ঢাকা, মঙ্গলবার 16 January 2018, ৩ মাঘ ১৪২৪, ২৮ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

চাহিদার কারণে গুড়ে ভেজাল দেয়ার প্রবণতা বেড়েছে

শাহজাহান, তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ): খেজুর গাছের সংখ্যা হ্রাস অপরদিকে রস ও গুড়ের চাহিদার কারণে এবার গুড়ে ভেজাল দেয়ার প্রবণতা বেড়েছে। গাছিরা জানান, শীত যত বেশি পড়ে, খেজুর গাছ থেকে তত বেশি রস সংগৃহীত হয়। এবার শীতের তীব্রতা শুরু থেকেই অনেক কম। ফলে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের পরিমাণও কম হচ্ছে। আবার আগের মতো ঝোঁপ-ঝাড় না থাকায় খেজুর গাছও কমেছে। পরিকল্পিতভাবে খেজুর গাছ রোপণ করা না হলেও ঝোঁপ-ঝাড়ের সঙ্গে ব্যাপক হারে খেজুর গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। ফলে আগের চেয়ে রস সংগ্রহের পরিমাণ অনেক কমেছে। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বাজারে গুড়ের চাহিদা অনেক বেড়েছে। চাহিদার সঙ্গে যোগান ঠিক রাখতে গাছিরা খেজুর রসের সঙ্গে চিনির মিশ্রণে বেশি গুড় তৈরি করছে। সিরাজগঞ্জ  নাটোর ও পাবনার তাড়াশ  চাটমোহর, সিংড়া,  গুরুদাসপুর, উল্লাপাড়া,শাহজাদপুর,  রায়গঞ্জ, উপজেলার  কাছিকাটা, চাচকৈড়, মির্জাপুর, নওগা, সিরাজগঞ্জ রোড সহ  বিভিন্ন এলাকায় ভেজাল  গুড় বিক্রি  হচ্ছে। মৌসুমের  শুরুতেই চলনবিলের বিভিন্ন হাটবাজারে উঠতে  শুরু  করেছে খেজুরের গুড়। অবাধে তৈরি  ভেজাল  গুড়  এক  শ্রেনীর অর্থলোভী  চাষীরা খেজুর  রসের সাথে চিনি মিশিয়ে  গুড় তৈরি করছে। তবে শীত শুরুতেই নবান্নের আমেজ এখন শহর থেকে প্রতিটি গ্রামে  গঞ্জের  বাড়িতে  বাড়িতে চলছে নতুন ধানের আটায় পিঠাপুলির উৎসব। ভেজাল গুড়ে  অনেক রোগব্যাধি হতে  পারে বলে বিশেষজ্ঞরা  জানিয়েছেন। পীড়াজনিত সমস্যা বিশেষ  করে শিশুদের  ওই  ভেজাল গুড় দিয়ে কোন খাদ্য তৈরি করে খাওয়ালে লিভারে ক্যান্সারের মতো  ভয়াবহ মারাত্মক জটিল রোগ  হতে পারে। এ ধরনের ভেজাল গুড় চাষীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে  আইনানুগ ব্যবস্থা  করতে সচেতন মহলের দাবি। সরে জমিনে বাজার ও হাটবাজার ঘুরে জানা গেছে  গুড়ের চেয়ে চিনির দাম  কম বলে খেজুর গুড়ে চিনি  মেশানো  হয়। চাষীরা ভোর বেলা গাছ থেকে  খেজুর  রস সংগ্রহ করে বাড়িতে নিয়ে এসে কড়াইয়ে  রসজাল করে লালচে বর্নের হলেই চিনি ঢেলে দিলেই চিনিগুলো রসের  সাথে মিশে তৈরি হচ্ছে গুড়। চিনি গলে  গেলে হাইড্রোজ,ফিটকারী দিলে রস গাঢ় হয়ে  গিয়ে গুড়ের রং উজ্জল  ও অনেক সুন্দর  লাগে।  খেজুর  রসের সমপরিমান লিটার  চিনি মিশ্রিত করেছে। বাজারে প্রতি কেজি চিনির দাম  ৫৫-৫৫ আর গুড় বিক্রি হচ্ছে ৯০/৯৫ টাকা দরে  প্রতি কেজি চাষিরা গুড়ে বেশী দাম  পায় ২০টাকা।  তাড়াশ  উপজেলার আঃ জব্বার মাষ্টার  বলেন বর্তমানে  হাট বাজারে  আমদানীকৃত  খেজুর গুড়ের  অধিকাংশই চিনি মিশ্রিত  ভেজাল গুড়ের সয়লাব। তবে কেনার সময় চিনতে  পারলেও কিছু করার থাকেনা। কারন জানতে চাইলে তিনি বলেন চিনি মিশ্রিত ছাড়া স্বচ্ছ বা ভালো খেজুরের গুড় পাওয়া  দুষ্কর। এব্যাপারে তাড়াশ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম ফেরদৌস ইসলাম বলেন এই এলাকায় খেজুর গাছের চাষ গুড় উৎপাদনের তুলনায় অনেক কম কিন্ত অসদুপায়ে গুড় প্রস্তুতকারকরা বিভিন্ন ক্ষতিকারক উপাদান দিয়ে গুড় তৈরি করে চলনবিলে বিভিন্ন হাট বাজারে নির্বিচারে ক্রয় বিক্রয় করছে।  তাড়াশ উপজেলার হাটবাজারে ভ্রাম্যমান আদালত বসিয়ে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে চলনবিলের বিভিন্ন হাট বাজার ঘুরে জানা যায়, নাটোরের গুরুদাসপুর পৌর সদরের চাঁচকৈড়ে ভেজাল খেজুরগুড় তৈরীর মহাৎসব চলছে। উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় মোকাম চাঁচকৈড় হাটকে কেন্দ্র করে ১১টি ভেজালগুড় তৈরীর কারখানা স্থাপিত হয়েছে। প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় ভেজালগুড় তৈরীর উৎসবে মেতে উঠেছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী।
খোঁজ নিয়ে জানাযায়, ওই গুড় তৈরী করতে চিটা গুড়, চিনি ও রং প্রয়োজন হয়। চিটা গুড় গো-খাদ্য হিসাবে ব্যবহার হয়। চিটা গুড় আর হাজার পাওয়ারের রং বলে খ্যাত বিষাক্ত রং এর সাথে চিনি মিশিয়ে চুলায় দীর্ঘ সময় জাল দিয়ে ওই গুড় তৈরী করা হয়। যা মানুষের দেহের অপূরনীয় ক্ষতি সাধন করে। প্লাষ্টিকের ড্রামে করে নাটোরের লালপুর উপজেলার আব্দুলপুর ও গোপালপুর এলাকা থেকে ওই চিটা গুড় নিয়ে আসেন তারা। ভেজাল গুড় তৈরীর কারখানার মালিক বাদশার তৈরী গুড় বিদেশে রপ্তানী করেন বলেও জানা যায়।
উপজেলার চাঁচকৈড় পুড়ানপাড়ার খালেক শা’র ছেলে হাজী বাদশা, আতিক শাহ ও আকতার শাহ ওই গুড় তৈরীর জনক বলে জানা যায়। এছাড়াও সুজন, সুমন, আলামিন, ময়েজ হুজুর, আসাদ, সুমন কুন্ডু. জনি কুন্ডু ও বাজার পাড়ার সাহাবুদ্দিন এসব ভেজাল গুড় তৈরী করে চলেছে। কিছু প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় অবৈধভাবে ওই ভেজাল গুড় তৈরী করছে বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভেজাল গুড় তৈরী কারখানার এক মালিক জানান, অতিরিক্ত লাভের আসায় তারা গুড়ের সাথে চিনি মিশিয়ে সুস্বাধু খেজুর গুড় তৈরী করছেন। তবে চা-পাতির রংও ব্যবহার করা হয়। এতে গুড়ের রং ভাল হয় তবে খরচ একটু বেশী পড়ে। ৩০ মন গুড়ের সাথে ৭০ মন চিনি মিশিয়ে একশ’ মন গুড় তৈরী করা হয়।
উপজেলা ভেজাল গুড় তৈরীর নেতা হাজী বাদশা শাহ জানান, গুড়ের সাথে চিনি মিশিয়ে খেজুর গুড় তৈরী করা হয়। অন্য কিছু ব্যবহার করা হয়না। সপ্তাহে ৩-৪শ’ মন গুড় বাজারজাত করেন বলে তিনি জানান।
চাঁচকৈড় বাজার এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, ওই ভেজাল গুড় খেয়ে ডায়রিয়া, আমাশাসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। চাঁচকৈড় ওই সকল ভেজাল গুড় তৈরীর কারখানা থেকে প্রতি সপ্তাহে ৭০ থেকে ৭৫ মেট্রিক টন ভেজাল গুড় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় যায়। চিটা গুড়, কাপড় তৈরীর রং, প্রিন্টিং রং এর সাথে এক ধরনের ক্যামিকেল, আটা, হাইড্রোজ, ফিটকারী, চুলা ড্রাম ও চিনি মিশিয়ে ওই গুড় তৈরী করা হচ্ছে। যা মানুষের শরীরের জন্য চরম ক্ষতিকর। ভেজাল গুড় তৈরী রোধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানান তারা।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মনির হোসেন জানান, গুড়ের সাথে চিনি মিশিয়ে ভেজাল গুড় তৈরী হয় শুনেছি। বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ