ঢাকা, রোববার 14 January 2018, ১ মাঘ ১৪২৪, ২৬ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ডিআইজি মিজানের কীর্তি : রক্ষক যদি ভক্ষক হয় তাহলে?

আমরা সব সময় রাজনীতি নিয়ে লিখি। এটাই চলে আসছে আজ ৬০-৭০ বছর হলো। এর কারণ হলো এই যে, ’৪৭ সালে একবার ভারত বিভক্ত হলো, ’৭১ সালে আরেকবার পাকিস্তান বিভক্ত হলো। কিন্তু মানুষের মৌলিক সমস্যাসমূহের সমাধান হলো না। ১৯৪৭ সালে যখন ভারত বিভক্ত হয় তখন ভারত ও পাকিস্তানের কমিউনিস্টরা একটি শ্লোগান তোলে। সেটি হলো, ‘ইয়ে আজাদী ঝুটা হ্যায়/ লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়’। সম্ভবত এই শ্লোগানের জন্য তৎকালীন সরকার বলে যে, ওরা ভারত বিভক্তি তথা স্বাধীনতা মেনে নেয়নি। ওরা তাই রাষ্ট্রদ্রোহী এবং সেই কারণে ওরা স্বাধীন ভারতে বা স্বাধীন পাকিস্তানে রাজনীতি করতে পারে না। কমিউনিস্টদের বক্তব্য ছিল কিন্তু ভিন্ন রকম। তারা বলতে চায় যে, স্বাধীনতা মিথ্যা, এই কথা তারা বোঝাতে চায়নি। তারা যেটা বোঝাতে চেয়েছে সেটা হলো, স্বাধীনতার অর্থে জনগণ আশা করেছিল যে, স্বাধীনতার মাধ্যমে তাদের আর ক্ষুধা ও দারিদ্য্র থাকবে না, তারা দুবেলা পেট পুরে খেতে পারবে, কাউকে বস্ত্রহীন থাকতে হবে না, প্রত্যেকেই শরীর ঢাকার জন্য প্রয়োজনীয় বস্ত্র পাবে। সেই সময় বামপন্থী লেখক ও সিনেমা নির্মাতা খাজা আহম্মদ আব্বাস শ্লোগান তুলেছিলেন, ‘রোটি, কাপড়া আওর মাকান’। অর্থাৎ মানুষের ন্যূনতম চাহিদা হলো তিনটি। এই তিনটি চাহিদা হলো রোটি (অন্ন), কাপড়া ( বস্ত্র) এবং মাকান (থাকার জন্য এক চিলতে জমি)। পবিত্র ইসলামে মানুষের ন্যূনতম পাঁচটি চাহিদার কথা বলা আছে। সেগুলো হলো, অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, এবং বাসস্থান বা গৃহ।
কমিউনিস্টরা ব্যাখ্যা দেয় যে, তারা ভারত বিভক্তি তথা স্বাধীনতাকে খাটো করতে চায়নি। তাদের মতে, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এসেছে, কিন্তু অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আসেনি। এখন তারা অর্থনৈতিক স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করছে। লক্ষ লক্ষ মানুষকে ক্ষুধার্ত রেখে যে স্বাধীনতা আসে সেই স্বাধীনতাকে সর্বাঙ্গীন অর্থবহ বলা যায় না। তবে উভয় দেশের সরকার তাদের এই বক্তব্য গ্রহণ করেনি। পাকিস্তানে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। তারা প্রথমে আওয়ামী মুসলিম লীগ, পরে আওয়ামী লীগ এবং তারও পরে ন্যাপে অনুপ্রবেশ করে। এরপর স্বনামে রাজনীতি করার অনুমতি পায় তারা। তবে কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ প্রভৃতি বামপন্থী পার্টি ভোটের রাজনীতিতে কোন সময় সুবিধা করতে পারেনি। ভোটে দাঁড়িয়ে হয় তাদের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে অথবা মাত্র দুই চার হাজার ভোট পেয়েছে।
আজকের লেখা শুরু করেছিলাম এই বলে যে, আমরা দীর্ঘদিন থেকেই প্রধানত রাজনীতি নিয়ে লিখছি। কিন্তু মাঝখান থেকে সমাজের অন্যান্য খাতে যে বিরাট ধ্বস নেমেছে ক্রাইম বা অপরাধ যেভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সেদিকটা আমরা বলতে গেলে অনেকটা ইগনোর করে গেছি। এখন দেখা যাচ্ছে, অপরাধে অপরাধে সমাজটা পচে গেছে। এখন অপরাধ এমনভাবে বেড়ে চলেছে যে গোটা সমাজটাকেই সেটি গিলে খেতে উদ্যত হয়েছে। নিচে কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি।
গত ৮ই জানুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, কক্সবাজার সদর উপজেলার খারুলিয়ায় বাড়তি বেতন ও পরীক্ষার ফি নির্ধারণের প্রতিবাদ করায় আয়াত উল্লাহ নামে এক অভিভাবককে হাত-পা বেঁধে নির্যাতন চালায় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের নেতৃত্বে শিক্ষকসহ একদল লোক। এই ঘটনায় স্কুলের প্রধান শিক্ষকসহ ১১ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মামলা এবং প্রধান শিক্ষককে শো-কজ করা হয়েছে। গত রবিবারের এ বর্বর ঘটনার ডিভিও এবং কিছু স্থির চিত্র ধারণ করে তা খারুলিয়া কেজি এন্ড প্রি-ক্যাডেট স্কুলের নিজস্ব ফেসবুক আইডিতে পোস্ট করলে তোলপাড় শুরু হয়। অনেকেই এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে। এ নিয়ে নিন্দার ঝড় ওঠে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। খবরে আরো বলা হয়, ঘটনার শিকার আয়াত উল্লাহর বাড়ি ওই স্কুলের পাশেই। সোমবার সকালে নির্যাতনের শিকার আয়াত উল্লাহ জানান, ইচ্ছা মাফিকভাবে পরিচালিত  হচ্ছে স্কুলটি। একটি সিন্ডিকেট দ্বারা পরিচালিত স্কুলটিতে বিনা নোটিসে বেতন বৃদ্ধির প্রতিবাদ করায় তার উপর নির্যাতন চালানো হয়। স্কুল শিক্ষক, পাশের উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এসে তারা দড়ি দিয়ে বেঁধে বেদম মারধর করেন। এ সময় তার ভিডিও ও ছবি তুলে রাখেন কয়েকজন শিক্ষক। ঘটনার পর পরিচালনা কমিটির সদস্যরা এসে তার কাছ থেকে উল্টো মুচলেকা নিয়ে তাকে ছেড়ে দেন। ঘটনার পর তিনি কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।
এই ঘটানাটি এক কথায় অবিশ্বাস্য। স্কুলের হেড মাস্টার বা মাস্টাররা কি মাস্তান হয়ে গেলেন? হেড মাস্টার বা মাস্টাররা গুন্ডা বাহিনী পোষেন এবং সেই গুন্ডা বাহিনী দিয়ে ছাত্রদের অভিভাবককে পেটান, এরকম কাহিনী অতীতে কোনদিন শুনিনি। স্কুলের বেতন বৃদ্ধির প্রতিবাদে সব সময় আন্দোলন হয়। এখানে একজন অভিভাবক প্রতিবাদ করেছেন। তাই বলে তাকে কি গুন্ডা দিয়ে মারতে হবে? কোথায় চলেছে জাতির বিবেক?
॥দুই॥
গত ৯ তারিখে কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে আরেকটি আতঙ্কজনক খবর ও ছবি বেরিয়েছে। প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত খবরে দেখা যাচ্ছে এক যুবতী নারীর ছবি। সারারাত ঐ নারীটি এই প্রচন্ড শৈত্যপ্রবাহের রোকেয়া হলের সামনে গেটে বসে আছে। সন্ধ্যার পর ছাত্রলীগের গুন্ডা-পান্ডারা এই ছাত্রীটিকে হল থেকে বের করে দেয়। তার অপরাধ, সে দিনের বেলা ছাত্র লীগের একটি মিছিলে যোগদান করেনি। সেই ‘অপরাধে’ তাকে হল কর্তৃপক্ষ নয়, ছাত্র লীগের নেতারা হল থেকে বের করে দিয়েছে। এখন রাতে ছাত্রীটি কোথায় যাবে? এই অবিচারের প্রতিবাদে সে ভিসির বাসভবনের সামনে অবস্থান করার চেষ্টা করে। কিন্তু সেখানে তাকে দাঁড়াতে দেওয়া হয়নি। তাই সে তার হল অর্থাৎ রোকেয়া হলের সামনে সারারাত অবস্থান করেছে এবং কনকনে শীতে ঠক ঠক করে কেঁপেছে। এতো বড় জুলুম, কিন্তু কেউ সেই জুলুমের প্রতিবাদ করেনি।
রক্ষক যদি ভক্ষক হয় তাহলে মানুষের আর যাওয়ার কোন রাস্তা থাকে না। এ কথা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না যে, পুলিশ হলো সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা দাতা। কিন্তু সেই পুলিশই যখন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা হরণ করে তখন মানুষের শেষ ভরসা আর কোথায় থাকে। পুলিশ বিভাগের ডিআইজি একটি বড় পোস্ট। ডিআইজির পরেই এডিশনাল আইজি বা অতিরিক্ত পুলিশ ইন্সপেক্টর জেনারেল। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে ডিআইজির সমপর্যায়ের পদ হলো এডিশনাল পুলিশ কমিশনার বা অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার। মিজান নামের ভদ্র লোক এখনও ডিএমপির এডিশনাল পুলিশ কমিশনার বা ডিআইজি। অথচ পুলিশের এতো বড় পোস্টে থেকে তিনি একের পর এক ক্ষমতার অপব্যাবহার করে চলেছেন। প্রথমে খবর ছাপা হলো যে, এই মিজান বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সুন্দরি ছাত্রীকে জোর করে উঠিয়ে নেয় এবং একটি বাসায় বন্দি করে রাখে। এরপর সে পিস্তলের জোরে ৫০ লক্ষ টাকার কাবিন করে মরিয়ম আক্তার ইকো নামক ঐ মেয়েকে বিয়ে করে। এরপর চার মাস তারা সংসার করে। কিন্তু ডিআইজি মিজান এই বিয়েটি চেপে যায়। মরিয়ম আক্তার ইকো তাদের বিয়ের ছবি ফেসবুকে আপলোড করলে ডিআইজি মিজান ক্ষেপে যায় এবং তাকে নানান হুমকি ধামকি দিয়ে থাকে। বগুড়া থেকে ইকোর মা ঢাকায় মিজানের বাড়িতে গেলে মা এবং মেয়ে উভয়কেই গুলি করে হত্যার হুমকি দেয় ডিআইজি মিজান। এই বিষয়টি দৈনিক যুগান্তরে এবং যমুনা টেলিভিশনে একাধিক দিবস ছাপা এবং সম্প্রচারিত হলে ডিআইজি মিজান যুগান্তর এবং যমুনা টেলিভিশনের সংবাদ দাতাকে গুলি করে হত্যার হুমকি দেয়। এই বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এবং পুলিশের আইজির নজরে এসেছে। এই কলাম লেখা পর্যন্ত ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে কোন অ্যাকশন নেওয়া হয়নি।
॥তিন॥
দুঃখের বিষয়, এই সরকারের আমলে পুলিশের ক্ষমতার বাড়াবাড়ি সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ২০১৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে সাবেক পুলিশের এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা আক্তার মিতু চট্টগ্রামে নিহত হন। সেই মৃত্যু নিয়ে কত খেলা চলেছে। দেড় বছরেরও বেশি হয়ে গেল, আজও সেই হত্যা রহস্যের উদঘাটন হলো না। একবার খবর বের হলো যে, এসপি বাবুলের পরকীয়ার বলি নাকি মিতু। আবার উল্টা খবর বের হলো যে, নিহত মিতুই নাকি পরকীয়ায় জড়িত ছিল। এই ধরনের কত কথাই না শোনা গেল। সর্বশেষ যে কথা শোনা যায় সে কথা এই যে, পুলিশ বিভাগের ভাবমুর্তি রক্ষার জন্য নাকি এসপিকে বলা হয়েছে যে, সে পদত্যাগ করলে তদন্ত সেখানেই থেমে যাবে। সেই মোতাবেক এসপি বাবুল আক্তার নাকি পদত্যাগ করেছে এবং আদ দিন নামক ইস্কাটনের  এক হাসপাতালের প্রশাসনে জয়েন করেছে। এ ঘটনা যদি সত্যি হয় তাহলে ধারণা হয় যে, মিতুর হত্যা কান্ডে হয়তো কোনো না কোনোভাবে বাবুল জড়িত ছিল। ব্যাপারটি যাই হোক, নর হত্যার সাথে অথবা নারী ধর্ষণের সাথে যখন পুলিশের ডিআইজি বা এসপি র‌্যাঙ্কের অফিসারদের নাম শোনা যায় তখন বুঝতে হবে যে সেই প্রশাসনের মাথায় পচন ধরেছে।
এই ধরনের কত ঘটনাই তো ঘটছে। আজ চার পাঁচ বছরেরও বেশি হয়ে গেল, টেলিভিশন সাংবাদিক সাগর রুনির হত্যা রহস্য উদঘাটিত হলো না। অথচ এই জোড়া খুনের পরদিন তাদের বাসায় তৎকালীন স্বরাষ্ট মন্ত্রী সাহারা খাতুন গিয়েছিলেন। তিনি সমবেত জনগণ এবং সাংবাদিকদের কাছে ওয়াদা করেছিলেন যে, ৪৮ ঘন্টার মধ্যে হত্যাকারীদের গ্রেফতার করা হবে। ৪৮ ঘন্টা তো পরের কথা, পাঁচ বছরেও খুনিদের টিকিটিও ধরা সম্ভব হয়নি।
বিগত ৯ বছরে এই ধরনের অসংখ্য অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। ২০১৬ সালের ২০ মার্চ ১৯ বছরের কলেজ ছাত্রী তনুকে ধর্ষণ করা হয় এবং ক্যান্টনমেন্টে তার লাশ পাওয়া যায়। লাশের ময়না তদন্তে তনুকে তিনজন ধর্ষণ করেছিল বলে আলামত পাওয়া যায়। তারপর প্রায় পৌনে দুই বছর হয়ে গেছে। কিন্তু এই ধর্ষণ এবং হত্যাকান্ডের কোন কিনারা হয়নি।
এই ধরনের অসংখ্য ঘটনা আছে। যেগুলোর তালিকা বানালে ধর্ষণ বা হত্যাকান্ডের একটি মহাকাব্য রচিত হবে। অথচ আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, এসব ধর্ষণ এবং হত্যাকান্ড অপ্রতিহত গতিতে এগিয়েই চলেছে। এগুলো দমনের কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। তিন বছরের শিশু থেকে ৬০ বছরের বৃদ্ধা পর্যন্ত সকলকে ধর্ষণ করা হচ্ছে। শিশুর পায়ু পথে পাম্প করে পেট ফুলিয়ে সেই শিশুকে হত্যা করা হচ্ছে। বিবেকবান সমাজ বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমরা কি আইয়ামে জাহেলিয়াতের দিকে দ্রুত আগুয়ান হচ্ছি? না হলে সরকারের তরফ থেকে শক্ত ব্যবস্থা কোথায়? অথবা জনপ্রতিরাধ কোথায়?
॥চার॥
শুক্রবার লেখাটি শেষ করেছি। ইমেইলে সংগ্রামে পাঠাবো। এমন সময় টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভাষণ দিলেন। ভাষণটি শুনলাম। আসলে এই ভাষণটিই আজকের লেখার মূল উপজীব্য হওয়ার কথা । কিন্তু পুরো ভাষণটি পড়তে হবে, এর সাথে সাংবিধানিক প্রশ্ন জড়িত আছে, সেগুলো স্টাডি করতে হবে। তারপর লেখাটি দাঁড় করাতে হবে। দেখলাম এটি সময় সাপেক্ষ। তবুও তাৎক্ষণিকভাবে মনে যা এলো, সেটাই নিচে তুলে দিলাম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১২ই জানুয়ারি শুক্রবার জাতির উদ্দেশ্যে প্রদত্ত বেতার ও টেলিভিশন ভাষণে রাজনীতির ময়দানে তাঁর ফাইনাল শটটি খেলেছেন। তিনি বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী ২০১৮ সালের শেষদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কীভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে তা আমাদের সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলা আছে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের আগে নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে। সেই সরকার নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন পরিচালনায় সহায়তা করবে। বাংলাদেশের সকল নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলকে এই নির্বাচনে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান তিনি। একই সাথে তিনি এই মর্মে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন যে, কোন কোন দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে তাদেরকে কঠোর হাতে দমন করা হবে।
ওপরে তিনি যেসব কথা বলেছেন, সেসব কথা তিনি এবং তার দলের অন্যান্য নেতা অনেকদিন থেকেই বলছেন এবং তারা খুব জোরের সাথেই বলছেন এবং তাজ্জবের ব্যাপার হলো, অসংখ্য বার প্রত্যাখ্যাত হওয়া সত্ত্বেও বিএনপিও অসংখ্য বার আলাপ আলোচনা ও সংলাপের জন্য সরকারের কাছে আবেদন নিবেদন করে যাচ্ছে। এইবার স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী জাতীয় নির্বাচনের আগে নির্বাচনী বছরে জাতির উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণে বিএনপির আবেদনকে ফাইনালি প্রত্যাখ্যান করলেন। এখন বিএনপি কি করবে? প্রধানমন্ত্রীর এই সর্বশেষ হার্ড লাইন নেওয়ার পরেও প্রদত্ত প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ফের সংলাপ এবং আলোচনার কথা বলেছেন। বিএনপির একজন স্ট্রং সাপোর্টার ড. দিলারা চৌধুরী একটি টেলিভিশন টকশোতে বলেছেন যে,  সংলাপ এবং আলোচনার জন্য বিএনপি সরকারের কাছে ‘বেগ’ করছে, অর্থাৎ অনুনয় বিনয় করছে। কিন্তু তারপরেও সরকারের তথা আওয়ামী লীগের মন গলাতে পারেনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের আগে নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রীর এই ভাষণ শোনার পর সংবিধান তন্ন তন্ন করে ঘাঁটাঘাঁটি করা হলো। পঞ্চদশ সংশোধনীও খুটিনাটি পড়া হলো। কিন্তু কোথাও নির্বাচনকালীন সরকার গঠন সম্পর্কে কোন অনুচ্ছেদ বা উপ অনুচ্ছেদ খুঁজে পাওয়া গেল না। কিভাবে কোন সূত্রে প্রধানমন্ত্রী এই কথা বললেন সে কথা বোঝা গেল না। তাহলে এই কথার ফল দাঁড়াচ্ছে এই যে, বর্তমান দলীয় সরকার অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
প্রধানমন্ত্রীর সর্বশেষ বক্তৃতার পটভূমিতে এখন বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের সামনে দুটি পথ খোলা আছে। একটি হলো, নিঃশর্তে সরকার তথা প্রধানমন্ত্রীর টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশন অনুযায়ী আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়া। আর না হলে সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা থেকে শুধু বিরত থাকাই নয়, সেই নির্বাচন যাতে অনুষ্ঠিত হতে না পারে সেজন্য দেশের কোটি কোটি মানুষকে সাথে নিয়ে দুর্বার, শান্তিপূর্ণ, নিয়মতান্ত্রিক, গণআন্দোলনে নেমে পড়া। আজ একটি সমাবেশে বিএনপি নেতা শামসুজ্জামান দুদু প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, রাস্তায় আন্দোলন নয়, আপনাকে পদত্যাগ করার জন্য সামনের দিনে কি আন্দোলন আসছে সেটা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না।
নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, জেল ভেঙ্গে আনবো এ কথা বলি না। তবে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করবেন না, যাতে জেল ভেঙ্গে আনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
এসব কথা থেকে ধারণা করাটা অযৌক্তিক হবে না যে, এবারের নির্বাচন সম্ভবত ২০১৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনের মতো হবে না। গত বারেও এটি নিয়ে মেরুকরণ সৃষ্টি হয়েছিল। একদিকে বেগম জিয়ার নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোট, অন্যদিকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোট। আওয়ামী লীগের পেছনে ছিল ইন্ডিয়ার সলিড সাপোর্ট। পক্ষান্তরে বিএনপি বা ২০ দলীয় জোটের পেছনে এই ধরনের কোন বৃহৎ শক্তির সমর্থন ছিল না। এবারেও যে মেরুকরণ হচ্ছে সেখানে ইন্ডিয়ার কি ভূমিকা হয় সেটি দেখার জন্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল গভীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করছেন।
asifarsalan15@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ