ঢাকা, রোববার 14 January 2018, ১ মাঘ ১৪২৪, ২৬ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দুর্বল অর্থনৈতিক অবস্থায় জাতীয় নির্বাচন হলে আরও বিপর্যয় দেখা দেবে

স্টাফ রিপোর্টার : ব্যাংক খাতের ভয়াবহ কেলেঙ্কারিসহ নানামুখী অর্থনৈতিক দুর্বলতা সঙ্গী করে জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগুচ্ছে সরকার। যা অর্থনীতিতে আরও বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। দেশের অর্থনীতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এমন পর্যবেক্ষণ দিয়েছে গবেষণা সংস্থা সিপিডি। তাদের মতে, গেলো কয়েক বছরে প্রবৃদ্ধি হলেও তার বিপরীতে বেড়েছে সম্পদের বৈষম্য। ফলে, সুফল পৌঁছায়নি গরিব মানুষের কাছে। এমন অবস্থায়, সামনের দিনগুলোতে আরো সংযতভাবে অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
গতকাল শনিবার দুপুরে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লক (সিপিডি) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ অর্থনীতি ২০১৭-১৮ অর্থবছর- প্রথম অন্তর্বর্তীকালীন পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক সাংবাদিক সম্মেলনে এসব মন্তব্য করেন বক্তারা।
সাংবাদিক সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান। সাংবাদিক সম্মেলনে সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, গবেষণা পরিচালক খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বক্তব্য রাখেন।
 দেশের বস্ত্রখাত এখন কয়েক বিলিয়ন ডলারের। যার মূল নিয়ামক হচ্ছে তুলা। কিন্তু চলতি বছরের প্রথম চার মাসে এই পণ্য আমদানির পেছনে খরচ হয়ে গেছে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি। যা বছর ব্যবধানে বেড়েছে ৭৫ শতাংশ। অথচ, এই সময়ে নতুন কারখানা তো দূরের কথা, পুরনো কারখানায়ও ব্যবহার বাড়েনি খুব বেশি।
 অর্থনীতির সাম্প্রতিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে এই তথ্যে একরকম হতবাক সিপিডি। তাই তাদের আশঙ্কা, নির্বাচনের আগে এসে আমদানির অজুহাতে ঘটতে পারে টাকা পাচারের ঘটনা। তাদের অভিযোগ তুলা আমদানিতে কোন শুল্ক নেই। তাই বিদেশ থেকে তুলা আমদানি করে টাকা পাচার হচ্ছে। প্রতি বছর আমদানি নামে দেশ থেকে ৮/৯ বিরিয়ন মার্কিন ডলার পাচার হচ্ছে।
কি কারণে তুলা আমদানি বেড়েছে তাই কেউ বলতে পারছে না। আদৌ তুলা আমদানি হয়েছে কি না এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যদি আমদানিই হয়ে থাকে তাহলে এত তুলা গেলো কোথায়। এসব প্রশ্নের কোন জবাব নেই। আসলে তুলা আমদানির নামে হয়েছে অর্থ পাচার। সরকার কোনভাবেই ক্যাপিটার ফ্লাইট ঠেকাতে পারছে না।
এর বাইরে, অর্থনীতির কথা বলতে গিয়ে বরাবরই সংস্থাটির দুশ্চিন্তার জায়গা ছিল ব্যাংক খাত। যা আরো খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছে নতুন বছরে। এছাড়া, গেলো কয়েক বছর ধরে বাড়তে থাকা প্রবৃদ্ধির সুফল গরিব মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে না পারাও ছিল বড় ব্যর্থতা। এমন বাস্তবতায়, নির্বাচনের আগে এমন সঙ্কট সমাধানের মতো রাজনৈতিক পুঁজি বিনিয়োগের সক্ষমতা নেই বর্তমান সরকারের- বলছে সংস্থাটি। তাই পরামর্শ দেয়া হচ্ছে, ভবিষ্যতের জন্য সংযত অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নের।
সিপিডির মতে, রোহিঙ্গাদের কারণে কেবল বনাঞ্চল উজাড় হওয়ায় এরই মধ্যে ক্ষতি হয়ে গেছে প্রায় সাড়ে সাত’শ কোটি টাকা। আর সে দেশ থেকে আসা মানুষ জনকে ফেরত পাঠাতে গেলেও আরো খরচ বাড়বে কয়েক বিলিয়ন ডলার।
 দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ২০১৭ সাল ছিল দেশের অর্থনীতির জন্য দুর্বল বছর। দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অবস্থা আগের তুলনায় এখন আরো বেশি নাজুক। সরকার যদি এখনো কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেয় তাহলে তার প্রভাব থাকবে ২০১৮ সালেও। সঙ্গে নতুন ব্যাংকের অনুমোদন আরো ঝুঁকি সৃষ্টি করবে।
ব্যাংক খাত সম্পর্কে তিনি বলেন, ব্যাংকের সামগ্রিক সূচক আরো খারাপ হয়েছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে, শুধু তাই নয়, ঋণের টাকা কয়েক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি আশঙ্কার জায়গা প্রশাসনিকভাবে বেশ কিছু ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তন হয়েছে।
 তিনি বলেন, এ বছরই ব্যাংকিং কেলেঙ্কারির বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই খাতে সংস্কার হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। চলতি বছরেও কোনো সুরাহা হবে বলে মনে হচ্ছে না।  এমন ম্যাজিক্যাল কিছু ঘটবে না যাতে বড় ধরনের সংস্কার হবে। সংস্কার করার মতো রাজনৈতিক পুঁজিও নাই।
অভিযোগ করে তিনি বলেন, ঋণের ওপর কয়েকটি ব্যাংকে ব্যক্তির প্রাধান্য বিস্তার করছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পাওয়া ব্যক্তি খাতের নতুন ব্যাংক কার্যকর হতে পারেনি। এসব ব্যাংক থেকে বিদেশে টাকাও পাচার হচ্ছে। সরকার এ বিষয়ে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
 দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সংস্কারের পরিবর্তে উল্টো ব্যাংক কোম্পানি আইন  সংশোধন করে পরিবারের হাতে ব্যাংকগুলোকে জিম্মি করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নতুন ব্যাংকগুলোর বিশৃঙ্খলার মধ্যে রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন করে আরও ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এসব ব্যাংকের অনুমোদন এখাতে সৃষ্টি করবে ঝুঁকির।
 দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ২০১৭ সাল সামষ্টিক অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। অর্থপাচার, দারিদ্র্য ও সম্পদের বৈষম্য বেড়েছে। ২০১৮ সাল যেহেতু নির্বাচনী বছর, এ বছর সামষ্টিক অর্থনীতি আরো দুর্বল হয়ে পড়বে। এ থেকে বেরিয়ে আসতে ২০১৮ সালে অর্থনীতিকে রক্ষণ ব্যবস্থাপনার দিকে নিতে হবে।
 তিনি ঝুঁকি মোকাবিলায় অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় ‘রক্ষণশীল’ নীতি নেয়ার জন্য সরকারকে পরামর্শ দেন। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, একটা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০১৭ সাল শুরু হয়েছিল, সেটা ছিল বিনিয়োগ বাড়ানো। কিন্তু বছর শেষে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি। ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ বাড়েনি।
তিনি বলেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি হলেও সেই তুলনায় দারিদ্র্য কমেনি। সেই অনুযায়ী কর্মসংস্থানও হয়নি। আবার এই সময়ে সম্পদের বৈষম্যও বেড়েছে। ফলে ২০১৭ সালে সার্বিকভাবে সামষ্টিক অর্থনীতি দুর্বল হয়েছে।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমদানির আড়ালে অর্থ পাচার হচ্ছে। বিশেষ করে পোশাক শিল্পের কাঁচামাল হিসাবে তুলা আমদানি ৭৫ শতাংশ বেড়েছে। যদিও উৎপাদনে তার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিদেশী বিভিন্ন  সংস্থার হিসেবে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ৮ থেকে ৯ বিলিয়ন ডলার পাচার হচ্ছে। এর মধ্যে ৮০ ভাগই আমদানি-রপ্তানি মূল্য কারসাজির মাধ্যমে। বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক  ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের  (এনবিআর) খতিয়ে দেখা উচিত।
তিনি বলেন, আমাদের দেশে তুলা আমদানিতে কোন শুল্ক নেই। এ খাতে নতুন বিনিয়োগ এমনকি পুরাতন মিলেও তুলার ব্যবহার বাড়েনি। তাহলে এত বড় ভুতরে আমদানি হলো কি কারণে। এসব আমদানি ফাকে ক্যাপিটাল ফ্লাইট হচ্ছে। সরকার কোনভাবেই এসব পাচার ঠেকাতে পারছে না। এসব টাকা আগামী নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে।
তিনি আরও বলেন, এসব পাচার ঠেকাতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং এনবিআরকে আরও সক্রিয় হতে হবে। তা না হলে এ নির্বাচনী বছরে আরও পাচার বেড়ে যাবে। দেশে অর্থনীতি বাড়লেও বিনিয়োগ বাড়ছে না। একই সাথে বেকারত্বও বাড়ছে। এতে করে দেশে ধনী-দরিদ্রে বৈষম্য বাড়ছেই।
মূল প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, আমদানি ব্যয় অনেক বেড়েছে রপ্তানি আয় সেই হারে বাড়েনি। ফলে ব্যালান্স অব পেমেন্টে ঘাটতি হচ্ছে। টাকার মান কমেছে। সার্বিকভাবে সুদ হার কমলেও দেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এই সুবিধা পাননি। সরকার প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ জনগণের করের টাকা থেকে সরকারি ব্যাংকগুলোতে মূলধন যোগান দিচ্ছে। এখন বেসরকারি ব্যাংক থেকে বিদেশে অর্থ পাচার হচ্ছে।
মূল প্রবন্ধে রোহিঙ্গা সম্পর্কে বলা হয়, গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ৬ লাখ ৫৫ হাজার ৫০০ জন রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে এসেছে। এদের ফিরিয়ে নেয়ার আলোচনা চলছে। বর্তমান   প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, প্রতিদিন যদি ৩০০ জনকে ফেরত পাঠানো হয়, তাহলেও সময় লাগবে কমপক্ষে ৭ বছর এবং এতদিনে খরচ হবে কমপক্ষে ৪৪৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার। আর যদি প্রতিদিন ২০০ জন ফেরত পাঠানো হয়, তাহলে সময় লাগবে কমপক্ষে ১২ বছর এবং এতদিনে খরচ হবে কমপক্ষে ১ হাজার ৪৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ