ঢাকা, সোমবার 15 January 2018, ২ মাঘ ১৪২৪, ২৭ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিশ্বশান্তি এবং মুসলিম উম্মাহর মুক্তি ও কল্যাণ কামনা

গতকাল রোববার তাবলীগ জামায়াতের ইজতিমায় মুনাজাত করছেন ধর্মপ্রাণ মুসল্লীরা -সংগ্রাম

গাজীপুর থেকে মোঃ রেজাউল বারী বাবুল ও গাজী খলিলুর রহমান : টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমানের কন্ঠে আমিন আল্লাহুমা আমিন ধ্বনিতে মুখরিত মুনাজাতের মধ্য দিয়ে রোববার শেষ হলো এবারের তাবলীগ জামায়াতের ইজতিমার প্রথম পর্ব। তাবলীগ জামাতের ৫৩ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম আরবী-উর্দুর সঙ্গে বাংলায় অনুষ্ঠিত হলো বিশ্ব ইজতিমার মুনাজাত। মুনাজাতে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, শান্তি, সমৃদ্ধি, ইহলৌকিক ও পরলৌকিক মুক্তি এবং দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দেয়ার তৌফিক কামনা করা হয়। জীবনের সব পাপ-তাপ থেকে মুক্তির জন্য, পরম দয়াময় আল্লাহর দরবারে অনুনয়-বিনয় করে পানাহ ভিক্ষা করছিলেন মুসুল্লীরা। ক্ষমা লাভের আশায় লাখো মানুষের সঙ্গে একত্রে হাত তুলতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে এসেছিলেন তাঁরা ভোর থেকেই। বহু মানুষের অংশগ্রহণে ইহলোকের মঙ্গল, পরলোকের ক্ষমা, দেশের কল্যাণ, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও বিশ্বশান্তি কামনা করা হয় তাবলিগ জামাতের ৫৩তম ইজতিমার প্রথম পর্বের মুনাজাতে। এরআগে হেদায়েতী বয়ান করা হয়। প্রথম পর্বের পর দ্বিতীয় পর্বের ইজতিমা হবে আগামী ১৯ জানুয়ারি থেকে ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত।
বাংলাদেশের রাজধানীর কাকরাইল তাবলীগ মারকাজের বিশেষ ব্যক্তিত্ব হাফেজ মাওলানা জোবায়ের ছোট ছোট বাক্যে আরবী-উর্দু ও বাংলা ভাষায় ৩৫ মিনিটব্যাপী মুনাজাত পরিচালনা করেন। তিনি বেলা ১০টা ৪০ মিনিট থেকে মুনাজাত শুরু করেন এবং তা চলে বেলা সোয়া ১১টা পর্যন্ত। ৩৫ মিনিটব্যাপী মুনাজাতের মধ্যে ১৪ মিনিট আরবী ও ২১ মিনিট বাংলায় মুনাজাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। মুনাজাত শুরু হতেই পুরো এলাকা জুড়ে নেমে আসে পিন পতন নীরবতা। খানিক পর পর শুধু ভেসে আসে আমিন, ছুম্মা আমিন, আল্লাহুম্মা আমিন। অনুতপ্ত মানুষের কান্নার আওয়াজে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। জীবনের সব পাপ-তাপ থেকে মুক্তির জন্য, পরম দয়াময় আল্লাহর দরবারে কেঁদে কেঁদে অনুনয়-বিনয় করে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে পানাহ ভিক্ষা করছিলেন তাঁরা। ক্ষমা লাভের আশায় ধনী-গরিব-শ্রমিক-মালিক নির্বিশেষে সর্বস্তরের লাখো মানুষের সঙ্গে একত্রে হাত তুলতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে এসেছিলেন তাঁরা ভোর থেকেই। বহু মানুষের অংশগ্রহণে ইহলোকের মঙ্গল, পরলোকের ক্ষমা, দেশের কল্যাণ, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও বিশ্বশান্তি কামনার মধ্য দিয়ে তাবলিগ জামাতের ইজতিমার প্রথম পর্ব শেষ হয়েছে রোববার। এবারের প্রথম পর্বের মুনাজাতে প্রায় ১৮ লক্ষাধিক মানুষ অংশ নিয়েছেন বলে সংশিষ্ট সূত্রের ধারণা।
এদিকে, মুনাজাতে অংশ নিতে রোববার ভোর রাত থেকেই টঙ্গীর ইজতিমা অভিমুখে শুরু হয় মানুষের ঢল। টঙ্গীর পথে শনিবার মধ্যরাত থেকেই ইজতিমা ময়দানগামী ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে মোটর গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে মুনাজাতে অংশ নিতে চার দিক থেকে লাখ লাখ মুসুল্লী পায়ে হেঁটেই ইজতিমাস্থলে পৌঁছেন। মুনাজাতের আগেই ইজতিমা মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হলে মুসুল্লীরা মাঠের আশেপাশের রাস্তা, অলি-গলিতে অবস্থান নেন। ইজতিমাস্থলে পৌঁছুতে না পেরে কয়েক লাখ মানুষ কামার পাড়া সড়ক ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে মুনাজাতের জন্য পুরনো খবরের কাগজ, পাটি, সিমেন্টের বস্তা ও পলিথিন সিট বিছিয়ে বসে পড়েন। এছাড়াও পার্শ্ববর্তী বাসা-বাড়ি-কলকারখানা-অফিস-দোকানের ছাদে, যানবাহনের ছাদে ও তুরাগ নদীতে নৌকায় মুসুল্লীরা অবস্থান নেন। যে দিকেই চোখ যায় সেদিকেই দেখা যায় শুধু টুপি-পাঞ্জাবি পড়া মানুষ আর মানুষ। ইজতিমাস্থলের চারপাশের ৩-৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। মুনাজাতের জন্য রোববার আশেপাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানাসহ বিভিন্ন অফিস-আদালতে ছিল ছুটি। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা না করলেও কর্মকর্তাদের মুনাজাতে অংশ নিতে বাধা ছিল না। নানা বয়সী ও পেশার মানুষ এমনকি মহিলারাও ভিড় ঠেলে মুনাজাতে অংশ নিতে রোববার সকালেই টঙ্গী এলাকায় পৌঁছেন।
শেষ দিনে বয়ানকারী রোববার মুনাজাতের দিন বাদ ফজর থেকে খাস বয়ান করেন বাংলাদেশের মাওলানা প্রকৌশলী আনিসুর রহমান। এরপর মুনাজাত পরিচালনার আগে বাংলাদেশের হাফেজ মাওলানা জোবায়ের তাবলিগের গুরুত্ব তুলে ধরে মুসুল্লীদের উদ্দেশ্যে হেদায়তি বয়ান করেন। এসময় ইজতিমাস্থলে আগতরা বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে সেসব বয়ান শুনেন।
ভিআইপিদের মুনাজাতে অংশগ্রহণ বিশ্ব ইজতিমার মূল আকর্ষণ হচ্ছে মুনাজাত। প্রতিবারের মতো এবারের ইজতিমার প্রথম পর্বের মুনাজাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে মন্ত্রী পরিষদের বিভিন্ন সদস্যবর্গ, সংসদ সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও গণভবনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাসহ বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ অংশগ্রহণ করেছেন। তারা টেলিভিশনের সামনে বসে সরাসরি সম্প্রচার দেখে মুনাজাতে অংশ নেন। এদিকে বিশ্ব ইজতিমায় আগত লাখো লাখো মুসল্লির সঙ্গে ইজতিমা ময়দানে বসে মুনাজাতে অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল, গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ুন কবির, পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদ, গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এডভোকেট আজমত উল্লাহ খান ও গাজীপুর মহানগর যুবলীগ আহ্বায়ক কামরুল আহসান সরকার রাসেলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। এছাড়াও মুনাজাতে বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের কূটনীতিকবৃন্দ, বিভিন্ন রাজনেতিক দলের নেতৃবর্গ শরিক হন। এ ছাড়া পদস্থ সামরিক, বেসামরিক কর্মকর্তাসহ দল-মত, শ্রেণী-পেশা নির্বিশেষে সর্বস্তরের ধর্মপ্রাণ মুসলমান মুনাজাতে অংশ নেন।
গাজীপুর ও টঙ্গীর সকল কারখানায় ছুটি বিশ্ব ইজতিমার প্রথম পর্বের মুনাজাত উপলক্ষে গাজীপুর ও টঙ্গীর সকল কারখানায় ছুটি ছিল। ফলে এবার এসব কারখানার শ্রমিকদের ইজতিমায় আখেরি মুনাজাতে অংশ নিতে সমস্যা হয়নি।
টেলিভিশন-মুঠোফোন ও ওয়্যারলেস সেটে মুনাজাত ইজতিমা মাঠে না এসেও মুনাজাতের সময় হাত তুলেছেন অসংখ্য মানুষ। টঙ্গীর ইজতিমাস্থল থেকে প্রায় ১৫ কিমি দূরে কনফারেন্সের মাধ্যমে গত কয়েকবারের মতো এবারও গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তায় মসজিদের মাইকে আখেরী মুনাজাত সম্প্রচার করা হয়। এখানে কয়েক হাজার নারী পুরুষ ঈদগাহ মাঠে এবং পার্শ্ববর্তী সড়কে ও ভবনগুলোতে জড়ো হয়ে মুনাজাতে অংশ নেন। এছাড়াও গাজীপুর জেলার বিভিন্ন এলাকায় টেলিভিশন, ওয়্যালেস সেট ও মুঠোফোনের মাধ্যমে মুনাজাত প্রচার করা হয়। এসব স্থানেও পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল। আবার টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে সরাসরি সম্প্রচার করার কারনে অনেকে বাসায় বসে মুনাজাতে অংশ নিয়েছে। আবার দেশ বিদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অনেকে ইজতিমাস্থলে অবস্থানকারীর সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করেও মুনাজাতে শরীক হয়েছেন।
মুনাজাত শেষে যানজট মুনাজাত শেষ হওয়ার পরপরই বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেয়া মানুষ একযোগে নিজ নিজ গন্তব্যে ফেরার চেষ্টা করেন। এতে টঙ্গীর আশে-পাশের সড়ক-মহাসড়ক গুলোতে সৃষ্টি হয় জনজট ও যানজট। ফলে যানজটের বিড়ম্বনা এড়াতে অনেক মুসল্লী পায়ে হেটে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। আর পাঁয়ে হাঁটা মুসুল্লীদের চাপে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা মুসুল্লীদের যানবাহন রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত থেমে থাকে ইজতিমা মাঠের আশে-পাশের এলাকায়।
প্রথম পর্বে প্রায় তিনহাজার জামাত তৈরি বিশ্ব ইজতিমার আয়োজক কমিটির সদস্য প্রকৌশলী মো গিয়াস উদ্দিন জানান, বিভিন্ন দেশে তাবলীগের কাজে বের হতে এবার ইজতিমা স্থলে প্রথম পর্বে প্রায় ৩ হাজার জামাত তৈরী হয়েছে। এরমধ্যে দেশীয় জামাত হয়েছে প্রায় দু’হাজার এবং প্রায় ৮শ’ বিদেশী জামাত হয়েছে। এসব জামাতে কেউ কেউ এক চিল্লা, দু’চিল্লা, তিন চিল্লা, ছয় চিল্লা ও একবছরের চিল্লা এমনকি আজীবন চিল্লার জন্য প্রস্তুত হয়েছেন। আগামী ১৫-২০ দিনে মধ্যে এসব জামাত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়বে।
মুানাজাতে মহিলাদের অংশগ্রহণ মুনাজাতে অংশ নিতে বিভিন্ন এলাকা থেকে কয়েক হাজার মহিলা মুসল্লীও আগের দিন রাত থেকে ইজতিমা ময়দানের আশেপাশে, বিভিন্ন মিলকারখানা, বাসা-বাড়িতে ও বিভিন্ন দালানের ছাদে বসে মুনাজাতে অংশ নেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ