আমি তোমাকে বাস্তবে দেখার আগে মনের মুকুরে শতবার প্রত্যক্ষ করেছি। তোমার বিমুগ্ধ ছবি আমি পথের মসৃণ বিস্তারে খুঁজে ফিরেছি। আজ আমি ধন্য এজন্য যে, তোমার সাথে আমার দেখা হয়েছে। কল্পনার দুঃসহ আবর্তে আমাকে ঘুরে মরতে হচ্ছে না। যখনই চাচ্ছি, তোমার সাথে দেখা করতে পারছি। এ কথাগুলো বিশ্বাস করতে আগে খুব কষ্ট হতো রুমানার। এখন তার মনের আকাশ থেকে সন্দেহের মেঘ কেটে গেছে। সীমাকে নিয়ে পারভেজের কি হবে? যে প্রণয়ের সূচনা হয়েছে মিথ্যা ও প্রতারণার অনুর্বর ভিত্তির ওপর তা নির্ঘাত আহত করবে সীমাকে। রুমানা ইচ্ছে করলে এখনই ওর স্বপ্নের প্রাসাদ গুঁড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু তা সে করছে না। অতটা তাড়াহুড়োর কি আছে। পারভেজ যদি দাম্পত্য সম্পর্ক নষ্ট করতে চায় তাহলে তো রুমানার হাত পা ছুঁড়ে লাভ নেই। আর যদি সে রুমানাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় তখন স্বভাবতই সীমা হবে কল্পনালোকের নিভৃতচারিনী। যখন তার প্রণয় মহীরুহের শিকড়ে বাসনার রস সিঞ্চিত হবে না তখন আপনাতেই তো দিবসের উন্মুক্ত খরতাপে শুকিয়ে যাবে। সীমার প্রতি কেন জানি তার মায়া হয়। একটি চঞ্চলা মেয়ে নবীন বাসনার উদ্দাম শকটে চড়ে দ্রুত সরে যাচ্ছে অশুভ গন্তব্যের দিকে। কান্নাই হবে যার একান্ত সাথী, রাতজাগা পেঁচকের কর্কশ শব্দ যার অখন্ড চেতনাকে বিক্ষত করবে। এখান থেকে সীমাকে উদ্ধার করার কোন পথ তার জানা নেই। সীমার কাছে সবকিছু গোপন রেখে রুমানা তাকে কিছুটা অবকাশ দিচ্ছে। হোক না সে একটু আশার ভুবনে সঞ্চরণ করুক। দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত মুমূর্ষু রোগীর মত দুঃস্বপ্নের রাতে বাঁচার স্বপ্ন দেখুক। সীমাকে মোবাইল করে সে। ‘আপু একটা কথা বলি।' ‘কী কথা বলুন না।' ‘আজকাল ছেলেরা তো অহহর বিট্রয় করছে। কামরান ভাই যদি তেমন কিছু করে।' ‘সেটা আমিও ভাবছি। না না, ওকে দেখে তেমন মনে হয় না।' ‘তবু সাবধান হতে তো দোষ নেই। বিয়েটা চুকে ফেললে ভাল হয় না?' ‘আমি তো তাই চাচ্ছি। কামরানই ডিলে করছে। ও বলছে আমার পাসটা হোক।' ‘দেখুন আমার কথা আমি বললাম। আমি কিন্তু ছেলেদের মাথামুন্ডু কিছুই পাইনে।' মনকে অনেক সান্ত্বনা দিল রুমানা। পৃথিবীতে একজন আরেকজনের বন্ধু হতেই পারে। বিজ্ঞানের উদ্ভাবনী শক্তি মানুষকে টেনে এনেছে একেবারে কাছাকাছি। ভাষা, বর্ণ এবং ভৌগোলিক দূরত্ব কমিয়ে মানবতাকে দাঁড় করিয়েছে একই সমতলে। হয়ত সীমার মধ্যে আছে আলাদা মাধুর্য, আলাদা ভাললাগার বিষয়বস্তু। তাই বলে তার কাছে সব সত্য গোপন করে মিথ্যার জাল বুনতে হবে? কেন পারভেজ একথা বলল না সে সীমার একজন বন্ধু হতে চায়। যেমন রুমানাকে বন্ধু বলে গ্রহণ করেছে সবুজ। যাকে সে রোদের মত প্রাঞ্জল এবং পরিশুদ্ধ বলে জানে। রুমানার সব হতাশাকে জোসনার সৌরভ দিয়ে ধুয়ে দেয় সে। সে তো মিথ্যার ধোঁয়ায় তার চেতনাকে আচ্ছন্ন করেনি। এমন একজন ভাল বন্ধুকে রুমানা কখনও দূরে ঠেলে দিতে পারবে না। তাকে দুরে ঠেলার কোন যুক্তিই সে আবিষ্কার করতে পারেনি। রুমানা এখন স্পষ্ট করে বুঝতে পারছে একজন ভাল বন্ধুর কতটা প্রয়োজন। এ দু'বছর সবুজ তাকে যতটা খুশি করার চেষ্টা করেছে বিভিন্ন উপহারে তা তার ধারণারও বাইরে। কেন তিনি ওসব দিচ্ছেন? এ সম্পর্কে সে সবসময় মনে নেগেটিভ ধারণা পোষণ করেছে। কিন্তু গত কুরবানী ঈদে রুমানার যখন অনেক টাকার দরকার হল তখন অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাকে কল করল। তার মনে এ ধারণা কখনই ছিল না যে সবুজ তাকে নিঃসংশয়ে অতগুলো টাকা দেবে। কিন্তু সবুজ তাকে ফিরায়নি। কোন প্রশ্ন না তুলে সহাস্যচিত্তে টাকাগুলো দিয়েছে সবুজ। কোন ডকুমেন্ট রাখবার প্রয়োজনও বোধ করেনি। এখন মানুষকে বন্ধু না বলে কাকে বলবে সে। এখন তার মনে একজন বিশুদ্ধ মানুষ হিসেবে বিরাজ করছে ডা. সবুজ। এই নির্দোষ, নিরীহ লোকটি মনের ভুবন থেকে বের করে দিতে কখনই পারবে না রুমানা। দু' চারদিনের আলাপে সীমার প্রতি গভীর মমতা জন্ম নিল রুমানার মনে। মেয়েটার কণ্ঠে একটা মারাত্মক যাদুকরী শক্তি আছে। দূরাগত কোন ছন্দময় সুর যেন সমুদ্র তরঙ্গের ওপর দিয়ে লাফিয়ে এসে কানের ভেতর গড়িয়ে পড়ে। শব্দগুলো এক বিশেষ ভঙ্গিমায় বিন্যস্ত হয়ে হৃদয়কে করে তোলে উদাস উন্মন। অশ্রুত সব সুরের কারুকার্য কণ্ঠে ধারণ করে সে বিচরণ করে অচেনা জগতে। কী এক দুর্বার আকর্ষণে রুমানা তার দিকে ছুটে যেতে চায় তা সে নিজেই জানে না। রুমানা ভাবে এমন করে ব্যক্তিত্বহীন হওয়া তার কি ঠিক হচ্ছে। যে সীমা তার বুকে অশান্তির প্রদাহ জ্বালিয়ে দিয়েছে তার প্রতি দুর্বল হওয়া নিজের প্রতি অবিচার করার নামান্তর। পারভেজকে নিয়ে সীমার স্বপ্নগুলো মন দিয়ে শুনেছে রুমানা। তার হৃদয়ের প্রতিধ্বনিই তো বাজে সীমার মধ্যে। একটি সাজানো সুখের নীড়, একটি কচি মুখের প্রাণবন্ত হাসি আরও কত কিছু। না না এমনটা হবে কেন? এসব তো তার একান্ত স্বপ্ন। তার স্বপ্নগুলো সীমা নির্দয়ভাবে ছিনিয়ে নিতে চায়। রুমানা ভাবল, সে অবশ্যই দেখা করবে সীমার সাথে। তারপর তাকে বুঝাবে সে রুমানার কতটা ক্ষতি করছে। তার স্বপ্নের নিভৃত নিকুঞ্জ সে তছনছ করছে কোন অধিকারে। তাদের ছোট সংসারের আবেগঘন মুহূর্তের একটি ছবি সে দেখাবে সীমাকে। তখন সীমা অবশ্যই বুঝবে কোন ভংগুর মৃত্তিকাটিলায় দাঁড়িয়ে সে চাঁদের দিকে হাত বাড়িয়েছে। সীমার সাথে দেখা করতে রুমানা রংপুর যায়। রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠেই তাদের দেখা হয়। একান্ত বন্ধু হিসেবে সবুজ সঙ্গ দেয় তাকে। কামরান সম্পর্কে অনেক কথা বলে সীমা। তার একান্ত প্রিয়, হৃদয়ের রাজা কামরান তাকে কখনই কষ্ট দিতে পারবে না। রুমানা সব শোনে। কোন কথাই বলতে পারে না সে। সবুজ একখানা ছবি তুলে দেয় সীমার হাতে। ‘দেখুন তো আপামনি এ ছবিখানা চিনতে পারেন কিনা। আর শুনুন আপনি যাকে কামরান বলে জানেন তার নাম পারভেজ। আর ইনি হচ্ছেন তার স্ত্রী রুমানা। ছবির দিকে এক পলক দেখেই চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে লাগল সীমার। দু'হাতে মুখ ঢেকে সে ছুটে চলে গেল অন্যদিকে। তাকে ডাকতে যেয়েও ডাকতে পারল না রুমানা। প্রশ্নপূর্ণ চোখে সবুজের চোখের দিকে তাকাল সে। সেখানে সে শান্ত সুমধুর এক প্রান্তর দেখতে পেল। যেখানে দাঁড়িয়ে পারভেজ তাকে ডাকছে, অবাধ আনন্দমুখর অন্তহীন ভালবাসার দিগন্তে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ