ঢাকা, মঙ্গলবার 9 January 2018, ২৬ পৌষ ১৪২৪, ২১ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পুলিশ সপ্তাহে আলোচনার খোরাক ডিআইজি মিজান ॥ সমালোচনার ঝড়

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : পুলিশ সপ্তাহ ২০১৮ শুরুর আগের দিনই কাকতালীয়ভাবে আলোচনায় এলেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম এন্ড অবস) মিজানুর রহমান। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনার খোরাক এখন তিনি। এক নারী ‘তুলে নিয়ে বিয়ে করার’ অভিযোগ তোলার পর মিজানুরকে নিয়ে এই আলোচনার শুরু। গতকাল সোমবার শুরু হওয়া পুলিশ সপ্তাহের মধ্যেও মিজানুরের বিয়ে আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়; যদিও ডিএমপির শীর্ষ পর্যায়ের এই গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাকে রাজারবাগের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেখা যায় নি বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে, ডিআইজি পদমর্যাদার এই পুলিশ কর্মকর্তার দাবি, যে নারী তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন তিনি প্রতারক। এ বিষয়ে জানতে অভিযোগকারী ওই নারীর মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। গতকাল বন্ধ পাওয়া গেছে ডিআইজি মিজানের মুঠোফোনও। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, তার সাথে যোগাযোগের সব মাধ্যমই বন্ধ। গতকাল পুলিশ সপ্তাহর শুরু হয় প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে। এই সপ্তাহ নিয়ে পুলিশ বিভাগে ব্যস্ততার মধ্যেই রোববার গণমাধ্যমে মিজানের বিরুদ্ধে ওই নারীর অভিযোগ আসে।
অতিরিক্ত উপকমিশনার পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা বলেন, “শনিবার রাতেও বলছিলাম, এবার পুলিশ সপ্তাহ শুরু হওয়ার আগে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ সংক্রান্ত কোনো নিউজ নেই, ভালোই হল। “তখন একজন কনস্টেবল বলেছিল, ‘স্যার এখনও ২৪ ঘণ্টা বাকি আছে’। কিন্তু ২৪ ঘণ্টা না যেতেই পরদিন রোববার সকালে দেখি এই খবর।”
মরিয়ম আক্তার ইকো নামের এক নারীকে তুলে নিয়ে বিয়ে করেন ডিআইজি মিজানুর রহমান। আর সেই নারী যখন পুলিশ স্বামীর স্ত্রী পরিচয় দিতে চাইলেন তখনই তাকে ফাঁসানো হলো মামলার জালে। যা রীতিমতো ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’তে পরিণত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে এ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।
এদিকে , স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল সোমবার বিকেলে রাজধানীর নাখালপাড়া হোসেন আলী স্কুলে প্রধান অতিথি হিসেবে শীতবস্ত্র বিতরণ শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘তুলে নিয়ে বিয়ে করার’ অভিযোগে আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্ত চলছে। তার অপরাধ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেয়া হবে ।
পুলিশ কর্মকর্তার এমন বিয়ের খবর প্রকাশ হতেই চারদিকে সমালোচনার ঝড় ওঠে। পুলিশের এমন রূপ সবাইকে ভাবিয়ে তুলছে। রোববার থেকে শুরু করে আজ অবধি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ ঘটনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকে।
যদিও নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগই অস্বীকার করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিআইজি) মিজানুর রহমান। দেশের একটি শীর্ষস্থানীয়  দৈনিককে তিনি বলেন, মরিয়ম আক্তার ইকো একজন প্রতারক। তার মা, নানিও একই রকম। তার সঙ্গে ইকোর মাত্র দুবার দেখা হয়েছে। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইকোর আপলোড করা ছবির জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
ওই নারী একটি দৈনিক সংবাদপত্রকে বলেন, পান্থপথের স্কয়ার হাসপাতালের কাছে তার বাসা। সেখান থেকে কৌশলে গত বছরের জুলাই মাসে তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা মিজান। পরে বেইলি রোডের মিজানের বাসায় নিয়ে তিনদিন আটকে রাখা হয়েছিল তাকে। ওই নারী দাবি করেছেন, আটকে রাখার পর বগুড়া থেকে তার মা’কে ১৭ জুলাই ডেকে আনা হয় এবং ৫০ লাখ টাকা কাবিননামায় মিজানকে বিয়ে করতে বাধ্য করা হয়। পরে লালমাটিয়ার একটি ভাড়া বাড়িতে তাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে রাখেন ইতোপূর্বে বিবাহিত মিজান।
এই নারীর অভিযোগ, কয়েক মাস কোনো সমস্যা না হলেও ফেইসবুকে স্ত্রী পরিচয় দিয়ে একটি ছবি তোলার পর ক্ষিপ্ত হন মিজান। ভাংচুরের ‘মিথ্যা’ একটি মামলা দিয়ে তাকে গত ১২ ডিসেম্বর কারাগারে পাঠানো হয়। সেই মামলায় জামিন পাওয়ার পর মিথ্যা কাবিননামা তৈরির অভিযোগে আরেকটি মামলা করানো হয়। দুটি মামলায় জামিনে বেরিয়ে আসার পর পুলিশ কর্মকর্তা মিজানের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তোলেন ওই নারী।
মগবাজারের কাজী অফিসের কাজী মাওলানা সেলিম রেজা ভুয়া কাবিননামা তৈরির অভিযোগে ওই নারীর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করলে আদালতের নির্দেশে তা রমনা থানা পুলিশ নথিভুক্ত করে। ওই মামলাটির তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন ডিএমপির উপকমিশনার মারুফ হোসেন সরদার।
ডিএমপি সদর দপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রোববার সকালে সংবাদটি প্রকাশের পর অতিরিক্ত কমিশনার মিজানকে বেশ অস্থির মনে হয়েছে। মিজান বলেন, তার বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগ ‘পুরোপুরি মিথ্যা’। “আমার স্ত্রীর সঙ্গে আমার ভালো বোঝাপড়া। আমরা পারিবারিক জীবনে সুখী। আমাকে সমাজে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য স্বামী বানিয়ে মিথ্যা প্রচার চালানো হচ্ছে।”
অভিযোগকারী নারীকে ‘প্রতারক’ আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, ওই নারী ২০১৫ সালে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একটি জিডি করেছিলেন। সেই সূত্রে তার সঙ্গে পরিচয়।
ওই নারীর বিরুদ্ধে রমনা থানায় ভাংচুরের মামলার বিষয়ে মিজান বলেন, গত বছরের ১৬ জুলাই এই নারী বেইলী রোডের তার ভাইয়ের বাসায় জোর করে ঢোকার চেষ্টা করেছিল। তখন থানায় একটি মামলা হয়। অভিযোগপত্র দেয়ার পর এটি এখন বিচারাধীন। ওই নারী কেন ওই বাসায় ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলেননি পুলিশ কর্মকর্তা মিজান। তিনি দাবি করেন, ওই নারী যেসব অভিযোগ করেছিলেন, তা ইতোমধ্যে প্রত্যাহারও করে নিয়েছেন।
তবে মিজানের এই বক্তব্য নিশ্চিত হতে ওই নারীর সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। গতকাল বার কয়েক চেষ্টা করেও তার মুঠোফোন বন্ধ থাকায় কোনো বক্তব্য পাওয়া যায় নি ।
মিজানের এই বিষয়টি নিয়ে বিভাগীয় কোনো তদন্ত হচ্ছে কি না- জানতে চাইলে পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, “পুলিশ সপ্তাহের পরে হয়ত এসব বিষয় নিয়ে কথা উঠতে পারে।”
অপরাধ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল বিকেলে রাজধানীর নাখালপাড়া হোসেন আলী স্কুলে প্রধান অতিথি হিসেবে শীতবস্ত্র বিতরণ শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, যত বড় কর্মকর্তাই হোন না কেন, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। তিনি যদি এমন গর্হিত কাজ করেন তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তুলে নিয়ে বিয়ে করে নির্যাতনের পর মামলা দিয়ে হয়রানির দায়ে অভিযুক্ত ডিআইজি মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে বিয়ে ও নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠন করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী । স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্ত চলছে। তার অপরাধ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ