ঢাকা, মঙ্গলবার 2 January 2018, ১৯ পৌষ ১৪২৪, ১৪ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নির্বাহী হস্তক্ষেপমুক্ত বিচার বিভাগ চান আইন বিশেষজ্ঞরা

স্টাফ রিপোর্টার : প্রথমবারের মতো দেশে সুপ্রিম কোর্ট দিবস পালিত হতে যাচ্ছে আজ। দিবসটি উদযাপন উপলক্ষে আলোচনা সভার আয়োজন করেছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। এদিকে সুপ্রিম কোর্ট দিবস পালনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা।
দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে এক বিবৃতিতে তারা বিচার বিভাগের উপরে নির্বাহী বিভাগের আধিপত্য ও হস্তক্ষেপমুক্ত একটি পরিবেশ তৈরী করার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, এমন একটা সময়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে যখন এদেশের বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ অভিভাবক প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য। অধস্তন আদালতের (নিম্ন) বিচারকদের আচরণ ও শৃঙ্খলাবিধি প্রসঙ্গে উদ্বেগ প্রকাশ করে ববৃতিতে বলা হয়েছে, এই বিধিমালা প্রণয়নে সংবিধানের মূলধারার বিচুতি ঘটেছে। আইন সমূহ (বিধিমালা) সংবিধানের অধীনে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এবং বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের দুটি বিভাগ (আপীল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ) এর সাথে যথাযথ পরামর্শ ব্যতীত প্রণয়ন করা হয়েছে।
বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন-সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন, প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, ব্যারিস্টার এম. আমীর-উল ইসলাম, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, সাবেক এটর্নি জেনারেল এ এফ হাসান আরিফ ও ফিদা এম কামাল।
সুপ্রিম কোর্ট দিবসের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি মো.আবদুল হামিদ। বিশেষ অতিথি থাকবেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। সভাপতিত্ব করবেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি মো.আবদুল ওয়াহহাব মিঞা। দুপুর ২টায় অনুষ্ঠান শুরু হবে সুপ্রিম কোর্টের জাজেস স্পোর্টস কমপ্লেক্সে। অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখবেন সুপ্রিম কোর্ট দিবস উদযাপন সংক্রান্ত জাজেস কমিটির সভাপতি আপিল বিভাগের বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখবেন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল বাসেত মজুমদার ও সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি জয়নুল আবেদীন।
অনুষ্ঠানে আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা অংশ নেবেন। আলোচনা সভা উপলক্ষে এরআগে সুপ্রিম কোর্টের সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পরিচয়পত্র বহণ করতে নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন।
বিবৃতিতে বলা হয়, ১৯৭২ সালে ২৮শে ডিসেম্বর বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট উদ্বোধন করেন জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। এবার প্রথম, সুপ্রীম কোর্ট দিবস পালিত হতে যাচ্ছে আগামী ২ জানুয়ারিতে (আজ মঙ্গলবার)। এমন একটা সময়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে যখন এদেশের বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ অভিভাবক প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য।
এই উপলক্ষে বাংলাদেশের সংবিধান এর অখন্ডতা রক্ষা, সমর্থন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, এদেশের নাগরিকদের সকল মৌলিক অধিকার বলবৎ করার আদেশ বা নির্দেশ, সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারের পাশাপাশি সংবিধানের যে কোন অংশের সঙ্গে সঙ্গতিহীন কোন আইন বা সরকারি বিধি বা আদেশ যা সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক এমন কোন প্রশ্ন কিংবা জনগুরুত্বপূর্ণ  কোনো বিষয়ে বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্ট এর গুরুত্বপূর্ণ রায় ও ঐতিহ্য গর্বের সাথে স্মরণ করছি।
এক্ষেত্রে সুপ্রীম কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রায় ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে, যা আমরা উল্লেখ করতে পারি (ক) ৭টি বিভাগীয় শহরে মহামান্য হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ গঠনের বিষয়ে প্রণীত সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত রায় (খ) সামরিক ফরমান জারী সংক্রান্তে আনীত সংবিধানের ৫ম সংশোধনী বাতিলের রায় (গ) চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশী কোম্পানিকে ১০০ বছরের জন্য লীজ প্রদান বাতিল সংক্রান্তে রায় (ঘ) ২০০৭ সালের ১,৪০,০০,০০০ ভুয়া  ভোটার বাতিল সংক্রান্ত রায় এবং (ঙ) সাম্প্রতিক সময়ে সংসদ কর্তৃক মহামান্য সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতি অপসারণ সংক্রান্তে আনীত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা ও বাতিলের রায় সহ জনস্বার্থে দেওয়া অসংখ্য রায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উপরোল্লিখিত রায় সমূহের মাধ্যমে এটাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে জনগণের অধিকার রক্ষার্থে সংবিধানের  মৌলিক কাঠামো ও ভারসাম্য কোন অবস্থাতেই পরিবর্তন ও ব্যত্যয় ঘটানো যাবেনা।
সম্প্রতি মাসদার হোসেন মামলার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি পুনঃস্মরণ করতে গিয়ে দেখা যায় যে অধঃস্তন আদালতের ক্ষেত্রে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিধি প্রণয়নে সংবিধানের মূলধারার বিচ্যুতি পরিলক্ষিত হয়। এটা গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। কারণ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্বকীয় অবস্থানের জন্য সংবিধান যে সুরক্ষা দিয়েছে তা সংরক্ষণ বা বাস্তবায়ন করা সর্বোচ্চ আদালতের দায়িত্ব। দীর্ঘ ৪৬ বছর কালক্ষেপনের পর এই বিধিগুলো বর্তমানে অধঃস্তন বিচার বিভাগের জন্য সরকার সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৩৩ অনুযায়ী করেছে, অথচ উক্ত ১৩৩ অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কর্মচারীদের নিয়োগ ও কর্মের জন্য প্রণীত হওয়ার বিষয়টি সংবিধানের কর্ম বিভাগের জন্য প্রযোজ্য। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, অধঃস্তন আদালতে বিচার বিভাগীয় পদে নিয়োগ, নিয়ন্ত্রণ, পদোন্নতি প্রদান ও ছুটি মঞ্জুরীসহ শৃঙ্খলা বিধান সংক্রান্ত বিষয় সংবিধানে দুটি অনুচ্ছেদ ১১৫ ও ১১৬ তে পৃথকভাগে বিচার বিভাগের অংশে প্রণীত আছে। তথাপিও উক্ত আইন প্রণয়নের মাধ্যমে অধঃস্তন বিচার বিভাগের বিচারকদের নির্বাহী বিভাগের অধঃস্তন হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, যা ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতির লঙ্ঘনসহ মাসদার হোসেন মামলার রায়ের সাথেও সাংঘর্ষিক। উক্ত আইন সমূহ সংবিধানের অধীনে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এবং বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের দুটি বিভাগ (আপীল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ) এর সাথে যথাযথ পরামর্শ ব্যতীত প্রণয়ন করা হয়েছে।
অধঃস্তন আদালতে বিচারক নিয়োগ ও বদলি বিষয়ের বিধিমালা দীর্ঘ কালক্ষেপনের পর নির্বাহী বিভাগ ও মন্ত্রণালয় এমন একটি সময়ে স্থানান্তরিত হয়েছে যখন বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য এবং যা সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের সাথে প্রয়োজনীয় অর্থবহ পরামর্শ ব্যতীত প্রণয়ন করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অধঃস্তন আদালতকে ১৯৯৯ সালের পূর্বের যুগে নির্ধারিত করার সামিল।
তাহলে সর্বোচ্চ আদালত দিবসে আমরা কি বার্তা প্রেরণ করব? এ বিষয়ে জনগণ ও সুশীল সমাজকে সচেতন করার কোন বিকল্প নেই। আমাদের ঐক্যমতের মাধ্যমে একত্রিত হয়ে দেশের সাংবিধানিক ভারসাম্য রক্ষা করার প্রচেষ্টাকে একত্রিত করে দৃঢ় ও সংকল্পিতভাবে জনগণের অধিকার পুনরুদ্ধার করা এবং সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর ভিত্তিতে একটি উপযুক্ত স্বাধীন ও পৃথক বিচার বিভাগের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা ব্যতীত অন্য কোন বিকল্প নেই।
প্রথমবার সুপ্রীম কোর্ট দিবস পালন করার উদ্যোগকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখার নির্মিত্তে বিচার বিভাগের উপরে নির্বাহী বিভাগের আধিপত্য ও হস্তক্ষেপ মুক্ত একটি পরিবেশ তৈরী করার আহবান জানাতে চাই। সেই সাথে মাসদার হোসেন মামলার রায়ের মাধ্যমে যাতে অধঃস্তন আদালতকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথকীকরণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আদালতের দিক নির্দেশনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগ সংবিধান ও সর্বোচ্চ আদালতে রায়ের প্রতি সম্মান দেখাবেন বলে আশা করি।
সংবিধান অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্ট ১৯৭২ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রথম কার্যক্রম শুরু করে। এর প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের প্রথম কার্যদিবসকে প্রতি বছর সুপ্রিম কোর্ট দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ১৮ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের পূর্ব নির্ধারিত ছুটি থাকায় প্রথম কার্যদিবস (ছুটির পরে) ২ জানুয়ারি দিবসটি উদযাপিত হবে। এর আগে গত ২৫ অক্টোবর দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞার সভাপতিত্বে সুপ্রিম কোর্টের ফুলকোর্ট সভায় দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ