ঢাকা, রোববার 14 January 2018, ১ মাঘ ১৪২৪, ২৬ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ডিসেম্বর মাসে রাজনৈতিক সন্ত্রাস

মুহাম্মদ ওয়াছিয়ার রহমান : ডিসেম্বর মাসে রাজনৈতিক মাঠে লক্ষণীয় ছিল রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন। এ মাসেও বিএনপি-আওয়ামী লীগের অতি সীমিত আকারে সদস্য সংগ্রহ ও নবায়ন প্রক্রিয়া অব্যাহত ছিল। ডিসেম্বর মাসে ১৩৭টি রাজনৈতিক ঘটনার তথ্যে নিহতের সংখ্যা ১০। এই ১০ জনের ৪ জনই খুন হয় আওয়ামী লীগের হাতে, ছাত্রলীগের হাতে ৫ এবং বিএনপির হাতে ১ জন। এ মাসে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতায় প্রাপ্ত তথ্যে আহত হয় ২৯১ জন এবং গ্রেফতার অনেক বেশী হলেও ১৯৬ জনের তথ্য পাওয়া গেছে বাকীদের পরিচয় প্রকাশিত হয়নি, গ্রেফতারকৃতরা অধিকাংশই বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী এবং দন্ডপ্রাপ্ত ২৭ জন, এই ২৭ জনের আওয়ামী লীগের ৫, ছাত্রলীগের ১৮ এবং জমিয়েতে ওলামায়ে ইসলামের ৪ জন। ২০১৭ সালে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে রাজনৈতিক সন্ত্রাসে নিহত ১২২। এ বছর ১,৫৫৭টি রাজনৈতিক সন্ত্রাসের তথ্যে আহত ৪,১১৮, দন্ডপ্রাপ্ত ৩১১ এবং আটক বেশী  হলেও প্রকাশ হয় ৩,৪৩৭ জন। নিহত ১২২ জনের মধ্যে আওয়ামী পরিবারের হাতে ১১৮ জন নিহত অর্থাৎ মোট খুনের ৯৬.৭২ % আওয়ামী পরিবার দখল করে তারা প্রথম স্থান অধিকার করে, বিএনপির হাতে ২ জন নিহত হয়ে ১.৬৩ % নিয়ে বিএনপি দ্বিতীয় স্থান এবং জাতীয় পার্টি ও জাসদ ১ জন করে খুন করে ০.৭৮ % নিয়ে তারা যৌথ ভাবে তৃতীয় স্থান অধিকার করে। রাজনৈতিক খুনের ঘটনা এ বছর কেবলমাত্র এই ৪টি সংগঠনের মধ্যে সীমাবন্ধ ছিল। তবে যেহেতু সব ঘটনা নগমাধ্যমে আসেনা তাই প্রকৃত চিত্র অনেক বেশী।
প্রাপ্ত তথ্যে ডিসেম্বর মাসে যারা নিহত হয়- (১) চট্টগ্রামের সদরঘাটে আওয়ামী লীগের হামলায় সদরঘাট থানা যুবদল আহ্বায়ক হারুন চৌধুরী, (২) সিলেটের জৈন্তাপুরে পাথর কোয়ারীতে হোসাইন আহমেদ হত্যা মামলায় আওয়ামী লীগ নেতাসহ ৭৭ জনের নামে মামলা, (৩) মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে ঝুমা হত্যা আওয়ামী লীগ নেতার ভাই-ভাবীর নামে মামলা ও (৪) নীলফামারীর সৈয়দপুরে আওয়ামী লীপ নেতার নামে স্ত্রী ইসমত আরা হত্যার মামলা দায়ের হয়, (৫) মৌলভীবাজার সদরে ছাত্রলীগের দলীয় কোন্দলে শাহবাব রহমান ও (৬) মাহি আহমেদকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়, (৭) সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে স্কুল ছাত্রী হুমায়রা আক্তার মুন্নী হত্যা মামলায় ২ ছাত্রলীগ কর্মীর নামে মামলা এবং (৮) ঢাকার আশুলিয়ায় ছাত্রলীগ নেতার নেতৃত্বে আবু তালেবকে কুপিয়ে হত্যা করে ও (৯) ঘটনার খবর প্রকাশ হলে শোকে তাদের বংশের বৃদ্ধ তমিজ উদ্দিন মন্ডল মারা যায় এবং (১০) বরিশালের উজিরপুরে যুবলীগ নেতা টিটু হাওলাদার হত্যায় বিএনপি নেতাদের নামে মামলা দায়ের হয়।
আওয়ামী লীগ ঃ ২ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের সদরঘাটের মাদারবাড়ী এলাকার আওয়ামী লীগের মটর শোভাযাত্রা থেকে যুবদল সদরঘাট থানা আহবায়ক হারুণ চৌধুরীকে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গুলি করে হত্যা কর হয়। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ পৌর শহরে আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে পুলিশসহ আহত ১০ জন।  জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের কমিটিতে যুবদল নেতা হামিদুলকে আহবায়ক করায় এই সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে আহতরা হলো- ছাত্রলীগ নেতা মিজানুর রহমান, পীরজাদা আব্দুল কাইউম, সোহেল, আব্দুল লতিফ, আওয়ামী লীগ নেতা জগলুর রশীদ রিপন, মাজেদুল ইসলাম ও পুলিশ কনস্টেবল দেলোয়ারসহ ১০ জন। ৩ ডিসেম্বর মাগুরার মোহাম্মদপুরে চরবড়রিয়া গ্রামে আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষ ও বাড়ী-ঘরে হামলায় ৫ পুলিশসহ আহত ১২ জন। আওয়ামী লীগে নেতা মফিজুর রহমান মিনা ও পান্নু মোল্লা গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্বে এই ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে ২০টি বাড়িঘর হামলা, ভাংচুর ও লুটপাট করা হয়। হামলায় আহত হয় চুন্নু, জহির মোল্লা, ইমরুল শিকদার, ববিতা, সুজন, রিবুল, কাবুল, পুলিশ সদস্য হাফিজ, মঞ্জুর মোর্শেদ, আবুল বাশার, সিরাজুল ও ওবায়দুর রহমান। ৩ ডিসেম্বর সিলেটের জৈন্তাপুরে শ্রীপুর, আসামপাড়া ও খড়মপুরে পাথর কোয়ারী দখলকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে আহত ৫০ জন। উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি কামাল আহমেদ ও সাধারন সম্পাদক লিয়াকত আলীর সমর্থকদের মধ্যে এই সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে আহতরা হলো- শ্রমিক লীগ সভাপতি ফারুক আহমেদ, আনোয়ার হোসেন, শারমিন, হোসাইন আহমেদ, নজরুল মিয়া, অহিদ মিয়া, আব্বাস মিয়া, আমিন আহমেদ, কালা মিয়া, দেলোয়ার, আব্দুর রশীদ, গোপাল, মোস্তাক আহমেদ, সালেহ আহমেদ, আমিন উদ্দিন, মোহন মিয়া, তাজউদ্দিন, আব্দুল খালেক, জামশেদ মিয়া, আব্দুর রহীম, আকবর আলী, আব্দুস শুকুর, বাহার, আখলাকুল আম্বিয়া, সাজেদুর রহমান, নূর উদ্দিন ও আব্দুন নূরসহ ৫০ জন। পরে হোসাইন আহমদ নামে একজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। এ বিষয় উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারন সম্পাদক লিয়াকত আলীসহ ৭৭ জনের নামে মামলা করে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে নোয়াগাঁও ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা কাজল চৌধুরীর দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে তাকে অপসারণ করার দাবীতে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করে এলাকাবাসী।
৪ ডিসেম্বর সিলেট প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে টিলাগড়ের বাসিন্দা নগেন্দ্র চন্দ্র বর্মণ অভিযোগ করেন তার সাবেক ব্যবসায়ী অংশীদার ও আওয়ামী লীগ নেতা বিজিত চৌধূরীর কাছে তিনি সাড়ে চার কোটি টাকা পাবেন, কোন ভাবেই তা দিচ্ছেন না, নিরূপায় হয়ে আদালতে মামলা করলে বিজিত চৌধুরী তাকে ও তার পরিবারকে হত্যা করার হুমকি দেয়। পিরোজপুরের নাজিরপুরে উদয়তারা গ্রামে বিধাব ফিরোজা বেগমের ছাগল চুরির অভিযোগে আওয়ামী লীগ শ্রীরামকাঠি ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ড যুগ্ম-সম্পাদক লোকমান বেপারীর ১০ হাজার টাকা জরিমানা ও ২০টি চড়থাপ্পড় দন্ড হয়। ইউপি চেয়ারম্যান উত্তমকুমার মৈত্র এই ঘটনার বিচার করে। গত ১ নবেম্বর এই চুরির ঘটনা ঘটে। ৭ ডিসেম্বর জামালপুরের বকশীগঞ্জ পৌর সভা নির্বাচনে দলীয় শৃংখলা লঙ্ঘনের দায়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য এ.এম নুরুজ্জামান ও উপজেলা তাঁতী লীগ আহবায়ক আনোয়ার হোসেন তালুকদার বাহাদুরকে দল থেকে বহিস্কার করে। ৮ ডিসেম্বর মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে আওয়ামী লীগ নেত্রী ও এমপি মমতাজ বেগমের ভাই এবারত হোসেন, ভাবী ফরিদা পারভীন ও ভাতিজা ফিরোজসহ ২-৩ জনের বিরুদ্ধে ঝুমা নামের এক শিশুকে হত্যা করার অভিযোগ ওঠে। এ অভিযোগে গত ১২ ডিসেম্বর আদালতে হত্যা মামলা করে নিহতের বাবা রিয়াজুল ইসলাম। ৯ ডিসেম্বর রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আচরণ বিধি লঙ্ঘনের দু’টি অভিযোগের দায়ে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টুকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করে ভ্রাম্যমান আদালত। চট্টগ্রামের বায়োজিত বোস্তামী থানাধীন শেরশাহ কলোনী থেকে ২ হাজার পিস ইয়াবাসহ আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ হোসেনের মেয়ে সেলিনাকে আটক করে পুলিশ। ১০ ডিসেম্বর নোয়াখালীর সুধারামে ধর্মপুর ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী মোহাম্মদ খলিল একটি মামলায় দু’বছরের কারাদন্ড ও ৫ হাজার টাকা অর্থদন্ডে দন্ডিত হলে আদালতে আত্মসমার্পণ করে। আওয়ামী লীগ নেতা খলিল আদালতে হাজির হলে তাকে জেল হাজতে পাঠায় আদালত। ১১ ডিসেম্বর নোয়াখালী সদরে নোয়াখালী ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনী প্রচারণা কালে সদর উপজেলা যুবদল নেতা গোলাম হোসেন সরোয়ার, নোয়াখালী ইউনিয়ন যুবদল যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আজগর হোসেন ও সাংগঠনিক সম্পাদক নূরুল ইসলাম বাবুলসহ ৭ জন আওয়ামী লীগের খালেদ মোশররফ সঞ্জয়, হৃদয় খান, নাঈম, রাসেল ও রাজুসহ ১০-১২ জনের হামলায় আহত হয়। উল্লেখ্য, ২৮ ডিসেম্বর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। শেরপুর জেলার সদর উপজেলার চরশ্রীপুর গ্রামে পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ কার্যক্রমের শেষ পর্যায়ে বলাইয়েরচর ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি এস.এম আশরাফুল আলম লাইন প্রতি ২ হাজার টাকা চাঁদা দাবির করার কারণে সংযোগ স্থাপন হচ্ছে না। 
১৩ ডিসেম্বর গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে দহবন্দ ইউপিতে কর্মসৃজন কর্মসূচির টাকা ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা ও ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম কবির মুকুল এবং যুবলীগের এক নেতার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোন্তাজ আলী আহত হয়। ১৪ ডিসেম্বর নাটোরের বড়াইগ্রামে উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগ সাধারন সম্পাদিকা শরিফুন্নেসা শিরিনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ জেলা সভাপতি ও এমপি অধ্যাপক আব্দুল কুদ্দুস এবং বনপাড়া পৌর মেয়র আওয়ামী লীগ নেতা কে.এম জাকির হোসেনের সুনাম ও সম্মানহানীর অভিযোগে মামলা দায়ের করে গোপালপুর ইউনিয়ন যুবলীগ সাধারন সম্পাদক মিজানুর রহমান মিনহাজ। পিরোজপুরের কাউখালীতে বিজয় দিবসে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে আহত ১০ জন। স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের ব্যানার মুজিব সেনা লীগ নামধারীরা ছিড়লে এক সংঘর্ষে উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান সুমন, মুজিব সেনার সাধারন সম্পাদক শান্ত খন্দকার, আমরাজুড়ি স্কুল ছাত্রলীগ সভাপতি শাহরিয়ার শুভ ও কাউখালী সরকারী কলেজ ছাত্রলীগ সাধারন সম্পাদক রাজু তালুকদারসহ ১০ জন আহত হয়। পুলিশ ৩ জনকে আটক করে। ১৬ ডিসেম্বর গাইবান্ধার সাদুল্যাপুরে আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষ হয়। নলডাঙ্গা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সম্পাদক শাহীন চোকদার ও ইউনিয়ন যুবলীগ যুগ্ম-আহবায়ক শাহরিয়ার ইসলামের সমর্থকদের মধ্যে এই সংঘর্ষ হয়। রাজবাড়ীর কালুখালীতে রজনীকান্ত উচ্চবিদ্যালয় মাঠে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করতে শোভাযাত্রায় জেলা বিএনপির সাধারন সম্পাদক হারুন-অর-রশীদ, কালুখালী উপজেলা যুবদল সাধারন সম্পাদক আনোয়ার হোসেন, ছাত্রদল নেতা রানা ও আবু তালেবসহ ৫ জনের উপর হামলা করে আওয়ামী লীগ ক্যাডার বাপ্পা রাজের নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ