ঢাকা, বৃহস্পতিবার 18 January 2018, ৫ মাঘ ১৪২৪, ৩০ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের চুক্তি প্রসঙ্গে

মিয়ানমার থেকে জীবন বাঁচিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে গত মঙ্গলবার দু’দেশের মধ্যে মাঠ পর্যায়ের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য গঠিত যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক শেষে মিয়ানমারের প্রশাসনিক রাজধানী নেপিডোতে পররাষ্ট্র সচিবদের স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী প্রতিদিন তিনশ’জন রোহিঙ্গাকে ফেরৎ নেবে মিয়ানমার। বৈঠকে বাংলাদেশ সপ্তাহে অন্তত ১৫ হাজার জনকে ফিরিয়ে নেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু নানা অজুহাত দেখিয়ে মিয়ানমার রাজি হয়নি। শুধু তা-ই নয়, প্রতিদিন তিনশ’ জন হিসাবে সপ্তাহে ২১শ’ জনকে নেয়ার বিষয়টিকেও মিয়ানমার পাশ কাটিয়ে গেছে। দেশটি বলেছে, সপ্তাহে ফিরিয়ে নেয়া হবে দেড় হাজার জনকে।
প্রত্যাবাসনের জন্য প্রথমে রোহিঙ্গাদের যে তালিকা তৈরি করা হবে সেখানেও মিয়ানমার সুকৌশলে হিসাবের মারপ্যাঁচ খাটিয়েছে। বলেছে, ব্যক্তি হিসেবে নয়, বাছাই ও তালিকা করা হবে পরিবারভিত্তিক আবেদনের ভিত্তিতে। এ উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে পাঁচটি অন্তর্বর্তীকালীন শিবির স্থাপন করা হবে। অন্যদিকে রাখাইনের মংড়–র লা পো খুংয়েতে মিয়ানমার দুটি অস্থায়ী অভ্যর্থনা শিবির খুলবে। কাগজপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রত্যাবাসনের জন্য নির্বাচিত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে পাঠানোর পর মিয়ানমার প্রথমে তাদের অস্থায়ী আশ্রয় শিবিরে নিয়ে যাবে। সেখানে আরো এক দফা যাচাই-বাছাই করে কাগজপত্র সন্তোষজনক মনে হলে রোহিঙ্গাদের চিনিয়ে দেয়া স্থানগুলোতে সরকারি খরচে বাসা-বাড়ি তৈরি করে সেখানে পাঠিয়ে দেয়া হবে। প্রত্যাবাসনের কার্যক্রম তদারকির জন্য উভয় দেশ দুটি পৃথক কারিগরি দল গঠন করতে সম্মত হয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এভাবে প্রত্যাবাসনের কাজ সম্পূর্ণ হতে দু’ বছর লেগে যাবে।
কূটনীতির ভাষায় বরফ গলতে শুরু করলেও মঙ্গলবার স্বাক্ষরিত চুক্তিটিকে রেহিঙ্গা মুসলিম ও বাংলাদেশের স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক বলে মনে করছেন না পর্যবেক্ষকরা। অনেক কারণের মধ্যে প্রত্যাবাসনের জন্য নির্ধারিত সংখ্যার কথা বলা হচ্ছে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে। কারণ, গত বছরের আগস্ট থেকে সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রেহিঙ্গাদের সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। নেপিডোতে যেদিন চুক্তি স্বাক্ষরিত হচ্ছিল সেদিন অর্থাৎ মঙ্গলবারও উখিয়া ও টেকনাফে শয়ের বেশি রোহিঙ্গা এসে উঠেছে। অন্যদিকে মিয়ানমার প্রতিদিন তিনশ’ হিসেবে সপ্তাহে মাত্র দেড় হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে এক দশকেও প্রত্যাবাসনের কার্যক্রম সমাপ্ত হতে পারবে না।
কথা শুধু এটুকুই নয়। রোহিঙ্গাদের মধ্যে ঠিক কারা ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাবে সেটাও মিয়ানমারই নির্ধারণ করবে। যেমন প্রকাশিত খবরে জানানো হয়েছে, চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর মিয়ানমার বাংলাদেশকে তাদের প্রথম পছন্দের যে তালিকা দিয়েছে সেখানে ৫০৮ জন হিন্দু এবং সাতশ’ জন মুসলিম রোহিঙ্গার নাম রয়েছে। জানা গেছে, বাংলাদেশে আশ্রয়গ্রহণকারী রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধন করে তার ভিত্তিতে প্রত্যাবাসনের জন্য তালিকা তৈরি করা হলেও মিয়ানমার কেবল সেইসব রোহিঙ্গাকেই গ্রহণ করবে, যারা ওই দেশটির মানদন্ড অনুযায়ী সে দেশের নাগরিক হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে সক্ষম হবে। এমন এক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই পর্যবেক্ষকরা ধারণা করছেন, বাংলাদেশকে শেষ পর্যন্তও মিয়ানমারের ইচ্ছা অনুসারেই চলতে হবে। ফলে খুব কম সংখ্যক রোহিঙ্গাকে ফেরৎ পাঠানো সম্ভব হবে না।
প্রত্যাবাসনের কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য পরিকল্পিত সময় সীমাকেও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। দু’ বছরের মধ্যে সকল রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেয়া যে সম্ভব নয় সে কথা পরিষ্কার হয়েছে মাসে মাত্র ছয় হাজার করে ফিরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, মিয়ানমার প্রকৃতপক্ষে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার অত্যন্ত চাতুরিপূর্ণ কৌশল নিয়েছে। তাছাড়া প্রত্যাবাসনের কার্যক্রম তদারকির জন্য জাতিসংঘকে যুক্ত করার বিষয়েও মিয়ানমার ইতিবাচকভাবে সাড়া দেয়নি। বাংলাদেশের চাপে রাজি হলেও দেশটির কর্মকর্তারা বলেছেন, তারাই এ বিষয়ে জাতিসংঘের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। অথচ সত্যি সদিচ্ছা থাকলে মিয়ানমারের উচিত ছিল বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে জাতিসংঘকে অনুরোধ জানানো এবং জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচআরকে প্রত্যাবাসন কার্যক্রমে শুরু থেকেই যুক্ত রাখা। সেটা না করার ফলেও এ আশংকাই শক্তি অর্জন করেছে যে, মিয়ানমার আসলে সকল রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে চায় না। বরং সময়ক্ষেপণের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের ওপরই চাপিয়ে দিতে চায়।
এ ধরনের বিভিন্ন বাস্তব কারণেই নেপিডোতে স্বাক্ষরিত প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত চুক্তিটি বাংলাদেশের জন্য আশাবাদের সৃষ্টি করতে পারেনি। বিপরীত দিক থেকে বরং নতুন পর্যায়েও অভিযোগ উঠেছে, মিয়ানমার থেকে নির্যাতিত ও বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি সে দেশের সরকার ও সেনাবাহিনীর গণহত্যা প্রতিহত করাসহ সামগ্রিকভাবে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সরকার চরম কূটনৈতিক ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে চলেছে। এমন অভিযোগকে একবাক্যে নাকচ করে দেয়ারও সুযোগ নেই।
আমরা মনে করি, সরকারের উচিত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থাকে যুক্ত করার জন্য মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। বলা দরকার, এখনই ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে মিয়ানমারের ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করা হলে ১০ বছরেও রোহিঙ্গাদের ফেরৎ পাঠানো সম্ভব হবে না। বরং ১০ লাখের মধ্যে নয় লাখের বেশি রোহিঙ্গাই বাংলাদেশে থেকে যাবে। এত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার বোঝা বহন করা অসম্ভব বলেই বর্তমান পর্যায়ে নতুন করে উদ্যোগ নেয়া দরকার। প্রয়োজনে নেপিডো চুক্তি সংশোধন করার জন্যও মিয়ানমারকে বলতে হবে। এসব কারণেই সরকারের উচিত জোর কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ