ঢাকা, মঙ্গলবার 16 January 2018, ৩ মাঘ ১৪২৪, ২৮ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অধিকাংশ বারে নেই বৈধ আমদানির কাগজপত্র

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : ২০১৭ সালের মে মাসের কথা। ওই মাসের ৬ তারিখে বনানী থানায় দুই তরুণীর পক্ষে একজনের ধর্ষণ মামলা দায়েরের পর আলোচনায় উঠে আসে সরকারদলীয় এমপি বি এইচ হারুনের মালিকানাধীন হোটেল “রেইনট্রি”। ওই হোটেলেই কৌশলে দুই তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগ করা মামলায় এক তরুণী অভিযোগ করেছেন আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাত আহমেদ ও তার বন্ধু নাঈম আশরাফ তাদেরকে আটকে রেখে ধর্ষণ করেছেন। তার আগে জন্মদিনের পার্টিতে তাদেরকে মদ খাওয়ানো হয়।
আইন অনুযায়ী বাংলাদেশে সাধারণের কাছে মদ বিক্রি নিষিদ্ধ হলেও লাইসেন্সধারী বা বিদেশীদের কাছে বিক্রির জন্য কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেয়া হয়। তবে হোটেল রেইন ট্রির সেই অনুমোদন ছিল না। তার পরও সেখানে মদ বিক্রি হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
এই অভিযোগের ভিত্তিতে ওই সময়ের আলোচিত রেইন ট্রি হোটেলে মামলা হওয়ার এক সপ্তাহের মাথায় ১৩ মে অভিযান চালায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। অভিযানে কোনো মাদক দ্রব্য খুঁজে পায়নি মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। অথচ ২৪ ঘণ্টা যেতে না যেতেই পরদিন ১৪ মে একই হোটেল থেকে মদ উদ্ধার করে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতর।
এর আগে ২০১৬ সালের ৬ মে ঢাকা রিজেন্সি হোটেল এন্ড রিসোর্টে অভিযান চালিয়ে ‘বিপুল পরিমাণ’ বিদেশী মদ, বিয়ার ও সীসা জব্দ করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। বিমানবন্দর রোডের খিলক্ষেতের চার তারকা মানের ওই হোটেলে তিন দিনের অভিযান চালিয়ে এসব মাদক জব্দ করা হয় বলে জানান অধিদফতরের মহাপরিচালক মইনুল খান। এসবেরও কোন বৈধ কাগজপত্র ছিল না।
এই দুটি ঘটনার কথা মাথায় রেখেই চলতি বছরের শুরু থেকেই অভিযানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে শুল্ক ও গোয়েন্দা অধিদফতর। তাদের মতে, মাদকের ভয়াল থাবায় সর্বনাশের পথে রয়েছে দেশের তরুণ সমাজ। মদ, গাঁজা, ইয়াবা এমনকি সিসার প্রতি এক শ্রেণির তরুণ বিশেষ করে ধনাঢ্য তরুণদের আসক্তি বেড়েই চলছে। খোদ রাজধানীতে মাদক বিক্রেতা ছোট-বড় প্রতিষ্ঠান ও বারের সংখ্যা দুই’শ ছাড়িয়েছে অনেক আগেই। এসব প্রতিষ্ঠান ও বারে প্রতিদিন বিক্রি হচ্ছে লাখ লাখ টাকার অবৈধ মাদকদ্রব্য।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (ডিএনসি) হিসেবে রাজধানীতে বৈধ মদের বার ৫০ থেকে ৬০টি এবং সিসা বার বা সিসা লাউঞ্জ রয়েছে ১০৫টি। অনেক বারের আইনি ভিত্তি থাকলেও সেখানে যে মদ বা সিসা বিক্রি হয় তার বেশির ভাগেরই বৈধ কাগজপত্র নেই। নতুন বছরে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের টার্গেট হচ্ছে এসব বার। এরই মধ্যে শতাধিক বারের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। তালিকা ধরে শিগগিরই অভিযানে নামছে সংস্থাটি।
তালিকায় প্রথম সারিতে রয়েছে বনানীর আরগিলা রেস্টুরেন্ট হাউস, মিন্ট আলট্রা লাওসিস, ফ্লোর সিক্স লিমিটেড. হোটেল বেঙ্গল ব্লু-বেরি, ফ্যাশন হান্ট এন্টারপ্রাইজ, ব্লু- মুন রিক্রিয়েশন, হোটেল সেরিনা লিমিটেড, হোটেল জাকারিয়া ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, কারিশমা সার্ভিস, লেকভিউ রিক্রিয়েশন, লা-ডিপ্লোম্যাট রেস্টুরেন্ট লিমিটেড, কোরিয়ান ইন্ট. ক্লাব লিমিটেড, বেস্টহোল্ডিং লিমিটেড এবং ডিমপল বার এন্ড রেস্টুরেন্ট ইত্যাদি।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান বলেন, ‘রাজধানীতে মদের শতাধিক বার রয়েছে যেখানে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার মদ বিক্রি হয়। তবে অধিকাংশ বারে নেই বৈধ আমদানির কাগজপত্র। তাহলে মদ বা এ জাতীয় নেশাদ্রব্য কোথা থেকে আসে। এবার সেটাই খোঁজা হবে প্রধান লক্ষ্য।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমানে সিসা নামের আরো একটি নেশা দ্রব্য ভীষণ জনপ্রিয়। যদিও এখনো নিষিদ্ধ মাদকের তালিকায় নেই এ জিনিষটি। ২০১৬ সালে রাজধানীর রিজেন্সি হোটেল এন্ড রিসোর্ট থেকে আমরা ২০ কেজির বেশি অবৈধ সিসা জব্দ করি। বর্তমানে রাজধানীতে সিসার অবাধ ব্যবহার লক্ষ্য করা গেছে। শুধু তাই নয়, সিসার সঙ্গে গাঁজা ও বিভিন্ন মাদকদ্রব্য বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া আর একটি মাদক ইয়াবার ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সমাজে। ইয়াবা খুব সস্তা ও কালারফুল হওয়ায় তরুণ সমাজকে আকৃষ্ট করে। ইয়াবা উত্তেজকমূলক মাদক হওয়ায় সমাজের জন্য বেশ ক্ষতিকর। যা সামাজিক একটি অস্থিরতা তৈরি করে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও অভিভবাবকরা আমাদের অভিযান পরিচালনার জন্য অনুরোধ করেছেন। শিগগিরিই অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সহযোগিতায় অভিযান চালানো হবে। আর এটাই হবে নতুন বছরের মূল ফোকাস।’
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই নিরাপদ বাণিজ্য নিশ্চিত করতে। এর মানে হচ্ছে আমরা অবৈধ ও দেশের জন্য ক্ষতিকর পণ্য আমদানি বন্ধ করতে চাই। তাই এ বছর আমরা মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। তবে আমাদের কাজ হবে আমদানি সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও শুল্ক ফাঁকির বিষয়টি যাচাই করা। বাকি বিষয়টি মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর দেখবে।’
শুল্ক গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালের মে মাসে ঢাকায় রিজেন্সি হোটেল এন্ড রিসোর্টে অভিযান চালিয়ে ‘বিপুল পরিমাণ বিদেশী মদ, বিয়ার ও সিসা জব্দ করেছে শুল্ক গোয়েন্দা। তিন দিনের অভিযানে জব্দ করা বিদেশী মদের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৮১ লিটার। অভিযানে ৯১টি বিদেশী মদের বোতলও উদ্ধার হয়। রেজিস্ট্রার খাতায় দেখা যায়, ২০০৯ সাল থেকে ওই সময় পর্যন্ত ওই হোটেলে ২৭ টন মদ ও বিয়ার বিক্রি হয়েছে। কিন্তু রেজিস্ট্রারের হিসাবে দেখা গেছে, হোটেলটি সাড়ে ৬ টন মদ ও বিয়ার বিক্রি করেছে। বাকি প্রায় ২১ টন মদ ও বিয়ারের হিসাব দিতে পারেনি হোটেল কর্তৃপক্ষ। এছাড়া হোটেলটি থেকে প্রায় ২২ কেজি সিসা ফ্লেভারও উদ্ধার করা হয়, যার বিপরীতে কর্তৃপক্ষ আমদানি সংক্রান্ত কোনো কাগজ দেখাতে পারেনি। রাজধানীর গুলশান বা বনানীর মতো অভিজাত এলাকার বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় সিসার সঙ্গে অন্যান্য মাদক মিশিয়ে সেবন করা হয়। এতে আমাদের তরুণ সমাজ মাদকদ্রব্য দ্বারা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যেহেতু সিসা মাদকদ্রব্য আইনের আওতায় পড়ে না এবং আমরা মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ নই সে কারণে শুল্ক গোয়েন্দা সিসা আমদানির কাগজপত্র যাচাই করে শুল্ক আইনে ব্যবস্থা নেবে।
শুল্ক গোয়েন্দা আরো জানায়, সীমান্তবর্তী দেশ ভারত থেকে ফেনসিডিল আসা অনেকাংশে কমে গেছে। তবে ফেনসিডিলের জায়গা দখল করেছে ইয়াবা নামের ভয়ঙ্কর নেশাদ্রব্য। বাংলাদেশ এবং ভারতের বিভিন্ন সংস্থার তৎপরতায় সীমান্তবর্তী এলাকায় ফেনসিডিলের অবৈধ কারখানা সিলাগালা করা হয়েছে। কড়া নজরদারির  কারণে  দেশে ফেনসিডিল পাচার হয়ে আসা  অনেকাংশে কমে গেছে। তবে ইয়াবা জাতীয় দ্রব্যের ব্যবহার বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। বিশেষ করে তরুণ সমাজের মধ্যে এই নেশার জনপ্রিয়তা বেশি লক্ষ্য করা গেছে। এটি শুধু মাদকাসক্তদেরই ক্ষতি করছে তাই নয়, সমাজকেও কলুষিত করছে। শুল্ক গোয়েন্দা বার কিংবা নেশা করার আস্তানা শনাক্ত করে অভিযান চালাবে।
রাজধানীতে বৈধ মদের বারের সংখ্যা পঞ্চাশের কিছু বেশি হলেও অবৈধ বারের সংখ্যা জানা নেই ডিএনসি’র। গুলশান বনানী এলাকায় বিভিন্ন ফাস্টফুড ও আবাসিক হোটেলগুলোয় বারের মতই কেনাবেচা হয় দেশী-বিদেশী মদ। পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় হোম ডেলিভারি সার্ভিসে বিক্রি হচ্ছে দেশী-বিদেশী মদ। ইয়াবা, ফেনসিডিল আর হোরোইনের মতই মুঠোফোনে যোগাযোগ করে চলছে এ ব্যবসা। অন্যদিকে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী রাজধানীতে সিসাসেবীর সংখ্যা এখন ৫০ হাজারেরও বেশি। দেশে বার হিসেবে এর সংখ্যা দুই শতাধিক। তবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি) ১০৪টির তালিকা করেছে। আবার সিসাসেবীদের মধ্যে ১৫ হাজার ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত। শুরুতে উচ্চবিত্ত ঘরের কিছু বিপথগামী তরুণ-তরুণীর মধ্যে সিসা সেবনের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেলেও এখন তা ছড়িয়ে পড়ছে সর্বস্তরে। সাধারণত শীতের সময় সিসা বারগুলোতে ভিড়বাড়ে। এর মধ্যে ঢাকার মোহাম্মদপুরের অ্যারাবিয়ান নাইটস, ফুড কিং, ধানমন্ডির সেভেন টুয়েলভ লাউঞ্জ, ডমিনেন্স পিজা, কিউ কিউ টি এন্ড লাউঞ্জ, এইচ টু ও লাউঞ্জ এন্ড রেস্টুরেন্ট, ঝাল লাউঞ্জ এন্ড রেস্টুরেন্ট, গুলশানের এক্সিট লাউঞ্জ, জোন জিরো লাউঞ্জ, মাউন্ট আল্ট্রা লাউঞ্জ, জাবেদ কাড লাউঞ্জ, ক্লাব অ্যারাবিয়ান, হাবুল-বাবুল, বনানীর মিলাউন্স, ডকসিন, কফি হাউস, বেইজিং লাউঞ্জ, মিট লাউঞ্জ, সিক্সথ ফ্লোর, বেইলি রোডের থার্টি থ্রি ও খিলক্ষেতের হোটেল রিজেন্সি অন্যতম।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ