ঢাকা, শনিবার 6 January 2018, ২৩ পৌষ ১৪২৪, ১৮ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সন্ত্রাসবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের ইতিবৃত্ত

-মাহমুদ ইউসুফ
॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥
সেনাবাহিনী মুসলিম পুরোপুরি নিরস্ত্র করলেও হিন্দুদের তো নিরস্ত্র করা হয়নি বরং সেনাবাহিনী উৎসাহিত করেছে আর কিছু ক্ষেত্রে বাধ্য করেছে স্থানীয় হিন্দুদের, মুসলিমদের বাড়িঘর ও দোকানপাট লুটপাট করার জন্য। সুন্দরলাল রিপোর্টের সাথে পেশ করা একটা গোপনীয় নোটে হিন্দুদের রক্তলোলুপ এই চরিত্রের এক জঘন্য নমুনা দেখা যায়। সুন্দরলাল কমিটির প্রতিবেদনের কয়েকটি তথ্য  “বেশ কয়েক জায়গায়, সামরিক বাহিনীর সদস্যরা শহর ও গ্রাম থেকে মুসলিম পুরুষদের ধরে নিয়ে এনে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করেছে।” “অনেক জায়গায় আমাদের দেখানো হয় কুয়া যেগুলো ছিল পচা লাশে ভরা। এ রকম এক ক্ষেত্রে আমরা ১১ টি লাশ দেখেছি যার মধ্যে ছিল একজন মহিলা যার ছোটো শিশুটি তার স্তনের সাথে লেগেছিল।” “দেখেছি ডোবা-নালার মধ্যে লাশ ছড়িয়ে আছে। বেশ কয়েক জায়গায় দেহ পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল, আমরা গিয়ে দেখেছি পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া হাড় আর খুলি এখনও সেখানে পড়ে আছে।” (বিবিসি নিউজ, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৩; “Hyderabad 1948: India’s hidden massacre)
পন্ডিত সুন্দরলাল উল্লেখ করেন, মুসলমান হত্যায় ভারতীয় সেনারা কোথাও কোথাও সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে। তারা প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমান পুরুষদের ধরে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করেছে।’ (সাম্প্রতিক দেশকাল, ১০ অক্টোবর ২০১৩) শুধু হত্যা আর লুটই নয়, অসংখ্য মুসলিম মহিলা সশস্ত্র হিন্দু মিলিশিয়াদের হাতে ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। মুহাম্মাদ হায়দারের ভাষায়, “ হাজার হাজার পরিবার ভেঙ্গে গিয়েছিল, শিশুরা তাদের পিতামাতার কাছ থেকে আর স্ত্রীরা তাদের স্বামীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলেন। মহিলা ও তরুণীদের ধাওয়া করা হত আর ধর্ষণ করা হত”। যাদের সামর্থ্য ছিল তারা পাকিস্তানে হিজরত করেছিলেন। জাতিসংঘ ও মানবাধিকার তখন অন্ধ ছিল। বিশ্বের “সর্ববৃহৎ গনতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র্রে” এ অপরাধের জন্য কাউকে শাস্তি পেতে হয়নি, কারো বিচার হয়নি বরং এর দৃশ্যায়ন আবার ঘটেছিল গুজরাটে।
ডাইনি অপবাদে ভারতে নারী হত্যা : ভারতের বিভিন্ন জায়গায় আজও চলছে ডাইনি অপবাদ দিয়ে নারী হত্যার হাজা হাজার ঘটনা। সংবাদমাধ্যমগুলোর সমীক্ষায় গত এক দশকে দুই হাজর ৫০০ কথিত ডাইনি হত্যার ঘটনা উঠে এসেছে। গত দুই বছরে ডাইনি বা প্রেতাত্মা অপবাদে চাবুক মেরে, লাঠিপেটা করে, ঢিলিয়ে মেরে ফেলা হয় ২৭০ জন নারীকে। এদের বেশির ভাগই হয় পৌঢ়া না হয় বৃদ্ধা। তবে বলা হয়েছে, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। ঘটনার বেশির ভাগই অজানা থেকে যায়। পুলিশ ও প্রশাসন হয় না জানার ভান করে থাকে কিংবা ডাইনি হত্যা বলে মানতে অস্বীকার করে। (ডিডব্লিউ, দৈনিক নয়াদিগন্ত, ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৪, মঙ্গলবার, কলাম ৫, পৃ ৫)
আলবেনিয়ায় মার্কসবাদীদের উগ্রতা : আলবেনিয়া ১৪২৩-১৯২২ সময়কালে ছিলো উসমানিয়া সালতানাতের অধীন। ১৯৪৬ সালে রাষ্ট্রপ্রধান হন মার্কসবাদী নেতা আনোয়ার হোজ্জা। ১৯৬৭ সালে তিনি আলবেনিয়া একটি নাস্তিক রাষ্ট্র্রে পরিণত করেন। এরপর তিনি ২১৬৯টি উপাসনালয় ধ্বংস করে। ২০০ ধর্মীয় নেতাকে বাধ্যতামূলক শ্রমশিবিরে পাঠান। ধর্মীয় পোশাক নিষিদ্ধ করা হয়। কেউ পড়লে তাকে ১০ বছর জেল দেয়া হত। ছোটো মসজিদগুলোকে ধ্বংস করা হয়। আর বড় মসজিদগুলোকে ঘোড়ার আস্তাবল ও জিমনেসিয়ামের পরিণত করা হয়। ঐতিহাসিক কিংস মসজিদকে সিনেমা হলে রূপান্তিরিত করে হোজ্জা সরকার। (কাজী মুহাম্মদ নিজামুল হক: বিশ্বময় ইসলামের পুনর্জাগরণ, পৃ ৩৫৬-৩৫৮) এইসব খুনি কমিউনিস্টরাই আজিকার সুসভ্যতার দাবিদার!
ঝালকাঠি জেলায় কুলকাঠি ট্রাজেডি : বিংশ শতাব্দির তৃতীয় দশকে বর্তমান বাংলাদেশের ঝালকাঠি জেলায় সংগঠিত হয় আরেকটি হত্যাযজ্ঞ। ১৯২৭ সালের ২রা মার্চ গুর্খা পুলিশের গুলীতে নিহত হয় ১৯ জন মুসলিম। কুলকাঠি মসজিদের নিকট সমাহিত শহিদদের স্মৃতিফলকে তাদের নাম লিপিবদ্ধ আছে। নিহতরা হলেন: বাবরউল্লাহ হাওলাদার, আক্কেল গাজি, নইম উদ্দিন হাওলাদার, ইয়াছিন আকন, আতা উদ্দিন হাওলাদার, হাসান উল্লাহ হাওলাদার, মোসলেম উদ্দিন, মোহন মোল্লা, সিরাজ উদ্দিন, সুন্দর খাঁ, ছবদার খান, মফেজ হাওলাদার, শরম্যাত আলি হাওলাদার, বলু খান, রিয়াজ উদ্দিন, জাহের তালুকদার, জহির উদ্দিন হাওলাদার, আবুল হোসেন হাওলাদার ও ফরমান উল্লাহ হাওলাদার। (সিরাজ উদদীন আহমদ: বরিশাল বিভাগের ইতিহাস প্রথম খণ্ড, পৃ ৬০৩-৬০৪) এছাড়া আহত হন অনেকে। দীনের সংগ্রাম এবং মসজিদের ঐতিহ্য রক্ষায় তাদের ত্যাগের আজও মূল্যায়ন হয়নি।
এ হত্যাকাণ্ডের মূল নায়ক ছিলেন ই.এন. ব্লান্ডি ও সত্যেন সেন। ১৯২৪-২৮ সালে সত্যেন সেনের নেতৃত্বে দক্ষিণাঞ্চলে সত্যাগ্রহ আন্দোলন জোরদার হয়। মূলত এটা ছিলো একটি কঠিন সাম্প্রদায়িক সংগঠন। বাকেরগঞ্জ, ঝালকাঠি, পটুয়াখালীতে সত্যাগ্রহ আন্দোলনের নামে নেতৃবৃন্দ সংঘাত সহিংসতায় মেতে ওঠে। ঝালকাঠির পোনাবালিয়া সংলগ্ন কুলকাঠি গ্রামে শিবপূজা উপলক্ষে ভয়ঙ্কর হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ই. এন. ব্লান্ডি, পুলিশ সুপারিনটেন্ড মি. টেলর, এসডিও জি কে বিশ্বাস, দারোগা ভূতনাথ এবং সত্যেন সেন। মসজিদের মর্যাদা রক্ষা ও শিবরাত্রে পূজাকে কেন্দ্র করে মুসলিম ও হিন্দুদের মধ্যে তিক্ততা পয়দা হলে সত্যেন সেনের মদদে ই. এন. ব্লান্ডির হুকুমে গুর্খা পুলিশের গুলীতে হতাহতের ঘটনা ঘটে।
খুন করা হয়েছিল নেতাজিকে : নেতাজি সুভাসচন্দ্রের দেহরক্ষী তথা আজাদ হিন্দ ফৌজের সাবেক সেনা জগরাম যাদব (৯৩) বলেছেন, নেতাজি বিমান দর্ঘটনায় মারা যাননি। তাকে হত্যা করা হয়েছিল। শুধু তাই নয় নেতাজির মৃত্যুর জন্য পরোক্ষভাবে দায়ি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। এক সাক্ষাৎকারে জগরাম যাদব দাবি করেন, নেতাজিকে নিয়ে সমস্যায় ছিলেন নেহরু। সুভাবের জনপ্রিয়তা ও জনমানসে গ্রহণযোগ্যতা যে নিজের তুলনায় অনেক বেশি তা বুঝতে পেরেছিলেন নেহেরু। তাই নেতাজিকে খুন করতে পিছপা হননি নেহরু। (কলকাতা ২৪˟৭, ১৬ এপ্রিল ২০১৫, দৈনিক ইনকিলাব, ১৮ এপ্রিল ২০১৫, শনিবার, কলাম, পৃ ৬)
সন্ত্রাসিক মাওসেতুং এর ভয়ঙ্কর মিশন : আধুনিক চীনের ‘রূপকার’ মাওসেতুং ১৯৪৯-৬৪ সময়কালে ৩ লাখ ৬০ হাজার মুসলিম হত্যা করে। একই সময় ৩ লাখ ৭০ হাজার কপি কুরআন হাদিস ও ইসলামি সাহিত্য ধ্বংস করে। মসজিদে মসজিদে মাওসেতুং এর ছবি টানানো হয়। পর্যায়ক্রমে ২৯ হাজার মসজিদকে প্রাইমারি স্কুল, কসাইখানা, সেনা ব্যারাক ইত্যাদিতে রূপান্তরিত হয়। ৫৪ হাজার ইমামকে গ্রেফতার করে তাদেরকে শ্রমিক এবং ক্লিনার হিসেবে কাজ করতে বাধ্য করা হয়। মাওসেতুং এর শাসনামলে মুসলিমদের সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় মালিকানায় কেড়ে নেয়া হয়। অ্যারাবিক স্ক্রিপ্ট এর পরিবর্তে ল্যাটিন অ্যালফাবেট ব্যবহারে বাধ্য করে চায়না সরকার। (কাজী নিজামুল হক, বিশ্বময় ইসলামের পুনর্জাগরণ প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৮)
শিখদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস : ভারত সরকার শিখদের বিরুদ্ধে দমন পীড়ন চালাচ্ছে বিগত কয়েক যুগ যাবত। শিখ নেতা অমরজিৎ সিং ভারত থেকে শিখ অঞ্চলকে স্বাধীন করার বিষয়ে পাকিস্তানের কুটনৈতিক সাহায্য চেয়েছেন। এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, ভারতের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার শিখ সম্প্রদায়ের মানুষের স্বাধীনতার জন্য পাকিস্তানের উচিত কূটনৈতিক সহায়তা দেয়া। কাশ্মিরের উরি হামলার বিষয়ে তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, পাকিস্তান কেন ভারতীয় সৈন্যদের ওপর হামলা করতে যাবে? তাদের চেয়ে কাশ্মিরের স্বাধীনতাকামীরা অনেক শক্তিশালী। (দ্য ডন, এঙপ্রেস ট্রিবিউন; দৈনিক ইনকিলব, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬, পৃ ১৬, কলাম ১)
মিন্দানাওয়ে আমেরিকার ধ্বংসয : মিন্দানাও ফিলাপাইনের আওতাধীন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি অঞ্চল। বিশ শতকের গোড়ার দিকে ফিলিপাইনে উপনিবেশ গড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র মিন্দানাওয়ে মুসলিম সংখ্যাধিক্য হ্রাসের জন্য ফিলিপাইনের উত্তরাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চল থেকে ৪ লাখ খৃস্টানকে নিয়ে আসে এখানে। ফিলিপাইন ১৯৪৯ সালে আমেরিকা থেকে আযাদি লাভ করে। ১৯৭০ সালে মরো মুসলিমরা স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র মিন্দানাও প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু করে। ফিলিপাইন সরকার মুসলমানদের ওপর ক্রাক ডাউন চালায়। ৩০ বছরে নির্মমভাবে নিহত হয় ১ লাখ ২০ হাজার মুসলিম। এই হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা ছিলো ফিলিপাইনের সাবেক একনায়ক ফার্দিনান্দ মার্কোস। (কাজী মুহাম্মদ নিজামুল হক: বিশ্বময় ইসলামের পুনর্জাগরণ, পৃ ২০৬-২০৯)
চেচেনে রাশিয়ার উৎকট সহিংসতা : রুশ শ্বেত ভল্লুকেরা ইউরোপে কখনও মুসলিমদের উপস্থিতি সহ্য করতে পারেনি। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জন মেজর বলেছিলেন, ‘ইউরোপে কোনো মুসলিম রাষ্ট্র সহ্য করা হবে না।’ সোভিয়েত ইউনিয়নের চরিত্রও একই। গত শতকে চেচেন ও দাগেস্তান স্বাধীনতা ঘোষণা করলে রুশ সরকার তাদের আযাদি স্পৃহা চিরতরে নির্মূলের জন্য গণহত্যা চালায়। এই হলো তাদের উদারতা, অসাম্প্রদায়িকতার চরিত্র। ১৯৯৪-১৯৯৬ সালে রাশিয়া সরকার চেচেনে ৪০ হাজার মুসলিম হত্যা করে। লাখ লাখ নর-নারী-শিশু বাস্তুচ্যুত হয়। ৩ লাখ লোক পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। সা¤্রাজ্যবাদী রুশফৌজের ধ্বংসযজ্ঞের ফলে চেচেন প্রজাতন্ত্রের নারী-পুরুষ বিপুল সংখ্যক শাহাদাত বরণ কের। এরফলে লোকসংখ্যা ভয়াবহরূপে হ্রাস পায়। (মেজর আবদুল হামিদ: ককেশাসের মহানায়ক ইমাম শামিল, পৃ.  ১-৪)
মাধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র্রের জঙ্গি সন্ত্রাস ॥ হত্যা করেছে প্রায় দেড় কোটি মুসলমান : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন সন্ত্রাসীরা জাপানের সমৃদ্ধশালী শহর হিরোশিমা ও নাগাসাকি ধ্বংস করে পারমানবিক বোমা ফেলে ইহা কারও অজানা নয়। সেই থেকে আমেরিকান বোমা, মারণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিক্ষা হচ্ছে নিরহ নিরপরাধ নিরস্ত্র ইনসান। ওদের ‘গড’ মুসলিমদের খতম করার জন্য অবাধ লাইসেন্স দিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে। নাইন-ইলেভেন ছিলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের একটি ইহুদিবাদী যৌথ দুষ্কর্ম, আলকায়েদার ওপর মিথ্যে অভিযোগ দিয়ে ইহুদিদের যোগসাজশে এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্র্রের একটি ফলস-ফ্ল্যাগ অপারেশন বা কভার্ট অপারেশন মাত্র। এটিও আজ সবার জানা নাইন-ইলেভেন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র অনেক মিথ্যাচার করেছে এবং সুষ্ঠু তদন্তকেও বাধাগ্রস্ত করেছে। এ ছাড়া নাইন-ইলেভেনের পর যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্ররা তথাকথিত সন্ত্রাস দমনের নামে বিশ্বব্যাপী যে যুদ্ধ এই দেড় দশক ধরে চালিয়ে আসছে, তাতে ১ কোটি ৫০ লাখ মুসলমান মারা গেছেন এ যুদ্ধের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষের প্রভাবে। (দৈনিক নয়াদিগন্ত, রামকৃষ্ণ মিশন রোড ঢাকা, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬, পৃ ৭) মার্কিন ও ইসরেলের জঘন্য জঙ্গিপনায় জনগণ অতিষ্ঠ। দুনিয়াটাই যেন একটা জাহান্নামরাষ্ট্র!
ভারতে বিপর্যস্ত মানবতা : আঞ্চলিক সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র ভারত। নেপাল, বাংলাদেশ, ভূটান, পাকিস্তান শ্রিলঙ্কায় আধিপত্যবাদের নেশা চেপে বসেছে তাকে। কেবল তাই নয় অভ্যন্তর ভারতে মুসলিম, দলিত, হরিজনদের কোনো মানবাধিকার নেই। কাশ্মিরে বিগত ৭০ বছর যাবত অবৈধভাবে দখল করে মুসলিমদের দমন নিপীড়ন করছে ভারত সরকার। সম্প্রতি দিল্লীর জওয়াহেরলাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিবেদিতা মেনন সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘কাশ্মির কোনোকালেই ভারতের অংশ ছিল না। ভারত অবৈধভাবে তাকে নিজের দখলে রেখেছে।’ (দৈনিক ইনকিলাব, আর কে মিশন রোড ঢাকা, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭)
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের সময়ে মানুষের মধ্যে সহিষ্ণুতা কমেছে এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘনের ঘটনা বেড়েছে। দেশটিতে মুসলিম ও দলিতদের ওপর হামলা বেড়েই চলছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হয়, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক হামলা, তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করা এবং জোর করে ধর্মান্তরকরণের ঘটনা ২০১৪ সাল থেকে ভারতে নাটকীয়ভাবে বেড়েই চলেছে। ‘কনস্টিটিউশনাল অ্যান্ড লিগ্যাল চ্যালেঞ্জেস ফেসড বাই রিলিজিয়াস মাইনরিটিস ইন ইন্ডিয়া’ শিরোনামে রিপোর্টটি প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের স্বাধীন সংস্থা ইউএস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম (ইউএসসিআইআরএফ)। সংস্থার প্রধান টমাস জে রিজ বলেন, ‘ভারত একটি গণতান্ত্রিক ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যের দেশ। এর ধর্মভিত্তিক বৈষম্যমুক্ত একটি সংবিধান আছে এবং ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকারের কথা ভারতের সংবিধানে বলা হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘কিন্তু বাস্তবতা এখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভারতের বহুত্ববাদী সংস্কৃতি এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে। গত কয়েক বছরে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা কমে গেছে এবং অনেক এলাকায় ধর্মীয় অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা অনেক বেড়েছে।’ তিনি বলেন, দেশটির ২৯টি রাজ্যের মধ্যে সাতটি রাজ্য গুজরাট, অরুণাচল প্রদেশ, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, হিমাচল প্রদেশ, উড়িষ্যা এবং ছত্তিশগড়ে জোর করে ধর্মান্তরকরণ-বিরোধী আইন আছে। তবে এই আইন সংখ্যালঘুদের প্রতি অন্যায়কে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। (ইন্ডিয়া টুডে থেকে দৈনিক নয়াদিগন্ত, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭)
ভারতে দলিত মুসলমানদের চেয়ে কুকুর উন্নত। ভারতের দলিত মহাসংঘ বলেছে,  ভারতে হিন্দুধর্মের সবচেয়ে নিচুবর্ণ দলিত  শ্রেণি ও মুসলমান সম্প্রদায়ের সামাজিক অবস্থানের চেয়ে পথের কুকুরও অনেক উন্নত ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অধিকারী। ক্ষমতাসীন বিজেপির শাসনামলে ক্রমবর্ধমান ভারতের ধর্ম-বর্ণ জাত-পাত বিদ্বেষের বিরুদ্ধে নয়াদিল্লীতে এই চিত্রটিই তুলে ধরেছে অখিল ভারতীয় দলিত মহাসংঘ (এবিডিএমএম) দলের সদস্যরা। দলের সভাপতি সুরেশ কানোজে বলেন, ভারতের ‘নিচুজাত’ ও মুসলিমদের ওপর নির্যাতনের জন্য বিজেপি-কংগ্রেস দুই দলই দায়ী। এ কারণেই দেশটিতে দিনে দিনে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার মারাত্মক আকার ধারণ করছে। (দ্য হিন্দু থেকে দৈনিক নয়াদিগন্ত, রামকৃষ্ণ রোড, ঢাকা ২১ মার্চ ২০১৬
উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের জঙ্গি-সন্ত্রাস : উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ জাতিতে তিনি রাজপুত। কট্টর হিন্দুত্ববাদী অবস্থান এবং মুসলমান বিরোধী মন্তব্যের জন্য হিন্দু সন্ন্যাসী আদিত্যনাথ নামজাদা হয়েছেন। তিনি বার বার বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন তাঁর বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক তারই কিছু ঝলক। তিনি  রামমন্দির প্রসঙ্গে বলেন, “যেখানে অযোধ্যার বিতর্কিত স্থাপনা ভেঙ্গে ফেলার থেকে কেউ আটকাতে পারে নি, তো মন্দির তৈরি করা কে আটকাবে।” বকরি ঈদকে কেন্দ্র করে ২০১৬ সালের অক্টোবরে যোগী আদিত্যনাথ মন্তব্য করেন, “মূর্তি বিসর্জন দেয়ার সময়ে সবার মনে হয় পরিবেশ দূষণ হচ্ছে, কিন্তু বকরি ঈদের দিন যে হাজার হাজার নিরীহ পশু কেটে ফেলা হয় কাশীতে, ওই সব পশুদের রক্ত যখন সরাসরি গঙ্গায় গিয়ে পড়ে, তখন দূষণ হয় না?” ২০১৫ সালেই যোগব্যায়াম নিয়ে করা তার একটি মন্তব্য ছিল এরকম : “যারা যোগব্যায়ামের বিরোধিতা করছে, তাদের ভারত ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত। সূর্য নমস্কারকে যদি কেউ সম্মান দিতে না পারে, তার সমুদ্রে ডুবে মরা উচিত।” তবে সাম্প্রতিক কালে সবথেকে বিতর্কিত মন্তব্য ছিল এটি: “যদি অনুমতি পাই তাহলে দেশের প্রত্যেকটা মসজিদে গৌরী-গণেশের মূর্তি স্থাপন করে দেব। আর্যাবর্তে আর্যরা তৈরি হয়েছিলেন, হিন্দুস্তানে আমরা হিন্দু করে দেব। পুরো পৃথিবীতে গেরুয়া ঝা-া উড়াবো।” (বিবিসি থেকে নতুন বার্তা, ঢাকা,  ১৯ মার্চ ২০১৭)
মাদার তেরেসা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মাদার তেরেসা ভারতে ধর্মপ্রচারের একটি চক্রান্তের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি সেবার নামে হিন্দুদের ধর্মান্তকরণ ঘটিয়েছেন।  সংখ্যালঘু মুসলিম সম্পর্কে বলেন, আমরা চাই, তোমরা কাউকে মেরো না এবং শান্তিপূর্ণভাবে থাকো ও উন্নয়নে মন দাও ... যদি অন্য পক্ষ শান্তিতে না থাকে, আমরা দেখিয়ে দেব কীভাবে শান্তিতে থাকতে হয় ... যে ভাষা ওরা বোঝে, ঠিক সেই ভাষাতেই। ধর্মান্তর প্রসঙ্গে বলেন, যদি এক জন হিন্দু মেয়ের ধর্মান্তকরণ হয়, তা হলে আমরা ১০০ মুসলমান মেয়ের ধর্মান্তকরণ করব। যেভাবে হিন্দু মেয়েদের অপমান করা হচ্ছে, আমার মনে হয় না কোনও সভ্য সমাজ তাকে মেনে নিতে পারে। যদি সরকার কিছু না করে, তা হলে হিন্দুরা নিজেদের হাতেই বিষয়টি তুলে নেবে। তিনি তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বলেন, আমি উত্তরপ্রদেশ ও ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র্রে পরিণত না করা পর্যন্ত থামব না। (দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ, ঢাকা, ১৯ মার্চ ২০১৭)
প্রচারমাধ্যম, চলচ্চিত্র, নাটক, কার্টুন, তথ্যচিত্র, বইপুস্তক সর্বত্রই একই শ্লোগান ‘মুসিলমরা সন্ত্রাসী’, ‘মুসলমানরা জঙ্গি’, ‘ইসলামী জঙ্গিবাদ’, ইসলামী কিতাব  জঙ্গিবাদী বই, কুরআন-হাদিস জিহাদি বই। দুনিয়ার সবজায়গাতেই একই বচন। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, ভারতীয় আঞ্চলিক সাম্রাজ্যবাদ, ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ, চায়না সাম্রাজ্যবাদ, ইহুদি সাম্রাজ্যবাদ সবার চরিত্র একই। ইসলামী ও মুসলিম তাদের অসহ্য। দুনিয়ার সব মারনাস্ত্র ওদের হাতে। অথচ ওরা মুসলমানদের বলে সন্ত্রাসী। দুনিয়ার সব প্রযুক্তি তাদের হাতে। ভয়ঙ্কর সব অস্ত্রের নির্মাতা ওরা। অথচ মুসলিমদের ওরা জঙ্গি আখ্যা দেয়। মুসলিম মাত্রই ইহুদি-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ-হিন্দুদের কাছে অপরাধী। অথচ অতীত-বর্তমানের ঘটনাবলি পর্যালোচনা ও বিচার বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে ওরাই সন্ত্রাসী, ওরাই জঙ্গি, ওরাই অপরাধী। ওরাই পৃথিবীর সর্বত্র সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনা করছে। (সমাপ্ত)
    হদিস :
১.     জওহর লাল নেহরু: বিশ্ব ইতিহাস প্রসঙ্গ (গ্লিমসেস অব ওয়াল্ড হিস্টরি এর বঙ্গানুবাদ), আনন্দ, ৪৫ বেনিয়াটোনা লেন, কলকাতা, নবম মুদ্রণ ২০১৬
২.     কাজী মুহাম্মদ নিজামুল হক: বিশ^ময় ইসলামের পুনর্জাগরণ প্রথম খ-, আধুনিক প্রকাশনী, বাংলাবাজার ঢাকা-১১০০, প্রথম প্রকাশ, ডিসেম্বর ২০০৪
৩.     আবুল আলা : সীরাতে সরওয়ারে আলম ২য় খ-, (তরযমা: আব্বাস আলী খান),
৪.     মেজর আবদুল হামিদ: ককেশাসের মহানায়ক ইমাম শামিল (তরযমা- শাহেদ আলী), বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ সোসাইটি, মতিঝিল ঢাকা-১০০০, ফেব্রুয়ারি ২০০০
৫.     ড. মুহাম্মাদ সিদ্দিক: ক্রুসেডের গণহত্যা অতীত বর্তমান, ঢাকা পাবলিকেশন্স, বইমেলা ২০১৩
৬.     হিউয়েন সাঙ ভ্রমণ কাহিনীঃ তরযমা-খুররম হোসাইন, শব্দগুচ্ছ, ঢাকা, বইমেলা ২০০৩
৭.     শ্রী দীনেশচন্দ্র সেন: প্রাচীন বাঙ্গলা সাহিত্যে মুসলমানের অবদান, পলাশ প্রকাশনী, ১০ কবি জসিমউদদীন রোড, ঢাকা ১২১৭, প্রথম পলাশ প্রকাশনী সংস্করণ, ফেব্রুয়ারি ২০০২ইং
৮.     আবদুল মওদুদ: মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশঃ সংস্কৃতির রূপান্তর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, পঞ্চম মুদ্রণ, এপ্রিল ২০১৫
৯.     মোহাম্মদ সাজিদ করিম: ভারতে মুসলিম নিধনের চেপে রাখা অধ্যায়, মূলধারা বাংলাদেশ (ব্লগ), সংগ্রহের তারিখ-১৪.০২.২০১৭
১০.     নূরুর রহমান, হায়দারাবাদ পতন : এক গোপন সত্যের সন্ধানে, ১০ অক্টোবর ২০১৩, সাম্প্রতিক দেশকাল, ১০/১২  ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭
১১.     আবুল মনসুর আহমেদ: আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, খোশরোজ কিতাব মহল, ১৫ বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০, পুনর্মুদ্রণ সেপ্টেম্বর ২০১৩
১২.    বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, সাময়িকী, ব্লগ,  ইন্টারনেট ওয়েবসাইট, অনলাইন খবরের কাগজ ইত্যাদি।
১৩.     সুরজিৎ দাশগুপ্ত: ভারতবর্ষ ও ইসলামী, সাহিত্য প্রকাশ, প্রথম বাংলাদেশ মুদ্রণ, ফেব্রুয়ারি ২০১৪
১৪.     এইচ.এ.এল.ফিসার: ইউরোপের ইতিহাস [১৫০০-১৮০০] (তরযমা- আরশাদ আজিজ), বাংলা একাডেমি ঢাকা, প্রথম প্রকাশ জে ২০০৮,
১৫.     বৃহত্তর বাকরগঞ্জের ইতিহাস, সংগ্রহ ও সম্পাদনায়: তপংকর চন্দ্রবর্তী ও সিকদার আবুল বাশার, আনন্দধারা, প্রথম প্রকাশ, ১লা জানুয়ারি ২০০৪, বাংলাবাজার  ঢাকা ১১০০
১৬.     মাসিক প্রেরণা, মার্চ ২০১৭, পুরানা পল্টন ঢাকা
১৭.     সিরাজ উদদীন আহমদ: বরিশাল বিভাগের ইতিহাস প্রথম খ-, ভাস্কর প্রকাশনী, বরিশাল-ঢাকা, দ্বিতীয় সংস্করণ জুলাই ২০০৩
১৮.     সুখময় মুখোপাধ্যায়: বাংলার ইতিহাস ১২০৪-১৫৭৬, খান ব্রাদার্স এ্যান্ড কোম্পানি, ৬৭ প্যারীদাস রোড ঢাকা-১১০০, এপ্রিল ২০০০
১৯.     শাহাদত হোসেন খান: বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ, পার্ল পাবলিকেশন্স, ৩৮/২ বাংলাবাজার ঢাকা ১১০০, প্রথম প্রকাশ: একুশে বইমেলা ২০১০
২০.     রেবতী বর্মণ: সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশ, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, প্যারিদাস রোড, বাংলাবাজার ঢাকা ১১০০, সেপ্টেম্বর ২০০৮
২১.     মুহাম্মদ ইনাম-উল-হক: ভারতের মুসলমান ও স্বাধীনতা আন্দোলন, বাংলা একাডেমি ঢাকা, তৃতীয় পুনর্মুদ্রণ: জুন ২০০৯
২২.     ড. নিজামউদ্দিন আহমেদ: পৃথিবীর আদিম সমাজ, বাংলা একাডেমি ঢাকা, জুন ১৯৮২
২৩.     প্রফেসর ড. ওয়াজেদ আলী: ইংল্যান্ডের ইতিহাস ১৪৮৫ থেকে ১৯১৪ সাল পর্যন্ত, অধুনা প্রকাশন, ৩৮/২-ক বাংলাবাজার ঢাকা ১১০০, প্রথম প্রকাশ, এপ্রিল ২০০৪
বরগুনা সদর, বরগুনা

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ