ঢাকা, শুক্রবার 12 January 2018, ২৯ পৌষ ১৪২৪, ২৪ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সমাজে উৎসাহদাতার অভাব

আজহার মাহমুদ : এগিয়ে যাওয়ার অপর নাম উৎসাহ। কিন্তু বর্তমান মানুষের মধ্যে যে বিষয়টির অভাব সবচেয়ে বেশি সেটা হলো উৎসাহ দেয়া। দেশ এবং সমাজের মানুষ এগিয়ে যাওয়ার জন্য উৎসাহ এবং প্রেরণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অতীব জরুরি। আমাদের বর্তমান সমাজে এমনও কিছু ব্যক্তি রয়েছে, যাদের ভেতর উৎসাহ দেয়ার প্রবণতা না থাকলেও এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা দেয়ার প্রবণতা আছে। তারা সমাজের যেকোনো ব্যক্তির উন্নয়ন দেখলে তাদের সমালোচনা করতে আগ্রহী হয়ে উঠে। তাদের কাজ হয়ে দাঁড়ায় কোথায়, কার, কি ভুল হয়েছে সেটা নিয়ে বিশ্লেষণ করা। কিন্তু সেই ভুলের সমাধান কেউ দেয় না। মানুষকে ভালো কাজে এগিয়ে যাওয়ার পথে উৎসাহ দিতে না পারলেও মন্দ কাজে উৎসাহ দেয়ার মতো কিছু বিষাক্ত মানুষ আমাদের সমাজে বসবাস করে এখনো। তবে কোনো এক কবি বলেছেন, “পাছে লোক কিছু বলে” অন্যের কথায় কান না দিয়ে নিজের লক্ষ্যকে বাস্তবায়ন করতে হবে। আমাদের নিজেদের স্থানে নিজেদের পৌঁছাতে হবে। কে কী বলেছে সেটা শুনে সময় নষ্ট করার প্রয়োজন নেই। অনেক সময় সামান্য উৎসাহের অভাবে ঝরে যায় অনেক দেশের সম্পদ। যারা হয়তো একদিন দেশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকত। কিন্তু সেই উৎসাহ দেয়ার মতো মানুষ আমাদের সমাজে খুবই কম। উৎসাহটা সবসময় বড়দের দিতে হয়। আজকের প্রজন্ম উৎসাহ পাবে বিগত প্রজন্ম থেকে। আজকের প্রজন্ম থেকে উৎসাহ পাবে আগামী প্রজন্ম। একজন বন্ধু অন্য বন্ধুকে উৎসাহ দিতে পারে। মা-বাবার পরে বড় ভাই তার ছোট ভাইকে উৎসাহ দিতে পারে। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিতে পারে। সমাজের মুরুব্বীরা সমাজের যুবকদের এগিয়ে যেতে উৎসাহ দিতে পারে। এই উৎসাহ দিতে কারো কোনো প্রকারের কষ্ট কিংবা ক্ষতি হবে বলে মনে হয় না। তবুও কেন আমরা এত কার্পণ্য বোধ করি উৎসাহ দিতে? এটাতো শুধু উৎসাহ নয়, এটা একটা প্রেরণা। এই প্রেরণার মাধ্যমে একটি ছেলে অথবা মেয়ের মনোবল আরো দৃঢ় হয়। আর এই দৃঢ় মনোবল নিয়ে হয়তো একদিন দেশের নাম উজ্জ¦ল করবে তারা। কিন্তু সমাজের মানুষের ভেতর এমন চিন্তাধারা দেখা যায় না। আমরা যদি উৎসাহ দিতে না পারি তবে সমালোচনা করবোই বা কেন। সমালোচনা করা তাদের সাঝে, যাদের উৎসাহ দেয়ার ক্ষমতা আছে। কারো মনোবল ভেঙ্গে দেয়ার জন্য সমালোচনা করা তো কারো অধিকার না। সমাজে এমনও কিছু ব্যক্তি রয়েছে যারা অন্য মানুষের উন্নতি সহ্য করতে পারে না। তাদের ভেতর যতœ করে পুষে রাখে হিংসা আর অহংকার। তারা চায় না তাদের চেয়ে উচ্চস্থানে কারো স্থান হোক। তারা সবসময় ভালো কিছুতে বাধা দিবে। তাদের নীতি হচ্ছে সমাজের কেউ উচ্চস্থানে যেতে পারবে না। কারো এগিয়ে যাওয়া দেখলে তাদের ভেতর যতœ করে রাখা রক্ষিত হিংসা তখন বেরিয়ে আসে। আমাদের মানবজাতির মধ্যে কিছু কিছু নিকৃষ্ট মানুষও রয়েছে যা আমাদের কাছে অজানার কিছু নয়। তবে সেই নিকৃষ্ট জাতির সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। সমাজের চোখে থেকে হয়তো তারা খুব সহজেই ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নিয়তি তাদের কখনো ছাড়বে না। আজ আপনি একজনকে এগিয়ে যেতে বাধা দিচ্ছেন, একদিন আপনি সেই বাধাতে নিজেই আটকে যাবেন। আমরা যদি যার যার বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নিজের প্রশ্ন নিজেই করি, তবে আজ হয়তো আমাদের ভেতর থেকে হিংসা আর অহংকারের আধিপত্য কিছুটা কমে যেতো। আমাদের বিচার আমাদের করতে হবে। নিজে যদি সৎ হয়ে থাকেন তবে নিজের বিচারক নিজের চাইতে বড় কেউ হতে পারে না। এ ধরনের অপরাধ শুধরানোর দায়িত্বও নিজের। কিন্তু আমাদের ভেতর এখনো সেই বোধটুকু কাজ করে না।আমরা মানুষের মনোবল ভেঙ্গে দিতে কার্পণ্যতা করি না। আবার উৎসাহ দেয়ার বেলায় ঠিক সেই কার্পন্যবোধ সজাগ হয়ে উঠে। আমরা হবে না, পারবে না এগুলো বলতে বেশি আগ্রহী। হবে কিংবা পারেব বলতে আমরা যেনো বোবা হয়ে যাই। কিন্তু মনোবল দেয়ার জন্য হলেও বলি না পারবে। আমরা না বলতে খুব বেশি পছন্দ করি, কিন্তু হ্যাঁ বলাটা যেনো আমাদের জন্য কষ্টের বিষয়। আমাদের ভেতর আধুনিকতা এখনো আসেনি। আমাদের কাজেকর্মে হয়তো আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে, কিন্তু আমাদের মনের ভেতরে এখনো নেংরা মনোভাব লালন করে রেখেছি। আগে নিজেদের মন মানুষিকতা পরিবর্তন করতে হবে, তবেই আমরা আমাদের দেশ এবং সমাজকে আধুনিকভাবে পাবো। আমরা উৎসাহ, উদ্দীপনা, প্রেরণামূলক কথা এখন খুব কমই শুনি। আমাদের লেখালেখিতেও এখন উৎসাহ, উদ্দীপনা, প্রেরণামূলক কিছু থাকে না। আমরা শুধু ভুলটা তুলে ধরি, কিন্তু কেউ সেই ভুলের সমাধান কি হবে সেটা তুলে ধরি না। এটাই কি আমাদের শিক্ষা? একজন মানুষ হয়ে অন্য মানুষের মনোবল ভেঙ্গে দেয়াটা কখনোই মনুষ্যত্বের মধ্যে পড়ে না। তাই আমাদের উচিৎ উৎসাহ আর প্রেরণা দেয়ার প্রবণতা বাড়ানোর। আর নিতান্ত্যই যদি উৎসাহ দিতে না পারি তবে মনবোল যেনো ভেঙে না দিই সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ আপনার জন্য যদি কোনো এক ব্যক্তির লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়, তার সেই ক্ষতি পূরণ দেয়ার সাধ্য আপনার নেই। উৎসাহ হয়তো আপনার স্থানে কেউ না কেউ দিবে, কিন্তু একবার মনোবল ভেঙে দিলে তার লক্ষ্যটাই হয়তো নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই বলা যায় উৎসাহ দেয়াটা যতটুকু ভালো তার চাইতে ভালো মনোবল ভেঙে না দেয়া।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ