ঢাকা, রোববার 14 January 2018, ১ মাঘ ১৪২৪, ২৬ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বর্ণবাদী ট্রাম্পকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান আফ্রিকান ইউনিয়নের

১৩ জানুয়ারি, বিবিসি/ওয়াল স্টিট জার্নাল/গার্ডিয়ান : আফ্রিকার অভিবাসীদের নিয়ে অবমাননাকর বক্তব্য দেয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ৫৫ জাতিগোষ্ঠীর সংস্থা আফ্রিকান ইউনিয়ন। আফ্রিকার দেশগুলোকে ‘অত্যন্ত নোংরা ও বসবাসের অযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছিলেন ট্রাম্প। এর জের ধরে তাকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

ওয়াশিংটন ডিসি’তে আফ্রিকান ইউনিয়নের দপ্তর ‘হতাশা ও ক্ষোভ’ প্রকাশ করে বলেছে, ট্রাম্প প্রশাসন আফ্রিকার জনগণকে বুঝতে ভুল করেছে।

অবশ্য তার ওই বিতর্কত বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর নিজেকে বাঁচাতে এর আগেই ট্রাম্প দাবি করেন যে, তিনি ওই পরিভাষা ব্যবহার করেননি।ট্রাম্প শুক্রবার এক টুইটার বার্তায় দাবি করেছেন, তিনি সিনেটরদের সঙ্গে বৈঠকে আফ্রিকার অভিবাসীদের নিয়ে অনেক ‘কড়া’ কথা বলেছেন কিন্তু যে পরিভাষাগুলো গণমাধ্যমে এসেছে তিনি তা প্রয়োগ করেননি।

কিন্তু তার এই অস্বীকৃতিতে সন্তুষ্ট হতে পারেনি আফ্রিকান ইউনিয়ন। সংস্থাটি আফ্রিকার দেশগুলোকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যের জন্য ট্রাম্পকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। অভিবাসীদেরকে ‘অশ্লীল’ ভাষায় গালি দিলেন ট্রাম্প

১২ জানুয়ারি, ২০১৮ বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্র তাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু করার পর, এবার অভিবাসীদের ‘অশ্লীল ভাষায়’ গালাগাল দিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি বলেন, “ওসব নোংরা দেশের অভিবাসীদের কেন এখানে দরকার?” একটি সর্ব সম্মত অভিবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে বৃহস্পতিবার রিপাবলিকান ও ডেমোক্রাট উভয় দলের আইন প্রণেতাদের মধ্যকার অনুষ্ঠিত বৈঠকে ট্রাম্প এ কথা বলেন। বৈঠকে সুনির্দিষ্ট কিছু দেশের জন্য ‘সাময়িক সুরক্ষা স্ট্যাটাস’ (টিপিএস) পুণরায় বজায় রাখতে ট্রাম্পকে প্রস্তাব করেন আইন প্রণেতারা। বিনিময়ে তারা ট্রাম্প ঘোষিত মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণে দেড় বিলিয়ন ডলার অনুমোদনের আশ্বাস দেন।

ট্রাম্পের এ মন্তব্য হাইতি, এল সালভাদর, এবং আফ্রিকান দেশগুলোর উদ্দেশ্য করে করা হয়েছে। ওয়াশিংটনস্থ এল সালভাদর দূতাবাস এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকার করে।

চলতি সপ্তাহে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী দুই লাখের বেশি এল সালভাদরের নাগরিকের টিপিএস সুবিধা প্রত্যাহার করেন। ফলে তিনি দশক ধরে বসবাসের পরও ২০১৯ নাগাদ তাদের যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করতে হবে। হাইতি ও নিকারাগুয়ার নাগরিকদের টিপিএস সুবিধাও এর আগে প্রত্যাহার করা হয়। সাউথ ক্যারোলাইনার রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম বৈঠকে উপস্থিত থাকলেও ট্রাম্পের এ অশ্লীল বক্তব্যের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। ওয়াইট হাউজ সূত্র ট্রাম্পের এ মন্তব্যকে অস্বীকার করেনি। মুখপাত্র রাজ শাহ বলেন, ওয়াশিংটনের কিছু সুনির্দিষ্ট রাজনীতিবিদ অন্য দেশের জন্য লড়াই করে, কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব সময় আমেরিকান জনগণের জন্য লড়াই করবে।

 তিনি আরও বলেন, অন্যান্য দেশের মতো অভিবাসন বিষয়ে মেধা-ভিত্তিক স্থায়ী সমাধানের জন্য লড়াই করছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। আমাদের অর্থনীতি ও সামাজিক সমৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি সমাজের সঙ্গে মিশতে পারা মেধাবীদের আমরা স্বাগত জানাবো।এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ট্রাম্পের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ব্যাপক নিন্দা ও সমালোচনার ঝড় বইছে। এক টুইট বার্তায় ম্যারিল্যান্ডের ডেমোক্র্যাট আইন প্রণেতা এলিজা কামিংস বলেন, ক্ষমার অযোগ্য এ বক্তব্যের নিন্দা জানাই আমি, এবং এটি প্রেসিডেন্ট অফিসের সম্মান ও মর্যাদা নষ্ট করছে। ডেমোক্রাট আইন প্রণেতা সেডরিক রিচমন্ড বলেন, এটি প্রমাণ করে ট্রাম্পের আমেরিকাকে আবারও মহান করার উদ্দেশ্যের পেছনে রয়েছে আমেরিকাকে সাদা চামড়াদের দেশে পরিণত করা।হাইতি বংশোদ্ভুত একমাত্র কংগ্রেস সদস্য এবং উটাহ’র রিপাবলিকান আইন প্রণেতা মিয়া লাভ, ট্রাম্পের এ বক্তব্যকে ‘নির্মম, বিভেদ সৃষ্টিকারী, এবং অভিজাতদের স্বার্থ কেন্দ্রিক’ বলে মন্তব্য করেছেন।

‘বর্ণবাদী মন্তব্যের’ বিরুদ্ধে বিশ্ব জুড়ে নিন্দার ঝড়:  যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হেইতি, এল সালভাডর এবং আফ্রিকার কিছু দেশকে খুবই স্থূল ভাষায় বর্ণনা করেছেন বলে অভিযোগের পর এর বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘ সহ বিভিন্ন দেশ।

হোয়াইট হাউসে কংগ্রেস সদস্যদের সঙ্গে অভিবাসন নীতি নিয়ে এক বৈঠকের সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এসব দেশকে ‘শিটহোল’ বা ‘পায়খানার গর্তে’র সঙ্গে তুলনা করেন বলে খবর দেয় মার্কিন গণমাধ্যম। এ নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক নিন্দা এবং প্রতিবাদ শুরু হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য এরকম শব্দ ব্যবহারের কথা অস্বীকার করছেন।

কিন্তু ঐ বৈঠকে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেট দলীয় একজন সেনেটর ডিক ডারবিন দাবি করছেন, তিনি প্রেসিডেন্টকে বর্ণবাদী শব্দ ব্যবহার করতে শুনেছেন। তিনি শুধু একবার নয়, কয়েকবার এই শব্দটি ব্যবহার করেছেন। তিনি কিছু আফ্রিকান দেশকে ‘শিটহোল’ বলে বর্ণনা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের নামকরা সংবাদপত্র নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট এবং ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল সহ অনেক সংবাদপত্রেই বৃহস্পতিবার এই খবর প্রকাশিত হয়। এর কোন প্রতিবাদ হোয়াইট হাউজ থেকে করা হয়নি। পসনেটর ডিক ডারবিন বলেন, “আমি বিশ্বাস করতে পারছি না যে গতকাল প্রেসিডেন্ট যে শব্দগুলো সেখানে ব্যবহার করেছেন, হোয়াইট হাউসের ইতিহাসে, ঐ ওভাল অফিসে বসে এর আগে কখনো কোন প্রেসিডেন্ট তা বলেছেন।” অভিবাসন নিয়ে শুক্রবার রিপাবলিকান এবং ডেমোক্রেট দলীয় সেনেটরদের একটি দল একটি প্রস্তাব নিয়ে প্রেসিডেন্টের কাছে গিয়েছিলেন।

তখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নাকি তাদের বলেছিলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ বা এরকম বিপর্যয়ের শিকার দেশগুলোর মানুষদের আশ্রয় দেয়ার চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বরং উচিত নরওয়ের মত দেশ থেকে অভিবাসীদের আনা।

ওয়াশিংটন পোস্ট প্রেসিডেন্টকে সরাসরি উদ্ধৃত করে বলছে, এর পর তিনি বলেছেন, “এই সব ‘শিটহোল’ দেশ থেকে কেন লোকজনকে আমাদের দেশে আনতে হবে।”সেনেটর ডারবিন বলেন, যখন প্রেসিডেন্টকে জানানো হয় যে ‘টেম্পোরারি প্রটেকটেড স্ট্যাটাস’ (টিপিএস) বা সাময়িক সুরক্ষা পাওয়া অভিবাসীদের বেশিরভাগই এল সালভাডর, হন্ডুরাস এবং হেইতির নাগরিক, তখন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ‘হেইশিয়ান? আমাদের কি আসলে আরও হেইশিয়ানের কোন দরকার আছে”? তবে শুক্রবার সকাল থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্প একের পর এক টুইট করে এরকম কথা বলার কথা অস্বীকার করতে থাকেন। তিনি বলেন, “আমি হেইতির মানুষ সম্পর্কে বাজে কিছু বলিনি।” বোতসোয়ানা সেদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে ডেকে নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মন্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন, এসব কথাবার্তা চরম দায়িত্বহীন, নিন্দনীয় এবং বর্ণবাদী।” আফ্রিকান ইউনিয়ন বলেছে, তারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মন্তব্য শুনে শংকিত।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক মুখপাত্র রুপার্ট কোলভিল বলেছেন, যদি প্রেসিডেন্ট এসব কথা সত্যিই বলে থাকেন সেটা স্তম্ভিত হওয়ার মতো এবং লজ্জাজনক। তিনি বলেন, এটাকে ‘বর্ণবাদী’ বলা ছাড়া আর কিছু বলার সুযোগ নেই।

আর যুক্তরাষ্ট্রে অশ্বেতাঙ্গ নাগরিকদের একটি সংগঠন ‘ন্যাশনাল এসোসিয়েশেন ফর দ্য এডভান্সমেন্ট অব কালারড পিপল’ বলেছে, প্রেসিডেন্ট দিনে দিনে আরও বেশি করে বর্ণবাদ আর বিদেশি বিদ্বেষের গর্তের গভীরে ঢুকে যাচ্ছেন।

কংগ্রেসের এক কৃষ্ণাঙ্গ সদস্য সেডরিক রিচমন্ড বলেছেন, প্রেসিডেন্ট যে আমেরিকাকে আবারও সেরা দেশে পরিণত করার নামে আসলে শ্বেতাঙ্গদের দেশে পরিণত করতে চাইছেন, এটা তার আরও একটা প্রমান। সূত্র : বিবিসি

অভিযোগ তুললেন জাতিসংঘ কর্মকর্তা : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বর্ণবাদের অভিযোগ তুলেছেন জাতিসংঘ মানবাধিকার দফতরের মুখপাত্র রুপার্ট কলভিল। আফ্রিকা মহাদেশের কয়েকটি দেশের অভিবাসীদের নিয়ে ট্রাম্পের বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে তিনি এ অভিযোগ তুলেছেন।

এক বিবৃতিতে ট্রাম্পের ওই মন্তব্যকে ‘বেদনাদায়ক, লজ্জাজনক ও বর্ণবাদী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে জেনেভার জাতিসংঘ মানবাধিকার দফতর।

জাতিসংঘ মানবাধিকার দফতরের মুখপাত্র রুপার্ট কলভিল বলেন, আপনি পুরো দেশ বা মহাদেশের সব মানুষকে নোংরা বলতে পারেন না। ট্রাম্পের ওই মন্তব্যকে বর্ণবাদী ছাড়া অন্য কিছু হিসেবে বর্ণনা করা অসম্ভব। পশ্বতাঙ্গ নয় এমন জনগোষ্ঠীকে যুক্তরাষ্ট্রে স্বাগত না জানানোর ট্রাম্পের মানসিকতার সমালোচনা করেন জাতিসংঘের এ মানবাধিকার কর্মী। দ্য ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর অ্যাডভান্সমেন্ট অব কালার্ড পিপল অভিযোগ করেছে, ট্রাম্প বর্ণবাদ ও বিদেশি আতঙ্কের গভীর থেকে গভীরে নিমজ্জিত হচ্ছেন।

মার্কিন কংগ্রেসের একমাত্র হাইতিয়ান-আমেরিকান সদস্য, রিপাবলিকান নেতা মিয়া লাভ ট্রাম্পের মন্তব্যকে নির্দয় ও বিভেদজনক হিসেবে আখ্যায়িত করে ট্রাম্পকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

ম্যারিল্যান্ড থেকে নির্বাচিত ডেমোক্র্যাটিক পার্টির একজন আইনপ্রণেতা টুইটারে দেওয়া এক পোস্টে ওই মন্তব্যের নিন্দা জানিয়েছেন।

আরেক ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা সেড্রিক রিচমন্ড বলেছেন, ট্রাম্পের এই মন্তব্য আবারও প্রমাণ করেছে, তিনি আমেরিকাকে মহান নয়; বরং আবারও শ্বেতাঙ্গ করতে চান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ