ঢাকা, মঙ্গলবার 16 January 2018, ৩ মাঘ ১৪২৪, ২৮ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মানিকগঞ্জে ফসলি জমিতে ইটভাটা ॥ পরিবেশ বিপর্যয় ॥ কমে যাচ্ছে চাষের জমি

এইচ এম হাসিবুল হাসান, ঘিওর (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা : বেড়েই চলেছে ফসলি জমিতে ইটভাটা নির্মাণ। এতে ক্রমেই কমে যাচ্ছে ফসলি জমির পরিমাণ আর পরিবেশ পড়ছে বিপর্যয়ের মুখে। কৃষি জমিতে ইটভাটা স্থাপনের কারণে একদিকে আশেপাশের কৃষি জমিগুলোর উর্বরতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে অন্যদিকে ভালো ফলন উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে এলাকার স্থানীয় কৃষকের ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ছে।

মানিকগঞ্জ সিঙ্গাইর উপজেলার জামির্ত্তা ইউনিয়নে তিন ফসলি জমিতে চারটি ইটভাটা স্থাপন করা হয়েছে। এসব ইটভাটায় ইট তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে কৃষি জমির মাটি। ইটভাটার কার্যক্রম ও কৃষি জমির মাটি কাটা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। সম্প্রতি ভাটার আশেপাশে গ্রামের কয়েক শ মানুষ প্রতিবাদ সমাবেশ করেন। সমাবেশ থেকে ইটভাটা প্রতিরোধ কমিটিও গঠন করা হয়।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, গত বছর জামির্ত্তা ইউনিয়নের হুটের জামির্ত্তা মৌজায় তিন ফসলি চারটি ইটভাটা স্থাপন করা হয়। এগুলো হচ্ছে মেসার্স এএমসিও ব্রিকস কোম্পানি লিমিটেড, মেসার্স জিএইচবি ব্রিকস কোম্পানি লিমিটেড, মেসার্স টিএইচবি ব্রিকস কোম্পানি লিমিটেড ও মেসার্স ডিএমসি ব্রিকস কোম্পানি লিমিটেড। চলতি বছর এ সব ভাটায় ইট পোরানোর প্রক্রিয়া চলছে। ভাটা স্থাপন ও ইট পোরানোর ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের ও জেলা প্রশাসনের অনুমতি নেই। এ ছাড়া গত কয়েক বছর আগে ইউনিয়নের তিন ফসলি জমিতে আরও দুইটি ইটভাটা স্থাপন করা হয়েছে। এসব ভাটায় কৃষি জমির মাটি নিয়ে ইট তৈরি করা হচ্ছে। এতে এখানকার কৃষি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। মাটিবাহী ট্রাক ও ট্রলি চলাচলের কারণে পাকা ও কাঁচা রাস্তা নষ্ট হচ্ছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, হুটের জামির্ত্তা এলাকার চারদিকে সরিষা ও ভুট্টার আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যেই ওই চারটি ইটভাটা স্থাপন করা হয়েছে। ভাটাগুলোতে ইট তৈরির জন্য আশেপাশের কৃষি জমি থেকে মাটি কেটে ট্রাকে করে নেয়া হচ্ছে। এসব ইটভাটা কর্তৃপক্ষ পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, জেলা প্রশাসনের অনুমতিপত্র ও কৃষিবিভাগের অনুমতিপত্র এখনো পায়নি। মেসার্স এএমসিও ব্রিকসের মালিক মোজাম্মেল হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ হলে তিনি বলেন, ভাটা চালাতে গেলে সকল অধিদপ্তরের অনুমতি লাগে। পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের অনুমতি পেয়েছি তবে কৃষি বিভাগের অনুমতিপত্র আশা করছি দু-চার দিনের মধ্যে পেয়ে যাব। মেসার্স টিএইচবি ব্রিকসের ম্যানেজার সিরাজুল ইসলাম ও ডিএমসি ব্রিকসের মালিক আলী আহমেদ বলেন, অনেক আগে থেকেই এই ব্যবসা করছি। কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছি। অবশ্যই সকল অধিদপ্তরের অনুমতি নিয়েই ভাটার কার্যক্রম শুরু করেছি। তবে কথা বলার জন্য জিএইচবি ব্রিকসের কাউকে পাওয়া যায়নি। এই চারটি ইটভাটার মালিক কিছু জমি কিনে করেছেন আর বাকি সব জমি এলকার কৃষকের কাছ থেকে ১০ বছরের চুক্তিতে ভাড়া নিয়েছেন। প্রত্যেক ভাটার মালিকে জমির ভাড়া বাবদ প্রতিবছর দিতে হবে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা। এসব ভাটায় অবাদে ট্রাক চলাচল করার জন্য কৃষি জমির ফসল নষ্ট করে রাস্তা বানানো হয়েছে।

সূত্রে জানা গেছে, জামির্ত্তা ইউনিয়নের কাঞ্চননগর ও হাতনীগ্রামের চারদিকে সরিষা আবাদ করা হয়েছে। এসব গ্রাম থেকে ফসলিজমির মাটি কেটে ট্রাকে করে আশেপাশের বিভিন্ন ভাটায় নেয়া হচ্ছে। এলাকার বেশ কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এলাকায় সাধারণ মানুষদেরকে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রভাব খাটিয়ে ফসলি জমি থেকে মাটি কিনে ভাটায় বিক্রি করছে স্থানীয় মাটির ব্যবসায়ীরা।  নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বলেন, মাটির ব্যবসায়ীরা কিছু কৃষি জমির মাটি কিনছেন। এরপর খনন যন্ত্র দিয়ে ২৫ থেকে ৩০ ফুট গভীর করে মাটি কাটা হচ্ছে। এতে চার পাশের জমির মাটিও ধসে পড়ছে। প্রতিবাদ করলে মাটি ব্যবসায়ীরা নানা ভয়ভীতি দেখান।

স্থানীয় ইটভাটা প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবুল বাশার বলেন, একদিকে তিন ফসলি জমিতে অবৈধভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে ইটভাটা, অন্যদিকে কৃষিজমির মাটি যাচ্ছে সেই ভাটায়। এতে কমছে কৃষি জমি বাড়ছে পরিবেশ দূষন ও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এলাকার রাস্তাঘাট। এসব সমস্যা সমাধানে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

 জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. সাঈদ আনোয়ার বলেন, মাঝে মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অবৈধ ভাটাগুলো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়। কোনো কোনো ভাটার মালিক আবেদন করেই ভাটা নির্মাণ করে ইট পোরানো শুরু করেন। আবার কেউ কেউ উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেও ভাটার কার্যক্রম চালাচ্ছেন। খোঁজখবর নিয়ে ওই সব ভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ