ঢাকা, রোববার 7 January 2018, ২৪ পৌষ ১৪২৪, ১৯ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিশ্ব নবী (সা.) এর কৌতুক ও হাস্যরস

মুফতি মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম : বিশ্ব প্রভূ তাঁর প্রিয় হাবীবকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম এবং সর্বগুণে গুণান্বিত করে সৃষ্টি করেছেন। তাঁর শারীরিক গঠন, কথা-বার্তা, কাজ-কর্ম ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সাথে কারো তুলনা নেই। বরং তাঁর তুলনা তিনি নিজেই। আল্লাহ তায়ালা তাঁর গুণাবলী বর্ণনা করে বলেছেন আর অবশ্যই তুমি নীতি নৈতিকতার ও উত্তম চরিত্রের সর্বোচ্চ শিখরে প্রতিষ্ঠিত। তিনি আরো ইরশাদ করেন- অবশ্যই আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্য সর্বোকৃষ্ট আর্দশ। এ হিসেবে মহানবী (সা.) এর সকল কথা-বার্তা ও কাজ-কর্ম মুমিনের জন্য আদর্শ ও অনুকরণীয় বিষয় (Model)। তিনি রূক্ষ ও  কর্কশ মেজাজী ছিলেন না, কখনো অশ্লীল ও মন্দ কথা বলতেন না। রাজা-বাদশাহ ও নেতাদের মত গম্ভীর হয়ে বসে থাকতেন না। বরং হাস্যকর কথায় হাসতেন ও কৌতুক করতেন। কারণ হাস্য-রস ও কৌতুক অন্তরের কুটিলতা ও দুঃশ্চিন্তা  দূরভীত করে দেয়। মহানবী (সা.) এর কৌতুক একটি নেয়ামত এবং উম্মতের জন্য উত্তম পাথেয়। কৌতুক করা শরীয়ত সম্মত এবং বিশ্ব নবী (সা.) এর সুন্নত। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সাহাবায়ে কিরাম মহানবী (সা.) কে রসিকতা করতে দেখে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাদের সাথে হাসি-তামাশার কথা ও বলেন! তিনি বলেন, তবে হ্যাঁ, আমি কোন অসত্য ও প্রকৃত ঘটনা বিপরীত কিছু বলি না (তিরমিযী মিশকাত পৃষ্ঠা নং-৪১৬)। হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ (সা.) খোলামেলা ভাবে আমাদের সাথে মেলামেশা করতেন। এমন কি তিনি আমার ছোট ভাই,যার নাম ছিল উমাইর তার সাথে কৌতুক করে বলেন, হে উমাইর তোমার নুগাইর কোথায়? উমাইয়ের একটি ছোট নুগাইর তথা পাখি ছিল। উমাইয়ের সেই পাখিটি মারা গিয়েছিল। সে এই পাখিটি নিয়ে খেলা করতো (বুখারী ও মুসলিম)। পাখিটির মৃত্যুতে উমাইর চিন্তিত ছিল বলে মহানবী (সা.) এ কথা বলে তার সাথে রসিকতা করেছেন।
মহানবী (সা.) একদা ¯েœহের কন্যা হযরত ফাতেমা (রা.) এর বাড়িতে  গিয়ে জামাতা হযরত আলী (রা.) কে বাড়িতে না দেখে কন্যা কে এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন আমার সাথে বাক-বিতন্ডা করে বাড়ি থেকে বের হয়ে গিয়েছেন। মহানবী (সা.) মসজিদে নববীতে গিয়ে সেখানে দেখেন হযরত আলী (রা.) একটি চাদর গায়ে জড়িয়ে এমনভাবে শুয়ে আছেন যে, তাঁর অর্ধেক দেহ মসজিদে আর অর্ধেক মাটিতে। তখন তিনি কৌতুক করে বলেন, উঠো! হে আবু তোরাব (মাটির পিতা)! এর পর থেকে হযরত আলী (রা.) এর উপনাম হয়ে যায় আবু তোরাব (বুখারী)। মহানবী (সা.) একদা হযরত আবদুর রহমান (রা.) এর বাড়ীতে গিয়ে দেখতে পান যে, তার কোলে বিড়ালের বাচ্চা, তখন তিনি রসিকতা করে বলেন-হে আবু হুরায়রা (বিড়াল ছানার পিতা)! এর পর থেকে হযরত আবদুর রহমান (রা.) এই উপনামে প্রসিদ্ধ লাভ করেন। যাহের ইবনে হারাম (রা.) নামে এক গ্রাম্য সাহাবী রাসূল (স) কে গ্রামের জিনিষ উপহার দিতেন। তিনি ও তাকে শহরের জিনিষ উপহার দিতেন। রাসূল (সা.) উপহাস করে বলতেন, যাহের আমার গ্রাম্য বন্ধু আর আমি তার শহুরে বন্ধু। মহানবী (সা.) তাকে ভালবাসতেন।  যাহের ছিলেন কৃষ্ণকায় ব্যক্তি। একদিন তিনি মদীনায় গ্রামের জিনিষপত্র বিক্রি করতেছিলেন, তখন মহানবী (সা.) পিছন দিক দিয়ে এসে তাঁকে জাপটে ধরেন। যাহের রাসূল (সা.) কে দেখতে না পেয়ে বললেন-তুমি কে? আমাকে ছেড়ে দাও। যাহের চেহারা ফিরিয়ে প্রিয় নবী (সা.) কে দেখতে পেয়ে স¦ীয় দেহকে প্রিয় নবী (সা.) এর দেহ মোবারকের সাথে লাগানোর চেষ্টা করেন। রাসূল (সা.) বলতে লাগলেন, এ গোলামকে কে কিনবে? আমি একে বিক্রয় করবো। যাহের বললেন হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে সস্তায়  বিক্রি করতে হবে। কারণ আমি কাল কুৎসিত। রাসূল (স) বললেন, তুমি সস্তা নও, আল্লাহর কাছে অনেক দামী। তা ছিল রাসূল (সা.) এর রসিকতা। কারণ যাহের গোলাম ছিলেন না (তিরমিযি, মিশকাত পৃষ্ঠা নং-৪১৬) রাসূলুল্লাহ (সা.) হাসতেন তবে তা ছিল মুচকি হাসি। একজন দরিদ্র ও বৃদ্ধ সাহাবী স্বীয় স্ত্রীর সাথে যেহার করেন। যেহার হলো- যাদের কে বিবাহ করা হারাম তাদের কোন পূর্ণ অঙ্গের সাথে স্ত্রীর কোন অঙ্গের তুলনা করা। এরূপ তুলনা করলে কাফফারা প্রদান করতে হয়। সাহাবী যখন যেহার করেছেন বলে দাবী করেছেন, এখন রাসূল (সা.) তাকে বললেন, তুমি একাধারে ষাটটি রোযা রাখ। সাহাবী বললেন আমার রোযা রাখার শক্তি নাই। তখন রাসূল (সা.) বললেন- তাহলে তুমি ষাটজন মিসকীনকে আহার করাও। সাহাবী বললেন আমার এরও সামর্থ নেই। রাসূল (সা.) বললেন, তা হলে একজন গোলাম আযাদ করে দাও। সাহাবী বললেন আমার কাছে গোলাম ক্রয়ের অর্থ নেই। মহানবী (সা.) বললেন, তাহলে একটু অপেক্ষা কর। একটু পরে একজন সাহাবী একটি পাত্র করে খেজুর নিয়ে আসলেন। রাসূল (সা.) তাকে বললেন এ খেজুর গুলো নিয়ে যাও এবং তোমার আশে পাশের দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করে দাও। সাহাবী বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার আশে পাশে আমার চেয়ে দরিদ্র আর কেউ নেই। তখন রাসূল (সা.) হাসেন এবং বলেন তুমি তা খেয়ে ফেলো এবং এটাই তোমার কাফফারা।
হযরত আনাস (রা.) ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.) এর একান্ত খাদেম। তিনি অল্প বয়স থেকে তাঁর খেদমত শুরু করেন। মহানবী (সা.) একদা তাকে একটি কাজের জন্য প্রেরণ করেন, কিন্ত বালক আনাস (রা.) মহানবী (সা.) এর নির্দেশের কথা ভুলে গিয়ে অন্যান্য বালকদের সাথে খেলায় মত্ত হয়ে যান। দীর্ঘ  প্রতিক্ষার পর স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.) আনাস (রা.) খোঁজে বের হন। অত:পর গিয়ে দেখেন বাজারে আনাস (রা.) অন্যান্য ছেলেদের সাথে খেলা করছেন। রাহমাতুল্লিল আলামীন (সা.) হযরত আনাস (রা.) এর দিকে তাকিয়ে কিছু না বলে হাসতে থাকেন। হঠাৎ করে আনাস (রা.) এর নযর রাসূল (সা.) এর দিকে পড়লে তিনি হতবাক হয়ে যান। রাসূল (সা.) জিজ্ঞেস করেন  আনাস তুমি কি কাজটি করেছ? আনাস (রা.) বলেন- যাচ্ছি হে আল্লাহর রাসূল! (মুসলিম, মিশকাত পৃষ্ঠা নং- ৫১৮) হযরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত বিশ্বনবী (সা.) একদিন কোন এক জরুরী কাজে যাচ্ছিলেন, তাঁর গায়ে ছিল নাযরানি চাদর। তখন একজন বেদুইন রাসূল (সা.) কে দেখে তাঁর চাদর ধরে জোরে টান দিয়ে বলল- আমাকে আপনার মাল থেকে দেয়ার নির্দেশ দিন। হাদীস বর্ণনাকারী আনাস (রা.) চাদরের দাগ রাসূল (সা.) এর গলা মোবারকে প্রত্যক্ষ করছিলেন। কিন্তু বিশ্ব নবী কিছু না বলে প্রচন্ড ব্যথা সহ্য করে বেদুইনের দিকে তাকিয়ে হাসতে থাকেন এবং তাকে মাল প্রদানের নির্দেশ দেন। (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত পৃষ্ঠা নং- ৫১৮)
হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন- রাসূলুল্লাহ (সা.) মুচকি হাসি হাসতেন। (বুখারী, মিশকাত- ৫১৯)
হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, বাসূল (সা.) তাঁকে রসিকতা করে বলেছেন হে দু’কান ওয়ালা। তাঁর কর্ণদ¦ার তুলনামূলক বড় ছিল অথবা তিনি কানে অধিক শুনতেন বলে এ উপাধিতে ভূষিত করেন (তিরমিযী)। হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি মহানবী (সা.) এর খেদমতে হাজির হয়ে একটি বাহনের আবেদন করলো। মহানবী (সা.) তাকে বললেন, আমি তোমাকে একটি উষ্ট্র ছানা দেব। লোকটি বললো, হে আল্লাহর রাসূল! উষ্ট্র ছানা দিয়ে আমি কি করবো? আমার তো এমন উটের প্রয়োজন, যার উপরে আমি আরোহন করতে পারি। রাসূল (সা.) বললেন ওহে শোন! প্রত্যেক উটই তো কোন না কোন উষ্টীর ছানা (তিরমিযী)।
হযরত হাসান বসরী (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.)-এর খেদমতে জনৈকা বৃদ্ধা এসে বললো, হে আল্লাহর রাসূল! আমার জন্য দোয়া করুন যেন আল্লাহ আমাকে জান্নাত দান করেন। রাসূলুল্লাহ (স) বললেন, জান্নাতে কোন বৃদ্ধা প্রবেশ করতে পারবে না। মহানবী (সা.) এর কাছে এ কথা শুনে বৃদ্ধা কেঁদে কেঁদে নিরাশ হয়ে ফিরে চললো। মহানবী (সা.) তখন উপস্থিত সাহাবীদের কে বললেন, তাকে বলে দাও, সে বৃদ্ধা অবস্থায় জান্নাতে প্রবেশ করবে না। আল্লাহ তা’য়ালা  সকল জান্নাতী মহিলাকে চিরকুমারী হিসেবে সৃষ্টি করবেন। যেমন আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেন- আমি ঐসব মহিলাকে এক বিশেষ অবয়ব দিয়ে সৃষ্টি করেছি। অর্থাৎ তাদেরকে কুমারী বানিয়েছি। সহবাসের পর পুনরায় তাদের কুমারীত্ব ফিরে আসবে (তিরমিযী)। একদিন জামাই শ্বশুর মানে নবী (সা.) ও আলী (রা.) এক সাথে বসে খেজুর খাচ্ছিলেন। নবী (সা.) খেজুর খেয়ে আটিগুলো আলী (রা.) যেখানে আটি রাখছিলেন সেখানে রাখছেন। একপর্যায়ে রসিকতা করে নবী (সা.) বললেন, আলী তোমার দেখছি খুব খিদে পেয়েছে! তোমার পাশে দেখছো তো অনেক খেজুরের আটি! জামাইও ছাড়ার পাত্র নয়। নবী (সা.)-কে লক্ষ্য করে আলী (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার চেয়ে দেখছি আপনার অনেক বেশি খিদে পেয়েছে! কারণ আমি তো আটি ফেলে দিচ্ছি কিন্তু আপনি তো আটি সমেত খেজুর খেয়ে ফেলছেন। এ কথার পর জামাই শ্বশুর সমস্বরে হো হো করে হেসে উঠলেন।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীসে হাস্যরস করতে নিষেধ করা হয়েছে। ইমাম নববী (র.) উভয় প্রকার হাদীসের মাঝে সামঞ্জস্য বিধান করে বলেন, যে কৌতুক ও হাস্যরস অন্তরে কাঠিন্যতা সৃষ্ঠি করে অথবা আল্লাহর যিকির ও স্মরণ থেকে গাফেল রাখে কিংবা কোন মুসলমানের কষ্টের কারণ হয় বা গাম্ভীর্যতা দূর করে দেয় এরূপ হাস্যরস ও কৌতুক বৈধ নয়। অন্যথায় মনকে প্রফুল্ল করার উদ্দেশ্যে হাস্যরস ও কৌতুক করা শুধু জায়েয নয় বরং মুস্তাহাব।
লেখক : প্রধান ফকীহ্, আল জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদ্রাসা ফেনী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ