ঢাকা, শনিবার 6 January 2018, ২৩ পৌষ ১৪২৪, ১৮ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মাদরাসা শিক্ষা এবং শিক্ষার্থীদের বৈষম্য

মোহাম্মদ ইমাদ উদ্দীন : একজন আদর্শ মানুষ ও দক্ষ সুনাগরিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে হলে পড়াশোনার কোন বিকল্প নেই। আর পড়াশোনা ছাড়া যেহেতু জ্ঞানার্জন করা কঠিন তাই ইসলাম ধর্মে জ্ঞানার্জনের ওপর ব্যাপক জোর দেয়া হয়েছে।
পড়াশোনার ওপর গুরুত্ব দেয়ার কারণেই নবী করীম (সা.) এর প্রতি মহান আল্লাহম প্রথম যে ওহিটি নাজিল করেছেন, তা শুরু হয়েছে ‘ইক্‌রা’ শব্দটি দিয়ে। রাসূলাল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর উপর ফরজ। তিনি আরো ইরশাদ করেছেন, ‘দোলনা থেকে শুরু করে কবরে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত মানুষকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে।” হাদীস শরীফে এসেছে, “বিদ্বানের কলমের কালি, শহীদের রক্তের চাইতেও পবিত্র।’ জ্ঞানার্জন এক প্রকার ইবাদতের শামিল। জ্ঞানী ব্যক্তিদের মর্যাদার কথা উল্লেখ করে আল-কুরআনে ইরশাদ হয়েছে : বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না; তারা কি সমান হতে পারে? চিন্তা-ভাবনা কেবল তারাই করে যারা জ্ঞানবান। (সূরা যুমার-৯)।
জ্ঞানার্জন লাভ করার জন্য শিক্ষার বিকল্প নেই। আর মাদরাসা শিক্ষাই হচ্ছে সর্বোৎকৃষ্ট শিক্ষা ব্যাবস্থা। কারণ এ শিক্ষা ব্যবস্থায় ইহকালীন ও পরকালীন শিক্ষার অপূর্ব সমন্বয় সাধন হয়েছে। মাদরাসা কারিকুলামে আল কুরআন ও আল হাদীস সহ ইসলামী শরীয়া সংক্রান্ত, বাংলা, ইংরেজি, গণিতসহ বাস্তব জীবনের সাথে জড়িত বিভিন্ন বিষয় পাঠ্যভুক্ত। মাদরাসাগুলো সৎ, যোগ্য, দক্ষ, দেশপ্রেমিক ও নৈতিকগুণ সম্পন্ন নাগরিক গড়ে উঠার কারখানা। তাছাড়া প্রতি মুহূর্তে মাদরাসায় নৈতিক শিক্ষা ও ইসলামী মূল্যবোধ সম্পর্কে শিক্ষা দেয়। আজ পর্যন্ত মাদরাসায় পড়াবস্থায় কোন ছাত্র তেমন কোন বড় অপরাধ করেনি। এমন কি সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী জনাব নুরুল ইসলাম নাহিদ সাহেব অকপটে স্বীকার করেছেন “মাদরাসার ছাত্রদেরকে কালভার্ট নির্মাণসহ অন্যান্য কাজে দায়িত্ব দিলে তারা কোন দুর্নীতি করবে না”।
বাংলাদেশের সংবিধানে শিক্ষাকে সকলের জন্য সমান মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও বাস্তবে তা কি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে? স্বাধীন বাংলাদেশের পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত মাদরাসা শিক্ষা ও মাদরাসা শিক্ষার্থীদের বৈষম্য চোখে পড়ার মত। যদিও সেটা অনেকটা কমে এসেছে।
মাদরাসায় শিক্ষক সংকট যা একটি অন্যতম বড় বৈষম্য। মাদরাসায় একজন শিক্ষককে বিভিন্ন সাবজেক্ট পড়াতে হয় কিন্তু স্কুল- কলেজের জন্য প্রতি সাবজেক্টের জন্য একজন করে শিক্ষক বরাদ্দ। এমনকি পূর্বে মাদরাসা ছাত্রদের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি, বাংলা, অর্থনীতি, রাষ্টবিজ্ঞানসহ সকল সাবজেক্টে ভর্তি হওয়ার সুযোগ থাকলেও দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতৃপক্ষ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক উভয় পরীক্ষায় বাংলা ২০০ ইংরেজী ২০০ নম্বরের শর্তারোপের মাধ্যমে প্রধান নয়টি বিভাগে মাদরাসা ছাত্রদের ভর্তি না করার বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেছিল। প্রতি বছর ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থানসহ টপ ২০ জনের মধ্যে প্রায় ০৯/১০ জন থাকার পরও ভালো সাবজেক্টে ভর্তি হওয়ার সুযোগ দেয়নি এই রকম নজির অনেক। অথচ সরকারি অধ্যাদেশের মাধ্যমে দাখিল ও আলিম কে যথাক্রমে এসএসসি ও এইচএসসি সমামান দেয়া হয়েছিল। দীর্ঘ ২০/২৫ বছর মাদরাসা ছাত্ররা উপরোক্ত নয়টি বিষয়সহ বিভিন্ন বিষয়ে ভর্তি হয়ে মেধার স্বাক্ষর রেখেছে।
২০১৫ সাল হতে মাদরাসা বোর্ড শিক্ষার্থীদের জন্য দাখিল ও আলিম পরীক্ষায় ২০০ নম্বরের ইংরেজি ও বাংলা সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করে। ফলে ঢাবির এসব বিভাগে ভর্তির ক্ষেত্রে মাদরাসা শিক্ষার্থীদের ভর্তিতে আর কোনো বাধা থাকার কথা নয়। তবে চলতি বছর মাদরাসা শিক্ষার্থীদের সেই শর্ত পূরণ হয়েছে। অভিযোগ আছে, তা সত্ত্বেও ঢাবির ‘খ’ ইউনিটভুক্ত কলা অনুষদের ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ মাদরাসা শিক্ষার্থীদের চয়েস ফরমে অনেকগুলো বিভাগ আসছে না।
মাদরাসা শিক্ষার জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন ২০১৩ সালে বর্তমান সরকার উচ্চতর মাদরাসা শিক্ষার উন্নয়নে ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে। অবশ্য ২০০৬ সাল থেকে মাদরাসা শিক্ষার্থীরা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া হতে ফাযিল ও কামিল সার্টিফিকেটে বিএ ও মাস্টার্সের মান পেয়েছে। উল্লেখ্য, মান দেয়ার আগে যারা কামিল শ্রেণীতে অধ্যয়ন করেছিল তাদেরকে একাধারে তাফসীর, হাদীস ও ফিকাহ সহ বিভিন্ন বিষয় পড়তে হয়েছে। যার ফলে বড় আলেম তৈরী হওয়ার সম্ভাবনা থাকতো।
কিন্তু মান দেয়ার পর তাদের এত কিছু পড়তে হচ্ছে না। সিলেবাস সংক্ষিপ্ত করার কারণে তুলনামূলক তেমন কোন আলেম তৈরী হচ্ছে না।
এত কিছুর পর প্রশ্ন থেকে যায়, মাদরাসায় পড়াশোনার মান বৃদ্ধি পেয়েছে কি? ফাযিল কামিলকে মান দেয়ার পরও বিসিএসসহ বিভিন্ন সরকারি চাকরিতে অংশগ্রহণ করার কেন সুযোগ নেই? আশা করি এই ব্যাপারে সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ