ঢাকা, শনিবার 6 January 2018, ২৩ পৌষ ১৪২৪, ১৮ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নৈতিকতাবর্জিত শিক্ষাব্যবস্থা জঙ্গিবাদের উত্থান এবং জাতীয় বিপর্যয়ের সহায়ক

খোন্দকার জিল্লুর রহমান : দুর্বল অবকাঠামোর ওপর জোড়াতালি এবং ক্ষণস্থায়ী সংস্কার করে কোনো স্থাপনা টিকিয়ে রাখা যায় না। এক সময় সর্বস্ব নিয়ে ভেঙে পড়ে আর শক্ত অবকাঠামোর ওপর সঠিকভাবে স্থাপনা গড়ে তুললে তা হাজার বছরেও নষ্ট হয় না। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সুশীলসমাজ থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন মহল থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আবার এদের অনেকেই মনে করছে, বর্তমানে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ত্রিমাত্রিক ধারা (পুরনো ধারার বই, এরপর নতুন বই পরিবর্তন এবং পরে সৃজনশীল শিক্ষাব্যবস্থা) প্রবর্তন, বর্তমান শিক্ষায় নৈতিকতাবর্জিত শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে ছাত্রসমাজে দিন দিন সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, সমন্বয়হীনতা, ছাত্র-শিক্ষক ভেদাভেদ নষ্ট হওয়া, শিক্ষকের মর্যাদাহানি করা, খুন, গুম ও অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়া ইত্যাদি মিলিয়ে শিক্ষা অবকাঠামো ভেঙে পড়ার উপক্রম। গুলশান, শোলাকিয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি হামলার পর তদন্ত প্রতিবেদনে শিক্ষার্থীদের জড়িয়ে পড়ার প্রমাণ, আবার স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিষাদগ্রস্ততা, শিক্ষার্থীদের দিয়ে মানবতাবিরোধী কাজ করানো, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একযোগে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়া, অযোগ্য ব্যক্তিদের যোগ্যতার আসনে বসানো, পারিবারিক শিক্ষা হতে সন্তানদের দূরে রাখা, মাতাপিতার সন্তানের প্রতি অনাদর, অযতœ-অবহেলা, সামাজিক শিক্ষা থেকে ছেলেমেয়েদের দূরে রাখা, স্বামী-স্ত্রী, মাতাপিতার ব্যতিক্রম চলাফেরা, লোভ-লালসা, কাঁচা পয়সা উপার্জন ও এর প্রভাব আবার কখনো কখনো ইসলামের অপব্যাখ্যা করে শিক্ষার্থীদের ভিন্নপথে প্ররোচিত করা। এক কথায় বলতে গেলে বর্তমান সৃজনশীল নৈতিকতাবর্জিত শিক্ষাই এর জন্য দায়ী বলে সুশীলসমাজের অনেকে মনে করেন।
গত এক দশক ধরে দেশের ছাত্রসমাজের যে পরিবর্তন, তা লক্ষ করার মতো। একদিকে সৃজনশীল শিক্ষা, তারপর আকাশ সংস্কৃতি, মোবাইল ও স্মার্টফোনের ব্যবহার, ইন্টারনেট আসক্তি, পাসের হার বাড়ার সাথে সাথে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির সুযোগবঞ্চিত হওয়া, মানসম্মত শিক্ষা না থাকা, নি¤œমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আগাছার মতো গড়ে ওঠা, উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মানসম্মত শিক্ষা না দিয়ে ছাত্র নামধারী বহিরাগতদের দ্বারা বিভিন্ন সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটানো, ছাত্রছাত্রীদের দলীয়করণ করা, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ছুতা ধরে নিজেদের মধ্যে মারামারি ও খুনখারাবির মতো কাজ করাসহ পুরো জাতি ও দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে অন্ধকারে নিমজ্জিত করে ফেলা হয়েছে।
প্রথমত, একটি জাতি পরিচিত হয় তার শিক্ষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও সভ্যতার মানদ-ে। আর প্রথমটিতেই (শিক্ষা খাত) দেশের যে অবস্থা, গত ক’দিনের পত্রপত্রিকা, মিডিয়া ইত্যাদিতে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে যে দুর্নীতির চিত্র ফুটে উঠেছে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না। দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানের উক্তিই তা প্রমাণ করে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। কারণ, দুর্নীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে। এ অবস্থা থেকে জাতিকে বাঁচাতে হলে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়নরত ৮৫ লাখ ছাত্রছাত্রীকে টার্গেট করে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। শিক্ষার কৌশলগত দিক পরিবর্তন করে কর্মপরিকল্পনা করার মত প্রকাশ করেন তিনি। শিক্ষা প্রসঙ্গ এলেই অবকাঠামো, শ্রেণিকক্ষ, ভবন, শিক্ষা উপকরণ এসব নিয়ে আলোচনা হয়। আসলে আমাদের শিক্ষকগণ শ্রেণিকক্ষে ছাত্রছাত্রীদের কী পড়াচ্ছেন বা কী শিক্ষা দিচ্ছেন তা নিয়ে আলোচনা হয় না। শুধু জিপিএ-৫ পাওয়ার আশায় অনেকে বলেন, আমরা আলোকিত মানুষ সৃষ্টি না করে পুলকিত মানুষ সৃষ্টি করেছি। তাই শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
সন্ত্রাস নয় শান্তি চাই, শঙ্কামুক্ত জীবন চাই, এ স্লোগানকে সামনে রেখে গত পহেলা আগস্ট জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ বিরোধী মানববন্ধন করেছে সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর লাখ লাখ শিক্ষার্থী। ক্লাস ছেড়ে রাস্তায় এনে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায় তারা। জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস রুখে দেয়ার প্রত্যয় নিয়ে হাতে হাত ধরে মানববন্ধনে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অংশ নেয় শিক্ষক কর্মকর্তা, কর্মচারীরাও। আবার পোপ ফ্রান্সিস বলেছেন, ইসলাম নয়, বরং বৈষয়িক অর্থনীতির বৈষম্যই সন্ত্রাসবাদকে অনুপ্রাণিত করে। তিনি আরও বলেন, সহিংসতার সাথে ইসলামকে চিহ্নিত করা ঠিক নয়।
সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে তরুণ প্রজন্মকে আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান শিক্ষাশন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মানববন্ধন থেকে এ আহ্বান জানান তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ঘোষণা অনুযায়ী গুলশান হামলার এক মাস পূর্তিতে বেলা ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত সারাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। আর এ মানববন্ধনে দেখা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি), জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, ইউজিসির চেয়ারম্যানসহ বহু দায়িত্বশীল, শিক্ষাবিদদের। আর এসব দেখে হতবাক দেশের ১৬ কোটি মানুষ। আবার অনেক কৃষিজীবী, কর্মজীবী, সাধারণ মানুষকে বলতে শোনা যায়, গত কয়েক বছর আগে শিশু ও কোমলমতি শিক্ষার্থীদের দিয়ে কোন মানববন্ধন, বা কোন রাজনৈতিক কর্মসূচি করানো যাবে না বলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী এবং অন্যান্য দায়িত্বশীল লোকের বক্তব্য আজ কোথায় এবং এই মানববন্ধন কি সন্ত্রাস ও জঙ্গি হামলা বন্ধ করে দিতে পারবে?
এটা যেন হবুচন্দ্র রাজা ও গবুচন্দ্র মন্ত্রীর দেশ। হবুচন্দ্র রাজা ও গবুচন্দ্র মন্ত্রীর কবিতা হরতে বর্তমান জেনারেশন জানেই না, সে হবুচন্দ্র রাজার দেশে প্রতিদিন গবুচন্দ্র মন্ত্রীকে একজন কান্না করা লোককে সুলে চড়াতে হবে। মন্ত্রী এক পর্যায়ে কোন কান্না করা লোক না পেয়ে রাজার নিকট উপস্থিত হন। আর রাজা আইনকাুন প্রণয়ন করতে গিয়ে নিজেই কেঁদে ফেলেন।
কবিতার কয়টি লাইন এ রকম:
‘হবুচন্দ্র রাজা বলেন গবুচন্দ্রে ডেকে
আইন জারি করে দিও রাজ্যতে আজ থেকে
কাঁদতে কেহ পারবে না আর যতই মরুক শোকে
হাসবে আমার যতেক প্রজা, হাসবে যত লোকে।’
এই বলিয়া হবু রাজা কেঁদে ফেলেন জোরে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ