ঢাকা, শনিবার 20 January 2018, ৭ মাঘ ১৪২৪, ২ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

শাহজাদপুরের বাঘাবাড়ী নৌ-বন্দরে স্থবিরতা

যমুনার বিভিন্ন পয়েন্টে নাব্য সঙ্কট

এম,এ, জাফর লিটন ,শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) : যমুনা নদীতে নাব্য সঙ্কটের কারণে বাঘাবাড়ী বন্দরের সাথে নৌযোগাযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। গত সপ্তাহ থেকে জ্বালানি তেল, রাসায়নিক সারসহ অন্যান্য পণ্যবাহী জাহাজ বাঘাবাড়ী বন্দরে যেতে পারছে না। বাঘাবাড়ী বন্দরের ৩০ কিলোমিটার ভাটিতে নগরবাড়ীর উজানে ৪৯ লাখ লিটার জ্বালানি তেল ও ৩৫ হাজার বস্তা রাসায়নিক সারভর্তি ৮টি কার্গো জাহাজ যমুনা নদীতে আটকা পড়েছে। চট্টগ্রাম থেকে জ্বালানি তেল ও রাসায়নিক সার নিয়ে জাহাজগুলো বাঘাবাড়ী বন্দরে যাচ্ছিল। বাঘাবাড়ী-আরিচা নৌরুটে নগরবাড়ীর উজানে নাব্য সঙ্কট মারাত্মক আকার ধারণ করায় জাহাজগুলো বাঘাবাড়ী নৌ-বন্দরে পৌঁছতে পারছেনা। আবার বন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়া জাহাজগুলো গন্তব্যে যেতে পারছে না।
এদিকে বিআইডব্লিউটিএ যমুনা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে ড্রেজিং করে পলি মাটি নদীতেই ফেলছে। ফলে পলি মাটিতে ডুবোচরের সৃষ্টি হচ্ছে। জানা যায়, বাঘাবাড়ী অয়েল ডিপোর পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা তিনটি কোম্পানির বিপণন কেন্দ্রে প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ লিটার জ্বালানি তেল আপদকালীন মজুদ আছে। বাঘাবাড়ী থেকে উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় সেচ মওসুমে প্রতিদিন ৩৬ লাখ লিটার জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়। নাব্য সঙ্কটে গত শনিবার থেকে জ্বালানি তেলসহ অন্যান্য পণ্যবাহী জাহাজ বাঘাবাড়ী বন্দরে পৌঁছাতে পারছে না। ফলে আপৎকালীন মজুদ থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। ওই পরিমাণ মজুদ দিয়ে মাত্র ১৬ দিনের জ্বালানি তেলের চাহিদা পুরণ করা সম্ভব। নাব্য সঙ্কট দ্রুত নিরসন না হলে এ অঞ্চলে সেচ ও সারনির্ভর বোরো আবাদ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে বলে কৃষি বিভাগ সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, জ্বালানি তেল, রাসায়নিক সার ও পণ্যবাহী কার্গো চলাচলের জন্য ১০ থেকে ১১ ফুট পানির গভীরতা প্রয়োজন। বাঘাবাড়ী বন্দরের ৩০ কিলোমিটার ভাটিতে নগরবাড়ীর উজানে আধা কিলোমিটার এলাকায় পানির গভীরতা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬ থেকে ৭ ফুট। গত শনিবার থেকে নগবাড়ীর উজানে ৩৫ হাজার বস্তা টিএসপি, এমওপি, ডিওপি ও ইউরিয়া সার এবং ৪৯ লাখ লিটার জ্বালানি তেল বোঝাই এমভি সাদিয়া, এম ভি অনিক, এমভি সিলিং বিজয়, এমভি আছরসহ ১২টি জাহাজ যমুনা নদীতে আটকা পড়েছে। আটকা পড়া জাহাজের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। নবেম্বর মাসে ১০ লাখ লিটার জ্বালানি তেল নিয়ে এসব জাহাজ বাঘাবাড়ী বন্দরে এসেছে। ডিসেম্বরে কমে দাঁড়িয়েছিল ৭ লাখ লিটারে। এখন জাহাজ চলাচল একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে। এই বন্দরে পত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কর্মরত ৫ হাজার শ্রমিক পরিবারে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। বাঘাবাড়ী ট্রানজিট বাফার গুদাম সূত্রে জানা যায়, উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় ১৪টি বাফার গুদামে রাসায়নিক সার চাহিদার ৯০ ভাগ বাঘাবাড়ী বন্দর থেকে যোগান দেয়া হয়। এখান থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার বস্তা রাসায়নিক সার সড়ক পথে বাফার গুদামগুলোতে সরবরাহ করা হয়। যমুনা নদীর নাব্যতা সঙ্কটে বাফার গুদামগুলোতে আপদকালীন সারের মজুদ গড়ে তোলার কাজ চরমভাবে বিঘিœত হচ্ছে।
বিসিআইসির বগুড়া আঞ্চলিক অফিসের একটি সূত্র জানান, ইরি-বোরো আবাদ মওসুমে উত্তরাঞ্চলে ১২ লাখ টন রাসায়নিক সারের প্রয়োজন। ১৪টি বাফার গুদামে আপদকালীন মজুদ আছে দুই লাখ ৮০ হাজার টন। নয় লাখ টন সার বিভিন্ন পথে আমদানি করা হচ্ছে। তবে প্রয়োজনের বেশির ভাগ সার বাঘাবাড়ী বন্দর দিয়ে আমদানি করা হয়। যমুনা নৌরুটে নাব্যতা সঙ্কট সৃষ্টি হওয়ায় আপদকালীন সার মজুদের কাজ বিঘিœত হচ্ছে।
বাঘাবাড়ী বন্দর সূত্রে জানা যায়, দৌলতদিয়া-বাঘাবাড়ী নৌপথ উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় জ্বালানি তেল, রাসায়নিক সারসহ অন্যান্য মালামাল পরিবহনের একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর মাধ্যম। এ নৌপথে জ্বালানি তেলবাহী ট্যাংকার, রাসায়নিক সার ও বিভিন্ন পণ্যবাহী কার্গো জাহাজ চলাচল করে। বাঘাবাড়ী বন্দর থেকে উত্তরাঞ্চলে চাহিদার ৯০ ভাগ জ্বলানি তেল ও রাসায়নিক সার সরবরাহ করা হয়। আবার উত্তরাঞ্চল থেকে বাঘাবাড়ী বন্দরের মাধ্যমে চাল ও গমসহ অন্যান্য পণ্যসামগ্রী রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। এ নৌপথের ১০টি পয়েন্টে নাব্যতা সঙ্কট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। সময়মতো বিআইডব্লিউটিএ ড্রেজিং না করায় নদীতে নাব্যতা না থাকায় জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের পাবনা হাইর্ড্রােলজি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ভারত থেকে আসা ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা নদীর প্রবাহ একসঙ্গে ধারণ করে যমুনা নদী বিশাল জলরাশি নিয়ে বির্স্তীর্ণ জনপদের ভেতর দিয়ে প্রবহমান ছিল। অপ্রত্যাশিতভাবে তিস্তার পানি প্রবাহ অনেক কমে যাওয়ায় এর বিরুপ প্রভাবে যমুনা নদীতে নাব্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে। তিস্তার পানি প্রবাহ বৃদ্ধি না পেলে যমুনায় নাব্য সঙ্কট আরো প্রকট আকার ধারণ করবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বিআইডবি¬উটিএ আরিচা অফিস সূত্রে জানা যায়, প্রতিবছরই এসময় দৌলতদিয়া থেকে বাঘাবাড়ী নৌপথে নাব্য সঙ্কট দেখা দেয়। বর্তমানে এ রুটে ৭ থেকে ৮ ফুট পানির গভীরতা রয়েছে। নৌ-চ্যানেল সচল রাখার জন্য যমুনা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে ড্রেজিং শুরু হয়েছে। বালির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় ড্রেজিং করার পরও পলি পড়ে ডুবোচরগুলো আগের স্থানে ফিরে যাচ্ছে। জাহাজগুলো অতিরিক্ত মালামাল বহন করায় ডুবোচরে আটকা পড়ছে। এছাড়া মোহনগঞ্জে যমুনা ও হুড়াসাগর নদীর মিলনস্থলে ডুবোচর জেগেছে। ফলে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় নাব্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে।
বিপিসি’র বাঘাবাড়ী রিভারাইন অয়েল ডিপোর যমুনা কোম্পানির ডেপুটি ম্যানেজার এ, কে, এম জাহিদ সরোয়ার, পদ্মার ম্যানেজার মোঃ আনোয়ার হোসেন, এবং মেঘনার ম্যানেজার মোঃ জালাল উদ্দিন জানান, বাঘাবাড়ীতে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা তিনটি তেল কোম্পানির ডিপোতে ৫ কোটি ৮০ লাখ লিটার ডিজেল মজুদ আছে। আরো প্রায় ৭৪ লাখ লিটার ডিজেল ভর্তি ১২টি জাহাজ চট্টগ্রাম থেকে বাঘাবাড়ী বন্দরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে এসেছে। নগরবাড়ীর উজানে ৪৯ লাখ লিটার জ্বালানি তেলবাহী ৭টি জাহাজ যমুনা নদীতে আটকা পড়েছে। নাব্য সঙ্কটে জাহাজগুলো বন্দরে আসতে পারছে না। সেচ মওসুমে প্রতিদিন বাঘাবাড়ী থেকে ৩৬ লাখ লিটার জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে আপদকালীন মজুদ থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে আপদকালীন মজুদ ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। নৌ চ্যানেল সচল হলে এ সমস্যা দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে তারা জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ