ঢাকা, মঙ্গলবার 16 January 2018, ৩ মাঘ ১৪২৪, ২৮ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ইতিহাস সৃষ্টি করেন সংবেদনশীল লেখকরা ॥ রাজা-মহারাজারা নয়

স্টাফ রিপোর্টার : সফররত ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি বলেছেন, সন্ত্রাসের বিষবাষ্প থেকে বিশ্বের ভবিষ্যত প্রজন্মকে রক্ষা ও বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আর এর জন্য মানুষের মনের দূষণ দূর করতে হবে। তিনি আরো বলেন, মানুষের মনের মধ্যে যে দূষণ, মানুষ হয়ে যাচ্ছে চলন্ত বোমা, এখানে সেখানে বোমা ফাটানো হচ্ছে। মানুষ মরছে। এ যে গোটা বিশ্বব্যাপী যে অস্থিরতা এটা থেকে তরুন সমাজকে রক্ষা করতে হলে তার মনের দূষণ দূর করতে হবে। সেটা জাতিসংঘ পারবে না, রাজা-মহারাজারা পারবে না। এটা পারবে এই সৃষ্টিশীল লেখকরা। মেধা, মনন ও লেখনী দিয়ে শিল্পী-সাহিত্যিকরা সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদকে রুখতে পারেন বলে মন্তব্য করেন প্রণব মুখার্জি।
গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলনের সমাপ্তি অধিবেশনে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আয়োজনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। এসেছিলেন ভারতের ঝাড়খ- রাজ্যের সংসদ বিষয়কমন্ত্রী সরযু রাই, চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন কবি কামাল চৌধুরী ও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান।
প্রণব মুখার্জি বলেন, কিছুক্ষণ আগে সম্মেলনে গৃহীত ও আলোচিত বিষয়গুলোকে চয়ন করে দেখলাম, ঢাকা সংকল্প তৈরি হয়েছে। সঠিকভাবে বর্তমান বিশ্বের মূল্যায়ন হয়েছে সেখানে। শিল্পী, সাহিত্যিক, লেখক তারা অঙ্গীকার করেছেন- পৃথিবীর এই চেহারা পরিবর্তন করতে হবে, যে পৃথিবীতে মানুষ হিংস্রতার শিকার হচ্ছে কোনো কারণ ছাড়া।
তিনি বলেন, গত এক দশকে যে সস্ত্রাসবাদী আক্রমণ হয়েছে, তার কারণ কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। তারা কী চান বোঝা যায় না। নিরীহ মানুষ প্রিয়জনের কাছে যাচ্ছেন, সেটা হাইজ্যাক করে লিভিং বোম্ব হয়ে গেল, কত মানুষের প্রাণ গেল। এই যে হিংস্রতা সেখানে মানুষ কিভাবে বাঁচবে। শুধু পরিবেশ দূষণ নয়, এরচেয়েও বড় দূষণ মানুষের চিন্তায়, ভাবনায়, মনে, কাজে।
ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্মেলন করে ওই সব দূষণের হাত থেকে বাঁচা যাবে না। শিল্পী, সাহিত্য স্রষ্টা, লেখকরাই এসব দূষণের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেন। যারা গত তিন দিনের সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন, তারাই নতুন পৃথিবী তৈরি করবেন। তিনি বলেন, ইতিহাস সৃষ্টি করেন সংবেদনশীল লেখক, সাহিত্যিক, শিল্পী, স্রষ্টা, রাজা-মহারাজারা নয়। পরীক্ষায় পাস করার জন্য মুখস্থ করতে হয়, পরীক্ষা হয়ে গেলে ভুলে যায়। কিন্তু শিল্পীর ছবি, একজনের লেখা, তার কবিতা, নিজের লেখা উপন্যাস কখনও ভুলে যায় না।
প্রণব বলেন, আমি তো পাঠক, একজন দর্শক। আমি স্রষ্টা নই, সৃষ্টিকর্ম তো আমার নেই। এই আন্তর্জাতিক সাহিত্যের মহামেলায় আমার কাজটা কী হবে? বীরভূমের গ্রামের ভাষায় রাজমিস্ত্রীদের সিমেন্ট, বালু, মসলা ইত্যাদি এনে দেওয়া লোকদের বলা হয় যোগাই। এই সম্মেলনে আমার কাজটা এখানে অনেকটা যোগাইয়ের মতো।
১৯৬৯ থেকে ২০১২, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আমি খুব বেশি পড়ার সুযোগ পাইনি। ২৫ বছর মন্ত্রী ছিলাম। সরকারি কাজ, সংসদীয় কাজের ঠেলায় পড়ার সময় পাইনি। ৩৩০ কক্ষের রাষ্ট্রপতি ভবনে এসে ভাবলাম- এখানে কী করব? প্রধানমন্ত্রী ফাইল পাঠাবেন, আইন প্রণয়ন করবেন সাংসদরা, আমি তাদের পরামর্শ দেব। রাষ্ট্রপতির ভূমিকা সেখানে কম। বছরে একদিন সাংসদদের ডেকে বক্তৃতা দেব, সেখানে দাড়ি-কমা সবটাই মন্ত্রিসভার তৈরি। রাষ্ট্রপতিকে বলতে হবে, মাই গভর্নমেন্ট। তিনি বলেন, কিন্তু যেটা হল, রাষ্ট্রপতি ভবনে আধুনিক ভারতবর্ষের প্রচুর কাগজপত্র, অনেক দুষ্প্রাপ্য গোপনীয় রেকর্ড, পড়বার জন্য প্রচুর উপাদান পেয়ে গেলাম। এসব পড়তে গেলে তো এক প্রেসিডেন্সিয়াল টার্মে হবে না, তিনটা টার্ম লাগবে। তার আগেই ঈশ্বরের সমন এসে যাবে। আমি ভাবলাম, যতটা পারা যায়, আমি পড়ব।
একুশে ফেব্রুয়ারিকে সারাক্ষণ স্মরণ করার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভারতের এই সাবেক রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক মর্যাদা পেয়েছে। আজকের বাংলা, তৎকালীণ পূর্ব বাংলা দীর্ঘ ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মাতৃভাষার অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করেছে। তাদের উদ্দেশে সালাম ও প্রণাম। আনুষ্ঠানিকভাবে শুধু ২১ ফেব্রুয়ারি নয়, প্রতি মুহূর্তে মনে রাখতে হবে, আমরা দায়বদ্ধ তাদের কাছে। আমাদের এই ঐতিহ্য, হাজার বছরের ভাষাকে তারা রক্ষা করেছেন। লুট হয়ে যেতে দেননি। আগ্রাসকদের হাতে ধ্বংস হয়ে যেতে দেননি। বাংলাদেশের সরকার, বাংলা একাডেমি ঢাকা, নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন, ফে-স অব ই-িয়া সোসাইটি যাদের যৌথ উদ্যোগে সম্মেলন হলো, তাদের ধন্যবাদ। বাংলা সাহিত্য কেবল বাঙালি চিন্তা, তার ধ্যান-ধারণার প্রতিফলন নয়, সর্বজনীনতার প্রতিফলন। সে কারণেই এই মঞ্চ থেকে এই সংকল্প নেওয়া সম্ভব, এই বিষাক্ত পৃথিবীকে রক্ষা করবো। আজকে এর প্রয়োজন আছে।
প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশের চমকপ্রদ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রশংসা করে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী বলেছেন, বাংলাদেশ এখন বিনিয়োগের জন্য একটি আকর্ষণীয় স্থান।
প্রণব মুখার্জী গতকাল দুপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবনে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে একথা বলেন। বৈঠকের পরে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। বৈঠকের শুরুতেই দুই নেতা নিজেদের মধ্যে কুশল বিনিময় করেন, বলেন প্রেস সচিব।
প্রণব মুখার্জী তাঁর অবসর সময় কাটানোর বৃত্তান্ত তুলে ধরে বলেন, বই পড়েই এখন তাঁর সময় কাটছে। তিনি বলেন, আমি জীবনের দীর্ঘ সময় রাজনীতি করেছি। ভারতের সংসদে এবং রাষ্ট্রপতির পদের মত সাংবিধানিক পদে ছিলাম। অবসর গ্রহণের পরে আমার অফুরন্ত সময় পড়ার জন্য।
তিনি ২০১৩ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলাদেশে তাঁর প্রথম বিদেশ সফরের কথাও স্মরণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের উল্লেখযোগ্য দিক তুলে ধরে বলেন, তাঁর সরকারের বিভিন্ন বাস্তবধর্মী পদক্ষেপের ফলে দারিদ্র্যের হার ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। গত বছরের বন্যার ফলে দেশের অর্থনীতি খানিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যু সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ মানবিক কারণে প্রায় ১০ লাখ বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিককে আশ্রয় প্রদান করেছে।
প্রণব মুখার্জীর মেয়ে শর্মিষ্ঠা মুখার্জী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব সুরাইয়া বেগম এ সময় উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া এক পারিবারিক মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন প্রণব মুখার্জি। এরআগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনের প্রধান প্রবেশ মুখে ফুলের তোড়া হাতে প্রণব মুখার্জীকে স্বাগত জানান।
এর আগে ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে যান ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি। সেখান থেকেই যান গণভবনে।
বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন সফররত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে তিনি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে যান। এ সময় তাঁকে সেখানে অভ্যর্থনা জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ও বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক। এরপর তিনি জাদুঘর ঘুরে দেখেন। তিনি ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নানা স্মৃতিচিহ্ন তিনি ঘুরে দেখেন।
পরে জাদুঘরের পরিদর্শন বইতে তিনি লিখেছেন, ‘ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে পুনরায় ভ্রমণ করার সুযোগ পেয়ে আমি গর্বিত। স্বাধীনতাযুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষকে এই বাড়ি থেকেই নেতৃত্ব দিয়েছেন শেখ মুজিব। যাকে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে এখানেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ভোরে হত্যা করা হয়।’
ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি আরও লিখেছেন, ‘এই বাড়িটিই একটি নতুন জাতির জন্ম ও এগিয়ে চলার ইতিহাসের সাক্ষী। আমি সর্বকালের সাহসী এই নেতাকে স্যালুট জানাই এবং সব শহীদের প্রতি সম্মানজনক শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।’
ঢাকা আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনের আমন্ত্রণে পাঁচ দিনের ব্যক্তিগত সফরে ঢাকায় এসেছেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। গত রোববার বিকাল ৪টায় জেট এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন তিনি।
নির্ধারিত কর্মসূচি মোতাবেক, ভারতের সাবেক এ রাষ্ট্রপতি আজ মঙ্গলবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। সেখানে তাকে সম্মানসূচক ডিলিট ডিগ্রি প্রদান করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে রাউজানে পারিবারিক বসতভিটা দেখতে যাবেন তিনি। রাতে চট্টগ্রামে থাকবেন প্রণব মুখার্জি।
বুধবার ঢাকায় ফিরে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন প্রণব মুখার্জি। পর দিন বৃহস্পতিবার সকালে ভারতের উদ্দেশে তিনি ঢাকা ত্যাগ করবেন।
ভারতের ১৩তম রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি গত বছরের জুলাইয়ে অবসরে যান। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ২০১৩ সালের মার্চে বাংলাদেশ সফরে এসে স্ত্রীকে নিয়ে নড়াইলে শ্বশুরালয়ে যান প্রণব মুখার্জি। এর আগে ১৯৯৬ সালে মেয়ে শর্মিষ্ঠাকে নিয়ে নড়াইলের বাড়িতে এসেছিলেন স্ত্রী শুভ্রা মুখার্জি। ২০১৫ সালে মারা যান শুভ্রা মুখার্জি। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখার জন্য প্রণব মুখার্জিকে সম্মাননাও দেয়া হয়েছিল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ