ঢাকা, রোববার 14 January 2018, ১ মাঘ ১৪২৪, ২৬ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কিশোরের হাতে ১২’শ লেগুনার স্ট্রিয়ারিং

কামাল উদ্দিন সুমন : রাজধানীর বিভিন্ন রুটে নিয়মিত চলছে লেগুনাসহ নানা নামে পরিচিত ছোট গাড়িগুলো। এসব গাড়ির চালক এবং হেলপারদের বেশির ভাগই শিশু-কিশোর। এসব চালকের গাড়ি চালানোর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। এছাড়া কিশোর চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। অন্যদিকে গাড়ির পেছনে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে শিশু হেলপার। এরইমধ্যে চলন্ত গাড়ি থেকে পড়ে হেলপারের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
ফার্মগেট লেগুনা স্ট্যান্ডে গিয়ে দেখা যায়, ঝিগাতলা, নিউ মার্কেট, ৬০ ফিট, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, মিরপুর ১ নম্বর ও ১০ নম্বর রুটের অধিকাংশ গাড়ি লক্কড়-ঝক্কর মার্কা চেহারা। ফিটনেসবিহীন এসব গাড়ি ভোর থেকে রাত পর্যন্ত ছুটে চলে রাজধানীর বিভিন্ন রাস্তায়। তবে রাজধানীর ব্যস্ততম সড়কের যাত্রী বোঝাই এসব লেগুনার স্টিয়ারিংয়ের নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে কোমলমতি শিশু-কিশোরদের দিয়ে। যাদের প্রত্যেকের বয়স ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে।
জানা যায়, রাজধানীতে প্রায় ২০টি রুটে প্রায় ১ হাজার ২০০টি লেগুনা চলাচল করে। এর মধ্যে ফার্মগেট থেকে মোহাম্মদপুর, জিগাতলা ও কৃষি মার্কেট এই তিন রুটে ঢাকা ইন্দিরা পরিবহনের প্রায় ১২০টি লেগুনা চলে। গাবতলী-মহাখালী রুটে ৬০টি, মিরপুর-মহাখালী রুটে ৭০, মোহাম্মদপুর থেকে গুলশান হয়ে বাড্ডা পর্যন্ত ৮০টির মতো লেগুনা চলে। এছাড়া নীলক্ষেত থেকে ফার্মগেট, গোড়ান থেকে গুলিস্তান, মিরপুর ১ নম্বর থেকে জিগাতলা, মিরপুর ১০ নম্বর থেকে মোহাম্মদপুর শিয়া মসজিদ, গুলিস্তাান থেকে লালবাগসহ আরও কয়েকটি পথে লেগুনা চলাচল করে। এছাড়া সাইনবোর্ড থেকে প্রায় অর্ধশত লেগুনা চলে নিউমার্কেট পর্যন্ত।
 ফার্মগেট, মোহাম্মদপুর এবং গুলিস্তান বাসস্ট্যান্ডে সরেজমিনে দেখা যায়, কয়েক মিনিট পরপর লেগুনা আসা-যাওয়া করছে। এসব লেগুনার অনেক চালকই কিশোর বয়সী। আর এসব লেগুনার হেলপার মূলত ৮ থেকে ১২ বছরের শিশুরা।
মোহাম্মদপুর থেকে গুলশান-বাড্ডা রুটে লেগুনা চালায় ১৬ বছর বয়সী সোহেল। কথা প্রসঙ্গে সে জানায়, তিন বছর হেলপারি করার পর রাতের বেলা একটু একটু করে চালাতে দিতো চালক। এভাবেই গাড়ি চালানো শিখছি। এখন ছয় মাস ধরে নিজেই চালাই।
মিরপুর ১ নম্বর থেকে মহাখালী পথে চলাচলকারী অনেকগুলো লেগুনার চালক কিশোর। এই রুটে লেগুনা চালায় হৃদয়। বয়স ১৫ বছর। দুই বছর হেলপারির কাজ করার পর এক বছর আগে চালক হয়েছে সে। হৃদয় জানায়, বয়সে ছোট হলেও আমাদের হাত খুব পাকা। এই লাইনে যত চালক গাড়ি চালায়, অনেকেরই আসল লাইসেন্স নাই। আর ঢাকায় গাড়ি চালাতে এখন এত কিছু জানা লাগে না, মনে সাহস থাকলেই চলে।
ফার্মগেট থেকে মোহাম্মদপুর রুটের একটি লেগুনার হেলপার তুষার। বয়স ১০ বছর। কথা প্রসঙ্গে সে জানায়, বাড়ি বরিশালের হিজলা উপজেলায়। মায়ের সঙ্গে থাকে কড়াইল বস্তিতে। সংসারের হাল ধরতেই এই পেশায় এসেছে। স্বপ্ন দেখে একদিন চালকের আসনে বসবে সে।
ফার্মগেটের মতো একই চিত্র দেখা যায় রাজধানীর গুলিস্তান, নিউ মার্কেট, মিরপুর-০১ নম্বর, ১০ নম্বরসহ বিভিন্ন রুটে। গুলিস্তান থেকে হাজারীবাগ, চকবাজার, নিউ মার্কেট, চান্দিরঘাট, ইসলামবাগসহ প্রতিদিন মোট ৭টি রুটে প্রায় ৩০০ লেগুনা চলাচল করে। লেগুনাগুতেও দেখা মেলে শিশু চালকদের। পিছনে দুইপাশে ছয় জন করে মোট ১২জন এবং সামনে ড্রাইভারের পাশে দুই জন করে মোট ১৪ জন যাত্রী বসার ব্যবস্থা রয়েছে এই লেগুনাগুলোতে। তবে হেল্পারের সঙ্গে ২-৩ জন ঝুলেও নিয়মিত যাতায়াত করে।
এই রুটের লেগুনা মালিকদের ‘রোড কমিটির’ সভাপতি মো. কামাল হোসেন বলেন, ড্রাইভারেরা বয়সে ছোট হলেও তারা ভালোই গাড়ি চালায়। বছরের পর বছর এই কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকায় এরা খুব ভালোভাবে গাড়ি চালানো রপ্ত করে ফেলে। পুলিশে মাঝে মধ্যে ঝামেলা করলেও তা আপসে মীমাংসা করে নেয়া হয়।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ঢাকা জেলা হাল্কা যানবাহন সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, এই অভিযোগ ভিত্তিহীন। আমাদের কাছে ১৮ বছরের নিচে কোন লাইসেন্স ইস্যু করার সুযোগই নেই। রাস্তার দায়িত্বে থাকে মালিক সমিতির লোকজন। রাস্তা নিয়ন্ত্রণে তারা বিভিন্ন রোড কমিটি গঠন করে। তারাই ভালো জানেন কাদের কাছ থেকে টাকা খেয়ে এইভাবে বাচ্চাদের দিয়ে গাড়ি চালানোর মতো ভয়ঙ্কর কাজ পরিচালনা করছেন।
বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) সচিব মো. শওকত আলী একটি গণমাধ্যমকে বলেন, ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া যেসব অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে লেগুনা চালাচ্ছে আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি, নেব। ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
স্থানীয় নেতাদের পৃষ্ঠপোষক বিষয়ে তিনি বলেন, এগুলো বিআরটিএ’র বিষয় নয়, এগুলো দেখবে পুলিশ। জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার সাইফুল হক একটি গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা নিয়মিতভাবে অভিযান পরিচালনা করছি। কোনো গাড়ির রুটপারমিট ও ড্রাইভারের লাইসেন্স না থাকলে তাদের বিরুদ্ধে আমরা উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করি। আর শিশু চালকের দিকেও আমাদের বিশেষ নজর রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ