শুক্রবার ২১ মে ২০১০
Online Edition

শত অসঙ্গতির বাস্তব চিত্র

মুহাম্মদ নূরে আলম বরষণ : গত ১০ মে থেকে ১২ মে পর্যন্ত ৩ দিনব্যাপী বাংলাদেশ কার্টুনিস্ট ফোরামের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল জাতীয় প্রেসক্লাবে কার্টুন প্রদর্শনী ২০১০। প্রদর্শনীতে ১০৮টি কার্টুন ঠাঁই পেয়েছে। এগুলোর মাধ্যম ডিজিটাল প্রিন্ট ও জল রঙ। কার্টুনগুলোতে সমাজের নানা অসঙ্গতি ও বিভিন্ন সমস্যা ব্যঙ্গ ও প্রতিবাদী শৈল্পিক প্রতিফলন ঘটেছে। কার্টুনগুলোর মূল উপজীব্য ছিল সমসাময়িক জাতীয় রাজনীতির অসঙ্গতি। প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন দেশের খ্যাতনামা কার্টুনিস্ট। তারা হলেন- দৈনিক আমার দেশের আসিকুল হুদা, দৈনিক আমাদের সময়ের শেখ তোফাজ্জল হোসেন তোফা, দৈনিক সংগ্রামের সিনিয়র আর্টিস্ট ইব্রাহিম মন্ডল, দৈনিক নয়া দিগন্তের জাহিদ হাসান বেনু, দৈনিক নিউ এজের মেহেদী হক, ঢাকাস্থ ইরান দূতাবাসের মাসিক পত্রিকা ‘কিশোর নিউজ লেটারে'র আর্টিস্ট মহিউদ্দিন আকবর, নয়া দিগন্তের জুনিয়র আর্টিস্ট আজিজুর রহমান তালুকদার নিয়ন ও কিশোর কার্টুনশিল্পী হাসান মাহমুদ। প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া ১০৮টি কার্টুন চিত্রের মধ্যে ফুটে উঠেছে বিপন্ন গণতন্ত্র, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার নামে ধোঁকাবাজি, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনে নগ্ন দলীয়করণ, মন্ত্রী-এমপিসহ সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের সন্ত্রাস, টেন্ডারবাজি, মানবাধিকার লংঘন, আইন শৃক্মখলার চরম অবনতি, দ্রব্যের অগ্নিমূল্য, সাংবাদিক নির্যাতন, গণমাধ্যম দল, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সংকট, বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ত্রাসী কান্ড ও ছাত্রী নির্যাতন, ট্রানজিটসহ ভারতের সকল দাবি সরকারের মিটিয়ে দেয়া ইত্যাদির মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামাজিক অসঙ্গতির চিত্র উঠে এসেছে। প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া সমাজের অন্যায়-অসঙ্গতির বিরুদ্ধে ৮ কার্টুনিস্ট শিল্পীর প্রতিবাদী চিত্র দর্শনার্থীদের নব চেতনায় উজ্জীবিত করেছে। দেশপ্রেম নতুন করে জাগ্রত করেছে। এদেশে ১৮৮৬ সাল থেকে কার্টুন চর্চা শুরু হয়ে এবং বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় কার্টুন প্রকাশ হতে থাকে। দশ পাতা লিখে যা স্পষ্ট করা যায় না, তা একটি কার্টুন দিয়ে বুঝিয়ে দেয়া যায়। সমাজের শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবাই কার্টুন বুঝতে পারেন। প্রদর্শনীতে অংশ নেয়া দেশের খ্যাতনামা ৮ কার্টুনিস্টের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হল- আসিকুল হুদা : ১৯৫৬ সালে জন্ম নেয়া নরসিংদীর সন্তান আসিকুল হুদা ১৯৮২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে এমএ করেন। ১৯৮১ সালে সাপ্তাহিক সচিত্র স্বদেশ পত্রিকার মাধ্যমে কার্টুনিস্ট হিসেবে প্রথম পেশাগত জীবন শুরু করেন। বর্তমানে আমার দেশে কার্টুনিস্ট হিসেবে কর্মরত। জীবনে অসংখ্য কার্টুন এঁকে খ্যাতি অর্জন করেছেন। এ পর্যন্ত একক প্রদর্শনী করেছেন ৩টি। শেখ তোফাজ্জল হোসেন তোফা : রাজবাড়ী জেলার ছেলে শেখ তোফাজ্জল হোসেন তোফা পড়াশুনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬৭ সালে সৈনিক পত্রিকায় কার্টুন অাঁকা শুরু করেন। ১৯৫৮ সালে কার্টুন অাঁকার কারণে দীর্ঘদিন কারাবরণ করেন। এ পর্যন্ত তিনি ৩ হাজারের বেশি কার্টুন ও পকেট কার্টুন প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমানে তিনি দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকায় কার্টুনিস্ট হিসেবে কর্মরত। জাহিদ হাসান বেনু : ঝিনাইদহের ছেলে জাহিদ হাসান বেনু ১৯৮৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত দৈনিক ইনকিলাবের সিনিয়র আর্টিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি দৈনিক নয়া দিগন্তের কার্টুনিস্ট হিসেবে কর্মরত। ১৯৭৩ সালে দিল্লীতে অনুষ্ঠিত শংকর আন্তর্জাতিক শিশু চিত্রকলা প্রতিযোগিতায় রৌপ্য পদক লাভ করেন। মেহেদী হক : ১৯৮৪ সালে ঢাকায় জন্ম। কার্টুনিস্ট মেহেদী হক বর্তমানে ইংরেজি দৈনিক নিউএজ-এ কার্টুনিস্ট হিসেবে কর্মরত। তিনি টিআইবি'র কার্টুন প্রতিযোগিতায় প্রথম হন। মহিউদ্দিন আকবর : ১৯৬৫ সালে মাদারীপুর জেলায় জন্মগ্রহণকারী মহিউদ্দিন আকবরের শৈশব কেটেছে পেশোয়ার ও রাওয়ালপিন্ডিতে। তাঁর অাঁকা কার্টুন ও কমিকসের সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। তিনি দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে একক চিত্র ও পোস্টার প্রদর্শনী করেছেন ৬ বার। বর্তমানে তিনি ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দূতাবাসের কিশোর নিউজ লেটার পত্রিকার আর্টিস্ট হিসেবে কর্মরত। ইব্রাহিম মন্ডল : ১৯৫৮ সালে মোমেনশাহী জেলার গফরগাঁওয়ের পোড়াবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে ড্রইং পেইন্টিংয়ে এমএ করেন। ১৯৮০ সাল থেকে কার্টুন অাঁকা শুরু করেন। কিশোরকণ্ঠ, সাপ্তাহিক ঝান্ডা, সাপ্তাহিক বিক্রম, দৈনিক মিল্লাতে কার্টুনিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি দৈনিক সংগ্রামের সিনিয়র আর্টিস্ট হিসেবে কর্মরত। এছাড়াও দেশের প্রথম কিশোর কার্টুন পত্রিকা নয়া চাবুকের সম্পাদক। ইব্রাহিম মন্ডল (ই মন্ডল) কার্টুন বিষয়ে একটি তথ্যবহুল বই রচনা করেছেন। তিনি দেশে বিদেশে বহু প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন। আজিজুর রহমান তালুকদার নিয়ন : ১৯৮৫ সালে ঢাকার ইব্রাহিমপুরে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে এমএফএ অধ্যয়নরত। পেশাগত জীবনে তিনি দৈনিক নয়া দিগন্তের আর্টিস্ট হিসেবে কর্মরত। হাসান মাহমুদ : ১৯৯৫ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে খিলগাঁও সরকারি স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র। তিনি কিশোরকণ্ঠ ও নয়া চাবুকের নিয়মিত কার্টুনিস্ট। দেশের খ্যাতিমান কার্টুনিস্টদের সাথে নিয়ে প্রকাশিত কিশোরকণ্ঠ কার্টুন সমাজে তার কার্টুন স্থান পেয়েছে। কার্টুন শুধু হাসির খোরাক নয়, সমাজের দর্পণ, জনমতের প্রতিধ্বনি। সমাজের যাবতীয় অসঙ্গতি তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সমাজ পরিবর্তনের বলিষ্ঠ হাতিয়ার। সার্বজনীন ভাষা। আমেরিকান একজন সমালোচকের মতে পাঁচ হাজার শব্দের একটি সম্পাদকীয়ের কাজ একটি ছোট্ট কার্টুনেই হয়ে যেতে পারে। ভারতের অশোক মিত্রের মতে- কার্টুন হল, অপারেশন থিয়েটারের কাঁচি। ডাক্তাররা যেমন অপারেশন থিয়েটারে রোগীর দেহের পচন অংশ কেটে ফেলে দেয় তেমনি কার্টুনের মাধ্যমে সমাজের অশুভ অপশক্তিকে চিহ্নিত করে বাদ দেয়া হয়। কার্টুনের এই কার্যকারিতার জন্যই দিন দিন এর চাহিদা বেড়েই চলছে। কার্টুন আজ পত্রিকার পাতার অপরিহার্য অংশ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। রাশিয়া, সোভিয়েত মতাদর্শ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কার্টুন এবং চলচ্চিত্র বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। অশিক্ষিত লোকদের জাগিয়ে তোলা ও তাদের জনমত গঠনের সার্বজনীন ভাষা এই কার্টুনকেই বেছে নিয়েছিল তারা। কার্টুন একটা মানুষের ভিতরের রূপটাকে প্রকাশ করে জন সম্মুখে তুলে ধরে, বাহ্যিক রূপ নয়। তাই অনেক কার্টুনে পশুর চেহারাও তুলে ধরেন কার্টুনিস্টরা। সম্প্রতি বাংলাদেশের সমকালীন অবস্থা নিয়ে বাংলাদেশ কার্টুনিস্ট ফোরাম জাতীয় প্রেসক্লাবে ৩ দিনব্যাপী আয়োজন করে কার্টুন প্রদর্শনী। ১০, ১১ ও ১২ মে এই প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন বরেণ্য সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শফিক রেহমান। সভাপতিত্ব করেন চারুকলা ইনস্টিটিউট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আব্দুস সাত্তার, প্রধান অতিথি ছিলেন বরেণ্য সাংবাদিক আতাউস সামাদ। তিনি অসুস্থ থাকায় লিখিত বক্তব্য পাঠান এবং তা পাঠ করা হয়। উদ্বোধনী বক্তব্য প্রদান করেন প্রদর্শনীর আহবায়ক ইব্রাহিম মন্ডল ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন জনাব আসিকুল হুদা। প্রদর্শনীতে বিপুল দর্শক সমাগম হয়। এতে নারী, পুরুষ, শিক্ষার্থী, পেশাজীবী, সাংবাদিকসহ সব শ্রেণী দর্শকের আগমন ঘটে। দেশী-বিদেশী বিভিন্ন মিডিয়াকর্মী এ প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া মজার অথচ রাজনীতি ও সরকারের আচরণের অসঙ্গতিমূলক কার্টুনের ছবি তুলে নেন। কাটুর্নগুলো সময়োপযোগী হওয়ায় তা দর্শনার্থীদের কাছে সমাদৃত হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ