ঢাকা, রোববার 7 January 2018, ২৪ পৌষ ১৪২৪, ১৯ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আল কুরআনের শ্রেষ্ঠত্ব

ইঞ্জিনিয়ার ফিরোজ আহমাদ : মহান আল্লাহ এক ও একক। আল্লাহ হলেন সর্বশ্রেষ্ঠ একক প্রভু। কুরআন হল সেই মহান আল্লাহ পাকের মহান বাণী। আল-কুরআন হল ইসলামী জীবন ব্যবস্থার প্রধান উৎস। একমাত্র আল কুরআনই নির্ভুল কিতাব। মানুষের একমাত্র হেদায়েত গ্রন্থ হল আল কুরআন। এই কুরআন লাওহে মাহফুজে সংরক্ষিত আছে।  আল্লাহ বলেন - যদি আমি এই পাক কুরআনকে পাহাড়ের উপর নাজিল করতাম তবে আপনি (মুহাম্মদ সা:) অবশ্যই ঐ পাহাড়কে আল্লাহর ভয়ে ভীত ও বিগলিত অবস্থায় দেখতে পেতেন। (সূরা হাশর)
আল কুরআন বিশ্ব মানবতার মুক্তি সনদ। আল্লাহর মহা নিয়ামত আর জ্ঞানের মূল উৎস হল আল কুরআন। কুরআন হল সর্বশ্রেষ্ঠ মু’জিজা।
কুরআনের কোন একটি আয়াতও কেউ বানাতে পারবেনা, পারেনি কোন দিন। এই কুরআন বিশ্বব্যাপী সর্বাধিক সংখ্যায় সংরক্ষিত ও পঠিত। বিশ্বব্যাপী এই কুরআনের হাফেজই সর্বাধিক। একমাত্র এই কুরআন পাঠ করেই নামায আদায় করতে হয়। এই কুরআন যার পক্ষে সাক্ষী দিবে সে ই জান্নাতে যেতে পারবে। সেই কুরআনের শ্রেষ্ঠত্ব অনেক। নিম্নে মাত্র কয়েকটি মূল্যবান বিষয় উল্লেখ করে আল কুরআনের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
কুরআন কি ? : কুরআন আরবী শব্দ। ইহার অর্থ-পাঠ, পঠন করা, আবৃত্তি, এখনই পড়, পড়া বা বুঝার মত একটি মূল্যবান গ্রন্থ।
আল কুরআন একমাত্র পবিত্র ধর্ম গ্রন্থ। কুরআনের নামকরণ করেছেন মহান আল্লাহ তায়ালা। আল কুরআনের হেফাজতের দায়িত্ব নিয়েছেন মহান আল্লাহ।
আল কুরআনের হেফাজতকারী আল্লাহ : সূরা হিজরের ৯নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি এই উপদেশ সম্বলিত কুরআন নাজিল করেছি আর আমিই উহার হেফাজতকারী”।
সূরা ত্বহা ১১৩নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, “এভাবেই আমি কুরআনকে আরবী ভাষায় নাযিল করেছি এবং তাতে (মানুষের পরিনাম সম্পর্কে) সাবধানতা সংক্রান্ত কথাগুলো সবিস্তারে বর্ণনা করেছি যেন তারা গোমরাহী থেকে বেঁচে থাকতে পারে বা তাদের মনে তা তাদের জন্য কোন চিন্তা ভাবনার সৃষ্টি করতে পারে।
ফুরকান : কুরআনের আরেক নাম ফুরকান। ফুরকান নামে রয়েছে একটি মূল্যবান সুরা। ফুরকান হলো মহাপবিত্র আল কুরআনের গুনবাচক একটি নাম। ফুরকান অর্থ সত্য মিথ্যার পার্থক্যকারী। সূরা ফুরকানের ১নং আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন “কত মহান তিনি যিনি তার বান্দার উপর (সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী) ফুরকান নাযিল করেছেন, যাতে করে সে সৃষ্টিকুলের জন্য সতর্ককারী হতে পারে।
মুবিন সুস্পষ্ট কিতাব : সূরা শুয়ারার ২নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, “এগুলো হচ্ছে সুস্পষ্ট গ্রন্থের আয়াত”।
যিকর উপদেশমালা : সূরা আম্বিয়ার ৫০নং আয়াতে আল্লাহ পাক ঘোষণা করেন - আর এ হচ্ছে বরকতপূর্ণ উপদেশ। এটি আমিই নাযিল করেছি। তোমরা কি এর অস্বীকারকারী হতে চাও ?
আল কুরআন আল্লাহর নাযিলকৃত শ্রেষ্ঠ কিতাব : সূরা হাক্কায় ৪১-৪৩ আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন, এটা কোন কবির কাব্য কথা নয়, যদিও তোমরা খুব কমই বিশ্বাস করো, এটা কোন গনক বা জ্যোতিষীর কথাও নয়, যদিও তোমরা খুব কমই বিবেচনা করে চলো, মূলত এ কিতাব বিশ্ব জগতের মালিক আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকেই নাযিল করা হয়েছে।
নির্ভুল মহাগ্রন্থ : সূরা বাকারায় ২নং আয়াতে আল্লাহ পাক ঘোষনা করেন, এই সেই কিতাব যাতে কোনই সন্দেহ নেই।
কুরআন লাওহে মাহফুজে সংরক্ষিত : সূরা বুরুজের ২১-২২নং আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন, কুরআন উন্নত ও মর্যাদা সম্পন্ন একটি গ্রন্থ, যা সংরক্ষিত আছে লাওহে মাহফুজে।
এ কুরআন বিজ্ঞানময় : সূরা ইয়াছিনের ২নং আয়াতে আল্লাহর ঘোষনা হল-“বিজ্ঞানময় কুরআনের শপথ”। একই সূরার ৫নং আয়াতে আল্লাহ বলেন এ কুরআন মহা পরাক্রমশালী পরম করুনাময় মহান আল্লাহর থেকে অবতীর্ন।
আল কুরআন নাযিলের মাস রমজান : সূরা বাকারার ১৮৫নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, রমজান মাস যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে। সূরা ক্বদরের ১নং আয়াতে বলা হয়েছে “আমি এ গ্রন্থটি নাযিল করেছি এক মর্যাদাপূর্ণ রাতে।”
সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষার কুরআন : সূরা কামারের ৪০নং আয়াতে আল্লাহ বলেন,“কুরআনকে সহজ করে নাযিল করা হয়েছে। কিন্তু যারা গ্রহণ করতে চায় তারাই এর সঠিক তাৎপর্য বুঝতে পারবে।”
কুরআন বিশ্ববাসীর জন্য উপদেশ : সূরা কালাম এর ৫২নং আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন, এ কুরআন তো সারা জাহানের জন্য একটি উপদেশ।”
পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান ও পরিপূর্ণ হেদায়াত : সূরা বাকারার ১৮৫নং আয়াতে আল্লাহ বলেন,“কুরআন নাযিল করা হয়েছে যা মানুষের জন্য পরিপূর্ণ হেদায়াত। ইহা এমন স্পষ্ট উপদেশপূর্ণ যে, তা সঠিক পথ দেখায় এবং হক ও বাতিলের পার্থক্য সুস্পষ্ট করে তুলে ধরে। সূরা সাফ এর ৯নং আয়াতের ঘোষনা হল। “তিনিই তাঁর রাসুলকে হেদায়াত ও সত্য জীবন  বিধানসহ পাঠিয়েছেন যেন ইহাকে অন্য সব জীবন বিধানের উপর বিজয়ী করেন।”
সত্যের স্মারক : সূরা আরাফের ২নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, “এই কিতাব আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে এর দ্বারা মানুষের সতর্ক করার দিকে তোমার অন্তরে কোন কুন্ঠা সৃষ্টি না হয়। আর এ গ্রন্থই মুমিনের জন্য সত্যের স্মারক।
শিফা ও রহমত : সূরা বনী ইসরাঈলের ৮১-৮২নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, “আর বলে দিন সত্য এসে গেছে, আর মিথ্যা বিলুপ্ত হয়ে গেল। বস্তুত: মিথ্যাতো বিলুপ্তই হয়ে থাকে।” আর আমি এ কুরআন নাযিল করেছি যাতে তা ঈমানদারদের জন্য শিফা ও রহমত হয় আর জালিমদের জন্য অনিষ্টতাই বর্ধিত হয়।”
আল কুরআনের সম্মোহনী শক্তি : এ কুরআনের এমন সম্মোহনী শক্তি যা যে কোন অন্তরকে বিগলিত করবে, যেমন করেছিল উমারকে। ওয়ালীদ বিন মুগীরা কুরআনের সম্মোহনী শক্তিতে বিমোহিত হয়ে তার সাথীদের বলেন, “আমি কুরআন সম্পর্কে কি বলবো ? আল্লাহর কসম। আমি কবিতা ও কাব্যে তোমাদের চেয়ে বেশী ভাল জ্ঞান রাখি। কিন্তু মুহাম্মাদের কাছে যে কুরআন শুনেছি তার সাথে এ গুলোর কোন মিল নেই। আল্লাহর শপথ, তার কাছে যা অবতীর্ন হয় তা অত্যন্ত চমৎকার ও মনোমুগ্ধকর এবং তা প্রাঞ্জল ভাষায় অবতীর্ন। যা তার সামনে আসে তাকে সে ছিন্ন ভিন্ন করে দেয়। এটি বিজয়ী হবার জন্য এসেছে। পরাজিত হতে আসেনি।”
ইনসাফের মানদন্ড : সূরা শুরার ১৭নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, তিনিই আল্লাহ যিনি সত্য জীবন বিধান সহ এ কিতাব ও ইনসাফের মানদন্ডে নাযিল করেছেন।
কুরআন আইনের একমাত্র উৎস : সূরা যায়েদার ৪৮নং আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন, “আল্লাহ তায়ালা যে বিধান নাযিল করেছেন হে নবী তার ভিত্তিতেই আপনি তাদের মধ্যে বিচার ফায়সালা করুন আর এ বিচারের সময় আপনার নিজের কাছে যা সত্য এ বিধান এসেছে তা থেকে সরে গিয়ে তাদের খেয়াল খুশির অনুসরন করবেন না।”
কুরআন নাযিলের উদ্দেশ্য মহান : সূরা সফ এর ৯নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, “তিনিই সেই সত্তা যিনি তাঁর রাসুলকে হেদায়াত ও সত্যদ্বীন দিয়ে পাঠিয়েছেন, যাতে তিনি একে অন্য সব জীবন ব্যবস্থার উপর বিজয়ী করতে পারেন, মুশরিকদের কাছে তা যতই অপছন্দনীয় হোক না কেন ? সূরা হাদীদের ২৫নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, “আমিই আমার রাসুলগণকে স্পষ্ট প্রমাণসহ পাঠিয়েছি এবং তাদের সাথে কিতাব ও মিযান নাযিল করেছি, যেন মানুষ ইনসাফের উপর কায়েম হতে পারে।”
হাদীসের আলোকে আল কুরআনের শ্রেষ্ঠত্ব :
আবুযর (রা:) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট উপস্থিত হয়ে নিবেদন করলাম। হে আল্লাহর রাসুল। আমাকে কিছু উপদেশ দান করুন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি তোমাকে আল্লাহকে ভয় করার জন্যে উপদেশ দিচ্ছি। কেনোনা আল্লাহর ভয় তোমার যাবতীয় কর্মধারাকে সঠিক পথে প্রবাহিত করবে। আমি বললাম আরো কিছু উপদেশ দিন। তিনি বললেন কুরআন তিলওয়াত ও আল্লাহর স্মরণে নিজেকে মশগুল রাখো। তাহলে আল্লাহ তোমাকে আকাশে স্মরণ করবেন। এদুটো জিনিষ তোমাকে পার্থিব জীবনের ঘোর অন্ধকারে আলোক বর্তিকার কাজ দেবে। (মিশকাত)
আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা:) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, পানি লাগলে লোহায় যেমন মরিচা ধরে তেমনি অন্তরেও (পাপের কারণে) মরিচা পড়ে। জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসুল। অন্তরের মরিচা দূর করার উপায় কি ? রাসুল (সা:) বলেন, অধিক হারে মৃত্যুর  কথা স্মরণ ও কুরআন তেলাওয়াত করলে অন্তরের মরিচা বিদুরীত হয়। (মিশকাত)
নাওয়াস ইবনে সাম’যান (রা:) থেকে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা:) কে বলতে শুনেছি, কিয়ামতের দিন কুরআন ও তার অনুসারীগণকে যারা দুনিয়ায় এর উপর আমল করতো, আল্লাহর দরবারে পেশ করা হবে। সূরায়ে বাকারা ও সূরায়ে আলে ইমরান সব  কুরআনের প্রতিনিধি হিসাবে তাদের উপর আমলকারীগণের জন্যে আল্লাহর নিকট সুপারিশ করবে এবং বলবে এরা আপনার রহমত ও মাগফিরাত পাওয়ার যোগ্য। এদের উপর দয়া করেন। এদের অপরাধ ক্ষমা করে দিন। (মুসলিম)
বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত রাসুল (সা:) বলেন, তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তি উত্তম যে নিজে কুরআন শিখে এবং অন্যকে তা শিক্ষা দেয়।
উবাইদাতুল মুলাকী (রা:) থেকে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, হে কুরআন অনুসারীগণ তোমরা কুরআনকে বালিশ বানিওনা। দিবস ও রাতের সময় গুলোতে সঠিকভাবে কুরআন তিলাওয়াত করো। তার প্রচার ও প্রসারে আত্মনিয়োগ করো। তার শব্দ সমূহ সঠিকভাবে উচ্চারন করো। কুরআনে যা বলা হয়েছে তা সঠিকভাবে অনুধাবন করার জন্য গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করো। এরূপ করলে তোমরা (দুনিয়া ও আখেরাতে) সফলতা অর্জন করতে পারবে। কুরআন অধ্যয়নের মাধ্যমে দুনিয়াবী উন্নতির আশা পোষন করো না। কেননা পরকালে এর জন্য মহামূল্যবান পুরস্কার রয়েছে। (মিশকাত)
যে ব্যক্তি কুরআন শরীফ পড়ে এবং তদ্রƒপ আমল করে কিয়ামতের দিন তার পিতা-মাতাকে সূর্য অপেক্ষা উৎকৃষ্ট জ্যোতিষ্মান টুপি পরানো হবে। (আবু দাউদ)
হযরত (সা:) বলেছেন - কুরআন শরীফের সুদক্ষ হাফিজ ও ক্বারী মহা মহা পয়গম্বরগণের সাথে বেহেশতে থাকার স্থান লাভ করবে। যে ব্যক্তি কুরআন শরীফ পাঠ করে এবং উহা (উচ্চারণ করতে) তারপক্ষে কষ্টকর হলেও যদিও যতœ ও চেষ্টা করে সেই ব্যক্তি দ্বিগুন পুণ্য পাবে। (বুখারি ও মুসলিম)
যে ব্যক্তি কুরআন শরীফ পাঠ করত: উহা হেফ্জ করেছে। অত:পর কুরআন শরীফের হালাল সমূহকে হালাল ও হারাম সমূহকে হারাম জেনে আমল করেছে, আল্লাহ তা’লা ঐ ব্যক্তিকে বেহেস্তে স্থান দিবেন এবং ঐ ব্যক্তি আত্মীয় স্বজন থেকে দোজখের উপযুক্ত ১০ জন লোকের জন্য সুপারিশ মঞ্জুর করবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ