ঢাকা, মঙ্গলবার 9 January 2018, ২৬ পৌষ ১৪২৪, ২১ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ব্যবসায়ীকে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে সোয়া তিন লাখ টাকা চাঁদা আদায়

খুলনা অফিস : খুলনায় তিন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীকে অমানুষিক নির্যাতন ও ক্রস ফায়ারের ভয় দেখিয়ে জোরপূর্বক তিন লাখ ১৬ হাজার টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ী রেজাউল করিম সরদারের স্ত্রী রুমা খাতুন। গত শনিবার খুলনা প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এ অভিযোগ করেন। তিনি লিখিত বক্তব্যে বলেন, নির্যাতন ও চাঁদাবাজীর ঘটনায় তিনি বাদি হয়ে খুলনা জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ইন্সপেক্টর ত ম রোকনুজ্জামান, কয়রা থানার এস আই প্রকাশ চন্দ্র সরকার ও ডুমুরিয়া থানার এস আই লিটন মল্লিকের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেন। আদালতের নির্দেশে দুদক মামলা তদন্ত করে ফাইনাল রির্পোট দেয়। বাদি নারাজীর আবেদন করলে বিজ্ঞ আদালত তা গ্রহণ করে মামলাটি পুনঃতদন্তের জন্য দুদকের পরিচালক খুলনাকে নির্দেশ প্রদান করেন। সাথে সাথে নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট দাখিলের নির্দেশ দেন। কিন্তু আদালতের দেয়া নির্দিষ্ট তারিখের পরেও আরো চার মাস অতিবাহিত হলেও দুদক অদ্যাবধি তদন্ত রির্পোট দাখিল করেননি।
নির্যাতনের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বার বার চোখ মুছছিলেন। চোখ মুছতে মুছতে বলেন, তার স্বামী রেজাউল করিম সরদার একজন ব্যবসায়ী। খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর বাজারে তার বন্যা এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ২০১৫ সালের ১৩ এপ্রিল তার স্বামী নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লেবার পেমেন্ট করছিলেন। তখন ইন্সপেক্টর ত ম রোকনুজ্জামান ফোর্স নিয়ে তার স্বামীকে নগদ ৪১ হাজার টাকা ও একটি মোবাইল ফোনসহ ধরে নিয়ে যায়। রূপসা থানাধীন তালপুর, কেসমত খুলনা পুলিশ ফাঁড়িতে তিন দিন আটকে রেখে ব্যাপক নির্যাতন চালায়। একপর্যায়ে ক্রসফায়ারের ভয় দেখায়। ইন্সপেক্টর রোকনুজ্জামান তার মোবাইল ফোন (০১৮১৭ ১১৩৬৩৮) দিয়ে তাকে মোবাইলে ফোন দিয়ে ৮ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না দিলে তার স্বামীকে ক্রসফায়ারে দেবে বলে ভয়ভীতী দেখায়। তখন তিনি নগদ ১৪ হাজার টাকা নিয়ে ওই ফাঁড়িতে যায়। পুরো টাকা না পেয়ে তার সামনে তার স্বামীকে লাথি মারে। তার কাছ থেকে ১৪ হাজার টাকা নিয়ে তিন দিনের মধ্যে আরো চার লাখ টাকা চেয়ে হুমকি দিয়ে বলে স্ব্মাীর প্রাণ বাঁচাতে চাইলে টাকা নিয়ে আসো। এ সময় তার কথায় তিনি রাজি হন। এরপর তার স্বামীকে কয়রা থানায় নিয়ে যায়। কয়রা থানার মামলা নং ৫, তারিখ ২/১২/১৪ (জি, আর ২৬৫/১৪) ধারা ৩৯৯/৪০২ দন্ডবিধিতে সন্ধিগ্ধ আসামী হিসেবে ১৬/৪/১৫ তারিখে গ্রেফতার দেখিয়ে কয়রা ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে চালান দিয়ে পাঁচ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। আদালত একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এস আই প্রকাশ চন্দ্র তার স্বামীর জিজ্ঞাসাবাদে কোন তথ্য পাননি। এরপর ওই এস আই ষড়যন্ত্রমূলকভাবে পুনরায় কয়রা থানার মামলা নং ৪, তারিখ ০২/১০/১৪ ইং (জিআর-২২১/১৪) ধারা ৩৬৫/৩৬৮/৩৮৭ মামলায় শোন এ্যারেষ্ট দেখান। এ মামলায় একদিনের রিমান্ডে নিয়ে তার স্বামীকে কয়রার একটি জঙ্গলে নিয়ে হাফপ্যান্ট পড়িয়ে এবং মাথায় গামছা পেঁচিয়ে অস্ত্র দিয়ে ছবি তোলে। টাকা না দিলে এই ছবি ইন্টারনেটে দিয়ে অস্ত্র মামলায় জড়াবে এবং ক্রসফায়ারের হুমকি দেয়। এরপর জি আর ২৬৫/১৪ নং মামলায় আটক রেখে একমাস পর ১৯/০৫/১৫ ইং তারিখে জি আর ২২১/১৪ নং মামলায় শোন এ্যারেষ্ট আবেদন করলে না মঞ্জুর হয়। ২০/০৫/১৫ তারিখে কয়রা থানার মামলা নং ১১, তারিখ ২০/৫/১৫ (জি আর-৭১/১৫), ধারা ১৯৭৮ সালের অস্ত্র আইনের ১৯-এ/১৯ এফ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে চালান দেন। অথচ ইন্সপেক্টর ত ম রোকনুজ্জামানের নির্দেশে এস আই প্রকাশ ওই অবৈধ অস্ত্রটি তার স্বামীর হাতে ধরিয়ে দেয়। মামলায় বেশ কয়েকমাস জেল খেটে ১০/০৮/২০১৫ইং তারিখে মুক্তি পেয়ে তার স্বামী পুনরায় ব্যবসা শুরু করেন। এরপর তার স্বামীর উপর অত্যাচার, নির্যাতনের কথা আমরা বেশ কিছু লোকজনকে জানাই। ফলে এসব কথা ইন্সপেক্টর ত ম রোকনুজ্জামানের কাছে চলে যায়। তিনি তার স্বামীর উপর আবারো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। এরপর গত ২১/১১/১৫ইং তারিখে তার স্বামী তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লেবার পেমেন্ট দেয়ার সময় তাকে নগদ ২১ হাজার টাকাসহ আটক করে ডুমুরিয়া থানায় নিয়ে যায়। ডুমুরিয়া থানার এসআই লিটন মল্লিক তাকে ফোন করে দেখা করতে বলে দুই লাখ টাকা চাঁদা চায়। সাংবাদিক সম্মেলনে রুমা খাতুন আরো বলেন, তার স্বামীকে নির্যাতন ও ক্রসফায়ার থেকে রক্ষা করতে খুলনা জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ইন্সপেক্টর ত ম রোকনুজ্জামান, কয়রা থানার এস আই প্রকাশ চন্দ্র সরকার ও ডুমুরিয়া থানার এস আই লিটন মল্লিককে বিভিন্ন সময়ে তিন লাখ ১৬ হাজার টাকা দিয়েছেন। যার অডিও এবং ভিডিও রেকডিং তাদের কাছে রয়েছে। তারপরেও তার স্বামীর নির্যাতন ও মিথ্যা মামলা থেকে রেহাই পাচ্ছেনা। ডুমুরিয়া থানায় ধরে নিয়ে তার স্বামীর উপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। ২১/১১/১৫ইং তারিখে তার স্বামীকে ধরে নেয়ার পর ২৩/১১/১৫ ইং তারিখে ডুমুরিয়া থানার মামলা নং-২৪, তারিখ ১৯/১১/১৫ (জি আর-৩০৪/১৫) ধারা ৩৯৫/৩৯৭ দন্ডবিধিতে সন্ধিগ্ধ হিসেবে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে চালান দেন। এভাবে তার স্বামীর উপর অত্যাচার-নির্যাতন চালানো হচ্ছে। তিনি আর কোন উপায়ন্তু না পেয়ে এসব ঘটনা উল্লেখ করে গত ১৯/৪/২০১৬ ইং তারিখে আদালতে বিচার চেয়ে মামলা দায়ের করেন। মামলায় উল্লেখিত তিন পুলিশ অফিসারকে আসামী করা হয়েছে। আদালত তার আরজিটি গ্রহণ করে মামলাটি তদন্তের জন্য দুদক খুলনায় পাঠান। কিন্তু সমস্ত ডকুমেন্ট থাকা সত্তেও দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা উপ-সহকারী পরিচালক মোশাররফ হোসেন গত ১৩/৩/১৭ ইং তারিখে ওই তিন আসামীকে মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে ফাইনাল রির্পোট দাখিল করেন। তিনি দাখিলকৃত প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করে সিনিয়র স্পেশাল জজ ও সিনিয়র জেলা দায়রা জজ আদালতে নারাজী পিটিশন দাখিল করেন। মিস কেস নং- ৩৬৫/১৬। আদালত আবেদনটি আমলে নিয়ে পুনঃতদন্তের জন্য দুদকের খুলনা বিভাগের পরিচালককে দায়িত্ব দেন এবং ২৯/০৮/১৭ইং তারিখে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। কিন্তু নির্ধারিত তারিখের পর আরো চার মাস অতিবাহিত হলেও প্রতিবেদনটি দাখিল হয়নি। এ সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপির কাছে বিচার দাবি করেছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ