ঢাকা, রোববার 14 January 2018, ১ মাঘ ১৪২৪, ২৬ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সরকারকে দ্রুত সংলাপের উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান

স্টাফ রিপোর্টার : ‘নির্বাচনকালীন সরকার গঠনে’ রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপের উদ্যোগ নিতে আবারো প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বিএনপি। সরকারের চারবছর পূর্তি উপলক্ষে শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সংবিধানে নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো বিধান নাই। বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী যদি সংসদ বহাল রেখে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে সেই নির্বাচন কখনো সুষ্ঠু হবে না। কারণ সংসদ বহাল থাকা অবস্থায় নির্বাচনকালীন সরকারও হবে বিদ্যমান সরকারেরই অনুরূপ। আমরা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, আত্মম্ভরিতা বাদ দিয়ে বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে জনগণের শান্তি ও স্বস্তির জন্য সকল বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনকালীন সময়ে একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায় গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ গ্রহণ করুন। বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার এটাই একমাত্র পথ। আসুন আমরা সবাই দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেই।
গতকাল শনিবার বিকেলে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপার্সনের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সাংবাদিক সম্মেলনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, প্রধানমন্ত্রী যদি আন্তরিকভাবে নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে নতুন কিছু ভেবে থাকেন তাহলে তার উচিত হবে এ নিয়ে সকল স্টেক-হোল্ডারদের সঙ্গে সংলাপের উদ্যোগ নেয়া। বিএনপি মনে করে একটি আন্তরিক ও হৃদ্যতাপূর্ণ সংলাপের মাধ্যমে ২০১৮ সালের নির্বাচন সম্পর্কে অর্থবহ সমাধানে আসা সম্ভব। দীর্ঘকাল যাবত সকল বিরোধী দল ও সুশীল সমাজ সকল দলের অংশ গ্রহণের জন্য আলাপ আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পদ্ধতি নির্ধারণের দাবি জানাচ্ছে। নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা কেমন হতে পারে তা নিয়ে বিএনপির একটি রূপরেখা ‘যথাসময়ে’ উপস্থাপন করা হবে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ জাতিকে হতাশ, বিস্ময়-বিমূঢ় এবং উদ্বিগ্ন করে তুলেছে মন্তব্য করে লিখিত বক্তব্যে মির্জা ফখরুল বলেন, এই ভাষণে বিদ্যমান জাতীয় সঙ্কট নিরসনে স্পষ্ট কোন রূপরেখা নেই। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে তিনি যা বলেছেন তা খুবই অস্পষ্ট, ধোঁয়াশাপূর্ণ, এবং বিভ্রান্তিকর । জাতি আশা করেছিল তার প্রধানমন্ত্রিত্বের এই মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার এক বছর আগেই তিনি যে ভাষণ দেবেন সে ভাষণে থাকবে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা, জাতীয় সংকট নিরসনে একটি স্পষ্ট রূপরেখা এবং জনগণের উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তা দূর করার জন্য থাকবে বিভ্রান্তির বেড়াজালমুক্ত কর্ম পদক্ষেপ।
তিনি বলেন, পাকিস্তানের স্বৈর সামরিক শাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান তার শাসনের দশ বছর পূর্তি উপলক্ষে জাঁকজমকপূর্ণভাবে উন্নয়ন দশক (উবপধফব ড়ভ উবাবষড়ঢ়সবহঃ) পালন করেছিলেন। গণতন্ত্রহীন তথাকথিত উন্নয়ন জনগণ গ্রহণ করেনি। পরিণতিতে তার মত ‘লৌহমানব’কে ক্ষমতা থেকে সমস্ত পাকিস্তানব্যাপী গণঅভ্য্ত্থুানের মুখে বিদায় নিতে হয়েছিল। বর্তমান সরকারও ‘উন্নয়নমেলা ’ করছে। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস পাকিস্তানী আমলের স্বৈরশাসক ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার জন্য যে ধরনের চমকের আশ্রয় নিয়েছিলেন, বাংলাদেশের বর্তমান সরকারও সেই একই পথে হাঁটছে। এ দেশের সচেতন জনগণ সবকিছু জানে ও বোঝে। সুতরাং এ ব্যাপারে আমাদের কোন মন্তব্য বাহুল্যই হবে মাত্র।
প্রধানমন্ত্রী তার শাসনামলে উন্নয়নের এক চোখ ধাঁধানো বয়ান পেশ করেছেন। বিশেষ করে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে তাদের দাবির সংগে বিশ্বব্যাংকের মত প্রতিষ্ঠানও একমত হতে পারেনি। জানুয়ারি / ২০১৭ এর বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত গ্লোবাল ইকোনমিক প্রস্পেক্টাস থেকে জানা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৩ শতাংশের বেশি  হবে না। অথচ অর্থমন্ত্রী দাবি করেছিলেন এই প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের নিচে হবে না। অন্যদিকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জন্য সরকারের জিডিপি লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭.২ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৬.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে বলে বিশ্বব্যাংক মনে করে। অথচ সরকার এ অর্থবছরে ৭.৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করেছে। এ ভাবে প্রায় প্রতি বছরই প্রবৃদ্ধি সংক্রান্ত সরকারী প্রাক্কলনের সংগে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থাগুলো দ্বিমত পোষণ  করে আসছে। আমাদের প্রশ্ন হলো, জনগণ কোন তথ্য বিশ্বাস করবে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন প্রবৃদ্ধির হারের সংগে অন্যান্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকের একটি সহসম্পর্ক থাকার কথা। কিন্তু আমদানি রপ্তানি, বৈদেশিক র‌্যামিট্যান্স, ঋণ প্রবাহ প্রভৃতির সংগে সরকারের প্রবৃদ্ধি সংক্রান্ত প্রাক্কলনের সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায় না। পরিসংখ্যানের তেলেসমাতি করে সরকার বরাবরই জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে। প্রধানমন্ত্রীও তাই করলেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি শ্লথ হয়ে গিয়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের উপাত্ত অনুযায়ী ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সময়ে দেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বার্ষিক হার ৩.১ শতাংশ হলেও ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সময়ে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বার্ষিক হার ১.৮ শতাংশে নেমে আসে। যা অর্থনীতিতে সুযোগের সমতা নিশ্চিত করণ ও সুবিধাবঞ্চিতদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে প্রবৃদ্ধির ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির হার ও নিম্ন আয়ের মানুষদের দৈনন্দিন জীবিকা নির্বাহের উপর এর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।  যে ২০১৭ সালের মে মাস থেকে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতির হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। গড় সাধারণ মূল্যস্ফীতি অক্টোবর মাসে সর্বোচ্চ ৫.৫৯ শতাংশ হয়। এদিকে খাদ্য মূল্যস্ফীতিও বৃদ্ধি পেয়ে অক্টোবর মাসে সর্বোচ্চ ৬.৮৯ শতাংশে উন্নীত হয় যদিও খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি সেপ্টেম্বর মাসের ৩.৮১ শতাংশ থেকে কিছুটা হ্রাস পেয়ে ৩.৬৫ শতাংশ হয়। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি খাদ্যদ্রব্যের উৎপাদন হ্রাস, প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়ার প্রবণতা ও কর্মসংস্থানের অভাব একদিকে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার মানের উপর প্রতিকূল প্রভাব সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে দেশের সার্বিক খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির সম্মুখীন করছে। ইতিমধ্যে দেশে ২০১০ সালের ২৩১৮ কিলোক্যালরি থেকে ২০১৬ সালে গড় মাথাপিছু দৈনিক ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ পাঁচ শতাংশ কমে ২২১০ কিলোক্যালরিতে নেমে আসে।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আয়-বৈষম্য প্রকট হয়ে উঠেছে দাবি কওে বিএনপি মহাসচিব বলেন,প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি আয়-বৈষম্য হ্রাস না পেলে সাধারণ জনগণ উন্ন্য়নের সুফল পায় না, দারিদ্র হ্রাস পায় না, বেকারত্ব পরিস্থিতির উন্নতি হয় না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পাঁচ বছর অন্তর অন্তর খানা আয় ব্যয় জরিপ চালায়। এই জরিপ থেকে মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে অনুপুঙ্খ(ফবঃধরষবফ) বিবরণ পাওয়া যায়। ২০০৫, ২০১০ এবং ২০১৬ সালে গৃহস্থালির প্রকৃত আয় ভোগমূল্য সূচকের নিরিখে দাঁড়িয়েছিল যথাক্রমে ৭ হাজার ২০৩ টাকা, ৮হাজার ১৩০ টাকা এবং ৭হাজর ২৫২ টাকা। একইভাবে প্রকৃত ভোগের পরিমাণ গৃহস্থালি প্রতি ছিল যথাক্রমে ৫ হাজার ৯৬৪ টাকা, ৭ হাজার ৯৯২ টাকা এবং ৭ হাজার ১৪ টাকা। স্পষ্টতঃ বোঝা যাচ্ছে ২০১০ এর তুলনায় ২০১৬ তে জনগণের জীবন মান নি¤œমুখী হয়েছে। ২০০৫ সালে ক্যালরি অর্থাৎ পুষ্টি গ্রহণের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২৩৯, ২০১০ এ ২ হাজার ৩১৮ এবং ২০১৬ তে ২ হাজার ২১০। ক্যালরি গ্রহণের দিক থেকেও ২০১০ এর তুলনায় ২০১৬ তে ক্যালরি গ্রহণ নি¤œমুখী হয়েছে। ২০১০ এর তুলনায় গৃহস্থালীর প্রকৃত আয় ২০১৬ তে ১১ শতাংশ কমে গেছে। ২০১০ এর তুলনায় ব্যক্তি প্রতি মাথাপিছু প্রকৃত আয় ২০১৬ তে ২ শতাংশ কমেছে এবং প্রকৃত ভোগব্যয় কমেছে ১ শতাংশ। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের জীবন মানের অবনতি ঘটেছে।
আয় বৈষম্য বোঝার জন্য অর্থনীতিবিদরা ‘গিনি সূচক’ ব্যবহার করেন। ২০১০ সালে সবচাইতে দরিদ্র এক পঞ্চমাংশ (১/৫) গৃহস্থালী মোট আয়ের ২.৭৮ শতাংশ পেয়েছিল। কিন্তু ২০১৬ সালে গরিবের হিস্যা হ্রাস পেয়ে ১.২৪ শতাংশে দাঁড়ায়। অন্যদিকে আয়ের সর্বোচ্চ স্তরে ৫ শতাংশ গৃহস্থালীর ২০১০ এ আয়ের হিস্যা ছিল ২৪.৬ শতাংশ। ২০১৬ তে ধনীদের হিস্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ২৭. ৯ শতাংশে। এই সময়ে গরীব ও ধনীর মধ্যে আয়ের বৈষম্য অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ ২০০৫ এ গিনি সূচক ছিল ০.৪৬৭ এবং ২০১০ এ ছিল ০.৪৫৮। অর্থাৎ ঐ সময়ে আয় বৈষম্য খানিকটা  হ্রাস পেয়েছিল। কিন্তু ২০১৬ তে গিনি সূচক ০.৪৮৩ দাঁড়িয়েছে। এর অর্থ হলো আয়-বন্টনে এই সময়ে বৈষম্য অনেক তীব্রতর হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা ‘গিনি সূচক’ ০.৫ হলে অত্যন্ত বিপদজনক মনে করেন। বাংলাদেশ ২০১০ থেকে ২০১৬ তে সেই বিপদজনক অবস্থার খুব কাছাকাছি চলে গেছে। প্রবৃদ্ধির সংগে বৈষম্য বৃদ্ধি কোনক্রমেই জনকল্যানের ইংগিত দেয় না। অর্থনীতির এই চেহারার জন্য দায়ী হলো শেয়ারবাজার কেলেংকারি, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে ভয়াবহ লুণ্ঠন, মূল্যস্ফীতি, মেগা-পকল্প কেন্দ্রিক ডাকাতি, কর্মসংস্থানে স্থবিরতা ও সর্বস্তরে লাগামহীন ও সর্বগ্রাসী দুর্নীতি।
মির্জা ফখরুল বলেন, বর্তমান সরকার মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে তাদের উন্নয়নের বয়ানকে দৃশ্যমান করার জন্য কোশেস করছে। মেগা-প্রকল্পগুলো নিয়ে গণমাধ্যম ইতোমধ্যে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করছে। এ সব প্রকল্পের ব্যয় ভারত, চীন ও ইউরোপের দেশগুলোর তুলনায় দুই থেকে তিন গুন বেশি। সঠিক সময়ে প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়িত না হওয়ায় একাধিকবার প্রকল্প-ব্যয় উধর্¦মুখী সংশোধন করতে হচ্ছে । ফলে এ সব প্রকল্প থেকে কাংখিত কল্যান সুদূরপরাহত হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশে ব্যাংকিং ব্যবস্থা একেবারেই ভেঙ্গে পড়েছে। একটি জাতীয় দৈনিকের হিসেব অনুযায়ী মার্চ ২০১৭ শেষে দেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ৭৩ হাজার ৪ শত ৯ কোটি টাকা, যা ব্যাংকের মোট ঋণের ১০.৫৩%। ২০১৬ মার্চে খেলাপি ঋণ ছিল ৫৯ হাজার ৪ শত ১১ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৪ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে আরও ৪৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করা হয়েছে। যার মাধ্যমে এসব মন্দ ঋণ আর্থিক প্রতিবেদন থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। এ তথ্য খেলাপির হিসাবে নিলে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। হিসাবটি আঁতকে ওঠার মতো। ২০১০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি টিম সোনালী ব্যাংক থেকে হলমার্ক গ্রুপ অবৈধভাবে প্রায় চার হাজার কোটি টাকার ঋণ নেয়ার জালিয়াতি শনাক্ত করে। এরপর একে একে বিসমিল্লাহ গ্রুপ, ডেসটিনি গ্রুপের ঋণ জালিয়াতি এবং বেসিক ব্যাংকসহ দেশের অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকে ঋণ জালিয়াতি ও জনগণের অর্থ লোপাটের লোমহর্ষক খবর দেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত হতে থাকে।
তিনি বলেন, ব্যাংকিং সেক্টরে দুর্যোগপূর্ণ অবস্থা কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকার বেইল আউট প্রোগ্রামের আশ্রয় নিয়েছে। বেইল আউট প্রোগ্রামের ফলে বাড়তি করের বোঝা সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো হচ্ছে। অন্যদিকে ব্যাংকিং সেক্টরের লুটপাট থেকে লাভবান হচ্ছে মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তি। এসব লুটপাটের সংগে দেশ থেকে অর্থ পাচারের যোগসূত্র রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। যা কখনও কোন দেশে ঘটেনি সে রকম ঘটনাই ঘটেছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রিজার্ভের ৮ শত ৮ কোটি টাকা সমমানের বৈদেশিক মুদ্রা লোপাট হয়ে গেছে। এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। কেন প্রকাশ করা যাচ্ছে না সে ব্যাপারেও সরকার গ্রহণযোগ্য কোন ব্যাখ্যা  দেয়নি। দেশের সর্বোচ্চ আর্থিক প্রতিষ্ঠান যদি এ ভাবে বিপর্যয়ের মুখে পড়ে তা হলে দেশের টেকসই উন্নয়নের ভবিষ্যত সম্পর্কে কোনক্রমেই আশাবাদী হওয়া যায় না। আর্থিক খাতে যখন এ রকম নৈরাজ্য চলছে, তখনই সরকার ব্যাংকগুলোতে পরিচালনা পর্ষদে ঊর্ধ্ব পদে একই পরিবারের ৪ জন সদস্যকে ঠাঁই করে দেয়ার যে সুযোগ করে দিয়েছে তার ফলে ব্যাংকিং খাত আরও নাজুক হয়ে পড়বে। সরকার খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পন্নতার দাবি করলেও ২০১৭ সনে লক্ষ লক্ষ টন খাদ্য আমদানি করতে হয়েছে। তাহলে দেশ খাদ্যে স্বয়ংস¤পূর্ণ হল কিভাবে? ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে বন্যার ফলে খাদ্য উৎপাদনে যে ঘাটতি হয়েছে তা পূরণের জন্য যথাসময়ে পদক্ষেপ না নেয়ার ফলে বাজারে চালসহ খাদ্যশস্যের দাম সকল সময়ের রেকর্ড অতিক্রম করেছে। বাজারে পেঁয়াজ, ডাল ও সব্জিসহ প্রত্যেকটি খাদ্যদ্রব্যের দাম অসহনীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সময়ে দফায় দফায় বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি কৃষি, শিল্পসহ অর্থনীতির সকল খাতে বিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এর ফলে ৫ লক্ষ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নীচে চলে গেছে বলে একটি সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল ২০২১ সালের মধ্যে শতকরা ১৩ ভাগে নিয়ে আসা। সরকারের চলতি মেয়াদে দারিদ্র্যের আনুমানিক হার ১৫ শতাংশের নীচে নামানোর কথা ছিল। বাকি ১ বছরে সেটির বাস্তব রূপ পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীন। দারিদ্র্য হ্রাসের হার এ সরকারের সময় বরং কমে এসেছে।
প্রশ্ন হল এই সরকারের দাবিকৃত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি যাচ্ছে কোথায়? সম্প্রতি প্রকাশ পাওয়া গ্লোবাল ফাইনান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (এঋও) এর প্রতিবেদনটি ব্যাপক আলোচনায় এসেছে। এই প্রতিবেদনে বলে হয়েছে, কেবল ২০১৩ সালে দেশ থেকে ৭৮ হাজার কোটি টাকা এবং ২০১৪ সালেই দেশ থেকে ৭২ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। ২০১৪ সালের পাচারের এই পরিমাণটি জিডিপির প্রবৃদ্ধির ৪% এর মত। জিডিপি প্রবৃদ্ধির ৭% এর মধ্যে যদি ৪% বাহিরে পাচার হয়ে যায় তাহলে দেশের অর্থনৈতিক লেনদেনে কিভাবে প্রবৃদ্ধির প্রভাব লক্ষণীয় হবে? এ থেকে বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতির বিষয়টি ¯পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন হল কেন এদেশের অনেক বিনিয়োগকারী দ্বৈত-নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছে? কেন তারা তাদের অর্থ দেশে বিনিয়োগ করার চাইতে বিদেশে রাখাটাই পছন্দ করছে? এই পাচার হওয়া টাকার একটা বড় অংশ হলো অবৈধ উপায়ে অর্জিত কালো টাকা। আর পাচার হওয়ার পেছনে কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো দেশে বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশের অভাব, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, দেশের অর্থনীতির প্রতি আস্থার অভাব, দেশের বাইরে একটি নিরাপদ বলয় তৈরি করে রাখা যাতে সুযোগ মতো বেরিয়ে যাওয়া যায়, আমাদের ব্যাংকগুলোর করুণ অবস্থা এবং সর্বোপরি লুটের টাকার একটি নিরাপদ আশ্রয় তৈরি। বিদেশে বাংলাদেশের এত বিরাট অংকের টাকা চলে যাচ্ছে অথচ সরকার একেবারেই নীরব। রহস্যজনকভাবে বিশাল অংকের এই টাকা ফিরিয়ে আনার কোন সরকারী উদ্যোগই দেখা যাচ্ছে না।
মির্জা ফখরুল বলেন, ২০০৯ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মাত্র ৭ বছরে দেশের ৭ লক্ষ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। সাম্প্রতিক বছর গুলোতে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া আর্থিক খাতের লুটপাটের প্রায় পুরোটাই ব্যবসায়ী , রাজনৈতিক নেতা, সরকারি কর্মচারী ও বড় মাপের প্রতারক ও টাউটরা প্রতিবছর গড়ে ১ লক্ষ হাজার কোটি টাকা অবৈধ ভাবে বিদেশে পাচার করেছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর , দুবাইসহ ইউরোপের বেশ কিছু দেশে সেকেন্ড হোম এবং ব্যবসাবাণিজ্য গড়ে তুলেছেন এই লুটেরার দল। কালো বাজারী ব্যবসা , ব্যাংক লুটপাট, শ্রমিকদেরকে শোষণ ,ঘুষ- দুর্নীতি, শেয়ারবাজার লুট, গখগ এর মাধ্যমে প্রতারণা ইত্যাদির মাধ্যমে এই ডাকাত দল টাকার পাহাড় গড়ে তুলে বিনা বাধায় তা বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত প্রতিবছরের গড়ে বিদেশে টাকা পাচার হয় ৮১ হাজার কোটি টাকা। শুধু ২০১৫ সালেই বিদেশে পাচার হয়েছে ১ লক্ষ ৫০ হাজার কোটি টাকা যা খুবই উদ্বেগজনক।২০১১ সালে সুইস ব্যাংকে  বাংলাদেশীরা  ১ হাজার ২২২ কোটি টাকা জমা করে ; আর ২০১৫ সালে জমা করে ৪ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা। মাত্র ৪ বছরে জমাকৃত টাকার পরিমাণ ৪ গুণ বেড়ে যায়।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, দেশের মানুষের রক্ত চুষে লক্ষ লক্ষ হাজার কোটি টাকা বিদেশে প্রেরণ করার ফলে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ কমে এসেছে। মানুষ নি:স্ব হচ্ছে আর বেকার সমস্যা বাড়ছে। মানুষের মৌলিক অধিকার লুন্ঠিত হচ্ছে। কিন্তু টাকা পাচার রোধে দৃশ্যত সরকারের কোন রাজনৈতিক সদিচ্ছা নাই। কারণ দেশের ভেতর বিভিন্ন ভাবে  লুটপাট করে অবৈধভাবে অর্জিত এসব টাকা বিদেশে পাচার করার সাথে যারা জড়িত তাদের অধিকাংশই আওয়ামী ঘরানার লোক বা আওয়ামী সরকারের মদদপুষ্ট। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তৃতায় ‘আগুন সন্ত্রসে’ নিহতদের কথা বলেছেন। ঐ সন্ত্রাস আসলে কে করেছে এটা জানার আগ্রহ আমাদেরও। গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে জনগণের সামনে হেয় করার জন্য তা ছিলো এক সরকারি অপচেষ্টা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও গণমাধ্যমে তা প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু সরকারি সিদ্ধান্ত ও প্রচেষ্টায় আইন শৃংখলা পরিস্থিতির যে অবনতি হয়েছে তার কথা সকলেই অবগত আছেন। গত ১০ বছরে কমপক্ষে ৭৫০ জন গণতন্ত্রকামী কর্মীকে গুম করেছে সরকারী বাহিনী। অধিকারের প্রতিবেদন অনুযায়ী কেবলমাত্র  ২১০৭ সালে সরকারী বাহিনী কর্তৃক গুমের শিকার ৮৬ জন। তাদের মধ্যে ৯ জনের লাশ পাওয়া গেছে। ৪৫ জনকে গুম পরবর্তী আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। ১৬ জনকে ছেড়ে দিয়েছ। এখন পর্যন্ত বাকি ১৬ জনের কোন হদিস পাওয়া যায়নি। গুম ও খুনের শিকার পরিবারগুলোই বোঝে তাদের কি কষ্ট।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, “সংবিধান অনুযায়ী ২০১৮ সালের শেষদিকে একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কী ভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে তা আমাদের সংবিধানে সম্পূর্ণভাবে বলা আছে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের আগে নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে। সেই সরকার সর্বতোভাবে নির্বাচন কমিশনারকে নির্বাচন পরিচালনায় সহায়তা দিয়ে যাবে”। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য নির্বাচনকে ঘিরে বিদ্যমান সংকটকে আরো ঘনীভূত করে তুলেছে। সংবিধানে     “নির্বাচনকালীন  সরকার” সম্পর্কে স্পষ্ট কোন বিধান নেই। বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী যদি সংসদ বহাল রেখে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তা হলে সেই নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে না। কারণ সংসদ বহাল থাকা অবস্থায় নির্বাচনকালীন সরকারও হবে বিদ্যমান সরকারেরই অনুরূপ। সংবিধানে নির্বাচনকালীন সরকার কেবল রুটিন ওয়ার্ক করবে- এমন কিছু উল্লেখ নেই। সংবিধানের ১৫তম ও ১৬ তম সংশোধনীর মাধ্যমে আওয়ামী লীগের শাসনকে পাকাপোক্ত করার একটি ব্যবস্থাই করা হয়েছে মাত্র। সংবিধান ও গণতন্ত্র সবসময় সমার্থক বা সমান্তরাল হয় না। তাই যদি হতো তা হলে হিটলার ও মুসোলিনির শাসনকেও গণতান্ত্রিক বলা যেত। কারণ তাদের শাসনও সংবিধান অনুযায়ীই ছিল। তবে প্রধানমন্ত্রী যদি আন্তরিকভাবে নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে নতুন কিছু ভেবে থাকেন তা হলে তার উচিত হবে এ নিয়ে সংলাপের উদ্যোগ নেয়া। আমাদের দল মনে করে একটি আন্তরিক ও হৃদ্যতাপূর্ণ সংলাপের মাধ্যমে ২০১৮’র নির্বাচন সম্পর্কে অর্থবহ সমাধানে আসা সম্ভব। নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা কেমন হতে পারে, তা নিয়ে আমাদের দলের একটি চিন্তা-ভাবনা আছে।  একটি সুন্দর পরিবেশে সংলাপটি অনুষ্ঠিত হলে জাতির মনে যে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে আমরা আস্থা রাখতে চাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ