ঢাকা, বৃহস্পতিবার 11 January 2018, ২৮ পৌষ ১৪২৪, ২৩ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

শিল্প-কারখানার নিরাপত্তা

সরকারের পক্ষ থেকে গ্যাস ও বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান হারে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের কথা শোনানো হলেও বাস্তবে অর্থনীতির চালিকা ক্ষেত্রগুলো অচল হয়ে পড়তে শুরু করেছে। দেশের বেশির ভাগ শিল্প-কারখানা বহুদিন ধরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে তো চলছেই, একের পর এক বন্ধও হয়ে যাচ্ছে অনেক শিল্প-কারখানা। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের বক্তব্য এবং তথ্য-পরিসংখ্যানের উদ্ধৃতি দিয়ে গতকাল দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, সময় মতো গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ না পাওয়ার কারণে কয়েকশ’ শিল্প-কারখানা এখনো উৎপাদনই শুরু করতে পারেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাংক ঋণ। আবেদনপত্র জমা দিয়ে বছরের পর বছর অপেক্ষা করেও অনেকে প্রয়োজনীয় পরিমাণের ব্যাংক ঋণ পাননি। অনেককে আবার এমন পরিমাণেই ঋণ দেয়া হয়েছে, যা দিয়ে তারা লাভজনক উৎপাদনে যেতে সক্ষম হননি। পরিণতিতে সব দিক থেকেই তারা লোকসান গুনতে বাধ্য হয়েছেন এবং এখনো হচ্ছেন।
ওদিকে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ না পেলেও এবং উৎপাদনে যেতে সক্ষম না হলেও সুদে-আসলে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ কেবল বেড়েই চলেছে। আর এই একটি বিষয়ে সরকারের নীতি ও নির্দেশ অনুসরণ করতে গিয়ে ব্যাংকগুলো রীতিমতো অত্যাচারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। তারা কোনো যুক্তিই মানতে চাচ্ছে না। শুধু চাপ বাড়িয়ে চলেছে ঋণের অর্থ আদায় করার জন্য। এর ফলে ঋণ খেলাপির সংখ্যা এবং খেলাপি ঋণের পরিমাণ- সবই লাফিয়ে বেড়ে চলেছে। একযোগে বাড়ছে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প-কারখানার সংখ্যাও। দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, বিগত মাত্র এক বছরেই দেশে ২৮৪টি শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এসবের মধ্যে বেশিরভাগ তৈরি পোশাকের কারখানা হলেও সঙ্গে রয়েছে ট্যানারি এবং আরো কিছু শিল্পপণ্যের কারখানাও। তৈরি পোশাক কারখানা মালিকদের কেন্দ্রীয় সংগঠন বিজিএমইএ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারের মানদন্ড অনুযায়ী আইন ও নিয়ম-কানুন মানতে গিয়ে বিগত কয়েক বছরে সকল মালিককেই পাঁচ থেকে ২০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়েছে। তা সত্ত্বেও পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে তাদের নানামুখী সমস্যা ও জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে। অনেক কষ্টে ক্রেতা পাওয়া গেলেও দেশের ভেতরে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটের কারণে খুব কম ক্ষেত্রেই মালিকরা চুক্তির সময় অনুযায়ী পণ্য রফতানি করতে সক্ষম হচ্ছেন। অনেকের চুক্তি বাতিলও হয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে বলতে গেলে কোনো সহায়তাই পাওয়া যায় না। একই কারণে ব্যাংকের ঋণও সময়মতো পরিশোধ করা যায় না। এ ধরনের শিল্প মালিকদের সুদে-আসলে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৫৯ কোটি টাকা। ঋণের এই  দায় থেকে অব্যাহতি দেয়ার আবেদন জানিয়ে বিজিএমইএ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি পাঠিয়েছে। কিন্তু সে চিঠিরও কোনো জবাব দেয়া হয়নি। অথচ অব্যাহতি দেয়া হলে সংশ্লিষ্ট শিল্প মালিকরা নতুন উদ্যমে উৎপাদন ও রফতানি শুরু করতে পারতেন।
অনেকাংশে একই ধরনের সমস্যার মুখে পড়েছেন ট্যানারি শিল্পের মালিকরাও। রাজধানীর হাজারিবাগ এলাকা থেকে উচ্ছেদ করে সাভারের ট্যানারি নগরীতে স্থানান্তর করা হলেও প্লট না পাওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে ৬০টি কারখানা। সেই সাথে আরো ৫৪টি কারখানা বন্ধ হয়েছে গ্যাস সংযোগ না পাওয়ার কারণে। উল্লেখ্য, সাভারে মোট ১৫৪টি কারখানাকে প্লট বরাদ্দ করা হয়েছিল। কিন্তু গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ না পাওয়াসহ কিছু কারণে একদিকে অনেক কারখানায় উৎপাদন শুরু করা যায়নি, অন্যদিকে ছোট-বড় আরো দেড় হাজার কারখানা প্লটই পায়নি। তা সত্ত্বেও প্রতিটি কারখানার মালিককেই ঋণের বিপরীতে সুদের বোঝা টানতে হচ্ছে। একই অবস্থা চলছে দেশের অন্য সকল শিল্পাঞ্চলেও। দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টে সিলেট ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকার আরো অন্তত দু’ হাজার শিল্প-কারখানার কথা বলা হয়েছে, যেগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। রিপোর্টে জানানো হয়েছে, তৈরি পোশাক ও ট্যানারি শিল্পে এরই মধ্যে ২০ হাজারের বেশি শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে সত্যিই যদি দু’ হাজার শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যায় তাহলে দেশে অন্তত লাখ দেড়েক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বে। এ ধরনের আরো কিছু তথ্য-পরিসংখ্যান রয়েছে দৈনিক সংগ্রামের আলোচ্য রিপোর্টে, যেগুলোর কোনোটিই সরকারের কথিত সমৃদ্ধির দাবিকে সমর্থন করে না।
বলার অপেক্ষা রাখে না, মাত্র এক বছরের মধ্যে ২৮৪টি শিল্প-কারখানা বন্ধ হওয়ার এবং আরো অনেক শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর্যায়ে এসে যাওয়ার খবর সকল বিচারেই অত্যন্ত আশংকাজনক। এমন অবস্থার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সংশ্লিষ্টজনেরা প্রধান যে কারণগুলোর উল্লেখ করেছেন, সে সবের মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে এসেছে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ না পাওয়া। এজন্য অনেক শিল্প মালিককে এমনকি পাঁচ বছর ধরেও অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কোনো কোনো কারখানায় বিকল্প হিসেবে ডিজেল ও এলএনজির মতো জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। এসব জ্বালনির দাম অনেক বেশি হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় যেমন বাড়ছে তেমনি কমে যাচ্ছে বিক্রি ও লাভের পরিমাণও। সুতরাং সত্যিই শিল্পের উৎপাদন বাড়াতে হলে সরকারকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু তা-ই নয়, গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ করতে হবে নিরবচ্ছিন্নভাবে, যাতে উৎপাদন কাজ বাধাগ্রস্ত না হয়। শিল্প-কারখানা স্থাপন করার মতো প্লট বা জমির ব্যবস্থা তো করতেই হবে, সরকারকে একই সঙ্গে পর্যাপ্ত পরিমাণে ব্যাংক ঋণের সুবিধা দেয়ারও আয়োজন করতে হবে। ঋণের অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো যাতে বাস্তব অবস্থাকে বিবেচনায় নেয় সেদিকেও নজর দেয়া দরকার। একথা বুঝতে হবে যে, উৎপাদন ও বিক্রি করা সম্ভব না হলে ঋণের অর্থ পরিশোধ করাও সহজে সম্ভব হবে না। এভাবে সব মিলিয়েই এমন আয়োজন করা জরুরি হয়ে পড়েছে, যাতে কোনো শিল্প-কারখানাই বন্ধ না হয়ে যায় বরং যথেষ্ট পরিমাণে উৎপাদন এবং রফতানি ও বিক্রির মাধ্যমে প্রতিটি শিল্প-কারখানাকে লাভজনক পর্যায়ে উন্নীত করা সম্ভব হয়। বলা বাহুল্য, ধারাবাহিকভাবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন ও নিশ্চিত করতে চাইলে এমন ব্যবস্থার কোনো বিকল্প থাকতে পারে না। এ জন্য দরকার, সুচিন্তিত এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ