ঢাকা, রোববার 14 January 2018, ১ মাঘ ১৪২৪, ২৬ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ডিএনসিসি উপনির্বাচন হওয়া নিয়ে নানামুখী আলোচনা

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : অপ্রত্যাশিতভাবে সামনে হাজির হওয়া ডিএনসিসি উপ-নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কিছুটা দুশ্চিন্তায় রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, এই নির্বাচনের ফলাফলের প্রভাব অন্যান্য সিটি কর্পোরেশন ও জাতীয় নির্বাচনেও পড়বে। জাতীয় রাজনীতির ডামাঢোলের এই বছরে ডিএনসিসি’র মেয়র পদে উপ-নির্বাচন করাকে রাজনৈতিক কারণে কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণও মনে করছে ক্ষমতাসীনরা। জানা গেছে, ডিএনসিসি নির্বাচন নিয়ে সম্ভাব্য প্রার্থী, রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্টরা সরব হলেও নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে শংকা রয়েছে। সূত্রটি জানায়, সরকারি দলই এখন রাজধানীতে কোনো নির্বাচন দেখতে চায়না। তাই এই মুহূর্তে নির্বাচনের কথা বলা হলেও আদৌ নির্বাচন হবে কিনা তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে সংশয় রয়েছে। বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, নতুন ভোটার ও কাউন্সিলরদের মেয়াদ নিয়ে আইনি জটিলতা থাকায় সরকার সেটিকে কাজে লাগাতে চায়। একটি মামলা হলেই আইনীজটিলতার ফাঁদে পড়বে ডিএনসিসি নির্বাচন। সূত্রটি জানায়, মামলার সার্বিক প্রস্তুতিও ক্ষমতাসীনরা নিয়ে রেখেছে। সিটি কর্পোরেশনে অন্তর্ভুক্ত হওয়া একটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানকে মামলার বিষয়ে প্রস্তুতও রাখা হয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আনিসুল হক গত ৩০ নবেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। গত পহেলা ডিসেম্বর থেকে মেয়র পদটি শূন্য ঘোষণা করে গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। পরে স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯ এর ধারা ১৬ অনুযায়ী মেয়রের শূন্য পদে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য ইসিকে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেয় স্থানীয় সরকার বিভাগ। আইনের ১৬ ধারা অনুযায়ী, পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে এ নির্বাচন করতে হবে। নির্বাচিত মেয়র সিটি কর্পোরেশনের অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য উক্ত পদে বহাল থাকবেন। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যুক্ত ১৬টি ইউনিয়নকে ৩৬টি ওয়ার্ডে বিভক্ত করে গত জুলাই মাসের শেষদিকে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এর ফলে ঢাকা উত্তরে ১৮টি ওয়ার্ড যুক্ত হয়ে মোট ওয়ার্ড হয়েছে ৫৪টি। আর দক্ষিণে ১৮টি নতুন ওয়ার্ড যুক্ত হয়ে মোট ওয়ার্ড হয়েছে ৭৫টি।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র উপ-নির্বাচন নিয়ে জমজমাট হয়ে উঠছে রাজধানী ঢাকার রাজনীতি। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ঘোষণা মতে, আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি সেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, এই উপনির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী হতে আবেদন জমা দেয়া যাবে আগামী ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত। তা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২৯ জানুয়ারি। মনোনয়নপত্র বাছাই হবে ২১ ও ২২ জানুয়ারি। ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের নবগঠিত ৩৬ ওয়ার্ডেও কাউন্সিলর পদে ভোট হবে। সাবেক মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যুতে এই সিটিতে উপ নির্বাচন বাধ্যতামূলক হয়ে উঠে।
সূত্র মতে, চলতি বছরটিকে একাদশ সংসদ নির্বাচনের বছর হিসেবে ধরা হচ্ছে। সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জাতীয় রাজনীতির ডামাঢোলের এই বছরে ডিএনসিসি’র মেয়র পদে উপ-নির্বাচন করাকে রাজনৈতিক কারণে কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণও মনে করছে ক্ষমতাসীনরা। এর আগের নির্বাচনগুলোতে কেন্দ্র দখল করে বিজয়ী হলেও এই উপ নির্বাচনে সেটি কিছু দুরূহ হবে। কারণ সরকার সবাইকে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন দেখাতে চাইবে। রাজধানীতে মিডিয়াসহ পর্যবেক্ষকদের ব্যাপক উপস্থিতির কারণে এবার ভোট কারচুপি সেভাবে সম্ভব নাও হতে পারে। এতে করে এই মেয়র পদটি হারাতে পারে আওয়ামী লীগ। তারা এই মুহূত্বে সেটি চাচ্ছেনা। সংসদ নির্বাচনের আগে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রস্থল রাজধানীর এই নির্বাচনের পরিবেশ ও ফলাফলের প্রভাব অন্যান্য সিটি কর্পোরেশন ও জাতীয় নির্বাচনেও পড়বে বলে আশংকা করছে ক্ষমতাসীনরা। ফলে অপ্রত্যাশিতভাবে সামনে হাজির হওয়া এ নির্বাচন সরকারি দলকে কিছুটা দুশ্চিন্তায়ও ফেলেছে। জানা গেছে, সরকার চাচ্ছেনা এই মুহূর্তে রাজদানীতে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। তাই নতুন ওয়ার্ড-সংক্রান্ত আইনি জটিলতাকে কাজে লাগিয়ে আইনী ফাঁদে নির্বাচনকে আটকাতে চায় তারা। এতে যেমনীভাবে তাদের দুশ্চিন্তাও দূর হবে তেমনীভাবে আইনের ব্যাখ্যা দিয়ে পার পাওয়া যাবে।
ডিএনসিসিতে ভোট না হওয়ার শঙ্কা নিয়েই নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীরা। যদিও এখন পর্যন্ত প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল তাদের প্রার্থী মনোনয়ন দেয়নি। আজ শনিবার রাতে বিএনপি তাদের দলের মেয়র প্রার্থীর নাম ঘোষণা করবেন। আজ রাত ৮টায় দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে বিএনপি তাদের মেয়র প্রার্থীর নাম ঘোষণা করবেন। গত নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়ালের নামই বেশী শোনা যাচ্ছে। অন্যদিকে আগামী ১৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডের সভা। সেদিনই তারা তাদের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করবেন। এফবিসিসিআই’র সাবেক একজন সভাপতিকে তারা প্রার্থী করছেন বলে শোনা যাচ্ছে। এদিকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে প্রচারণা চালাচ্ছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর উত্তরের আমীর, ছাত্র শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন।
সূত্র মতে, ডিএনসিসি নির্বাচন নিয়ে প্রার্থীদের মাঝে আগ্রহ থাকলেও সরকারের সদিচ্ছার অভাবে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন নাও হতে পারে। তবে এখনই সেটি হবেনা। মনোনয়নপত্র যাছাই-বাছাই বা ফাইনাল হবার পরই মামলা হতে পারে বলে জানা গেছে। এক্ষেত্রে নতুন ভোটার ও কাউন্সিলরদের মেয়াদ নিয়ে আইনি জটিলতা বিষয়টি প্রাধাণ্য পাবে। নির্বাচন অনুষ্ঠানে আশঙ্কা প্রকাশ করে একজন প্রার্থী বলেন, ভোট হবে তো? একইভাবে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে উপনির্বাচন ও উত্তর-দক্ষিণের নতুন ৩৬ ওয়ার্ডের ভোট নিয়ে নানামুখী শঙ্কা দেখছেন বিশ্লেষকরা। খোদ ইসির কর্মকর্তারাও ভোট নিয়ে জানাচ্ছেন শঙ্কার কথা। তারা বলছেন, ৩১ জানুয়ারি যে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা ঘোষণা হবে, সেখানে স্থান পাওয়া নতুন ভোটাররা ভোট দিতে পারলেও প্রার্থী হতে পারবেন না। কেননা ১৮ জানুয়ারি ঢাকার দুই সিটিতে মনোনয়ন দাখিলের শেষ দিন। এতে নতুন ভোটারদের অনেকেই ক্ষুব্ধ হতে পারেন। মামলাও করতে পারেন। এর আগে ২০১২ সালে ভোটার তালিকা হালনাগাদ ও ওয়ার্ডে সীমানা সংক্রান্ত কারণে ভোট আটকে গিয়েছিল।
নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, সিটি কর্পোরেশনের আইন সংশোধন করে নতুন ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের মেয়াদকাল নির্ধারণ না করলে আইনি জটিলতা সৃষ্টি হবে। তফসিল ঘোষণার পরেও ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র পদে উপনির্বাচনসহ ৩৬ ওয়ার্ডের নির্বাচন ঝুলে যেতে পারে। সেই সঙ্গে ইসি বলেছে, নতুন ভোটারদের প্রার্থিতার সুযোগ নেই। কিন্তু তারা ভোট দিতে পারবেন। ফলে সাড়ে চার লাখ নতুন ভোটারের সবাই প্রার্থী হওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিষয়টি আদালত গড়ালে সিটি নির্বাচন অনিশ্চয়তায় পড়তে পারে।
আর এই বিষয় সমাধান না করে ভোট করলে মামলা হওয়ার শঙ্কাও প্রকাশ করছেন খোদ ইসির কর্মকর্তারা। এমনকি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা বলেছেন, সিটি ভোট নিয়ে কেউ মামলা করলে এ নিয়ে ইসির করার কিছুই নেই। ভোট নিয়ে নানা জটিলতা দেখছেন ইসির কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, উত্তরের মেয়র পদে উপনির্বাচন এবং ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের নতুন অন্তর্ভুক্ত ওয়ার্ডে নির্বাচনের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ অনুরোধ করেছে। কিন্তু তারা আইনি সমাধানের বিষয়ে তেমন কিছু বলেননি। দুই সিটিতে সীমানা ও ওয়ার্ড বেড়ে যাওয়ায় পরিষদের বা বর্ধিতাংশের কাউন্সিলর পদের মেয়াদ নিয়ে জটিলতার শঙ্কা করছেন কর্মকর্তারা। সেই সঙ্গে ঢাকা উত্তরের মেয়র পদের উপনির্বাচনে কারা ভোট দেবেন সেই বিষয়ে সমস্যা হতে পারে। এ ছাড়া দুই সিটির সীমানা বাড়ানোর পর ওয়ার্ড সংখ্যা বৃদ্ধি ও ওয়ার্ড বিভক্তি নিয়ে কিছু জটিলতা রয়েছে। এমনকি এর আগে কমিশন সভায় উপস্থাপনের জন্য তৈরি করা কার্যপত্রে বলা হয়েছিল, ‘স্থানীয় সরকার সিটি করপোরেশন আইনে নতুন অন্তর্ভুক্ত ওয়ার্ডে সাধারণ নির্বাচন-সংক্রান্ত বিধান পরিলক্ষিত হয় না।’
স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯ এ মেয়র এবং কাউন্সিলর প্রার্থীদের যোগ্যতার বিষয়ে বলা হয়েছে, প্রার্থী হিসেবে তিনি যোগ্য হবেন, যদি তিনি বাংলাদেশের নাগরিক হন, তার বয়স পঁচিশ বছর পূর্ণ হয়, মেয়রের ক্ষেত্রে সিটি কর্পোরেশনের যে কোনো ওয়ার্ডের ভোটার তালিকায় তার নাম লিপিবদ্ধ থাকে এবং সংরক্ষিত মহিলা আসনের কাউন্সিলরসহ অন্যান্য কাউন্সিলরদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ভোটার তালিকায় তার নাম লিপিবদ্ধ থাকে। সংবিধানে বলা আছে, প্রতি এলাকার জন্য একটিমাত্র ভোটার তালিকা থাকবে। কিন্তু কমিশন যে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে তাতে এই নির্বাচনে কার্যত দুটি ভোটার তালিকা ব্যবহার করা হবে। বিশেষ করে প্রার্থী মনোনয়ন হবে বিদ্যমান ভোটার তালিকায় আর ভোটাররা ভোটদান করবেন নতুন ভোটার তালিকায়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে নির্বাচন হলে আইনি জটিলতা হবে। সংক্ষুব্ধরা আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন। কেননা বিগত কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ কমিশনের আমলে ৫ লাখ নতুন ভোটারকে বাদ রেখে দুই ডিসিসির তফসিল ঘোষণা করলে আদালত নির্বাচন স্থগিত করে দেয়। নতুন ভোটারকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে নির্বাচন আয়োজনের নির্দেশনা দেয়। আদালতের নির্দেশনা মেনে সর্বশেষ ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বড় জটিলতা হচ্ছে নতুন কাউন্সিলরদের মেয়াদ। কমিশন বলেছে, বর্তমান পরিষদের মেয়াদের সঙ্গে নতুন কাউন্সিলরদের মেয়াদ শেষ হবে। কিন্তু আইনে এ বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলা নেই। তাই কেউ মামলা করে নির্বাচন ভণ্ডুল করার সুযোগ নিতে পারেন। তিনি বলেন, ইসির উচিত সরকারকে এ বিষয়টি স্পষ্ট করতে বলা। আর সরকারের এ বিষয়ে কিছু দায়িত্ব রয়েছে, তা হলেও আইন সংশোধন করে দিয়ে মেয়াদ স্পষ্ট করা। তিনি বলেন, বল এখন সরকারের কোর্টে। চলতি সংসদ অধিবেশনে এ সংক্রান্ত আইন সংশোধন করা যেতে পারে বলেও মত দেন তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ