ঢাকা, বুধবার 10 January 2018, ২৭ পৌষ ১৪২৪, ২২ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড

জাফর ইকবাল : জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বদলে যাচ্ছে ঋতুচক্র। সময়ে দেখা না মিললেও অসময়ে বৃষ্টির বাড়াবাড়ি দেখা যায়। শীতও তার প্রচলিত সময়ের নিয়ম মানছে না। দুইদিন আগে যেখানে ভোর রাতে শীতের উপস্থিতি বেশী থাকতো সেখানে অল্প সময়ে সেটির ব্যাপক পরিবর্তন। অবস্থা এমন যে দেশে ৫০ বছরের মধ্যে এ মওসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে পঞ্চগড়ে। সোমবার ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় হিম হয়ে গেছে দেশের উত্তরপ্রান্তের এ জেলার বাসিন্দারা। জলবায়ুর প্রভাবে আবার বন্যাও ব্যাকরণ ভুলে হানা দিচ্ছে অসময়ে। এর প্রভাব পড়ছে জীবন ও প্রকৃতিতে। শুধু বাংলাদেশ নয়, আবহাওয়ার এ বৈরী আচরণ চলছে দক্ষিণ এশিয়া জুড়েই। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা ও জাতিসংঘের আন্তঃসরকার জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত প্যানেল (আইপিসিসি) বলছে, শিল্পোন্নত দেশগুলোর বিপুল কার্বন নিঃসরণের ফলে বিশ্বের তাপমাত্রা দিনের পর দিন বৈরী হয়ে উঠছে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মমতার শিকার বাংলাদেশ। এ কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়েছে। প্রকৃতি তার কোমলতা হারিয়েছে। আবহাওয়ার খামখেয়ালি আচরণ আগামী দিনে আরও বাড়বে। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা নতুন কিছু নয়। তবে এর মাত্রা বেড়ে যাওয়ার মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত আছে। ষড়ঋতুর এ দেশে কার্তিক ও অগ্রহায়ণ হেমন্ত ঋতু। হেমন্ত মানেই শিশিরস্নাত প্রহর। এ সময় সোনালি ফসলে ভরা থাকে মাঠ। হেমন্তের প্রথম মাস কার্তিকে ধানে পাক ধরে। কার্তিকের দ্বিতীয় সপ্তাহ পার হতে চলেছে। কিন্তু এখনও প্রকৃতিতে নেই শীতের আমেজ। শ্রাবণের মতোই বৃষ্টি ঝরেছে। অক্টোবরের শেষে এবারের বৃষ্টিপাতের এই চিত্র স্বাভাবিক নয়। আবার রাত পেরিয়ে বেলা অবধি কুয়াশার ঘন আস্তরণ বিভ্রান্ত করে অনুভূতি শক্তিকে।
প্রতি বছর ১০০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে। বৃষ্টিপাত আরও বাড়লে বাংলাদেশ, ভারত ও চীনের ১৩ কোটি ৭০ লাখেরও বেশি মানুষ ঝুঁকিতে পড়বে। ২০১২ সালের এক গবেষণায় এ তথ্য মিলেছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ওই গবেষণার শিরোনাম ছিল এশিয়ায় সবুজ নগরায়ন (গ্রিন আরবানাইজেশন ইন এশিয়া)। সমীক্ষায় দেখা গেছে, বৃষ্টির কারণে ১৯৫০ সাল থেকে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে চীন, ভারত এবং বাংলাদেশে। বেলজিয়ামের ইউনিভার্সিটি ক্যাথলিক দ্য লোভেনের তথ্য অনুসারে ১৯৫০ সাল থেকে এ পর্যন্ত বৃষ্টি-বন্যায় ২২ লাখ লোক প্রাণ হারিয়েছেন।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, এ অঞ্চলে তাপমাত্রাও ঘন ঘন পরিবর্তন হচ্ছে। সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়ছে। এবার উত্তর বঙ্গোপসাগরের মওসুমি বায়ুর অক্ষ ভারতের ওড়িশা ও উত্তর প্রদেশে সক্রিয় ছিল। মূলত উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত এই মেঘমালা হিমালয়ের পাদদেশীয় অঞ্চলে প্রবল বৃষ্টি হয়েছে। ওই অঞ্চলেই ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গা অববাহিকার উৎস। জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে অসময়ে বৃষ্টি, খরা ও বন্যার ঘটনা ঘটছে। একইসাথে শীতের প্রকোপও কমছে আর বাড়ছে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. হাফিজুর রহমান বলেন, উন্নত বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন রোধের লাগাম এখনই টেনে না ধরলে আবহাওয়ার বৈরী আচরণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে স্বল্পোন্নত দেশগুলো। জলবায়ু বিশেষঞ্জ ড. আরিফুল হক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রকৃতি বৈরী হয়ে উঠছে। তার স্বাভাবিক আচরণ পাল্টাচ্ছে। এতে দেশের কৃষি ও জীববৈচিত্র্য সংকটে পড়েছে। প্রকৃতির নতুন এ আচরণের সঙ্গে মিলিয়ে চলা ছাড়া বিকল্প কিছু নেই। শিল্পোন্নত দেশগুলো কার্বন নির্গমন না কমালে এ থেকে মুক্তি মিলবে না। বিশ্বব্যাংকের পরিবেশ অর্থনীতিবিদ সুস্মিতা দাশগুপ্ত বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা করছেন। সেই গবেষণায় দেখা গেছে ২০৫০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২০ সেন্টিমিটার বাড়বে। বর্তমানে উপকূলীয় এলাকার ৪৩ লাখ মানুষ সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার।
জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবের কারণে শীতের প্রকোপও নানারূপ ধারণ করছে। চলতি মওসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে পঞ্চগড়ে। গেল সোমবার ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় হিম হয়ে যাচ্ছে দেশের উত্তরপ্রান্তের এ জেলার বাসিন্দারা। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছেন না কেউ, এ কারণে রাস্তাঘাট একেবারেই ফাঁকা, মহাসড়কে ভর দুপুরেও হেড লাইট জ্বালিয়ে চলতে হচ্ছে যানবাহনগুলোকে। সেই সঙ্গে টানা কয়েকদিনের ঘন কুয়াশার কারণে নষ্ট হয়ে যেতে বসেছে রবিশস্যের বীজতলা।
 এছাড়াও অতিরিক্ত ঠা-ায় সবাই ঘরবন্দি হয়ে পড়ায় জীবিকার সংকটে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষেরা। রোববার পঞ্চগড়ের তাপমাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বিগত ৫০ বছরের ইতিহাসে এত কম তাপমাত্রা দেখা যায়নি। পঞ্চগড়ের ইতিহাসে তো বটেই দেশের ইতিহাসেও সর্বনিম্ন তাপমাত্রাও এটি। এর আগে ৫০ বছর আগে ১৯৬৮ সালে শ্রীমঙ্গলের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আসি আসি বলেও আসছিল না শীত। ২০১৭ সালের বিদায়বেলায় ডিসেম্বর মাসে হালকা শীতের সঙ্গে গরম কিছুটা আঁচড় কেটেছিল। অথচ ৮ জানুয়ারি অবস্থা এমনই হলো যে বাংলাদেশের ইতিহাসে শীত পড়ার সব রেকর্ড ভেঙে গেল। তাই ‘মাঘের শীতে বাঘ কাঁপে’ প্রবাদও বদলে হয়ে যেতে পারে ‘পৌষের শীতে বাঘ কাঁপে’। ২০১৩ সালে অবশ্য ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে তাপমাত্রা নেমে যাওয়ার অবস্থা হয়েছিল। ওই বছর ১০ জানুয়ারি নীলফামারীর সৈয়দপুরে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৩ সেলসিয়াস। এর আগের দিন ৯ জানুয়ারি দিনাজপুরে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
অবশ্য বাংলাদেশে শূন্য ডিগ্রি বা এর কম তাপমাত্রা পড়ার সম্ভাবনা নেই বলে মন্তব্য করেছেন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক শাহ আলম বলেন, বাংলাদেশে শীত পড়ার অনেক কারণ রয়েছে। এর একটি হলো সাইবেরিয়ার বাতাস। তবে বাংলাদেশে পৌঁছানোর আগেই এই বাতাসে শীতের মাত্রা কমে যায়। কিন্তু এ সময় সাইবেরিয়ার বাতাসে যে মাত্রার ঠান্ডা থাকে সেটি এ দেশের মানুষের কাছে সহনীয় নয়। শীতের কারণে শিশু ও বৃদ্ধরা শীতজনিত নানা রোগ ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট ও হাঁপানিতে আক্রান্ত রোগ বেশি দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও নরওয়েজিয়ান মেটেরিওলজিক্যাল ইনস্টিটিউট যৌথভাবে গত আগস্টে বাংলাদেশের জলবায়ু নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, গত ৫০ বছরে ডিসেম্বরের গড় তাপমাত্রা ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। ওই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ। তিনি বলেন, শীতকালে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ধরনের সঙ্গে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার মিল রয়েছে। তবে এখানে দ্রুত নগরায়ণ, জলাভূমি কমে যাওয়া ও পরিবেশ ধ্বংস হওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। সংস্থা দুটির প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, শীতকাল উষ্ণ হয়ে ওঠার পাশাপাশি এই সময় ঘন কুয়াশা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ