ঢাকা, মঙ্গলবার 2 January 2018, ১৯ পৌষ ১৪২৪, ১৪ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রসিক নির্বাচন, আসল কথা কেউ বলে না

খান মুহাম্মদ ইয়াকুব আলী : সম্প্রতি সমাপ্ত রংপুর সিটি কর্পোরেশন (রসিক) নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন রকম বক্তব্য দেখতে পেলাম। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিভিন্ন রকম বক্তব্য দিবে এটাই স্বাভাবিক। নিজেদের স্বার্থে নিজের মত করে বক্তব্য দেয়াটাই তাদের দায়িত্ব। যেমন ক’দিন আগে কমিউনিস্ট পার্টির নেতা জনাব মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, নির্বাচন কমিশনকে বলেছেন, ‘দলীয় নমিনেশন পেতে হলে অবশ্যই পাঁচ বছর সে দলের সদস্য বলে প্রতীয়মান হতে হবে’। জনাব সেলিম দেখেছেন, এখন আর কেউ হাতুড়ি আর কাস্তে নিয়ে বসে থাকতে চায় না। ইনুর মত, মেনন সাহেবের মত সবাই নৌকায় উঠতে চায়। তাই তিনি এসব বক্তব্য দিয়েছেন। যদি তার দলে কোন নেতাকর্মী নাম লিখাতেন এমনকি জামায়াতের মত স্বতন্ত্র নির্বাচন করে একটি আসন পাওয়ার ক্ষমতাও তার থাকতো তাহলে আর এমন প্রেসক্রিপশন দিতেন না। যাই হোক, রসিক নির্বাচন নিয়ে জনাব ওবায়দুল কাদের সাহেব বলেছেন, ‘নির্বাচনে পরাজয় হলেও রাজনৈতিকভাবে বিজয়ী হয়েছি’। আর বিএনপি বলেছে, ‘রায় পরিবর্তন করা হয়েছে, যে পরিমাণ ভোট দেখানো হয়েছে, সে পরিমাণ ভোটার উপস্থিত হয়নি। বিজয়ী প্রার্থীর কি বক্তব্য তা জানা সম্ভব হয়নি। প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, গত বছর আমাদের স্কুলের একজন ছাত্র পিএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে। ক্লাসে যার রোল ছিল ২২। রোল নং-৮ এর পর আর কেউ জিপিএ-৫ পায়নি। ফলাফল ঘোষণার সময় যখন বললাম সোহানুর রহমান জিপিএ-৫ পেয়েছে, তখন ছেলেটি কেবলই হাসছে। সে বিশ্বাস করতে পারছিল না। এক পর্যায়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলো ‘স্যার আমি কিভাবে জিপিএ-৫ পেলাম’? ভাগ্য কখনও নিজেই এসে দেখা দেয়। জাতীয় পার্টির মোস্তফা সাহেব কাউকে জিজ্ঞেস করেছেন কিনা জানি না এবং তিনি কিভাবে পাস করলেন তা বুঝতে পেরেছেন কিনা তাও জানি না। ভেদের খবর বললে আমার এ লেখা ছাপা হবে কিনা তাও জানিনা। তবে আমি যেহেতু সম্মানিত সম্পাদক সাহেবের পরিচিত বা অধীনস্থ কোন লোক নই, তাই আমার লেখায় কোন দায় বা পূর্ব পশ্চিমও নেই। আমার কথা আমি বলবোই। প্রয়াত অভিনেতা আবুল খায়ের বিক্রমপুরী বৃক্ষরোপণের বিজ্ঞাপনে চমৎকারভাবে বলেছিলেন, ‘গাছ আমাদের ফল দেয়, কাঠ দেয়, ছায়া দেয়, সবই কইলেন, আসল কথাটা কেউ কইলেন, তা হলো দমের কথা অর্থাৎ অক্সিজেনের কথা। রসিক নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ১ লাখ ৬০ হাজার আর বিএনপি পেয়েছে ৩৫ হাজার ভোট অর্থাৎ ১ লাখ ২৫ হাজার কম। যেখানে জাতীয় পার্টি ১ লাখ ৬০ হাজার ভোট পায় সেখানে আওয়ামী লীগ পায় মাত্র ৬০ হাজার আর বিএনপি পায় কেবল ৩৫ হাজার। যে রংপুরে কেবল জামায়াতের ভোটই আছে ৪০ হাজার। যদি ভোট সুষ্ঠু হয়ে থাকে তবে এ ৩৫ হাজার ভোট জামায়াতের। তাহলে বিএনপির ভোট কোথায়, আর যদি এ ৩৫ হাজার ভোট বিএনপির হয় তবে জামায়াতের ভোট কোথায়? স্বামীর হাত থেকে বাঁচার জন্য স্ত্রী বলেছিল, গোশত বিড়ালে খেয়ে ফেলেছে। অমনি স্বামী বিড়ালটাকে ধরে ওজন করে বললো, ‘বিড়ালের ওজন এক কেজি তাহলে এক কেজি গোশত কোথায়? আর এটা যদি গোশত হয় তবে বিড়াল কোথায়? এ প্রশ্নের জবাবটা আশা করেছিলাম আমার ওস্তাদ ড. রেজওয়ান সিদ্দিকীর লেখার মধ্যে। উত্তর পেলাম না ২৭ ডিসেম্বর ‘চোর চোর’ শিরোনামে। তার লেখায় যেখানে তিনি কঠোরভাবে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রীকে হেদায়েত দিয়েছেন। কিন্তু একটি কথা পরিষ্কার করতে পারেননি, নাকি ইচ্ছে করেই করেননি অথবা আমি বুঝতে পারিনি, তাহলো বিএনপি কি ৩৫ হাজার ভোট পাওয়ার কথা? নাকি ভোট কারচুপি হয়েছে? কারচুপি হলে আওয়ামী লীগ ভোট কেটে জাতীয় পার্টির ব্যালটে সীল মারবে কেন? কিছুটা বুঝেছি যে, ইসি চমৎকার একটি খেলা খেলেছেন। তাহলো, নির্বাচন ফেয়ার হয়েছে তাও দেখানো হলো, আবার বিএনপিও বিজয় হলো না। বলটা আওয়াী লীগের কোর্টে না থাকলেও খালাতো ভাইয়ের কোর্টেই থাকলো। এসব পলিসি মানুষ বুঝে, এসব করে নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষতা প্রমাণ করা যাবে না। তবে বিএনপি জামায়াতের মধ্যেও একটি গভীর রহস্য থাকতে পারে। ড. রেজওয়ান সিদ্দিকীর লেখা পড়ার পর সে বিষয়টি উদ্ঘাটন করার চেষ্টা করেছি।
তাহলো বিএনপি হয়তো বা ইচ্ছে করেই নির্বাচনে পরাজিত হতে চেয়েছিল। তাহলে সরকার বিরোধী আন্দোলন জমাতে পারবে, অথবা জামায়াতকে বাদ দিয়ে জয়ী হওয়া যায় কিনা তা দেখতে চেয়েছিলো। যাতে করে জোটে জামায়াতকে নয় ছয় বুঝিয়ে কাবু করা যায়। তাই রংপুর সিটি নির্বাচনে জামায়াতের সাথে কোন সমন্বয়ই তারা করেনি। সম্ভবত: জামায়াত ও তাদের ক্যারিশমা দেখিয়ে দিয়েছে। যে জামায়াত “৯৬ সালে তিনশ আসনে নির্বাচন করার দরুণ বিএনপি কোথায় গিয়েছে। ৫০টি আসনে বিএনপি ৫-৬ হাজার ভোটে পরাজিত হয়েছে আর ঐ ৫০টি আসনে জামায়াত ও ৫-৬ হাজার ভোট পেয়েছে। নেতাদেরকে শহীদ করে দেওয়ার পরও এককভাবে জামায়াত উপজেলা ও ইউপি নির্বাচনে আশার চেয়ে বেশি সফলতা অর্জন করেছে। সে জামায়াতকে সত্যিই যদি দূর্বল ভেবে তাদের মূল্যায়ন করা না হয় তবে যা হবার তাই হবে, যা হওয়ার তাই হয়েছে। রসিক নির্বাচনে এমন একজন প্রার্থী বাছাই করেছে বিএনপি। যে ব্যক্তি নাকি এমন একজন পীরের মুরিদ বা খলিফা যে পীর ইসলামের কোন পতাকাবাহী পীর নন, যার মুরিদকে জামায়াতের মতো একটি সংগঠন কেন কোন প্রকৃত ঈমানদার ভোট দিতে পারে না। এদিকে সরফুদ্দিন আহমদ ঝন্টু সাহেব আওয়ামী লীগ প্রার্থী যিনি পূর্বেও মেয়র ছিলেন, তার রাজত্ব নাকি ছিলো এক রাজার একদেশ এমন। তাই আওয়ামী লীগ এর লোকজনও তার হাত থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিলো। সুতরাং বিএনপি চেয়েছে দেখি জামায়াত ছাড়া পারি কিনা আর জামায়াত চেয়েছে দেখি আমাদের ছাড়া পারো কি ভাবে। তাই ১। বিএনপির অযোগ্য প্রার্থী, ২। জামায়াতের ক্যারিশমা ৩। আওয়ামী লীগের একাংশের ভোট ৪। ভোট কার চুপি এ চারটি সুবিধা গিয়ে জমা হয়েছে মোস্তফা সাহেবের ভাগ্যে। উপরের তিনটি সুবিধা পাওয়া যাবে জানলে হয়তোবা কারচুপি না করলেও মোস্তফা সাহেবই পাস করতেন, কারণ বিএনপি ও আওয়ামী লীগের কেউ গ্রহণযোগ্য প্রার্থী না হওয়ায় তাদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য মানুষ যে ভিন্ন প্লাট ফরম খুঁজছিলো মোস্তফা হলো সে কাক্সিক্ষত প্লাট ফরম। তাই মোস্তফা সাহেবের ভাববার কোন সুযোগ নেই তিনি আওয়ামী লীগ থেকেও এক লক্ষ ভোট বেশি পাওয়ার মত জনপ্রিয় যা একটি অতীব জনপ্রিয় দলের প্রার্থী। জবাব এরশাদ সাহেব ঠিকই বুঝে ফেলেছেন বিষয়টা কি হয়েছে। তবে মোস্তফা সাহেব যদি আমার ঐ ছাত্রের মতে বলতে পারতেন “স্যার সত্যি কি আমি জিপিএ-৫ পেয়েছি” তবে তার গ্রহণযোগ্যতা বা মর্যাদা আরো বেড়ে যেতো। সে যাই বলুক আগেই বলেছি নিজেদের স্বার্থে নিজেদের মতো করে বক্তব্য দিবে এটাই নিয়ম। জামায়াতের বক্তব্য কি তা আমি জানি না, তবে আমার মতো করে যদি আমিও স্বাধীনভাবে বলি তবে বলতে হবে এখানে বিজয়ী হয়েছে জামায়াত। মোস্তফা সাহেবও বুঝেছেন আওয়ামী লীগও বুঝেছে বিএনপি বুঝেছে কিনা জানি না। তবে জামায়াত একটি গঠনমূলক আদর্শিক সংগঠন এ সংগঠনের ৫ জন শীর্ষ নেতার শাহাদাৎ এবং ৩ জন নেতা কারাগারে এটাই যদি কেউ দূর্বল হিসেবে গণ্য করে তা হবে নিতান্তই অপরিপক্ব চিন্তা। বরং তাদের ৫ জন নেতার শাহাদাৎ বরণ এর মধ্যে দিয়ে সাংগঠনিক শক্তি কতটা বৃদ্ধি পেয়েছে তা অন্যকেউ না বুঝলেও বুঝতে পেরেছে সরকার।
তাই অযথা বিভিন্ন জেলায় নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করে তাদের দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। প্রকৃত ঘটনা হল কি রংপুর সিটি, কি ঢাকা, কি গাজীপুর কোথাও জামায়াতকে বাদ দিয়ে চিন্তা করার কোনও সুযোগ নেই। জামায়াত যে দিকে মেয়র সেদিকের। যারা বলতে পারবে জামায়াত আমার সাথে তারাই সার্প এক্সেলের মতো বলতে পারবে ‘সার্প এক্সেল আছে না।” কোন চিন্তা নেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ