ঢাকা, মঙ্গলবার 2 January 2018, ১৯ পৌষ ১৪২৪, ১৪ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

৫ জানুয়ারি রাজধানীতে সমাবেশের পাশাপাশি সারাদেশে কালো পতাকা মিছিল করবে বিএনপি

গতকাল সোমবার নয়া পল্টন বিএনপি কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিং করেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার: ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের বর্ষপূর্তির দিনে রাজধানীর  সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে সমাবেশের পাশাপাশি সারাদেশে জেলা-উপজেলা সদরে কালো পতাকা মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। গতকাল সোমবার সকালে দলের নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রহুল কবির রিজভী এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
সাংবাদিক সম্মেলনে দলের ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, কেন্দ্রীয় নেতা মীর সরফত আলী সপু, মুনির হোসেন, রফিকুল ইসলাম মাহতাব প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
রিজভী বলেন, আজকের ভোটারবিহীন সরকার গায়ের জোরে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একতরফা নির্বাচন করে গণতন্ত্রকে হত্যা করে। বিএনপি এই দিবসটিকে গণতন্ত্র হত্যাদিবস, গণতন্ত্র অপহরণ দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। আমরা ঢাকা মহানগরীতে সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে সমাবেশ করার কর্মসূচি ঘোষণা করেছি। একই সঙ্গে আগামী ৫ জানুয়ারি সারাদেশে জেলা ও উপজেলা সদরে কালো পতাকা মিছিল অনুষ্ঠিত হবে।
 সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে সমাবেশের অনুমতির বিষয়ে জানতে চাইলে রিজভী বলেন, আমরা পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমতি চেয়েছি। গত পরশুদিন (শনিবার) এই চিঠি দেয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে কোনো কথা জানতে পারিনি। তবে ৫ জানুয়ারি আমরা জনসভা অনুষ্ঠানের সব প্রস্তুতি রাখছি।
রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করে বলেন, বছরের প্রথম দিন থেকে সরকারের দমননীতির বর্হিপ্রকাশ ঘটিয়েছে। তার কিছু উদাহরণ তুলে ধরছি যাতে সরকারের মানসপট প্রকাশ পাবে। বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলা সদরের মো. আওলিয়া, শিবপুরের নবাব আলী, মো. লিটনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। চিতলমারী উপজেলা সদরের মমিনুল হক টুলু, আহসান হাবিব, জাকারিয়া, শরিফুল আলম অপু‘র বাসায় পুলিশ তল্লাশির নামে আসবাবপত্র ভাংচুর করেছে, বাড়ির মহিলাদের সাথে দুর্ব্যবহার করেছে পুলিশ। শুধু তাই নয়, ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে চুয়াডাঙ্গায় শোভাযাত্রার প্রস্তুতিকালে নেতা-কর্মীদের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে। এতে স্থানীয় বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক অহিদুজ্জামান ভোলা, ছাত্র দলের আহ্বায়ক শরিফুজ্জামান সিজারসহ অর্ধশতাধিক নেতা-কর্মী আহত হয়েছে। আমরা সরকারের এহেন কর্মকান্ডের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।
বিদায়ী বছর নিয়ে রিজভী বলেন, গেল বছর সারা বিশ্বে হানাহানি, যুদ্ধ, সংঘাত, রক্তপাতের পাশাপাশি মানবজাতির নানা অগ্রগতিরও খবর পাওয়া গেছে। বিচ্ছেদ, বিনাশ, ব্যবধানের মধ্যেও বিশ্বের সৃষ্টিশীল মানবিক মানুষ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মানুষকে রক্ষা করার। বাংলাদেশের মতো কিছু দেশ গণবিরোধী সরকারের উৎপীড়নে, পরাধীনতা ও অধঃপতনের শেষ সীমান্তে গভীর দুর্গতির মধ্যে এসে পড়েছে। ‘এক আইন, এক প্রভু হলে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের পক্ষে ভয়ঙ্কর সঙ্কট’। বাংলাদেশের গণতন্ত্র লাল দেয়ালের অভ্যন্তরে বন্দী। তিনি বলেন, গণতন্ত্রে অপরিহার্য শর্ত হলো বিরোধী দল। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি সরকারি নির্যাতনে আক্রান্ত। গেল বছরেও জনগণের অগ্রযাত্রাকে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী বলপূর্বক প্রতিহত করেছে। গণতন্ত্রে স্বীকৃত সভা-সমাবেশকে তারা বানচাল করেছে। কণ্ঠরোধ করার জন্য গণমাধ্যম থেকে শুরু করে নানা চিন্তা, মত ও বিশ্বাসের মানুষের ওপর নেমে এসেছে সরকারের নানা প্রকার আক্রমণের আঘাত। বিএনপি’র শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত নেতাকর্মীরা বিভিন্ন মিথ্যা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মামলায় জর্জরিত। জাতীয়তাবাদী শক্তির প্রতীক এ সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ভুয়া ও জালিয়াতি করে সাজানো মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করার জন্য প্রতি সপ্তাহে কয়েকদিন আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে। এছাড়াও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান, বিএনপি মহাসচিব, জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যবৃন্দসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে প্রায় সারাবছরই আদালতে হাজিরা দিতে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে।
রিজভী বলেন, গেল বছরে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের প্রতি অপপ্রচার, মিথ্যা কথা, কলঙ্ক লেপন, অশ্রাব্য-কুশ্রাব্য ভাষা ব্যবহার ইত্যাদি অব্যাহত ছিল। গুম, গুপ্তহত্যা, বিচার বহির্ভূত হত্যার ছড়াছড়ি ছিল গত বছর। গুম থেকে রেহাই পাননি রাজনৈতিক নেতা, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সাংবাদিক, ব্যাংকার, কূটনীতিক, ব্যবসায়ী, ছাত্র তথা বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ। ক্ষমতাসীনরা নিজেদের অঙ্গ সংগঠনগুলোকে বিষাক্ত সরীসৃপে পরিণত করেছে। তারা গোক্ষুরের মতো ঘৃণায় অন্যের জমি দখল, বাড়ি দখল, টেন্ডারদখল, নারী পুরুষ নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর হামলা করেছে। তারপরেও বিএনপি সর্বংসহা শক্তিকে বলীয়ান হয়ে নানা উৎপীড়ন সহ্য করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে আপোষহীন থেকে রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করেছে। বিএনপি এখনও অনির্বাণ শক্তিতে গণতন্ত্রের শুদ্ধ, ঋদ্ধ, মুক্ত ও ব্যপ্ত পরিমন্ডল নির্মাণ করতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। তবে বিএনপি কখনোই হিংসার ভিতরে লুকিয়ে থাকা প্রতিহিংসার প্রবল প্রতাপের রাজনীতিতে বিশ্বাসী দল নয়। বিএনপি এদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের শুধুমাত্র পথিকৃত নয়, অগ্রপথিক। ক্ষমতাসীনদের সৃষ্ট নৈরাজ্যের অন্ধকারে মানুষের সম্মান ধূলিধূসরিত। কিন্তু এর মধ্যেও অসাধারণ কিছু দৃষ্টান্ত আমাদেরকে উদ্ধুদ্ধ করে। বিষাক্ত ছোবলের মধ্যেও আমাদেরকে এগিয়ে যেতে প্রেরণা যোগায়। কয়েকদিন আগে রাজশাহীতে ক্ষুধার্তক্লিষ্ট দুটি শিশু চলন্ত ট্রেন থামিয়ে এক বড় দুর্ঘটনা ঠেকিয়ে দেয়। এটি যেন দেশের হৃদয়ে রৌদ্রঝলসিত বেঁচে থাকবার প্রতিধ্বনি। গোটা জাতির জন্য এটি একটি শুভ ইঙ্গিত।
‘নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে বিএনপির পরাজয় নিশ্চিত’ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যের জবাবে রিজভী বলেন, যদি তাই হয় তাহলে ওবায়দুল কাদের সাহেবরা নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে ভয় পান কেন? ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে দেশকে গণতন্ত্রীহীনতার গভীর খাদের দিকে ঠেলে দিলেন কেন? বর্তমান ভোটারবিহীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে তাদের গণবিরোধী কার্যক্রমে গোটা দেশ আজ অন্ধকারে নিমজ্জিত। নানা কেলেঙ্কারীর হোতা বর্তমান সরকার এবং ‘বাহিরে ফিটফাট, ভিতরে সদরঘাট-নির্বাচন কমিশন’ এর অধীনে কখনোই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে না। বছরের প্রথম দিনে জনগণের প্রত্যাশা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আগামী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে হবে। তিনি বলেন, ক্ষমতার ঘাড়ে রাবিশদের বসালে দেশ রসাতলে যেতে বাধ্য। কারণ অবৈধ ক্ষমতার মোহে রাবিশ ও জঞ্জালরা এমনভাবে ভিড় করেছে যে গোটা জাতি তাদের হাত থেকে এখন পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য হা-হুতাশ করছে। একমাত্র নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরে পাওয়ার মাধ্যমেই জনগণ নির্বোধ-রাবিশদের হাত থেকে নিজেদের স্বাধীনতা ফিরে পাবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ