ঢাকা, শুক্রবার 5 January 2018, ২২ পৌষ ১৪২৪, ১৭ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নাসির হেলালের দুটি ছড়াগ্রন্থ

অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান : বিশিষ্ট কবি, লেখক ও গবেষক নাসির হেলালের দুটি ছড়াগ্রন্থ এবারের একুশে বইমেলা উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছে। শতাধিক গ্রন্থের রচয়িতা নাসির হেলালের এ দুটি ছড়াগ্রন্থ শিশু-কিশোরদের মন আকর্ষণ করবে বলে আশা করা যায়।

১. প্রথম ছড়াগ্রন্থের নাম ‘চাঁদের হাসি’। প্রচ্ছদ-আজিজুর রহমান। প্রকাশক-সুহৃদ প্রকাশন। পৃষ্ঠা-২৪। দাম-ষাট টাকা মাত্র।

এ গ্রন্থটি উৎসর্গিত হয়েছে বিশিষ্ট কবি, ছাড়াকার ও গীতিকার মরহুম মতিউর রহমান মল্লিককে। এতে মোট ২০টি ছড়া সংকলিত হয়েছে। ছড়াগুলোর শিরোনাম এরূপ: মায়ের ছবি, একুশ আসে, চাঁদটা, খুশির তোড়ে ভাসে, উঠলো হেসে কলি, পান্না মাণিক ঝরে, থাকবে না আর খেদ, খোদার রহম, মুক্তির আলো, যাদু মাখা স্মতি, শপথ নেব লড়তে, ফুটলো মুখে বোল, শীত, চাঁদের হাসি, গাঁয়ের ছবি, বিষের বাঁশি বাজে, শিউলি জবা হাসে, জান্নাতেরই ফুল বাগানে, মিলেমিশে, কষ্ট কিছু থাকবে না আর।

শিশু সাহিত্যের কতগুলো বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রথমত: এর বিষয়বস্তু হবে শিশু-কিশোরদের উপযোগী। শৈশবে যেসব বিষয়ের প্রতি শিশুমন আকৃষ্ট হয়, সেসব বিষয় নিয়ে শিশু সাহিত্য রচিত হলে তা তাদের মনকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। দ্বিতীয়ত, শিশু সাহিত্যের ভাষা সহজ-সরল, সহববোধ ও যথাসম্ভব যুক্তাক্ষর বর্জিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। তৃতীয়, শিশু-মনস্তত্ব সম্পর্কে যারা ওয়াকিবহাল তারাই শিশুদের জন্য সার্থক সাহিত্য রচনা করতে পারেন। চতুর্থত, শিশু কবিতা বা ছড়া কবিতা ছন্দবন্দ হওয়া জরুরি। শব্দের সুসংগতি, অন্তমিল, সুর ও ঝংকারময় বর্ণবিন্যাস শিশু কবিতা বা ছড়ার জন্য অপরিহার্য বলা যায়। পঞ্চমত, শিশু-সাহিত্যে শিক্ষণীয়, চরিত্র গঠনমূলক এবং উপদেশমূলক বিষয় থাকা বাঞ্ছনীয়। কারণ এ বয়সটা তাদের আদর্শ মানুষরূপে গড়ে ওঠার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

শিশু সাহিত্য রচনায় উপরোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় থাকা প্রয়োজন। এ কারণে শিশু সাহিত্য রচনা সকলের জন্য সম্ভব হয় না। প্রকৃতপক্ষে, সহজ করে সুন্দর করে সহজ ভাষায় কোন কিছু ব্যক্ত করা খুব একটা সহজ নয়। এ জন্য অনেকেই শিশু সাহিত্য রচনায় উৎসাহী হলেও খুব কম লোকেই তাতে সফলতা অর্জন করেন। তাই বাংলা সাহিত্যে সফল শিশু সাহিত্যিকের সংখ্যা খুব বেশি নয়।

আলোচ্য ছড়াগ্রন্থটির কবি নাসির হেলাল দীর্ঘকাল ধরে অন্যান্য লেখালেখির পাশাপাশি ছড়া জাতীয় রচনাও লিখে যাচ্ছেন দেদারছে। এ যাবত তার রচিত ১০টি ছড়াগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ‘চাঁদের হাসি’ ছড়াগ্রন্থের কয়েকটি ছড়ার কিছু কিছু অংশ উদ্ধৃত করে আমরা নাসির হেলাল এক্ষেত্রে কতটা সাফল্য অর্জন করেছেন, তা পর্যালোচনা করার প্রায়শ পাবো।

এ গ্রন্থের প্রথম ছড়াটির নাম ‘মায়ের হাসি’। শিশুরা জন্মের পর প্রথম যাকে দেখে এবং যার সাথে তার আজন্ম ঘনিষ্ঠতম সম্পর্ক, সে মাকে নিয়েই তার প্রথম ছড়াটি রচিত হয়েছে। শিশুর কাছে মায়ের মত আর কেউ নয়। মায়ের আদর-¯েœহ-যতœ, মায়ের শেখানো বুলি, মায়ের সুমধুর স্তন্যপানে শিশুর বেড়ে ওঠা। তাই মায়ের প্রতি শিশুর ঋণ অপরিশোধ্য। ইসলামে ¯্রষ্টার ইবাদতের পরেই মা-বাবার খেদমত করার উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ইসলামে সব মানুষের উপর মায়ের মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। এমনকি পিতার চেয়েও মায়ের মর্যাদা তিনি গুণ অধিক। মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। বাবা-মায়ের প্রতি যে সন্তান খারাপ আচরণ করে, সে কখনও বেহেশতে যেতে পারবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মা মাতৃভাষা ও মাতৃভূমি এ তিনটি শব্দ প্রায় সমগুরুত্বপূর্ণ। মায়ের প্রতি ভালবাসা থেকেই মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির প্রতি আমাদের আনুগত্য। কবি কত সুন্দরভাবে আমাদের সামনে এ বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। ছড়াটি পাঠ করলেই তা সহজে উপলব্ধি করা যাবে-

আমার মায়ের ছবি যেন-

আকাশ ভরা নীলের মতো

শাপলা ফোটা বিলের মতো

মায়ের ছবি আঁকতে গিয়ে দেশের ছবি আঁকি

কেমন ছিল মায়ের ছবি আকাশ ভরা পাখি।

ছড়ার বিষয়বস্তু যেকোন শিশুর একান্ত কাছের ও প্রিয়। ছড়া রচনায় কবি সহজ সরল ও যুক্তাক্ষর বর্জিত শব্দারাজি ব্যবহার করেছেন। ছড়ার অন্তমিল অত্যন্ত চমৎকার হয়েছে। সর্বোপরি শিশুর পরিচিত প্রাকৃতিক দৃশ্যরাজির সমন্বয়ে মায়ের পরিচয় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এ রূপকল্পটি যেমন সহজ তেমনি অসাধারণ হয়ে উঠেছে। পরিশেষে এ ছড়ার মাধ্যমে বিভিন্ন শব্দ ও বর্ণের ভাঁজে শিশু-মনে যে একটি অপার্থিব মাধুর্যময় শিক্ষা বা উপদেশ দেয়া হয়েছে, শিশু-মনে তা চিরকাল রেখাপাত করবে। এদিক দিয়ে আমার বিবেচনায় এটা একটি সার্থক ছড়া।

পরের ছড়াটির নাম ‘একুশ আসে’। এটিও একটি চমৎকার ছড়া। এর শুরুটা চমৎকার। যেমন-

একুশ আসে

বছর ঘুরে আমের মুকুল নিয়ে

একুশ আসে

তরতরিয়ে পদ্মা মেঘনা দিয়ে।

তবে এ ছড়াটির শব্দ চয়ন ও অন্তমিলে কিঞ্চিৎ ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়। যেমন” দ্বিতীয় প্যারায় ব্যবহৃত ‘ফিরফিরিয়ে’ শব্দটি সুপ্রযুক্ত নয়। শেষ প্যারার ‘তুলে’ শব্দটির ব্যবহারও কানে বাজে। অনুরূপভাবে, দ্বিতীয় প্যারার ‘কচিপাতা’ এর সাথে ‘ছাতা’র অন্তমিল যথোপযুক্ত নয়।

পরের ছড়াটির নাম ‘চাঁদটা’। এ ছড়াটির বিষয়, শব্দবিন্যাস ও অন্তমিল ভাল। তবে ১৪তম লাইনের একটি শব্দ (শিল্পীত) যেমন যুক্তাক্ষর যুক্ত তেমটি তা ছন্দপতন ঘটিয়েছে। অবশ্য কবি ভাবপ্রকাশের জন্য উপযুক্ত বিকল্প কোন শব্দ না পেয়েই হয়তো এ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। মাঝে মাঝে কবিদের এ ধরনের অসহায়ত্ব হয়তো কিছুটা ক্ষমাযোগ্য।

পরবর্তী ছড়াটির নাম ‘খুশির তোড়ে ভাসে’। এ ছড়াটিও চমৎকার। সহজ শব্দের ঝরঝরে ব্যবহারে নিয়মিত ছন্দের তালে তালে কবি বৃষ্টিপড়ার প্রাকৃতিক দৃশ্যকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। যেমন-

বৃষ্টি পড়ে মাঠে মাঠে

জাগে মাটির প্রাণ

লাঙল চালায় কিষাণ তখন

শুঁকে মাটির ঘ্রাণ।

মাটির মাঝে বীজ ছড়িয়ে

কিষাণ দারুণ হাসে

ঠোঁটের ডগায় গানের কলি

খুশির তোড়ে ভাসে।

 

পরবর্তী ছড়াটির নাম ‘উঠলো হেসে কলি’। 

এটিও একটি সার্থক ছড়া। বর্ষাকালে বাংলার ¯িœগ্ধ-মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যের চমৎকার বর্ণনা ফুটে উঠেছে এখানে। বর্ষাকালে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হয়। বৃষ্টিতে গাছপালা প্রকৃতি যেমন নতুন প্রাণ পায়, আবার পশুপাখি ও গরীব মানুষরা তেমনি বৃষ্টির পানিতে ভিজে কষ্ট পায়। বৃষ্টির পানির সাথে বর্ষার পানি যুক্ত হয়ে মাঠ-ঘাট, বাড়ি-ঘর, শস্যক্ষেত সব তলিয়ে দেয়। এতে অনেকের কষ্ট হয়, আবার ভরা নদীতে মাঝিরা অনেকেই মনের সুখে পাল টানিয়ে গান গেয়ে নৌকা নিয়ে এখানে ওখানে স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরে বেড়ায়। বর্ষার শেষে জমিতে পলি পড়ে ক্ষেত উর্বরা হয়। উর্বরা মাটিতে কৃষক নতুন ফসলের আবাদ করে। তাই বর্ষা একদিকে যেমন আশীর্বাদ, অন্যদিকে কারো কারো জন্য তা কষ্টেরও বটে। কবি বর্ষার এ দুটি রূপ চমৎকারভাবে বর্ণনা করেছেন।

পরবর্তী ছড়ার নাম ‘পান্না মাণিক ঝরে’। এ ছড়াটিও চমৎকার। একটি পড়া-ফাঁকি দেয়া, খেলাধূলা-প্রিয়, আলসে, ঘুমকাতুরে ফুটফুটে সুন্দর শিশুকে নিয়ে ছড়াটি রচিত হয়েছে। ছড়াটি শুরু হয়েছে এভাবে-

হাসি নামের একটি মেয়ে সকাল দুপুর সাঁঝে

খেলাধূলায় কাটায় সময় পায়ে নূপুর বাজে।

নূপুর বাজে ঘুঙুর বাজে বাজে সোনার মল

ছবি আঁকা ফেলে রেখে খেলতে থাকে বল।

শিশু-মনস্তত্বের সাথে মিল রেখে একটি শিশুর চাওয়া-পাওয়ার বিষয়টি এ ছড়ায় সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পরবর্তী ছড়ার নাম ‘থাকবে না আর খেদ’। এ ছড়াটির তৃতীয় প্যারায় কিছুটা ছন্দপতন লক্ষ্য করা যায়। এছাড়া ঈদের উপর রচিত এ ছড়াটি বেশ সুন্দর হয়েছে।

পরবর্তী ছড়ার নাম ‘খোদার রহম’। কোরবানী ঈদের উপর রচিত এ ছড়াটিও চমৎকার হয়েছে। তবে শব্দ চয়নে এখানে কিছুটা ত্রুটি লক্ষ্য করা যায়। যেমন: ‘ছলাকলা’ শব্দটি এখানে সুপ্রযুক্ত নয়। তাছাড়া ‘মিসকি হাসি’ শব্দ বলে কোন শব্দ নেই। শব্দটি মুস্কি।

পরবর্তী ছড়ার নাম ‘মুক্তির আলো’। এটিও একটি চমৎকার ছড়া। 

পরবর্তী ছড়ার নাম ‘যাদু মাখা স্মৃতি’। এ ছড়াটিতে অতীতের সুখ-স্মৃতির বর্ণনা আছে। আগে বাংলাদেশে মাঠভরা ফসল, গোলাভরা ধান, হাওর-বিল-নদীনালায় অফুরন্ত মাছ, গাছে গাছে নানারকমের ফল-ফুল, পাখির গান, রাখালি বাঁশির সূর, কর্মব্যস্ত কৃষাণ-কৃষাণীর চলাফেরায় মুখর থাকত পল্লীর জীবন। এখন সে হাসিখুশী সম্পন্ন বাংলার রূপ বদলে গেছে। কবি সেজন্য আফসোস করে আবার সে পুরানো দিন ফিরে আসবে বলে আশা করছেন। ছড়াটি শেষ হয়েছে এভাবেÑ

মাথাল মাথায় কৃষক ছিল কলসি কাঁখে বধূ

ঠান্ডা পানির পরশ যেন ছড়িয়ে দিত মধু।

যাদুমাখা এসব স্মৃতি হারিয়ে গ্যালো কই

যেসব স্মৃতি দেখবো বলে আজো আশায় রই।

পরবর্তী ছড়ার নাম ‘শপথ নেব নড়তে’। এ ছড়াটিতে ঈদের জামাতের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। ঈদের জামাতে যে শৃঙ্খলা শেখানো হয়, সেরূপ সুশৃঙ্খল, শান্তিপূর্ণ, সুন্দর সমাজ গঠনে শিশু-কিশোররা উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠুক বলে কবির প্রত্যাশা।

পরবর্তী ছড়ার নাম ‘ফুটলো মুখে বোল’। এ ছড়াটিতে বাংলা ভাষা আন্দোলনের কথা বলা হয়েছে। আমাদের মায়ের ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে আন্দোলন করতে হয়েছিল। অনেক তাজা প্রাণের রক্তের বিনিময়ে অবশেষে আমরা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি। শিশু-কিশোরদেরকে সে রক্তাক্ত ইতিহাসের কথা এখানে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

পরবর্তী ছড়ার নাম ‘শীত’। এ ছড়াটিতে বাংলাদেশে শীত ঋতুর বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। শীতকালে প্রচ- শীতে মানুষ অনেক কষ্ট পায়। বিশেষ করে গরীব মানুষ যাদের বসবাসের মত ভালো ঘর-দুয়ার নেই, পেটে ঠিকমত অন্ন জোটেনা, উপযুক্ত জামা-কাপড়-জুতা নেই-শীতের সময় তাদের বড় কষ্ট হয়। আগুন জ্বালিয়ে পল্লী অঞ্চলে দরিদ্র মানুষেরা শীত নিবারণের চেষ্টা করে। কবি এখানে সে শীতার্ত মানুষের দুঃখ-কষ্টের বর্ণনা চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

পরবর্তী ছড়ার নাম ‘চাঁদের হাসি’। এখানে সাধারণ চাঁদ নয়, ঈদের চাঁদের কথা বলা হয়েছে। রমজানের শেষে শওয়ালের একফালি সুন্দর চাঁদ দেখার আশায় সকলে উদগ্রীব হয়ে থাকে। চাঁদ উঠলে পরের দিন ঈদ।ঈদের দিন নামাজ পড়া, কোলাকুলি করা, মানুষে মানুষে ভালোবাসা ও সম্প্রীতির বন্ধন গড়ে তোলা এবং সর্বোপরি ধনী-গরীব সকলের বাড়িতে সুন্দর সুন্দর রান্নার আয়োজন করে সকলে মিলে তা পরম সুখে আহার করা ইত্যাদি সুখ ও আনন্দময় একটি দিনের প্রত্যাশায় সকলে ঈদের চাঁদ দেখার জন্য উদগ্রীব থাকে। তাই এ চাঁদ সাধারণ কোন চাঁদ নয়, এ চাঁদ যেন ধনী-গরীব সকলের জন্য সুখ ও আনন্দের বারতা বয়ে আনে। এ চাঁদ আনন্দের প্রতীক, মানুষে মানুষে ভালোবাসা, সাম্য ও সৌহার্দ্যরে প্রতীক।

পরবর্তী ছড়ার নাম ‘গাঁয়ের ছবি’। এ ছড়াটিতে কবি তার গাঁয়ের সুন্দর মায়াবী স্মৃতি রোমন্থন করেছেন। বাংলাদেশের গাঁয়ের দৃশ্য যেমন হয়, কবির গাঁয়ের দৃশ্য তা থেকে পৃথক নয়। তবু নিজের গাঁয়ের জন্য সকলের মনই একটি বিশেষ আকর্ষণ থাকে। কবি সে আকর্ষণের কথাই এখানে সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন। ভাষা, ছন্দ ও বর্ণনা চমৎকার হয়েছে। কবি ছড়াটি এভাবে শেষ করেছেনÑ

এটা আমার গাঁয়ের ছবি মনের মাঝে আঁকা

শিমুল পলাশ কত যে ফুল নদী চলে বাঁকা।

এমন মজার ছবি বলো কোথায় পাবে তুমি

সকাল বিকাল সন্ধ্যা সাঁঝে সেই ছবিটি চুমি।

পরবর্তী ছড়ার নাম ‘বিষের বাঁশি বাজে’। এ ছড়াটি বাংলা বিদ্রোহী ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মরণে লেখা। কবির দুঃখময় শৈশব স্মৃতি ও সংগ্রামময় জীবনের কিছু বর্ণনা রয়েছে এখানে। তারপর নানা বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে তিনি কিভাবে বিশ্বের দরবারে সগৌরবে মাথা তুলে দাঁড়ালেন, তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা রয়েছে এতে। এটা একটি চমৎকার ছড়া।

পরবর্তী ছড়ার নাম ‘শিউলি জবা হাসে’। এ ছড়াটিতেও কবি বাংলার শীতকালের প্রাকৃতিক দৃশ্যের বর্ণনা দিয়েছেন। তবে এখানে চতুর্থ প্যারায় প্রথম লাইনে কিছুটা ছন্দপতন ঘটেছে। এখানে ভিন্নভাবে শব্দ বিন্যাস করে এ ছন্দপতন ঠেকানো যেতো। এছাড়া ছড়াটি চমৎকার হয়েছে।

পরবর্তী ছড়া নাম ‘জান্নাতেরই ফুল বাগানে’। এ ছড়াটি বাংলাদেশের এক প্রতিভাবান তরুণ কবি স্মরণে লেখা। কবি মতিউর রহান মল্লিক তার ছড়া, কবিতা ও গান দিয়ে একসময় মানুষকে মাতিয়ে রাখতেন। কিন্তু অল্প বয়সেই এ অসাধারণ কবি পৃথিবী থেকে বিদায় গ্রহণ করেন। তাঁর কথা স্মরণ করেই কবি এ অনবদ্য ছঢ়াটি রচনা করেছেন। ছড়ার শেষ কয়েকটি পংক্তি এখানে উল্লেখ করছিÑ

সেই পাখিটি উড়ে গ্যালো

বনের মাঝে একা

ইতি-উতি কত খুঁজি

পাই না পাখির দেখা।

পাখির জন্য দোয়া করি

ভালো থাকুক পাখি

জান্নাতেরই ফুল বাগানে

করুক মাখামাখি।

পরবর্তী ছড়ার নাম ‘মিলে মিশে’। এতে ঈদের বর্ণনা আছে। রমজান আমাদেরকে নিরন্ন মানুষের দুঃখ-কষ্টের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। গরীব মানুষের প্রতি আমাদের সমব্যথী করে তোলে। রমজানে গরীব মানুষের দুঃখ দূর করার জন্য তাদেরকে যাকাত-ফেতরা, দান-সদ্কা ইত্যাদি প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এভাবে প্রতি বছর রমজান আসে ধনী-গরীবের মধ্যে ব্যবধান ঘুচিয়ে দিতে, সকলকে ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ করে মিলেমিশে সুন্দর সমাজ গড়তে। এ ছড়াটি শিশু-কিশোর মনে এ ধরনের একটি সুন্দর আবেগঘন অনুভূতির জন্ম দেয়।

এ গ্রন্থের সর্বশেষ ছড়ার নাম ‘কষ্ট কিছু থাকবে না আর’। এ ছড়াটিতেও রোজার তাৎপর্য বর্ণনা করা হয়েছে। রোজা রাখা অনর্থক উপোস থাকা নয়। গরীবের ক্ষুধার জ্বালা অনুভব করা, শরীরে প্রতি অঙ্গের পবিত্রতা সাধন, মনের সকল কালিমা-হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে আধ্যাত্মিক পবিত্রতা সাধন করে প্রকৃত মুমিন বা সুন্দর মানুষে পরিণত হওয়ার সাধনাই রমজানের মূল উদ্দেশ্য।

‘চাঁদের হাসি’ ছড়া গ্রন্থটির প্রতিটি ছড়ায় কবি বাংলাদেশের প্রকৃতির বিভিন্ন হৃদয়গ্রাহী রূপ আঁকার সাথে সাথে এখানকার সমাজ ও মানুষের কথা তুলে ধরেছেন। ছড়া জাতীয় রচনা সাধারণত শিশু-কিশোরদের জন্য রচিত হয়। শিশু-কিশোরদের মন থাকে নরম, কাদামাটির মত। এসময় সুন্দর কথা ও উপদেশের দ্বারা তাদের মনে সুন্দর অনুভূতি সৃষ্টি করা একান্ত প্রয়োজন। তাদের মন ও জীবনকে যত সুন্দরভাবে ভালভাবে গড়ে তোলা যাবে, ভবিষ্যতে তারা তত সুন্দর সমাজ গড়ে তুলবে এবং তাদের দ্বারাই দেশ ও জাতি উন্নত হয়ে উঠবে। তাই শিশু-কিশোরদের সুন্দর ও আদর্শ জীবন গড়ার দায়িত্ব অনেক বড়। একটি দেশ ও জাতির উন্নতি ও মর্যাদা নির্ভর করে সে দেশের শিশু-কিশোরদেরকে উন্নত চরিত্রবিশিষ্ট করে গড়ে তোলার উপর। তাই শিশুদেরকে শুধু অর্থহীন, উদ্দেশ্যবিহীন হাসি-আনন্দপূর্ণ বিষয় দিয়ে তাদের জীবনকে লক্ষ্যহীন করে গড়ে তোলার কোন লাভ নেই। তাদেরকে পরিকল্পিতভাবে হাসি-আনন্দের মধ্যদিয়ে সৎগুণ, সৎচরিত্র ও দৃঢ় প্রত্যয়ী করে গড়ে তোলার উপর জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। কবি নাসির হেলাল অতি চমৎকারভাবে মানুষ গড়ার এ সুন্দর কাজটি এ গ্রন্থে আঞ্জাম দিয়েছেন। শব্দ চয়ন, ছন্দমিল ও নান্দনিক অভিব্যক্তিতেও এ গ্রন্থটি যথেষ্ট সুন্দর হয়েছে। তার কাছ থেকে এলুপ সুন্দর রচনা আরও প্রত্যাশা করা যেতে পারে।

॥২॥

নাসির হেলালের দ্বিতীয় ছড়াগ্রন্থটির নাম ‘মন পবনের নাও’। এ গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে কবি গোলাম মোহাম্মদকে। গোলাম মোহাম্মদ একজন প্রতিভাবান ও প্রতিশ্রুতিশীল কবি, ছড়াকার ও গীতিকার ছিলেন। অল্প বয়সে তিনিও ইন্তেকাল করেন। কিন্তু অল্পকালের মধ্যেই তিনি যে অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন, তার তুলনা বিরল। কবি নাসির হেলাল তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনার্থে এ ছড়াগ্রন্থটি তার নামে উৎসর্গ করেছেন। এ গ্রন্থটিও প্রকাশ করেছে সুহৃদ প্রকাশন। ছবি এঁকেছেন আজিজুর রহমান। পৃষ্ঠা সংখ্যা ২৪। মূল্য ষাট টাকা।

এ গ্রন্থে মোট ২০টি ছঢ়া সংকলিত হয়েছে। এগুলোর শিরোনাম নি¤œরূপ: পুণ্য যেন ঝরে, আখেরাতের বই, প্রদীপ জ্বেলে, যেন গানের কবি, নাচে খুশির জোয়ার, রোজা মানে, ঈদ মানে, কলজে ধরে টান, সিডর মানে, সবার প্রিয় কবি, মনপবনের নাও, সুরভি চারদিক, সত্য কথা বলা, ঈদের খুশি, দুধে মেঘে পানি, ধুম বৃষ্টি নামুক, উঠলো বেজে নূপুর, বনভোজনের চিঠি, বৃষ্টি ঝরে, বাংলাদেশি মেলা।

‘মন পবনের নাও’ ছড়াগ্রন্থটিতে তিন ধরনের ছড়া আছে। প্রথমত, ব্যক্তিগত ছঢ়া। প্রথম দুটি ছড়া এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। একটি মাকে নিয়ে অন্যটি কবি গোলাম মোহাম্মদকে নিয়ে লেখা। দ্বিতীয়ত, ঈদ, রোজা, বনভোজন, ইত্যাদি উৎসব-অনুষ্ঠান এবং নীতিবোধ নিয়ে লেখা ছড়া। তৃতীয়ত, প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক বিভিন্ন রূপ-বৈচিত্র্য এবং দুর্যোগ-দুর্বিপাক সংঘটিত দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে লেখা ছড়া। এ তিনটি বিষয়ই শিশু-কিশোরদের জন্য বিশেষ উপযোগী। তাই বিষয়গতভাবে এ গ্রন্থের ছড়াগুলো তাদের জন্য আকর্ষনীয় হয়ে উঠেছে।

শব্দ-চয়ন, অন্তমিল, চিত্রময় বর্ণনা ইত্যাদি সবকিছুই সুন্দর ও শিশু-কিশোরদের উপযোগী বলা যায়। কিছু কিছু বর্ণনা অতিশয় চমৎকার। যেমনÑ

মাগো তোমার আঁচল যেন বট বৃক্ষের ছায়া

তোমার কথায় কি যে মধু ছড়ায় কেবল মায়া।

 

সব কষ্ট দূর হয়ে যায় দেখলে তোমার মুখ

 তোমার ডাকে সব ভুলে যাই পাই যে মনে সুখ।

(পুণ্য যেন ঝরে)

‘মন পবনের নাও’ ছড়াগ্রন্থটি শিশু-কিশোরদের বিশেষ উপযোগী। সহজ-সরল শব্দ, শিশু-কিশোরদের জন্য শিক্ষণীয় বিভিন্ন বিষয়, ছন্দময় বর্ণনাভঙ্গি, অন্তমিল এবং শিশু মনস্তত্ত্ব বিষয়ক বিভিন্ন রচনা এ গ্রন্থটিতে অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে তুলেছে। কবি নাসির হেলাল একসময় শিক্ষকতা করতেন। শিক্ষকদেরকে শিশু-কিশোরদের মনস্তত্ব, চিন্তাভাবনা, আনন্দ-বেদনা ইত্যাদি বিশেষভাবে উপলব্ধি করতে হয়। সেকারণে ছোটদের উপযোগী ছড়া কবিতা লেখায় তিনি যথেষ্ট স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ থেকেই সফল ছড়া কবিতার সৃষ্টি হয়।

নাসির হেলালের লেখা এ পর্যন্ত ১০টি শিশুতোষ কাব্য প্রকাশিত হয়েছে। ভবিষ্যতে তার কাছ থেকে এ জাতীয় আরও রচনা আশা করা যেতে পারে। তবে করিকল্পিতভাবে বিষয়-বৈচিত্র্যপূর্ণ ছড়া কবিতাই তার নিকট প্রত্যাশা করবো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ