ঢাকা, বুধবার 10 January 2018, ২৭ পৌষ ১৪২৪, ২২ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

স্কুলে কমেছে খুলনা অঞ্চলের শ্রমিক সন্তানদের উপস্থিতি

* শিক্ষকদেরও চার মাসের বেতন বকেয়া

খুলনা অফিস : আর্থিক সংকটে অনেক শ্রমিক তাদের সন্তানদের এখনও স্কুলে ভর্তি করাতে পারেননি। আর তাই নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহ চলে গেলেও খালিশপুরের তিনটি মিলের বিদ্যালয়ে কমেছে শ্রমিক সন্তানদের উপস্থিতি। এসব বিদ্যালয়ের প্রায় ৪০ ভাগ শিক্ষার্থী নতুন বছরে স্কুলে ভর্তি হতে পারেনি। যারা ভর্তি হয়েছে তারাও বিদ্যালয়ে আসছে না। ছাড়পত্র নিয়ে স্কুল ছেড়ে গ্রামে চলে যাচ্ছে অনেক শিক্ষার্থী। এর মধ্যে আবার শিক্ষকদেরও প্রায় চার মাসের বেতন বকেয়া পড়েছে। 

অপরদিকে খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত আট পাটকলে গেল ১১ কার্যদিবসে কর্মবিরতি অব্যাহত রেখেছে শ্রমিকরা। নেই মিলে তাঁতের শব্দ। নেই মিল চালু থাকার সোরগোল। নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছে গোটা শিল্পাঞ্চল। এরই বিরূপ প্রভাব পড়েছে স্থানীয় অর্থনীতিতেও। 

পাটকলগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, খালিশপুর শিল্পাঞ্চলে বিজেএমসির বিদ্যালয় রয়েছে তিনটি। পাটকল শ্রমিক-কর্মচারীদের শিশুদের দিয়েই স্কুলগুলো চলে। কিন্তু ৮ থেকে ১০ সপ্তাহের মজুরি বকেয়া থাকায় পরিবারগুলোতে এক রকম হাহাকার চলছে। এ জন্য অর্থের অভাবে অনেক শ্রমিক শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে পারেননি। অন্যদিকে স্কুলগুলো পরিচালনা করে পাটকল কর্তৃপক্ষ। অর্থ সংকটের কারণে তারাও শিক্ষকদের বেতন দিতে পারছে না। 

প্লাটিনাম জুট মিলের স্কুলে গিয়ে দেখা যায়, সপ্তম শ্রেণীতে শিক্ষার্থী ৫৪ জন। এর মধ্যে গতকাল উপস্থিত হয়েছে মাত্র ২১ জন। ৬ষ্ঠ শ্রেণীতেও প্রায় একই অবস্থা। বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী আরাবি আনিকা জানান, তার বাবা জামাল উদ্দিন যাচাই বিভাগের শ্রমিক। এক হাজার আটশ’ টাকা মজুরিতে তাদের তিন বোনের পড়াশোনার খরচ চালানো সম্ভব না। এজন্য দুই বোন বাড়ি চলে গেছে। এখন মজুরি না পাওয়ায় তার মামা আর্থিক সহযোগিতা করছে। 

সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী মিম জানান, তাঁত বিভাগের শ্রমিক বাবা আব্দুর রহিমের পক্ষে চার ভাই-বোনের পড়াশোনার খরচ চালানো কষ্টকর। তারা চার ভাই-বোনের মধ্যে বড় ভাই জসিম সরকারি হাজী মুহম্মদ মুহসিন কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী, বোন রুবি একাদশ শ্রেণীতে পড়ে। আর ছোট বোন মেধা এবার প্রাক-প্রাথমিকে ভর্তি হবে। আমার বাবা সপ্তাহে দুই হাজার থেকে ২৫শ’ টাকা মজুরি পায়। তাই দিয়ে সংসার চলে। অথচ সাপ্তাহিক মজুরি না পাওয়ার কারণে বছরের প্রথমদিকে এসে মিল বন্ধ থাকায় বেশ বেগ পোহাতে হচ্ছে তার বাবার। একই শ্রেণীর শিক্ষার্থী সুমাইয়া বলেন, অধিকাংশ সহপাঠী ক্লাসে আসেনি। তাদের মধ্যে অনেকে এখনও ভর্তি হতে পারেনি। 

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ইউনুস আহমেদ বলেন, গত বছর এই সময় ৯০ ভাগ শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকতো। এখন শ্রমিক-কর্মচারীরা বেতন না পাওয়ায় অনেকে ভর্তি হতে পারেনি। বিদ্যালয়ের এক হাজার ৩৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ভর্তি হয়েছে প্রায় সাড়ে ৭শ’। অনেকে বাড়ি চলে গেছে। এবার উপস্থিতি তুলনামূলক কমেছে। তিনি বলেন, এ বছর ১০ জন শিক্ষার্থী ছাড়পত্র নিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে গেছে। বিগত বছর সর্বোচ্চ এক অথবা দুইজন ছাড়পত্র নিতো। পাটকলের দুরাবস্থার প্রভাব সবখানেই পড়েছে। 

ক্রিসেন্ট জুট মিল হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা সাবিনা ইয়াসমিন জানান, শ্রমিকদের মজুরি বকেয়া ও ধর্মঘট চলায় স্কুলে উপস্থিতি কমে আসছে। বিদ্যালয়ে এক হাজার ৩৯ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৮০ শতাংশ ভর্তি হয়েছে। যারা ভর্তির টাকা দিতে পারছে না তাদের স্কুল সভাপতির সুপারিশে ভর্তি করিয়ে বই দিয়ে দিচ্ছি। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকরাও ভালো নেই। কারণ বছরের শেষ চার মাসের বেতন এখনো তারা হাতে পাননি। খালিশপুর জুট মিল স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ফেরদৌসি হক বলেন, বিদ্যালয়ের ৮৫২ জন শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬০ শতাংশ ভর্তি হয়েছে। বাকীরা ভর্তির প্রক্রিয়াধীন রয়েছেন। 

ক্রিসেন্ট জুট মিলের স্পিনিং বিভাগের শ্রমিক আবুল কালাম জানান, ৯ সপ্তাহের মজুরি বকেয়া রয়েছে। যেখানে খাবারই জুটছে না, সেখানে কাজে গতি আসবে কিভাবে। এমনকি বছরের শুরুতে ছেলেমেয়েদের স্কুল-কলেজে ভর্তিও করানো যাচ্ছে না।

প্লাটিনাম জুট মিলের তাঁত বিভাগের শ্রমিক আবু হাসান বলেন, দোকানদার আর বাকিতে চাল ডাল দিচ্ছে না, না খেয়ে থাকা ছাড়া কোন উপায় নেই। উপায়হীন হয়ে কর্মবিরতি পালন করছেন তারা। প্লাটিনাম জুট মিল সিবিএ’র সাবেক সভাপতি খলিলুর রহমান বলেন, মজুরি না পেয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাঁটানো শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। অথচ মিল কর্তৃপক্ষ বকেয়া টাকা প্রদানের ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল সিবিএ-নন সিবিএ পরিষদের কার্যকরী আহবায়ক সোহরাব হোসেন বলেন, শ্রমিকদের বকেয়া সব মজুরি এক সাথে পরিশোধ না করা পর্যন্ত কেউ কাজে ফিরবে না। আলিম জুট মিলের সিবিএ সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম লিটু বলেন, মিলের শ্রমিকরা না খেয়ে রয়েছে। তাদের পরিবারে অসন্তোষ বিরাজ করছে। এ অবস্থায় শ্রমিকরা বাধ্য হয়েই আন্দোলনে নেমেছে।

উল্লেখ্য, বকেয়া মজুরি পরিশোধের দাবিতে গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত আটটি পাটকলে শ্রমিক কর্মবিরতি অব্যাহত রয়েছে। এসব পাটকলে বর্তমানে ২৬ হাজার ৭১৮ জন শ্রমিক কাজ করেন। তাদের চার থেকে ১০ সপ্তাহের মজুরি বকেয়া রয়েছে। খুলনা অঞ্চলের ৯ পাটকলে সব মিলিয়ে ৩৮ কোটি ২৯ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ