ঢাকা, মঙ্গলবার 2 January 2018, ১৯ পৌষ ১৪২৪, ১৪ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিদায়ী বছরে দেশে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে সাড়ে ৬ হাজার

এইচ এম আকতার: গত একবছরেই দেশে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে ৬ হাজার ৪৭৩ জন। কোটিপতির সংখ্যা বাড়লে সে হারে বাড়ছে না রাজস্ব আদায়। পুরো বছরজুড়ে করফাঁকি ঠেকাতে অভিযান অব্যাহত রাখে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড(এনবিআর)। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুষম অর্থনীতির নীতি না থাকায় আয় বৈষম্য বাড়ছে। আর একটা শ্রেণির কাছে জিম্মি হয়ে যাচ্ছে দেশের ব্যাংকিং খাত। যা আগামীতে অর্থনীতির জন্য অশনী সংকেত।
বাহাত্তরের তলাবিহীন ঝুড়ি এখন সমৃদ্ধির সোপান। বিশ্ব মানচিত্রে নতুন পরিচয় মধ্য আয়ের স্বীকৃতি। যার পেছনের অধ্যায়ে অর্থনীতির সবসূচকে এগিয়ে যাওয়ার গল্পটা। যার প্রভাব এড়ায়নি ব্যক্তিখাতও। নানা প্রতিকূলতায় দেশে ধীর গতিতে এগুলেও তীব্রগতিতে এগিয়ে চলছে বেসরকারি খাত। দেশের কোটিপতির সংখ্যার দিকে তাকালে বুঝতে কষ্ট হয় না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, ব্যাংকে এখন কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা ৬৮হাজার ৮৯১ জন। এক বছর আগের তুলনায় যা ৬ হাজার ৪৭৩জন বেশি। স্বাধীনতার পরের বছর এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৫ এ। বিশ্লেষকরা অবশ্য বলছেন, এতে টাকাওয়ালাদের কাছে জিম্মি হয়ে যাচ্ছে দেশের ব্যাংকিং খাত।
সূত্র মতে ১৯৭২ সালে কোটিপতির সংখ্যা ছিল মাত্র ৫ জন। ১৯৮০ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাড়ায় ৯৮ তে। দশ বছর পরে অর্থাৎ ১৯৯০ সালে কোটিপতির সংখ্যা এসে দাড়ায় ৯৪৩ জনে। তার পরের দশ বছরেই প্রায় ৮ হাজার কোটিপতির সংখ্যা বেড়ে তা দাড়ায় ৮৮৮৭ জনে। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এ দশ বছরে কোটিপতির সংখ্যা বাড়ে জ্যামিতিক হারে। আর সবচেয়ে বেশি কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে গত এক বছরে। অর্থাৎ এ এক বছরে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে ৬ হাজার ৪৭৩ জন।
প্রশ্ন হচ্ছে,স্বাধীনতার ৪৬ বছরে কোটিপতির সংখ্যা ৬৮৮৮৬ জন বাড়লেও সে হারে বাড়েনি রাজস্ব। ব্যাংকিং হিসেবে এ কোটিপতির বাহিরেও রয়েছে আরও দ্বিগুণ কোটিপতির সংখ্যা। এরা এখনও ধরা চোয়ার বাহিরে রয়েছে। এরাই হলো কালো টাকার মালিক। এসব টাকা দেশের অর্থনীতির মূলস্রোতে যুক্ত হলে বেকারত্ব থাকতো না। বাংলাদেশকে আর পর নির্ভরশীল হতে হতো না। কিন্তু কালো টাকা মূল ধারায় ফেরাতে নানা উদ্যোগ নিলেও তাতে কাজে আসেনি। কালো টাকা এখনও অন্ধকারে রয়ে গেছে। এসব টাকার মালিকদের রয়েছে রাজনৈতিক হাত। আর এ কারণেই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কিংবা এনবিআর নিরব রয়েছে। কোন সরকারই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেনি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই প্রতিবেদন বলছে, বিভিন্ন ব্যাংকে ৫০ কোটি টাকারও বেশি আমানত রেখেছেন ৮৫৩ জন। আর ৫৪ হাজার ৩১৭জন রয়েছেন, যাদের সঞ্চয় কোটি টাকার ওপরে। একবছরের ব্যবধানে এই সংখ্যাটা বেড়েছে ৪ হাজার ৮৫৪জন। বিষেজ্ঞদের মতে, বিনিয়োগের পরিবেশ না থাকায় সঞ্চয়ে ঝুঁকছেন অনেকে। এতে লাভ পাচ্ছে এক শ্রেণি, যা বাড়াচ্ছে বৈষম্য।
প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, দেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতি যখন ভালো থাকে না, তখন অনেকেই ব্যাংকে টাকা জমা রাখেন। বছর অন্তর সেই টাকা বেড়ে যাচ্ছে। দ্বিগুণ স্কিমে রাখা আমানতগুলো এখন কোটিপতির সংখ্যা বাড়াতে সহায়তা করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, টাকা পাচার না হয়ে ব্যাংকে থাকাটাও অর্থনীতির জন্য পজিটিভ। এতে হয়তো কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা বাড়ছে। তবে কোটিপতি আমানতকারী বাড়ার ফলে সমাজে একটি বিশেষ শ্রেণি ক্রমেই ধনী হয়ে যাচ্ছে, যা অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক দিক। এর ফলে সমাজে বৈষম্য বাড়ছে বলেও মনে করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, এসব টাকা বিনিয়োগে আনতে পারলেই দেশে বেকারত্বের সংখ্যা কমে আসবে। রপতানি আয়ও বাড়বে। কিন্তু বিনিয়োগের পরিবেশ না থাকার কারণই ব্যাংকে কোটিপতি আমানতকারির সংখ্যা বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর শেষে কমপক্ষে এক কোটি টাকা আমানত রাখা ব্যক্তির সংখ্যা ছিল ৪৮ হাজার ৮৯৭ জন। তিন মাসের ব্যবধানে (২০১৬ সালের ডিসেম্বরে) এই সংখ্যা বেড়ে হয় ৫১ হাজার ৭৪১ জন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৯৯ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩ লাখ কোটি টাকাও বেশি পরিমাণ আমানত কোটিপতিদের রাখা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন মাস সময়ে ৪০ কোটি টাকারও বেশি পরিমাণ আমানত রাখা ব্যক্তির সংখ্যা বেড়েছে ৩৭ জন। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ৩০ কোটি টাকার বেশি আমানতকারীর সংখ্যা ২৫ জন কমলেও ৩৫ কোটি টাকার বেশি আমানতকারীর সংখ্যা বেড়েছে ৩৪ জন, ২৫ কোটি টাকার ক্ষেত্রে আমানতকারী বেড়েছে ৪৯ জন, ২০ কোটি টাকার বেশি আমানতকারী বেড়েছে ৬৩ জন।
এছাড়া, ১৫ কোটি টাকারর বেশি আমানত রাখা ব্যক্তির সংখ্যা তিন মাসে বেড়েছে ৯১ জন, ১০ কোটি টাকার বেশি আমানতকারী বেড়েছে ১৬৭ জন, ৫ কোটি টাকার বেশি আমনতকারীর সংখ্যা বেড়েছে ৩৯২ জন।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গবর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংক খাতে আমানত রাখা কোটিপতিদের একটি বড় অংশ কালো টাকার মালিক। হয়তো এদের একটি বড় অংশই রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে কোটিপতি হয়েছেন। তবে ব্যাংক খাতে যে পরিমাণ অলস অর্থ জমছে, সেটা বিনিয়োগে গেলে অর্থনীতির জন্য আরও ভালো হতে পারত।
পুরো বছর ধরেই কর ফাঁকিবাজদের ধরতে বিশেষ অভিযান চালায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড(এনবিআর)। এ ছাড়া, অর্থপাচারকারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে সংস্থাটি। বছরজুড়ে কয়েকটি দামি গাড়ি জব্দ করা ছাড়া তেমন কোন সফলতা নেই সংস্থাটির। অর্থপচারকারীদের ধরতে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়িয়েছিল এনবিআর।
বিদায়ী বছরের আগস্ট মাসে এ বিষয়ে এনবিআর একটি বিশেষ বৈঠকও করে। ওই বৈঠকের সভাপতিত্ব করেন এনবিআর চেয়ারম্যান নজিুবর রহমান। আয়কর, শুল্ক ও ভ্যাট ফাঁকির তদন্ত পরিচালনা এবং এ সংক্রান্ত কার্যক্রমকে অধিকতর গতিশীল ও কার্যকর করতে নতুন নির্দেশনা দেন এনবিআর চেয়ারম্যান।
এতে বলা হয় ব্যাংক থেকে কোটিপতিদের তালিকা নিয়ে তাদের খোঁজ খবর নিতে। তারা যদি কর ফাঁকি দিয়ে থাকেন তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে। কিন্তু তাতে তেমন ফল হয়নি। কর ফাকি দেয় এমন কোন কোটিপতিকে পাকড়াও করেনি এনবিআর।
রাজস্ব ফাঁকির বিষয়ে সভায় ৮ দফা নির্দেশনা দেন এনবিআরের চেয়ারম্যান। এর মধ্যে রয়েছে, অর্থপাচার রোধে সরকারের সব পক্ষের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ রক্ষা করে মাঠপর্যায়ে নজরদারি বৃদ্ধি, অর্থপাচারকারীদের চিহ্নিতকরণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ।
একইসঙ্গে দেশের স্থল, নৌ ও বিমানবন্দরগুলো আরও তীক্ষ্ণ নজরদারির আওতায় আনা, দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র বন্দরগুলো যাতে কোনোভাবেই চোরাকারবারিদের বিচরণক্ষেত্র না হতে পারে তা নিশ্চিত করা, ভ্যাট ফাঁকি রোধ করে পণ্যের প্রকৃত উৎপাদন ও তার থেকে নির্দিষ্টহারে ভ্যাট আদায় নিশ্চিত করতে ভ্যাট গোয়েন্দা কার্যক্রম জোরদার করা, আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক বাবদ সরকারের প্রাপ্য রাজস্ব আহরণের পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা নিশ্চিত করা।
আরও রয়েছে, আয়কর, শুল্ক ও ভ্যাট ফাঁকিবাজদের বিরুদ্ধে প্রাপ্ত অভিযোগগুলো দ্রত তদন্ত ও পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, কর ফাঁকিবাজ অসৎ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার পাশাপাশি সৎ ব্যবসায়ীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং রাজস্ব ফাঁকি রোধে মাঠ পর্যায়ে যে কোনও অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি), শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর এবং ভ্যাট গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের সমন্বিতভাবে কাজ করা। কর ফাঁকি রোধে প্রয়োজনে যৌথ অভিযান পরিচালনা করার বিষয়েও একমত হয়েছে সরকারের সংস্থাগুলো।
কিন্তু এসব সিদ্ধান্তের কোনটিই বাস্তবায়ন হয়নি। অতীতে যারা করফাকি দিয়েছে কিংবা দুনীতি করেছে তাদের ব্যবস্থা তেমন কোন ব্যবস্থা নিতে পারেনি এনবিআর কিংবা দুদক। গত এক বছরে এসব মামলা আইনী জটিলতায় ফাইল বন্দী হয়ে পড়ে রয়েছে। এতে করে কালো টাকার মালিকরা আরও বেপরোয়া হয়ে পড়ছে। দেশে অবৈধ কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছেই।
নামে বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়ছে। অথচ দেশে দৃশ্যমান কোন বিনিয়োগ নেই। এনবিআর কিংবা দুদক সারা বছরজুড়ে হুমকি দিলেও কার্যত কোন ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। এতে করে কোটিপতির সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে আর সেহারে বাড়ছে না রাজস্ব। যদি এনবিআর আর দুদক কঠোর অবস্থানে থাকতো তাহলে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ যেমন বাড়তো তেমনি কালো টাকার মালিকের সংখ্যাও কমতো। এতে করে দেশের বেকারত্বে সংখ্যাও কমতো। বাড়তো দেশের রফতানি আয়। কিন্তু রাজনৈতিক চাপের কারণে এনবিআর এবং দুদক কার্যত তেমন ভুমিকা রাখতে পারেনি। আর এ কারণে স্বাধীনতার ৪৬ বছরে কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে ৬৮ হাজার৮৮৬ জন। দেশে সবচেয়ে বেশি কর ফাঁকি দিয়ে থাকেন রাজনীতিবিদরা। কিন্তু হযরানির শিকার হয়ে থাকেন ব্যবসায়ীরা। আর এ কারণেই ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে উৎসাহ হারান।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদায়ী বছরে যেভাবে আর্থিক খাতে কেলেঙ্কারি হয়েছে আগামী অর্থবছরে তা কাটিয়ে উঠুক। একই সাথে এসব কালো টাকার কোটিপতিরা যাতে করের আওতায় আসে এটাই তাদের প্রত্যাশা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ