ঢাকা, শনিবার 6 January 2018, ২৩ পৌষ ১৪২৪, ১৮ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আসামে বাঙ্গালী খেদাও আন্দোলন একটা পুরানো রাজনীতি

সামছুল আরেফীন: আসামে নাগরিকদের রেজিষ্ট্রেশন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বাঙ্গালীদের বিতাড়ণের চেষ্টার অংশ হিসেবেই এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আর বাঙ্গালীদের বিতাড়ণের ঘটনা পুরানো রাজনীতি ছাড়া কিছু নয়। ইতিপূর্বে বিভিন্ন সময়, বিশেষ করে ভারতের নির্বাচনের পূর্ব মুহূর্তে এই ধরনের দাবী উঠে। আর এই খেদাও এর টার্গেট হয় বাঙ্গালীরা, এখন মুসলমানরাই বেশী হচ্ছে। পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী আসামে চলমান ন্যাশনাল সিটিজেন’স রেজিষ্ট্রেশন-এনসিআর এর কার্যক্রমকে বাঙ্গালী হটাও আন্দোলন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বীরভূম জেলায় এক জনসভায় তিনি বলেন, আসামে সরকার কী ধরনের রাজনীতি শুরু করেছে? ইতিমধ্যে ১ কোটি মানুষ এনসিআর থেকে বাদ পড়েছে। এগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পুরানো বাঙ্গালী খেদাও আন্দোলন ছাড়া আর কিছুই নয়। এটা আসামে বসবাসরত বাঙ্গালীদের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র। তিনি হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, তৃণমূল কংগ্রেস বাঙ্গালীদের উপর কোন ধরনের নির্যাতন সহ্য করবে না। তিনি বিজেপি সরকারের উদ্দেশ্যে বলেন, আগুন নিয়ে খেলবেন না। সাপ্তাহিক হলিডে এ খবর দিয়েছে।
হলিডের রিপোর্ট অনুযায়ী, নববর্ষের শুরুতেই আসামের এনআরসি’র প্রথম খসড়া ৩২ দশমিক ৯ মিলিয়ন মানুষের মধ্যে ১৯ মিলিয়নের নাম প্রকাশিত হয়েছে। বাদ পড়াদের অধিকাংশই বাঙ্গালী মুসলিম। 
আসামে এনআরসি’র তালিকায়  নেই ৭০ শতাংশ বাঙ্গালি: ভারতের আসামে জাতীয় নাগরিক পঞ্জীর (এনআরসি) যে প্রথম খসড়া তালিকা বেরিয়েছে, তাতে নাম রয়েছে উলফা নেতা পরেশ বড়–য়ার, অথচ রাজ্যে বহু বছর ধরে বসবাসকারী বহু পরিচিত মানুষের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি বলে অভিযোগ, যা নিয়ে তীব্র বিতর্ক মাথাচাড়া দিয়েছে। প্রথম তালিকা থেকে বাদ প্রায় সত্তর শতাংশ বাঙালীর নাম। বাঙ্গালি অধ্যুষিত বরাক উপত্যকা থেকেই নথিভুক্তির হার সবথেকে কম। এরপর কী হবে, তা ভেবে আশঙ্কায় ভুগছেন অনেকেই। যদিও সরকারের দাবি, এখনও দ্বিতীয় তালিকা বেরনো বাকি।
৩১ ডিসেম্বর মধ্যরাতে অর্থাৎ নতুন বছরের শুরুতেই প্রকাশিত ওই তালিকায় নাম নেই বিরোধী নেতা, ধুবড়ির সাংসদ অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রাটিক ফ্রন্ট (এআইইউডিএফ) প্রধান বদরুদ্দিন আজমল, তাঁর ছেলে তথা যমুনামুখের বিধায়ক আবদুর রহিম আজমল, তাঁর ভাই তথা বরপেটার এমপি সিরাজুদ্দিন আজমলের। এতে প্রবল অসন্তুষ্ট তাঁরা।
আসামে বসবাসকারী তথাকথিত বেআইনি বাংলাদেশী ‘অনুপ্রবেশকারী’দের চিহ্নিত করার ব্যাপক প্রক্রিয়ার অঙ্গ হিসাবে ওই তালিকা বেরিয়েছে। বৈধ ভারতীয় নাগরিক বলে স্বীকৃতি চেয়ে মোট ৩ কোটি ২৯ লক্ষ আবেদনকারীর মধ্যে ১ কোটি ৯০ লক্ষের নাম উঠেছে প্রথম তালিকায়। অর্থাৎ তালিকায় নেই ১ কোটি ৩৯ লক্ষ মানুষের নাম। তাৎপর্যপূর্ণভাবে প্রথম তালিকায় নেই আসামের প্রায় ৭০ শতাংশ বাঙ্গালির নাম। যাঁদের নাম তালিকায় নেই, তাঁরা চরম উদ্বেগে রয়েছেন। এই মানুষগুলোর প্রশ্ন, তাহলে কি তাঁদের নাগরিকত্বের ওপর খাঁড়া নামতে চলেছে? অদূর ভবিষ্যতে কি তাঁদের অসম ছাড়তে হবে?
তালিকায় নাম না থাকার ব্যাপারে রেজিস্ট্রার জেনারেল অব ইন্ডিয়ার বক্তব্য, এখনও প্রক্রিয়াটি চলছে। অনেক সময় আছে। আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।
আসাম চুক্তি অনুসারে, ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে থেকে যারা এই রাজ্যে বসবাস করছেন, তাঁরাই নাগরিকত্বের অধিকারী। সেই সূত্র মেনেই এনআরসি-তে নাম তোলার প্রক্রিয়া চলেছে।
আসামে নাগরিকত্বের প্রমাণ হল ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেন্স বা জাতীয় নাগরিক পঞ্জী। ১৯৫১ সালের পরে এই প্রথম আসামে জাতীয় নাগরিক পঞ্জী নবীকরণে হয়েছে।
বাঙ্গালি খেদাও আন্দোলনের পিছনের কথা: মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুসারে, উত্তর-পূর্বের বাঙ্গালিদের প্রতি অসমীয়া জাতির বিদ্ধেষ মূলক একটি সংগঠিত প্রচারাভিযানের কথা উল্লেখ করে, যা আসামের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে এবং ১৯৮০-এর দশকে মেঘালয় ও ত্রিপুরাতে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৬০ সালে এই আন্দোলনের নামে আসামে বাঙ্গালি বিদ্ধেষ তীব্র হয়। এই সময় প্রায় ৫০,০০০ বাঙ্গালি আসাম রাজ্য থেকে বিতারিত হয় অসমীয়াদের দ্বারা, এবং পশ্চিমবঙ্গে আশয় নেয়।
১৯৪৮ সালের ১লা মে আসামের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়া অসমীয়া ও বাঙ্গালি হিন্দুদের মধ্যে একটি জাতিগত দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। গুয়াহাটিতে বাংলা-মালিকানাধীন দোকানগুলো লুট করা হয়েছিল অসমীয়াদের দ্বারা। ১৯৫৬ সালে, পূর্ববাংলার অবিভক্ত গোলপাড়া জেলার ব্যাপক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়, যখন রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন জেলার সাথে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে একত্রিত হওয়ার সম্ভাব্যতা যাচাই করার জন্য জেলা পরিদর্শন করে। প্রায় ২৫০ বাংলা ভাষা মাধ্যমের মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে রাতের অন্ধকারে আসামি ভাষার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করা হয়।
১৯৬০ সালের জুন মাসে বাঙ্গালি হিন্দুদের উপর হামলা শুরু হয়। এটি প্রথম গুয়াহাটির কটন কলেজে শুরু করে এবং তারপর রাজ্যের সমস্ত স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় আদিবাসী জনগোষ্ঠী বাঙ্গালি জনগোষ্ঠীকে আক্রমণ করে। কামরূপ জেলার গোরেশ্বরের ২৫ টি গ্রামে সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতা ঘটে। বিচারপতি গোপাল মেহেরপুরে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। রিপোর্ট অনুযায়ী ৯ জন বাঙালি মারা যায় এবং একশ'র বেশি আহত হন। মহিলাদের উপর আক্রমণের অন্তত একটি ঘটনা ছিল। বাঙালিদের ৪,০১৯টি কুটির এবং ৫৮টি ঘর ভাংচুর ও ধ্বংস করা হয়।
হাজার হাজার বাঙ্গালি ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা থেকে বিতাড়িত হয় এবং পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গে স্থানান্তরিত হয়। এক অনুমান অনুযায়ী ৫,০০,০০০ বাঙ্গালি অসম থেকে বাস্তুচ্যুত হয়। পশ্চিম বঙ্গে হাজারো শরণার্থী পর্যায় আসে। প্রায় ৪,০০০ শরণার্থীর প্রথম ব্যাচটি ১৯৬০ সালের ১ জুলাই থেকে ৫ জুলাই এবং ১১ জুলাইয়ের মধ্যে এসে পৌঁছায়। ৪৪৭ এর পরবর্তী ব্যাচের ১২ থেকে ২০ জুলাই এর মধ্যে আগমন ঘটে। বাকি বাঙালি শরণার্থীর ৩১ জুলাই পরে এসেছিল। জুলাই-সেপ্টেম্বরের সময়, প্রায় ৫০ হাজার বাঙালি পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নেয়।
১৯৬২ সালে বঙাল খেদা বা বাঙালি খেদা আন্দোলনের প্রতিবাদে বাঙালি পল্লি কবি নিবারান পন্ডিত সেই দিনগুলোর কথা নামে কাব্যের একটি সংগ্রহ রচনা করেন।
১৯৭২ সালে আসামে বড় বড় জাতিগত দাঙ্গা সংঘটিত হয়, যেখানে লক্ষ্য ছিল বেশিরভাগই বাঙালি। প্রায় ১৪,০০০ বাঙালি পশ্চিমবঙ্গ এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্য রাজ্য গুলীতে পালিয়ে যায়।
আসাম বিপ্লবের প্রথম পর্যায়ে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা জুড়ে বাঙালি সম্প্রদায়কে আক্রমণ করা হয়েছিল। দুলিয়াজানে অয়েল ইন্ডিয়ার সদর দফতরের একটি জন বাঙালি টেকনিক্যাল অফিসার রবি মিত্রের উপর রক্তক্ষয়ী হামলায় বাঙালিদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক দেখা দেয়। ১৯৮৩ সালে, বিদেশি বিতারণ আন্দোলনের নামে আবারও বাঙ্গালিদের উপর আক্রমণ করা হয়। ধমাইজি জেলায়, শালাপাথের অসমীয়া ছাত্রদের দ্বারা পূর্ব নোটিশ ছাড়াই বাঙালিদের ঘর ভাঙচুর করা হয়। বাঙালিদের প্রতি অসমীয়া জনগণের ঘৃণার পথ অনুসরণ করে, আদিবাসীরা মেঘালয়তে বাঙালি হিন্দুদের উপর হামলা চালাতে শুরু করে এবং তাদের চাকরি ও ব্যবসার আধিপত্য রোধ করে। আক্রমণগুলো বেশিরভাগই শিলংতে সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯৮০ সাল থেকে আনুমানিক ২৫,০০০ থেকে ৩৫,০০০ বাঙ্গালি হিন্দু মেঘালয় ত্যাগ করে এবং পশ্চিমবঙ্গ এবং ভারতের অন্যান্য অংশে বসতি স্থাপন করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ