ঢাকা, শুক্রবার 12 January 2018, ২৯ পৌষ ১৪২৪, ২৪ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

শীতের বিপদে সাধারণ মানুষ

বাংলাদেশে আবহাওয়ার বিচিত্র আচরণ নিয়ে মাঝেমধ্যেই কথা বলা হয়। চৈত্রে গরম না পড়ায় স্বস্তি বোধ যারা করেন তারাই আবার আষাঢ়-শ্রাবণে যথেষ্ট বৃষ্টি না হলে বিরক্তি প্রকাশ করেন। একই বিরক্তজনদের মুখের হাসি হাওয়ায় মিলিয়ে যায়, যখন তাদের রাজপথে জমে যাওয়া হাঁটু পানিতে কষ্ট ও ভোগান্তির শিকার হতে হয়। এভাবেই চলে আসছে বেশ কয়েক বছর ধরে। বিস্ময়কর আচরণ করছে আবহাওয়া। বন্যার পর শীতের আগমন নিয়েও কথা যথেষ্টই হয়েছে। ১৯৭০-এর দশক পর্যন্তও একটা সময় ছিল, যখন পৌষ আসতে না আসতেই প্রবল শীতের কারণে মানুষের স্বাভাবিক জীবন অচল হয়ে পড়তো। মাঘ এলে তো কথাই ছিল না। মাঘের শীতে তখন আসলেও কম্বল কাঁপতো। 

কিন্তু বিগত বছরগুলোতে আবহাওয়ার আচরণে অকল্পনীয় পরিবর্তন ঘটেছে। চলতি বছরের শীতের কথাই ধরা যাক। এবার শীত পড়েছে পৌষেরও অর্ধেক পেরিয়ে যাওয়ার পর। শীতের তীব্রতাও মানুষকে প্রচন্ড কষ্টে ফেলেছে। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় সর্বকালের রেকর্ড ভেঙে তাপমাত্রা নেমে গেছে দুই দশমিক ছয় ডিগ্রি সেলসিয়াসে। কুড়িগ্রাম ও চুয়াডাঙ্গাসহ আরো কিছু এলাকায় প্রচন্ড শীতে জনজীবন প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে ছিল তীব্র শৈত্য প্রবাহ। কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়েছে দেশের অধিকাংশ অঞ্চল। বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ওপর দিয়ে এখনো মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে চলেছে। আবহাওয়া দফতর জানিয়ে রেখেছে, জানুয়ারি মাস জুড়েই দফায় দফায় শৈত্যপ্রবাহ চলবে। এর অর্থ, পৌষ পেরিয়ে মাঘ মাসেরও বেশিরভাগ সময় দেশে তীব্র শীত থাকবে। 

প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে স্বাভাবিক হলেও এবারের শীতে সাধারণ মানুষের জীবনে এরই মধ্যে নানামুখী অসুখ ও বিপদ চেপে বসেছে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। প্রকাশিত খবরে জানা যাচ্ছে, সর্দি-কাশি তো হচ্ছেই, একই সঙ্গে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া ও হাঁপানির মতো রোগ-বালাইও ছড়িয়ে পড়েছে, যেগুলো সাধারণত শীতের সঙ্গে এসে থাকে। প্রচন্ড শ্বাসকষ্টেও ভুগছে অনেকে। পাশাপাশি রয়েছে শীতবস্ত্রের অভাব। খুব কমসংখ্যক মানুষের পক্ষেই সোয়েটার, জ্যাকেট, মাফলার ও শাল বা চাদর জাতীয় শীতবস্ত্র কেনা বা যোগাড় করা সম্ভব হয়েছে। তারা লেপ-কম্বলও কিনতে বা যোগাড় করতে সক্ষম হয়নি। ফলে অসম্ভব কষ্টে দিন ও রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছে তারা। রাজধানীর মতো বড় বড় শহরে-নগরে যারা দালান বা পাকা ভবনে বসবাস করেন, যাদের যখন-তখন যে কোনো ধরনের শীতবস্ত্র এবং লেপ-কম্বল কেনার সামর্থ্য রয়েছে, তাদের পক্ষে বিশেষ করে গ্রামের মানুষের কষ্টের কথা সহজে কল্পনা করতে পারার কথা নয়। 

শুধু গ্রামের কথাই বা বলা কেন? বিভিন্ন শহরে যে মেহনতী শ্রমিক ও গরীব মানুষের বসবাস, তারাও রয়েছে প্রচন্ড কষ্টের মধ্যে। প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্র তো নেই-ই, সেই সাথে তারাই আবার বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শীতজনিত অসুখ-বিসুখে। গণমাধ্যমের খবরে জানা যাচ্ছে, প্রথমত তাদের খুব কমসংখ্যকই সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছে। বেশির ভাগ হাসপাতালে সিট পাওয়া দূরে থাকুক, মেঝেতেও জায়গা মিলছে না এমনকি গুরুতর অসুস্থ শিশু ও বৃদ্ধদের। এর পর রয়েছে ওষুধ পাওয়ার পালা। খুব কম সরকারি হাসপাতালেই বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে। ওষুধ কিনতে হচ্ছে বাইরের দোকান থেকেÑ যাদের সঙ্গে হাসপাতালের ডাক্তার ও নার্সসহ কর্মচারীদের বিশেষ লেনদেনের সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। অর্থাৎ প্রচন্ড শীতের মধ্যেও চিকিৎসা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে গরীব তথা সাধারণ মানুষেরা। এমন অবস্থা চলছে সারা দেশেই। 

আমরা মনে করি, শীতের কারণে সৃষ্ট চরম বিপদের মধ্যেও সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে এতটা ন্যক্কারজনকভাবে ছিনিমিনি খেলার কর্মকান্ড কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সরকারের উচিত বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালগুলোর অনিয়ম ও বেআইনি কার্যকলাপের ব্যাপারে দ্রুত তৎপর হয়ে ওঠা। শিশু ও বৃদ্ধ নির্বিশেষে অসুস্থ সকল মানুষই যাতে যাওয়া মাত্র ভর্তি হওয়ার ও চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ পায় তার আয়োজন নিশ্চিত করতে হবে। সরকারকে একই সঙ্গে যথেষ্ট পরিমাণ ওষুধও সরবরাহ করতে হবে, যাতে বিপন্ন কোনো মানুষকেই বেশি দাম দিয়ে বাইরের দোকান থেকে ওষুধ কিনতে না হয়। ওষুধ ও চিকিৎসা নিয়ে যারা দুর্নীতি করছে তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। 

শীতবস্ত্র বিতরণের ব্যাপারেও সরকারের উচিত দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া। সরকার চাইলে সমাজের বিত্তবান মানুষদের কাছ থেকে সোয়েটার, জ্যাকেট, কম্বল, মাফলার এবং শাল বা চাদর ও কম্বল জাতীয় শীতবস্ত্র সংগ্রহ করা সহজেই সম্ভব হতে পারে। এজন্য দরকার আসলে আন্তরিকতার সঙ্গে উদ্যোগ নেয়া। সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিও এবং সামাজিক সংগঠনের প্রতিও আমরা শীতে কষ্ট পাওয়া মানুষদের সাহায্যে এগিয়ে আসার জন্য উদাত্ত আহবান জানাই। আমরা মনে করি, মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গা মুসলিমদের সাহায্যে যেভাবে ভ’মিকা রাখা হয়েছে ও হচ্ছে শীতে আক্রান্ত মানুষদের জন্যও একইভাবে ভূমিকা পালন করা সম্ভব। সেটাই আমাদের জাতীয় দায়িত্বও বটে।     

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ