ঢাকা, বুধবার 10 January 2018, ২৭ পৌষ ১৪২৪, ২২ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

একই দূরত্বে ভাড়া দ্বিগুণ-তিনগুণ বেশী

কামাল উদ্দিন সুমন : ঢাকা কলেজের ছাত্র রাসেল আহমেদ। কাকরাইল একটি বেসরকারি হাসপাতালে রোগী দেখার জন্য গুলিস্থান থেকে মনজিল বাসে উঠে। আধা কি:মি এ রাস্তায় ভাড়া ৫টাকার বেশী হওয়ার কথা নয় কিন্তু রাসেলকে ২০টাকা দিতে বলে হেলপার। এনিয়ে দুইজনের মধ্যে তুমুল ঝড়গা। পরে তা  হাতাহাতিতে রুপ নিলো। হেলপারের কথা সিটিং সার্ভিস তাই ২০টাকার নিচে ভাড়া নেই। শুধু এ রুটে নয়। রাজধানী জুড়ে পরিবহন  কোম্পানিগুলোর ভাড়া নিয়ে এমন ডাকাতি হরহামেশাই ঘটছে। এভাবেই চলছে রাজধানীতে গণপরিবহনে  ভাড়ার নৈরাজ্য। যে যেভাবে পারা যায় যাত্রীদের নিকট থেকে গলাকাটা ভাড়া আদায় করা হচেছ।
বিআরটিএ’র হিসাবে ঢাকা মহানগরে অভ্যন্তরীণ রুটে নিয়মিত চলাচল করে প্রায় ছয় হাজার বাস। ঢাকা মহানগরে বিআরটিএ নির্ধারিত সর্বনিম্ন ভাড়া বাসের জন্য৭ টাকা আর মিনিবাসের জন্য ৫ টাকা। অথচ  গেটলক সিটিং সার্ভিসের বাসগুলোতে সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা থেকে ক্ষেত্র বিশেষে ৫০ টাকা পর্যন্ত নিতে দেখা যায়।
প্রতিটি বাসে বিআরটিএর নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা টাঙানোর নিয়ম আছে। গত কয়েক দিনে বিভিন্ন পথে চলাচলকারী অন্তত ২০টি পরিবহনের বাসে উঠে দেখা যায়, নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা টাঙানো নেই। আর গেটলক সিটিং সেবা বলা হলেও দাঁড়ানো যাত্রী নিতে এবং যেখানে সেখানে থামিয়ে যাত্রী নামাতে দেখা গেছে অন্তত ১১টি পরিবহনের বাসকে।
রাজধানীর আজিমপুর থেকে গাজীপুরের চৌরাস্তা পর্যন্ত ‘ভিআইপি-২৭’ নামের একটি বাসসেবা চালু আছে। কোম্পানিটির বাসসেবা চালু আছে ‘কাউন্টার সার্ভিস’ নামে। এই বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ৫০টাকা। অর্থাৎ কোনো যাত্রী যদি আজিমপুর থেকে উত্তরা যেতে চান, তাঁকে ৫০ টাকার টিকিট কাটতে হবে। আবার কেউ আজিমপুর থেকে ফার্মগেট যেতে চাইলে তাঁকেও ৫০ টাকার টিকিট কাটতে হবে;যদিও গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্তভাড়া ৭০ টাকা।
ধানমন্ডি ২৭ নম্বর থেকে নিয়মিত বনানী চেয়ারম্যানবাড়ি যাতায়াত করেন আতিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘বনানী চেয়ারম্যানবাড়ি যেতে ১৫ টাকা লাগে। অথচ ভিআইপি-২৭ নম্বরে গেলে ৫০ টাকা খরচকরতে হয়। এর তো কোনো মানে হয় না।
ঢাকার গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়া থেকে গাজীপুরের আবদুল্লাহর পর্যন্ত চলাচল করে ‘এয়ারপোর্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ পরিবহন লিমিটেড’ বা ‘৩ নম্বর’ বাস। এই বাসে উঠে স্বল্প দূরত্বে গেলেও ভাড়া ১০টাকা। তারা সম্প্রতি ‘ স্পেশাল সার্ভিস’ নামে নতুন কিছু বাস চালু করেছে, যেগুলোতে আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত ভাড়া ৫০ টাকা। পরিবহনটির মালিকপক্ষের লোকজন বলছেন, নতুন বাসে সেবার মান ভালো,তাই ভাড়া একটু বেশি। তবে যাত্রীরা অভিযোগ করেন, এ পরিবহনের অধিকাংশ বাসেই যাতায়াত করা কষ্টকর।
আজিমপুর থেকে মিরপুর ইসিবি চত্বর চলাচলকারী মিরপুর লিংক বাসটির সর্বনিম্ন ভাড়া ২৬ টাকা। বিহঙ্গ পরিবহন লিমিটেড যাতায়াত করে মিরপুর রূপনগর থেকে আজিমপুর পর্যন্ত। এইপরিবহনের সর্বনিম্ন ভাড়া ১৬ টাকা। ফাল্গুন পরিবহন উত্তরার হাউস বিল্ডিং থেকে আজিমপুর পর্যন্ত চলাচল করে। তারা সর্বনিম্ন ভাড়া আদায় করে ১৮ টাকা। এই রুটে নির্ধারিত সর্বনিম্ন ভাড়া সাতটাকা।
মিরপুর থেকে গুলিস্তান ও মতিঝিল চলাচলকারী ল্যামস পরিবহন, হাজি ট্রান্সপোর্ট লিমিটেড, খাজাবাবা পরিবহন লিমিটেড, ইটিসি ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড ও বিকল্প অটো সার্ভিস লিমিটেডের বাসগুলোর সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়।
এ ছাড়া মিরপুর চিড়িয়াখানা থেকে কমলাপুর, নারায়ণগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ এবং মোহাম্মদপুর থেকে সায়েদাবাদ চলাচলকারী আয়াতপরিবহন, হিমাচল পরিবহন, নবকলি পরিবহন, মেশকাত ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড ও এভারেস্ট পরিবহন লিমিটেডেরও সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা।
ঢাকার অন্যান্য রুট চলাচলকারী লাব্বাইক ট্রান্সপোর্ট লিমিটেড, ওয়েলকাম ট্রান্সপোর্ট প্রাইভেট লিমিটেড, স্বাধীন এক্সপ্রেস, ঠিকানা এক্সপ্রেস লিমিটেড ও স্বাধীন পরিবহনের সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ থেকে ১৫ টাকা। উল্লেখিত রুটগুলোর সর্বনিম্ন ভাড়া ৭টাকা।
নিউ ভিশন, বসুমতী ট্রান্সপোর্ট, ট্রাস্ট বাস সার্ভিসসহ আরও কয়েকটি পরিবহনের ‘সিটিং সার্ভিস’ বা ‘কম স্টপেজ’ সর্বনিম্ন ভাড়ার সীমা মানছে না। ২০১৬ সালের আগস্টে গুলশান-বনানীতে ‘ঢাকাচাকা’ নামের বিশেষ বাসসেবা চালু করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, যেগুলোর সর্বনিম্ন ভাড়া ১৫ টাকা।
মিরপুরের দুয়ারীপাড়া থেকে আজিমপুর পর্যন্ত ‘আশীর্বাদ পরিবহন’–এর সিটিং সার্ভিস মিনিবাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ১৬ টাকা। এই পরিবহনের বাসগুলো পুরোনো। অন্তত তিনটি বাসের কয়েকটি জানালায়কাচ নেই এবং পেছনের অংশ ভাঙা দেখা গেছে।
 দেখা গেছে গেটলক সিটিং সার্ভিস বাসগুলোর নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর রয়েছেন পরিদর্শক বা ‘ চেকার’। দাঁড়িয়ে যাত্রী নেওয়া হচ্ছে কি না এবং মোট কতজন যাত্রী বাসে রয়েছেন, সেটি লিখে তিনি স্বাক্ষরকরেন। পরিদর্শক ওঠার আগে নেমে গেলে স্বল্প দূরত্বের জন্য ন্যূনতম ভাড়া দেওয়া যায়। কিন্তু যে যাত্রী পরিদর্শক ওঠার পর কোথাও নামেন, তাঁকে পুরো পথের ভাড়াটাই দিতে হয়।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান বলছেন, মহানগরে পরিবহন সেবায় অনিয়ম বন্ধের জন্য তাঁদের চারটি ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা কমবেশি প্রতিদিনই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করি। অনিয়ম বন্ধ করতেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির এক অনুসন্ধানে দেখা যায়, রাজধানীর ৭০ ভাগ গণপরিবহন সর্বনিম্ন ভাড়া আদায় করছে ১০ টাকা। ২০ ভাগ গাড়ি আদায় করছে ১৫ থেকে ২০ টাকা। অর্থাৎ ১০ ভাগ গাড়ি নিয়ম অনুযায়ী ৫ বা ৭ টাকা সর্বনিম্ন ভাড়াআদায় করছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও যাত্রী হয়রানি বেড়ে গেছে। বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ধার্য করলেও সঠিক ভাড়া আদায় করছেন না কেউই। যেমনধরেন গুলিস্তান থেকে রামপুরা ভাড়া হচ্ছে ৮ টাকা। কিন্তু গণপরিবহনের চালকরা নিচ্ছেন ২০ টাকা। আর টাকা কম দিলে যাত্রীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন তারা।
অতিরিক্ত ভাড়া আদায় রোধে আপনাদের কোনো পদক্ষেপ আছে কি  জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরাই প্রথম গণশুনানির আয়োজন করেছি। তবে এ বিষয়টি নিয়ে আমরা প্রতিবাদ করেছি মিডিয়ার মাধ্যমে। যখন মিডিয়ায় এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়, তখন কর্তৃপক্ষের এটি নজরে আসে। তখন তারা ব্যবস্থা নেয়।’
সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ঢাকার গণপরিবহনে যে নৈরাজ্য চলছে তা ঠেকাতে প্রশাসন কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। রাষ্ট্রযন্ত্রের পৃষ্ঠপোষকতায় এক শ্রেণীর মালিক ও শ্রমিক সড়ক পরিবহন খাতকে জিম্মি করে রেখেছে। এরাই রাজধানীতে সিটিং, গেটলক, সময় নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি নামে নগরবাসীর কাছ থেকে মাত্রাতিরিক্ত বাস ভাড়া আদায় করছে। অথচ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএ ‘ভাড়া সন্ত্রাস’ ঠেকাতেপারছে না।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সোবহান বলেন, রাজধানীর প্রায় বাসেই সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা দেখা যায় না। গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়সহ বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত কিংবা পুলিশের বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে মোটরযান আইন প্রয়োগ করতে গেলে মালিকরা বাস চালানো বন্ধ রেখে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ