ঢাকা, রোববার 7 January 2018, ২৪ পৌষ ১৪২৪, ১৯ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ভ্রমণ পিয়াসীদের জন্য তুলনাহীন গঙ্গামতি 

এইচ,এম,হুমায়ুন কবির কলাপাড়া (পটুয়াখালী) : পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ধুলাসার ইউনিয়নে গঙ্গামতি নিঃসন্দেহে একটি সুন্দর নাম। বিশেষ করে সাহিত্যপ্রেমী ও ভ্রমণপ্রিয়াসীদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করবে নামটি। আর এ সুন্দর নামটিকে আরও সুন্দর করেছে এখানাকার অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্য। গঙ্গামতি চর কুয়াকাঁ সমুদ্র সৈকত থেকে ১০ কিলোমিটার পূর্বদিকে অবস্থিত। প্রকৃতি নিপুণ হাতে নিখুঁত ভাবে সাঁজিয়েছে এ চরটি। বিশাল আয়তনের সবুজ বেষ্টনির মাঝখান দিয়ে সমুদ্র মিলিত লেকটি বলা যায় গঙ্গামতির অংলকার। লেকের জোয়ার ভাটার গ্রোতে চলা মাছ ধরা ট্রলারগুলো ভ্রমন পিপাসু পর্যটকদের কাছে যেন প্রোমদতরী। ট্রলারে না উঠেও তীরে বসে ঢেউয়ের সাথে মনে প্রাণে দোল খায় ভ্রমণপ্রিয়াসীরা।

কুয়াকাঁটায় আগত ভ্রমণ পিপাসু পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান। চরজুড়ে প্রাণজুড়ানো মনোরম প্রাকৃতিক নৈসর্গিক সৌন্দর্য পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। এখানে রয়েছে স্বচ্ছ নীল জলরাশির একাধিক লেক আর প্রাকৃতির কারুকাজ খচিত বিশাল বেলাভূমি। প্রকৃতির নিপুণ হাতে গড়া গঙ্গামতির চরের লেক ধরে আগত পর্যটকরা স্পিডবোট, ট্রলার অথবা নৌকা নিয়ে ঘুরে দেখার সুযোগ রয়েছে।

খুব সকালে গঙ্গামতি সৈকতে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের বুকচিরে সূর্যোদয় দেখার স্বপ্নিল অনুভূতি এনে দেয় এক স্বর্গীয় আবেশ। সূর্য লাল আলো ছড়িয়ে দেয় গঙ্গামতির বেলাভূমিতে। সৈকতজুড়ে লাল কাঁকড়ার ছোটাছুটি উচ্ছল করে তোলে অন্তর। ক্ষুদ্র কাঁকড়ার নিপুণ হাতে আঁকা নিখুঁত আল্পনা দর্শনার্থীদের নিয়ে যায় পল্লী কবি জসিম উদ্দিনের নকশিকাঁথার মাঠে। গাছে গাছে বানরের লাফালাফি, শেয়ালের  সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গহীন থেকে বের হয়ে সমুদ্রে মিলিত গঙ্গামতির লেক–সাগরকন্যা ডাকাডাকি আর লুকোচুরি, শুকুরের দূরহ দন্ত দিয়ে মৃত্তিকাগর্ভের কচু ধরে ভোজনের দৃশ্য দেখা তো সৌভাগ্যের ব্যাপার। বন মোরগের দুরন্তপনা নন্দিত করেছে গঙ্গমতি। কেওড়া, ছইলা, গেওয়া, বাইনসহ কয়েক’শ প্রজাতির বৃক্ষরাজি চিরসবুজের বিপ্লব ঘটিয়েছে এ চরে। গাছে গাছে পাখির কলরবে মুখোরিত থাকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল। গহীন বনের ভিতর থেকে ছোট ছোট  খালগুলো লেকের সাথে মিলিত হয়েছে বিভিন্ন স্থানে। জোয়ারের পানি বাগার বৃক্ষরাজির মূল ভিজিয়ে দেয়। ভাটার গ্রোতের টানে বনের শুকনো পাতা ও গাছ থেকে জড়ে পড়া ফুলগুলো পাড়ি জমায় অজানা ঠিকানায়। ফলে ভাটায় সময় লেকটি আরও সুন্দর লাগে।

সমুদ্র কন্যা কুয়কাটায় এসে গঙ্গামতি না গেলে পর্যটকদের ভ্রমণ অপূর্ণ থেকে যায়। কুয়াকাটা জিরোপয়েন্ট থেকে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলে যেতে হয় গঙ্গামতির চরে। সমুদ্রে ভাটার সময় মাইক্রোবাস নিয়েও যায় অনেকে। গঙ্গামতি গেলে অবশ্য সঙ্গে হালকা খাবার ও পানি থাকলে ভাল হয়। কারণ ওখানে গেলে অল্পতে ফিরতে মন চায় না কারো। মোটরসাইকেলে ভ্রমনে আসা রিয়াজ উদ্দিন ও নিসাত সুলতানা মারিয়া দম্পত্তির সাথে কথা হয়েছে। তারা ঢাকার মিরপুর থেকে কুয়াকাঁটা বেড়াতে এসেছিলেন।  মোটরসাইকেল চালকদের মুখে গঙ্গামতির মনোরম দৃশ্যের কথা শুনে যেতে বাধ্য হলেন। তারা জানালেন, গঙ্গামতি এত সৌন্দর্যমন্ডিত একটি স্থান চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন হত। তারা প্রাকৃতির মনোরম দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। পাশাপাশি সরকার তথা পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অবহেলা ও পরিকল্পনার অভাবে অবহেলিত থাকায় কিছুটা হতাশার সুরে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ধোলাই মার্কেট হয়ে গঙ্গামতির চরে প্রবেশ পথের জোয়ার ভাটার সবুজে ঘেরা লেক সাগরকন্যা বিনিয়োগকারীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, শুধুমাত্র সরকারি নীতি নির্ধারকদের পরিকল্পনার অভাবে সম্ভাবনা অনুযায়ী এ খাতের বিকাশ আজও ঘটেনি। কবে নাগাদ এ সম্ভাবনা কর্তৃপক্ষের নজরে আসবে তা কেউ জানে না। এরপরেও সেখানকার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে সমৃদ্ধ পর্যটন শিল্প গড়ে তুলতে আগ্রহী কিছু সংখ্যক হাউজিং কোম্পানী শত শত একর জমি ক্রয় করেছেন। আর এর পিছনে কাজ করেছে গঙ্গামতি থেকে কাউয়ারচর পর্যন্ত বিশাল বেলা ভূমি। উপকূলীয় এ অঞ্চলে সাগর ভাঙ্গন বা বালু ক্ষয়ের আশংকা খুবই কম। ক্রমশেই ওই এলাকার মানচিত্র বড় হচ্ছে। ওই এলাকার বসবাসকারীরা স্বপ্ন দেখতে শুরু করছে। এক কথায় প্রায় ১০-১২ কিঃমিঃ দৈর্ঘ্য সৈকত এবং সবুজ বেষ্টনীতে ঘেরা গঙ্গামতি চরটি আগত দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করছে।

গঙ্গামতি প্রকৃতির অপরূপ সাজে সজ্জিত হচ্ছে। গোটা গঙ্গামতি এলাকা একটি ছবির মত জনপদ। সরকারের একটু সুনজর আসলেই সেখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ব্যাপক কদর বাড়বে। সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত দেখার জন্য ছোটা ছুটি করতে হবে না। বর্তমানে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও সরকারের গুরুত্ব প্রদানের অভাবে অপার সম্ভাবনার এ খাত জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারছে না। এই বিশাল এলাকায় পর্যটকদের দেখার মতো অনেক গুলো স্পট রয়েছে। এরমধ্যে দোলাই মার্কেট, ঝাউ বাগান, বাস্তব হারাদের নীড়, গঙ্গামতির বনভূমি, কড়াইবন ডুবোচর উল্লেখযোগ্য।

স্থানীয় জেলে করিম জানান, প্রতিদিন এখানে  মোটরসাইকেলে দর্শনার্থীরা ভ্রমণে আসছে। তাদের সাথে পর্যটকরা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলছেন। তার ভাষায় সরকারের সুদৃষ্টি থাকলে এখানেও প্রচুর পর্যটক আসবে এবং তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে।

গঙ্গামতির একটু সামনে রয়েছে বিশাল বড় একটি ডুবোচর। ভাটা হলেই নানা প্রজাতির দেশি ও অতিথি পাখি খেলা করে। তাছাড়া হাজারো জেলে সমুদ্রে মাছ শিকার করছে। চকচকে বালুর বেলাভূমির মাঝে মাঝে লবনাক্ত পানির লেক দেখতে খুবই ভাল লাগে। ওই অখ্যাত এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে পারলে দিন আর দিন জোৎনার আলোর মতো সৌন্দর্য ফুটে উঠবে। যোগাযোগ ও বিদ্যুতের উন্নয়ন করে ব্যাপক প্রচারণা করতে পারলে কুয়াকাটার পাশাপাশি আর একটি বিশ্ব বিখ্যাত সমুদ্র সৈকত তথা পর্যটন কেন্দ্র গড়ে ওঠার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। পর্যটন শিল্প নিয়ে কাজ করছেন এমন একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, এত বড় বিস্তীর্ণ এলাকা থাকা সত্ত্বেও পর্যটন শিল্প বিকাশের দায়িত্বে থাকা সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন উদ্যোগ নিচ্ছে না কেন? তাই সরকারের স্থানীয় দায়িত্বশীলদের উচিত জরুরী এ খাতে আগ্রহ দেখিয়ে পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা অনুযায়ী বিকশিত করা। ফলে সরকার প্রতি বছর উপকূলীয় এলাকা হতে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব পাবে এবং ওই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের ভাগ্যের উন্নতি হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ