ঢাকা, শনিবার 13 January 2018, ৩০ পৌষ ১৪২৪, ২৫ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অনশনের চতুর্থ দিনে অসুস্থ শতাধিক মাদরাসা শিক্ষক

জাতীয়করণের দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসা শিক্ষকদের আমরণ অনশন চলছে। গতকাল শুক্রবার তোলা ছবি -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : সকল রেজিস্টার্ড স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা জাতীয়করণের দাবিতে চতুর্থ দিনের মতো আমরণ অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষকরা। গতকাল সন্ধ্যায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত অসুস্থ হয়েছেন ১১০ জন মাদরাসা শিক্ষক। গুরুতর অসুস্থ ১০ জনের মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি  হয়েছেন সাতজন। তাদের ন্যায্য দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এ কর্মসূচি চলবে বলে জানিয়েছেন মাদরাসা শিক্ষকরা। কনকনে শীতে টানা আট দিন অবস্থান ধর্মঘটের পর গত মঙ্গলবার সকাল ১১টা থেকে আমরণ অনশন শুরু করেছেন শিক্ষকরা।
বাংলাদেশ স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা শিক্ষক সমিতির মহাসচিব কাজী মোখলেছুর রহমান বলেন, চতুর্থ দিনের মতো আমরা অনশন চালিয়ে যাচ্ছি। এখন পর্যন্ত ১০৬ জন শিক্ষক অসুস্থ হয়েছেন। তবে আমাদের এই ন্যায্য দাবি মেনে না নেয়া পর্যন্ত এই অনশন কর্মসূচি চলবে।
গতকাল বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে গিয়ে দেখা গেছে, রাজপথের কালো পিচের ওপর সারি সারি অসুস্থ শিক্ষক শুয়ে আছেন। তাদেরকে স্যালাইন দিয়ে রাখা হয়েছে। অবস্থার অবনতি হলে তাদের মেডিকেলে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ভোলা জেলার দৌলত খান উপজেলার চরপাতা ইউনিয়নের মধ্য চরপাতা স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষক মো. ইসমাইল স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি দৈনিক সংগ্রামকে জানান, যারা বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছেন তাদের মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। প্রতিদিনই অসুস্থ শিক্ষকের সংখ্যা বাড়ছে। মেডিকেলে যাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, সেখান থেকে কিছুটা সুস্থ হলে তারা আবার অনশনে এসে যোগ দিচ্ছেন। এভাবেই চলছে অনশন কর্মসূচি। 
তিনি আরো বলেন, এখন পর্যন্ত আমরা সরকারের কোনো পক্ষের কাছ থেকে কোনো ধরনের আশ্বাস পাইনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি কাউকে পাঠিয়ে আমাদের খোঁজ নিয়ে দেখেন আমরা কী কষ্টে আছি।
বাংলাদেশ স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা শিক্ষক সমিতির সভাপতি রুহুল আমিন বলেন, আমরা শিক্ষামন্ত্রীর কোনো কথায় আর আশ্বস্ত হতে পারছি না। আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে ঘোষণা শুনতে চাই। অন্যথায় আমরা অনশন চালিয়ে যাবো।
এদিকে পুরুষ শিক্ষকের পাশাপাশি মাদরাসার মহিলা শিক্ষকরাও অনশনে যোগ দিয়েছেন। তাদের সঙ্গে নিয়ে এসেছেন অবুঝ শিশুদেরও। কারণ কর্মসূচিতে যোগ দেওয়া হলে তার তাদের সন্তানকে দেখভাল করার কেউ নেই।
অনশনে যোগ দেওয়া গাইবান্ধার দুর্গাপুরের মাদরাসা শিক্ষিকা কোহিনূর আক্তার বলছিলেন তিনি কখনো চিন্তা করেননি তার মেয়ে রাস্তায় ঘুমাবে। আর ছোট্ট শিশু তৃষ্ণাও বুঝতে পারছে না কেন হিম শীতে সে রাস্তায় রাত কাটাচ্ছে। কেনই বা দিনে যানবাহনের বিরক্তিরক শব্দ, মানুষের কোলাহল আর ধুলাবালির সঙ্গে থাকতে হচ্ছে। তবুও তৃষ্ণার তৃপ্তি এক জায়গায়, সে তার মায়ের সঙ্গে আছে। এই আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী হিসেবে শুরু থেকেই আছেন কোহিনূর আক্তার। যখন আন্দোলনের জন্য ঢাকায় আসেন, তখন তিন বছরের মেয়ে তৃষ্ণাকে ফেলে আসতে পারেননি। হয়তো মাতৃত্ববোধ থেকেই মেয়েকে একা রাখতে চাননি।
কোহিনূর আক্তার বলছিলেন, গত ২৪ বছরে শিক্ষকতা করে পাওয়া বঞ্চনার কথা। ২৪ বছর ধরে দুর্গাপুর সতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসায় শিক্ষকতা করছি। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো দিন কোনো বেতন-ভাতা পাইনি। আমার এক ছেলে ইন্টারমিডিয়েটে পড়ে। স্বামীর উপার্জনে সবার খরচ চলে না। সরকারি বেতনের আওতায় আসব এই আশায় মাদরাসায় শিক্ষকতা শুরু করেছিলাম। কিন্তু এতো দিনেও সরকারের কাছ থেকে কোনো কিছু পাইনি। একপ্রকার মানবেতর জীবন যাপন করছি।
তিনি বলেন, দাবি আদায়ে আন্দোলন অনেক দিন ধরে করছি। এবার ঢাকায় আসার আগে কোলের শিশুকে রেখে আসতে পারিনি। তাকে রেখে আসতে মন সায় দেয়নি। মেয়েকে নিয়ে কষ্ট করে এখানে আছি। সরকারের কেউ কী আমাদের এই কষ্ট দেখেন না? উপলব্ধি করেন না?
কনকনে শীতে মানুষ যখন তাদের শিশুদের উষ্ণতায় রাখার চেষ্টা করেন, তখন তারা শিশুদের জন্য মাতৃকোলের উষ্ণতাই হয়ে ওঠে একমাত্র প্রয়াস। আর শূন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে হাহাকার, দীর্ঘ দিনের স্মৃতি আউড়ানো আর কবে সরকার তাদের স্বীকৃতি দেবে সেই ক্ষণের অপেক্ষা। চার বছরের ছেলে মাহিমকে নিয়ে ভোলা থেকে আসা শিক্ষিকা কামরুন নাহার আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। তিনি বলেন, অন্তত আমাদের সন্তানদের কথা বিবেচনা করে আমাদের স্বীকৃতি দিন। এতো দিন ধরে আমরা অভুক্ত থেকে আসছি। আমাদের দিকে একটু মুখ তুলে তাকান।
প্রসঙ্গত, ১৯৯৪ সালে জারি করা পরিপত্রে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণ করা হয় ৫০০ টাকা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি ৫ম শ্রেণির কার্যক্রম একই হলেও ২০১৩ সালের ৯ জানুয়ারি ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করে সরকার। এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রতি মাসে ২২ থেকে ৩০ হাজার টাকা বেতন হলেও ১ হাজার ৫১৯টি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষকরা সরকারের থেকে কোনো বেতন পান না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ