ঢাকা, মঙ্গলবার 2 January 2018, ১৯ পৌষ ১৪২৪, ১৪ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

২০১৭ সাল জুড়েই খুলনাঞ্চলের পাটকলগুলোতে ছিল শ্রমিক অসন্তোষ

খুলনা অফিস : ২০১৭ সালে ভাগ্যের আশানুরূপ কোন পরিবর্তন ঘটেনি খুলনাঞ্চলের মিল-কলকারখানা শ্রমিকদের। একে একে বন্ধ হয়ে যাওয়া কোন মিলই এ বছরে চালু হয়নি। দীর্ঘদিন বন্ধ রয়েছে খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল, হার্ডবোর্ড মিল, দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরী, বেসরকারি এ্যাজাক্স, জুট স্পিনার্স ও মহসিন জুটমিল। আর যেসব মিল চালু রয়েছে সেগুলোও চলছে ধুকে ধুকে। তবে আংশিকভাবে চালু রয়েছে আফিল, সাগর ও সোনালী জুট মিল। 
অন্যদিকে, সরকারি পাটকলগুলো চালু থাকলেও নিয়মিত মজুরি না পেয়ে অর্থকষ্টে কেটেছে শ্রমিকদের এ বছরটি। মজুরি পরিশোধসহ বিভিন্ন ন্যায্য পাওনার দাবিতে রাজপথে সরব ছিল এসব মিলের শ্রমিকরা। বছরের বিদায়লগ্নে এসেও রাজপথে আন্দোলন-কর্মসূচিতে সরব রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল শ্রমিকরা। 
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, খুলনা-যশোর অঞ্চলে সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় ৩৫/৩৬টি পাটকল রয়েছে। এসব পাটকলে লক্ষাধিক শ্রমিক-কর্মচারীরা কাজ করে। দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিকরা বিভিন্ন দাবি আদায়ে নানা কর্মসূচি পালন করে আসছে। খুলনার ঐতিহ্যবাহী নিউজপ্রিন্ট মিলটি বন্ধ রয়েছ দীর্ঘ ১৫ বছর।
খুলনাবাসীর দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের ভিত্তিতে মিলটি নতুন করে চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়। একই সাথে মিল এরিয়ায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রক্রিয়াও চলছে। খুলনাবাসী ও মিলের শ্রমিকরা চলতি বছর মিলটি চালুর দৃশ্যমান প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে আশা করেছিল। কিন্তু এ বছরও মিল চালু হয়নি। তার পাশেই রয়েছে হার্ডবোর্ড মিল। এটিও চালুর কোন সম্ভাবনা দেখছে না শ্রমিক-কর্মচারীরা। মাসের পর মাস বন্ধ মিলে ব্যয় হচ্ছে প্রচুর অর্থ। মিলটি চালু হলে খুলনার মানুষের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি ফিরতো কর্মচাঞ্চল্যতা। চালু হয়নি দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরীও। এখানকার শ্রমিক-কর্মচারীরা অর্ধাহারে অনাহারে মানবেতর জীবন যাপন করছে। অনেকেই অর্থের অভাবে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করেছেন বলে শ্রমিকদের দাবি। তবুও চালুর অপেক্ষায় প্রহর গুনছে ফ্যাক্টরীর শ্রমিকরা।
এদিকে, খুলনা-যশোর অঞ্চলের সরকারি প্লাটিনাম, স্টার, ক্রিসেন্ট, খালিশপুর, দৌলতপুর, আলীম, ইস্টার্ণ, জেজে আই ও কার্পেটিং এ নয়টি পাটকল চালু থাকলেও এ বছরও বাস্তবায়ন হয়নি শ্রমিকদের মজুরি কমিশনের দাবি। পাচ্ছে না নিয়মিত মজুরী। ৫ থেকে ৮ সপ্তাহের মজুরি বকেয়া রয়েছে শ্রমিকদের। আর বছর জুড়ে মজুরিসহ নানা দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল, ধর্মঘটসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছে শ্রমিকরা। দাবি আদায়ে বর্তমানে খুলনাসহ সারাদেশে চলছে ১১ দিনের আন্দোলন কর্মসূচি। গেল সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে খালিশপুর, প্লাটিনাম, স্টার ও ক্রিসেন্ট জুট মিলে অঘোষিত আন্দোলন করেছে শ্রমিকরা। বন্ধ রেখেছে মিলের উৎপাদনের চাকা। আর এ বছরই কর্মরত শ্রমিকদের পাশাপাশি অনশনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিকরা। তাদের পিএফ-গ্রাচ্যুইটিসহ চার দফা দাবিতে এসব কর্মসূচি পালন করেছে।
শ্রমিক মো. মিজানুর রহমান বলেন, এসব মিলের কর্মরত শ্রমিক কর্মচারীরা দক্ষতার সাথে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। অথচ এ বছর হঠাৎ করে কর্মচারী পদে এসব দক্ষ ও অভিজ্ঞদের বাদ দিয়ে নতুন করে নিয়োগ দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বিজেএমসি। এ বিষয়ে হাজিরায় কর্মরত বদলী শ্রমিক-কর্মচারীরা আন্দোলনের পাশাপাশি চলতি বছর হাইকোর্টে মামলা করেছে। বর্তমানে নিয়োগ প্রক্রিয়া আদালতের নির্দেশনায় বন্ধ রয়েছে।
তিনি প্রশ্ন রাখেন দক্ষদের বাদ দিয়ে নতুন করে নিয়োগ দেয়া হলে এসব শ্রমিকরা যাবে কোথায়? অনেকেই কর্মচারী হিসেবে কাজ করেছে। ভেবেছে তাদের স্থায়ী করা হবে। অথচ বিজেএমসি’র সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে এসব শ্রমিকদের পরিবার পরিজন নিয়ে পথে নামতে হবে।
পাটকল শ্রমিক নেতা মো. সোহরাব হোসেন বলেন, বছর আসে আবার চলে যায় কিন্তু শ্রমিকদের ভাগ্যের তেমন কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় না। শ্রমিকরা কাজ করেও নিয়মিত মজুরী পায় না।
অন্যদিকে, বেসরকারি পাটকলগুলোর অবস্থা আরো নাজুক। বন্ধ থাকা পাটকলগুলো এ বছরও চালু হয়নি। বন্ধ রয়েছে মহসেন, এ্যাজাক্স ও জুট স্পিনার্স মিল। এসব শ্রমিকরা আশায় আশায় আরও একটি বছর পার করেছে। আর আফিল, সোনালী ও সাগর জুট মিল আংশিকভাবে চালু রয়েছে। এসব মিলের শ্রমিকরা অর্থকষ্টে দিন কাটাচ্ছে।
বেসরকারি পাটকল শ্রমিক নেতা অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম সবুজ বলেন, মালিকপক্ষের খামখেয়ালীপনার কারণে মিলগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। সারা বছর শ্রমিকদের আন্দোলন করতে হয়েছে। গেল ঈদ উল ফিতর এবং আযহার সময়ে শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে ডিসি ও এমপি’র হস্তক্ষেপে কিছুটা সুরহা হলেও সম্পূর্ণ দাবি বাস্তবায়ন হয়নি। আসেনি স্থায়ী কোন সমাধান। শ্রমিকরা অত্যন্ত মানবেতন জীবন-যাপন করছে। মিলগুলো চালু হলে শ্রমিকদের ভাগ্যের পরিবর্তন আসবে বলে তিনি আশাবাদী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ