ঢাকা, মঙ্গলবার 2 January 2018, ১৯ পৌষ ১৪২৪, ১৪ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

খুবির গণিত ডিসিপ্লিনের শিক্ষকের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ স্ত্রীর

খুলনা : খুবির যৌতুকলোভী শিক্ষক অধ্যাপক মো. ওয়াহিদুজ্জামানের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করছেন স্ত্রী মোছা. জান্নাত আরা ফেরদৌস

খুলনা অফিস : খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. ওয়াহিদুজ্জানের বিরুদ্ধে ১০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি ও মানসিক-শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন তার স্ত্রী মোছা. জান্নাত আরা ফেরদৌস। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে খুলনা প্রেসক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এ অভিযোগ করেন।
সাংবাদিক সম্মেলনে যশোর সরকারি এম এম কলেজের দর্শন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী জান্নাত আরা ফেরদৌস বলেন, ২০১৫ সালের ২৭ মার্চ খুবির গণিত ডিসিপ্লিনের সহকারী অধ্যাপক মো. ওয়াহিদুজ্জামানের সঙ্গে পারিবারিক ও আনুষ্ঠানিকতার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। বিয়ের সময় উভয় পক্ষের পরিবারের সদস্য, অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন ও ডিনসহ গণিত ডিসিপ্লিনের প্রায় সকল শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। বিয়ের পূর্বে পাত্রের বাড়ি গাজীপুরের শ্রীপুর হওয়ায় আমার মা-বাবাসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা জেলার দূরত্মের কারণে বিয়েতে আপত্তি জানায়।
কিন্তু তার শিক্ষক এবং এই বিয়ের প্রস্তাবক ও ঘটক খুবির গণিত বিভাগের অধ্যাপক (বর্তমানে বরখাস্তকৃত) মো. শরীফ উদ্দিন জানান, পাত্র ওয়াহিদুজ্জামান তার খুবই প্রিয় ছাত্র এবং তিনি তাদেও পরিবারকে পারিবারিকভাবে চেনেন। সে (ওয়াহিদুজ্জামান) অস্ট্রেলিয়া যাবার জন্য স্কলারশিপ পেয়ে দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়ে আছে। বিয়ে করেই সে স্ত্রীকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়া চলে যাবে। শুধু বিয়ের জন্য কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। এ কথা বলে অধ্যাপক শরীফ উদ্দীন আমার মা-বাবাকে রাজি করান। তার আগ্রহের কারণে সব কিছু বিবেচনা করে গুরুজনেররা আমাদের বিয়ে দেন। বিয়ের পর খুলনা মহানগরীর নিরালা আবাসিক এলাকার একটি ভাড়া বাসায় তাকে তোলা হয়। সেখানে মাসচারেক ভালভাবে সংসার চলে। তারপর শুরু হয় অশান্তি। তার রুক্ষ ও কর্কশ ব্যবহার, কৃপনতা এবং সব ব্যাপারে লুকোছাপা ভাব সত্ত্বেও আমি তার সাথে মানিয়ে চলার চেষ্টা করি।
এ অবস্থায় দু’মাস পর তার ছোট ভাইয়ের বিয়ে উপলক্ষে তার গ্রামের বাড়ি গাজিপুরের শ্রীপুরে আমাকে নিয়ে যায়। শ্বশুরালয়ে গিয়ে আমি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হই। সেখানে নারী এবং শিক্ষার কোন মর্যাদা নেই। আমার মুদি দোকানী শ্বশুর অশিক্ষিত ও যৌতুকলোভী।
ছোট ছেলের শ্বশুর বাড়ি থেকে বিয়ের আগেই তার ঘর ফার্নিচার দিয়ে সাজিয়ে দেয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে আমার শ্বশুর বলেন, এই বউ কেন খালি হাতে এসেছে? সেইসাথে শ্বাশুড়িসহ পরিবারের অন্যরাও তাকে নানান রকম কটূ কথা বলতে থাকে। কোনরকম দেনা-পাওনা ছাড়াই আমার বিয়ের কথাা হওয়ায় এবং তার স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশ যাওয়ার কথা থাকায় আমরা সেভাবে চিন্তাও করিনি। অপমানজনক এ পরিস্থিতি থেকে আমার মা-বাবা ও অন্যান্য আত্মীয়স্বজন সেখানকার অনুষ্ঠান শেষ করে চলে আসেন। এরপর আমার স্বামী আমাকে গাজীপুর থেকে আমার পিতার বাড়ি যশোরে রেখে খুলনায় যায়। তারপর শুরু হয় তার মুখোশ উন্মোচনের পালা। অনেক অনুরোধের পর আমাকে খুলনায় নিয়ে আসে। কিন্তু তার সবকিছুতে পরিবর্তন লক্ষ্যা করি। আমার সাথে অহেতুক কর্কশ ব্যবহার করতে থাকে। খোটা দিয়ে বলতে থাকে আমাকে কি দিয়েছ? তোমার যা যা দরকার বাবার বাড়ি থেকে নিয়ে এসো। তার কাছে সাংসারিক প্রয়োজনে টাকা চাইলে বলে আমাকে তালাক দিয়ে দাও। আমি তোমার সাথে সংসার করতে চাই না। এসব ঘটনা ঘটক অধ্যাপক শরীফ ভাইকে জানালে তিনি আমাকে সহ্য করা এবং চুপ থাকার উপদেশ দেন। ইতোমধ্যে আমি সন্তানসম্ভবা হই। এটা শোনার পর সে ধীরে ধীরে দূরে চলে যেতে থাকে। এ অবস্থায় সে আমাকে বাবার অথবা শ্বশুর বাড়িতে চলে যেতে বলে। দীর্ঘ ভ্রমনে ডাক্তারের নিষেধ সত্ত্বেও শ্বশুর বাড়ির লোকজন গাজীপুর যাওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকে। আমি যেতে অস্বীকৃতি জানালে সে আমার উপর শারীরিক-মানষিক নির্যাতন চালায়। এরপর ঈদ উপলক্ষে আমি বাবার বাড়িতে চলে যাই। ঈদ শেষে ফিরে আসার জন্য যোগাযোগ করা হলে সে এড়িয়ে যেতে থাকে। এক পর্যায়ে আমি ফিরে এলে সে সেপারেশনের সুবিধার্থে বাচ্চা নষ্ট করার কথা বলে। কয়েকবার বাচ্চা নষ্ট করার জন্যে আমাকে আঘাতও করে। বাজারের খরচ বন্ধ করে এবং কাজের মহিলাকে বিদায় করে সংসারের সব কাজ করতে বাধ্য করে। আমি বাসায় থাকা অবস্থায় সে এবং অধ্যাপক শরীফ মিলে কলগার্ল বাসায় এনে ফূর্তি করে। এ কারণে অধ্যাপক শরীফ ভার্সিটি থেকে চাকরিচ্যুৎ হয়। পরিস্থিতির এরকম পর্যায়ে বাবা-মা এসে আমাকে নিয়ে যান। এরপর সে আমার কোন খোঁজ নিত না। সন্তান প্রসবের জন্য ক্লিনিকে ভর্তি হবার পর সে গেলেও বিল দিতে হয় আমার আত্মীয়দের। সে আমার এবং আমার সন্তানের কোন খোঁজ নিত না। কিছুদিন পর আমাকে সন্তানসহ গাজীপুরে নিয়ে একরকম আটকে রেখে নির্যাতন এবং যৌতুক দাবি করা হয়। পরে আমার পরীক্ষার জন্য খুলনা আসি। কিন্তু এসে প্রচ- নির্যাতনের শিকার হতে হয়। অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার জন্য সরাসরি ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। অস্বীকৃতি জানালে সন্তানসহ আমাকে মেরে বাড়ি থেকে বের কওে দেয়া হয়। আমি বাবার বাড়ি যেতে বাধ্য হই। পরে আমরা ভার্সিটিতে গিয়ে তার ডিসিপ্লিন প্রধানের কাছে অভিযোগ করলে সে একটি ভূয়া ডিভোর্স লেটার দেখায়। পরে আমরা আদালতে যাই। কোর্টে তার ডিভোর্স প্রমাণ না করতে পারায় আদালত আমাকে গত ১৩ সেপ্টেম্বর সুরক্ষা দিয়েছে। সেটা বানচাল করতে সে জজকোর্টে রিভিশন করেছে।
তিনি বলেন, আমি শিক্ষক নামের এরকম মিথ্যাবাদী, অত্যাচারী ও পাপাচারীর মুখোশ উন্মোচিত হোক। তার অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তিনি সরকার, মানবাধিকার সংস্থা, মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিকট সহযোগিতা কামনা করেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন, জান্নাত আরা ফেরদৌসের বড় বোন মাহফুজা খানম, ভাই হোজায়ফা আল মাহমুদ ও শিশু পুত্র জাবির জাওয়াদ।
এ ব্যাপারে তার স্বামী খুবির গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ওয়াহিদুজ্জামান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, যৌতুক দাবি করার অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আমি কোন নির্যাতনও করিনি। বরং আমার উপর নির্যাতন হয়েছে এ ব্যাপারে আমি গত বছরের ২১ অক্টোবর খুলনা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছি। এছাড়া গত ২০ মার্চ তাকে আইনিভাবে তালাক দিয়েছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ