ঢাকা, মঙ্গলবার 9 January 2018, ২৬ পৌষ ১৪২৪, ২১ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

শর্ত পূরণে ব্যর্থদের নিবন্ধন বাতিল হবে ॥ নতুন আবেদন বাছাই চলছে

মিয়া হোসেন : নির্বাচন কমিশন নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ৭৬টি নতুন রাজনৈতিক দল আবেদন করেছে। এসব আবেদন পত্র যাচাই বাছাই করছে ইসি। আবেদনের তথ্য সরেজমিনে তদন্ত করে শর্ত পূরণকারী দলগুলোকে নিবন্ধন দেবে ইসি। অপরদিকে শর্ত পূরণে ব্যর্থ রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাতিল করারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে নিবন্ধিত সকল রাজনৈতিক দলের তথ্য সংগ্রহ করে তা যাচাই বাছাইয়ের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে ইসি সূত্র জানিয়েছে।
সূত্রমতে, নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন দিতে গত ৩০ অক্টোবর আবেদন আহ্বান করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আবেদনের সময়সীমা ছিল ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এ সময়ের মধ্যে ৭৬টি নতুন রাজনৈতিক দল আবেদন করেছে। তাদের আবেদনগুলো এখন বাছাই করা হচ্ছে। আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে আবেদন যাচাই বাছাই ও সরেজমিনে তদন্ত করে মার্চে নতুন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করবে ইসি।
এদিকে ইসি সূত্র জানিয়েছে, শর্ত পূরণে ব্যর্থ রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন বাতিলের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ লক্ষ্যে দলগুলো থেকে শর্ত পূরণের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছে এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। মধ্য জানুয়ারির পর বিশেষ টিম গঠন করে প্রাপ্ত তথ্য ও দলগুলোর মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম যাচাই শুরু করবে ইসি। তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে শর্ত পূরণে ব্যর্থ দলগুলোর নিবন্ধন বাতিল করা হবে।
একাদশ সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের পাশাপাশি বিদ্যমান দলগুলো নিবন্ধনের শর্ত প্রতিপালন করে কিনা, তা যাচাই করছে ইসি। এ লক্ষ্যে দুই দফায় রাজনৈতিক দলগুলোকে চিঠি দেয়া হয়েছে। আগামী ১৫ জানুয়ারি এই সময়সীমা শেষ হবে বলে জানা গেছে।
ইসি সূত্র জানায়, নিবন্ধিত ৪০টি দলের মধ্যে ১২টি দল ইসির চিঠির কোনও জবাব দেয়নি। তবে, নতুন করে শোকজ করায় এরই মধ্যে কয়েকটি দল তাদের জবাব দিয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, আগামী ১৫ জানুয়ারির সময়সীমা শেষ হওয়ার পর দলগুলোর প্রতিবেদন নিয়ে কমিশন কেন্দ্রীয়ভাবে তদন্ত দল গঠন করে তাদের মাঠ প্রশাসনের সহযোগিতায় দলগুলোর নির্বাচিত কমিটি ও মাঠ অফিসের কার্যক্রমের তথ্য যাচাই করবে। দলগুলোর দেয়া তথ্য ও মাঠের চিত্রের মধ্যে গরমিল পাওয়া গেলে কমিশন ওই দলগুলোর নিবন্ধন বাতিলের কার্যক্রম শুরু করবে। এক্ষেত্রে কারণ দর্শানোসহ যাবতীয় প্রক্রিয়া শেষ করে তাদের নিবন্ধন চূড়ান্তভাবে বাতিল করা হবে।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯০ (এইচ) ধারায় কোন কোন কারণে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাতিল হবে, তা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম রয়েছে ইসিতে চাহিদা মোতাবেক তথ্য না দেয়া ও আরপিও ৯০ (বি) ধারা মতে যেসব শর্তে নিবন্ধন প্রাপ্ত হয়েছে, তা প্রতিপালন না করা।
আরপিও’র শর্তগুলো হলো: দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যেকোনও জাতীয় নির্বাচনের আগ্রহী দলটিতে যদি অন্তত একজন সংসদ সদস্য থাকেন। যে কোনও একটি নির্বাচনে দলের প্রার্থী অংশ নেয়া আসনগুলোয় মোট প্রদত্ত ভোটের ৫ শতাংশ পায়। এবং দলটির যদি একটি সক্রিয় কেন্দ্রীয় কার্যালয়, দেশের কমপক্ষে এক তৃতীয়াংশ (২১টি) প্রশাসনিক জেলায় কার্যকর কমিটি এবং অন্তত ১০০টি উপজেলা/মেট্রোপলিটন থানায় কমপক্ষে ২০০ ভোটারের সমর্থন সংবলিত দলিল থাকতে হবে।
কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের ৪০টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে প্রথম বারের মতো দলীয় ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ২৪টি ও পৌরসভা নির্বাচনে ২১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছিল।
নতুন দলের নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা ৭৬ দলের মধ্যে রয়েছে- মাহমুদুর রহমান মান্না’র নাগরিক ঐক্য, জোনায়েদ সাকির গণসংহতি আন্দোলন; বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক আন্দোলন (বিডিএম); বাংলাদেশ আলোকিত পার্টি, বাংলাদেশ সমাধান ঐক্য পার্টি, বাংলাদেশ কর্মসংস্থান আন্দোলন, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ-ভাসানী গ্রুপ); বাংলাদেশ মঙ্গল পার্টি; বাংলাদেশ পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি (বিপিডিপি); বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক দল (বিজিপি); জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টি; বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল); বাংলাদেশ জনতা পার্টি; বাংলাদেশ ইসলামিক গাজী; বাংলাদেশ জালালী পার্টি; বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি (মো. রফিকুল ইসলাম); বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি (আবু হানিফ হৃদয়); ইনসানিয়া ইসলাম; বাংলাদেশ; বাংলাদেশ জনতা পার্টি; বাংলাদেশ সমাজ উন্নয়ন পার্টি (বিএসডিপি); বাংলাদেশ জাতীয় লীগ; বাংলাদেশ নিউ সংসদ লীগ (বিএনএসএল); বাংলাদেশ পরিবহন লেবার পার্টি; বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-বাংলাদেশ বাসদ, নাকফুল বাংলাদেশ, তৃণমূল ন্যাশনাল পার্টি; বাংলাদেশ সত্যব্রত আন্দোলন; ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি; বাংলাদেশ মানবাধিকার আন্দোলন; সোনার বাংলা উন্নয়ন লীগ; বাংলাদেশ জনতা পার্টি; ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ সমাজ উন্নয়ন পার্টি, ন্যাশনাল কংগ্রেস বাংলাদেশ, বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক পার্টি; গণতান্ত্রিক ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ভাসানী); বাংলাদেশ ঘুষ নির্মূল পার্টি; বাংলাদেশ গণশক্তি দল; বাংলাদেশ সততা দল; বাংলাদেশ তৃণমূল পার্টি; বেঙ্গল জাতীয় কংগ্রেস (বিজেসি); বাংলাদেশ হিন্দু লীগ; বাংলাদেশ জনতা ফ্রন্ট, বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক পার্টি (কেএসপি), বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি; সুশীল সামাজিক আন্দোলন; লিবারেল পার্টি (এলপি); বাংলাদেশ রামকৃষ্ণ পার্টি; বাংলাদেশ উইনাইটেড ইসলামী পার্টি; মুক্ত রাজনৈতিক আন্দোলন।
বাংলাদেশ জাতীয় দল, জাতীয় পরিবার কল্যাণ পার্টি (জেপিকেপি), নতুন ধারা বাংলাদেশ (এনডিবি), বাংলাদেশ জাতীয় লীগ, সাধারণ জনতা পার্টি; বাংলাদেশ ফরায়েজী আন্দোলন; বাংলাদেশ তৃণমূল কংগ্রেস; ঐক্য ন্যাপ; বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (বিপিএলডিটি); মুক্তিযোদ্ধা কমিউনিজম ডেমোক্রেটিক পার্টি; বাংলাদেশ গণ আজাদী লীগ; বাংলাদেশ ইসলামিক পার্টি; বাংলাদেশ শান্তির দল; বাংলাদেশ লেবার পার্টি; কৃষক শ্রমিক পার্টি; জনস্বার্থে বাংলাদেশ; বাংলাদেশ তৃণমূল লীগ; বাংলাদেশ জনতা পার্টি; বাংলাদেশ লেবার পার্টি; নাগরিক ঐক্য; মৌলিক বাংলা; বাংলাদেশ ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (বিএনডিপি); বাংলাদেশ ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (বিডিএম); ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বাংলাদেশ; বাংলাদেশ কংগ্রেস ও বাংলাদেশ আওয়ামী পার্টি-ভাসানী ন্যাপ।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের ভারপ্রাপ্ত সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, নতুন রাজনৈতিক দলগুলো তথ্য যাচাই বাছাই করে নিবন্ধন চূড়ান্ত করা হবে। আর বর্তমানে ‘নিবন্ধিত ৪০টি রাজনৈতিক দলের কাছে আমরা প্রতিবেদন  চেয়েছি। জানুয়ারির ১৫ তারিখ পর্যন্ত সময় রয়েছে। এই সময়ের পর আমরা প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা করবো। নিবন্ধিত দলের মধ্যে যেসব শর্তপূরণ করে নিবন্ধন পেয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে তারা সেই অবস্থায় নেই তাহলে তাদের নিবন্ধন বাতিল করা হবে।’
এক প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব বলেন, ‘নতুন দলের নিবন্ধন ও বিদ্যমান দলের নিবন্ধন বহালে আমরা কঠোরভাবে তথ্য যাচাই করবো।’ কমিশন কেন্দ্রীয়ভাবে টিম গঠন করে এবং মাঠ প্রশাসনের মাধ্যমে এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করবে বলেও জানান ইসি সচিব। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য লাইসেন্স ও তাদের নামে প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হয়। কাজেই নিবন্ধন পেলে তাদের নির্বাচনে অংশ নেয়া উচিত।’
এর আগে ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন প্রথা চালু করে ইসি। প্রথম বছরে ১১৭টি আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ৩৯টি দল নিবন্ধন পায়। এর মধ্যে স্থায়ী সংশোধিত গঠনতন্ত্র দিতে না পারায় ২০০৯ সালে ফ্রিডম পার্টির নিবন্ধন বাতিল করে ইসি। আর আদালতের আদেশে ২০১৩ সালে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন স্থগিত করা হয়। এছাড়া ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল) নামে নতুন একটি দলের নিবন্ধন দেয়া হয়। বর্তমানে ইসির নিবন্ধনে ৪০টি রাজনৈতিক দল রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ