ঢাকা, শনিবার 20 January 2018, ৭ মাঘ ১৪২৪, ২ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

তাবলিগ ইজতেমায় জুময়ার নামায আদায়

মো. রেজাউল বারী বাবুল/গাজী খলিলুর রহমান, টঙ্গী থেকে : টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে র‌্যাব-পুলিশের কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে গতকাল শুক্রবার বাদ ফজর থেকে শুরু হয়েছে বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব। আগামীকাল রোববার জোহরের নামাযের পূর্বে যে কোন সময় দ্বিতীয় পর্বের ইজতেমায় মুনাজাত অনুষ্ঠিত হবে।
তাবলীগ জামাতের জেষ্ঠ্য মুরুব্বীদের আম বয়ানের মধ্য দিয়ে তিন দিনব্যাপী বিশ্ব ইজতেমায় দেশের ১৪ জেলার ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসল্লিরাও দ্বিতীয় পর্বে অংশ নিয়েছেন। এ পর্বের জন্য ইজতেমা ময়দানকে জেলাওয়ারি ২৮টি খিত্তায় ভাগ করা হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বের প্রথম দিনে ইজতেমা ময়দানে দেশ-বিদেশের কয়েক লাখ মুসল্লি জুমার নামায আদায় করেছেন। জুমার নামাযে ইমামতি করেন ঢাকার কাকরাইল মসজিদের খতিব হাফেজ হযরত মাওলানা মোহাম্মদ যোবায়ের।
ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বের প্রথম দিন শুক্রবার জুমার নামাযে অংশ নিতে জনসমুদ্রে পরিণত হয় ইজতেমা ময়দান। জুমার নামাযে অংশ নিতে গাজীপুর ও ঢাকাসহ আশপাশের জেলার মুসল্লিরা ভোর থেকে ময়দানে আসতে শুরু করেন। ইজতেমা ময়দান, সড়ক-মহাসড়ক, অলিগলিসহ বিভিন্ন স্থানে পাটি, চটের বস্তা, খবরের কাগজ, চাদর ও পলিথিন বিছিয়ে মুসল্লিরা জুমার নামাযে শরিক হন।
ইজতেমার মুরুব্বি প্রকৌশলী মন্তাজ জানান, শুক্রবার বাদ ফজর আম বয়ানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ৫৩তম বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব। বাদ ফজর আম বয়ান করেন বাংলাদেশের মাওলানা ফারুক। বাদ জোহর ঈমান ও আমলের উপর হেদায়েতী বয়ান করেন মাওলানা শেখ আহমদ মাসুদ ও বাদ আছর তাবলীগ জামাতের ৬ উছুলের উপর বয়ান করেন মাওলানা ইউনুছ পালনপুরি।
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীর জানান, ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বে ৩৫টি দেশের ২ হাজার ৫শ’ মুসল্লি অংশ নিয়েছেন। এসময় তিনি আরো জানান, ইজতেমা ময়দান ও আশপাশ এলাকায় জেলা প্রশাসনের ১০টি ভ্রাম্যমাণ আদালত ভেজালবিরোধী অভিযান এবং উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
ইজতেমা ময়দানের জিম্মাদার মুরুব্বী ইঞ্জিনিয়ার গিয়াস উদ্দিন জানান, বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বেরও মুসল্লিদের ঢল নেমেছে। দ্বিতীয় পর্বের ইজতেমায় অংশ নিতে দেশের বিভিন্নস্থান থেকে মুসল্লিরা জামাতবদ্ধ হয়ে বুধবার রাত থেকে ইজতেমাস্থলে আসতে শুরু করেন এবং ময়দানে জেলাওয়ারি খিত্তায় খিত্তায় অবস্থান নেন। কেউবা বাস, ট্রাক, পিকআপ, লেগুনা, কেউবা ট্রেনে, নৌকায় চড়ে ইজতেমাস্থলে আসছেন। যানবাহন থেকে নেমে তারা তাদের প্রয়োজনীয় মাল ছামানা নিয়ে নিজ নিজ জেলাওয়ারি খিত্তায় অবস্থান নিয়েছেন। মুসল্লিদের ইজতেমা ময়দানে আসার এ ঢল আখেরী মোনাজাতের আগ পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।
ইজতেমা ময়দানের চারদিকে যতদূর চোখ যায় শুধু পাঞ্জাবি আর টুপি পড়া লাখো মুসল্লি আর মুসল্লি। ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের পদচারণায় শিল্প নগরী টঙ্গী এখন যেন ধর্মীয় নগরীতে পরিণত হয়েছে।
ইজতেমা ময়দানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী:
গতকাল শুক্রবার টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ময়দান পরির্দশনে এসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, মাওলানা সা’দ ইস্যুতে কোনো প্রভাব এবারের বিশ্ব ইজতেমায় পড়েনি, ভবিষ্যতেও পড়বে না বলে তিনি জানান। শুক্রবার দুপুরে বিশ্ব ইজতেমা ময়দান সংলগ্ন পুলিশ কন্ট্রোল রুমে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব একথা বলেন।
এ সময় মন্ত্রীর সাথে উপস্থিত ছিলেন- স্থানীয় এমপি জাহিদ আহসান রাসেল, পুলিশ মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হক, এডিশনাল আইজি ড. জাবেদ পাটোয়ারী, ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন, গাজীপুর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন-অর রশিদসহ পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসময় আরো বলেন, ভারতের নিজামুদ্দিন মারকাজের সদস্যদের মধ্যে মতভেদ আছে। তারই একটি ধারবাহিকতা বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু, সরকার এ মতভেদ দূর করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে। ফলে ইজতেমার প্রথম পর্ব সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আশা করছি, দ্বিতীয় পর্বও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে।
তিনি বলেন, ইজতেমার প্রথম পর্বে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ৪ হাজারের বেশি বিদেশী মুসল্লি অংশ নিয়েছিলেন। এ পর্বেও অনেক বিদেশী এসেছেন। এ পর্ব শেষেও শান্তিপূর্ণভাবে মুসল্লিরা বাড়ি ফিরে যেতে পারবেন। সরকারি ভাবে মুসল্লীদের ইবাদত বন্দেগী নির্বিঘœ করতে সার্বিক সহযোগিতা করা হচ্ছে।
আসাদুজ্জামান খান জানান, ইজতেমায় নিরাপত্তার বিষয়টি সরকার নিশ্চিত করেছে। গোয়েন্দা নজরদারিসহ সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে মুসল্লিদের স্বাস্থ্য সেবা, পয়ঃনিষ্কাশনসহ বিভিন্ন ধরনের সেবামূলক ব্যবস্থা প্রথম পর্বের মতোই এবার রাখা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নারায়গঞ্জের ঘটনার ভিডিও ফুটেজ পুলিশের কাছে আছে। যারা অস্ত্র দেখিয়েছে, ভিডিও ফুটেজ দেখে তাদের ধরার চেষ্টা চলছে।’
ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বে ৩৫ দেশের মুসল্লি:
গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মাহমুদ হাসান বলেছেন, দ্বিতীয় পর্বের ইজতেমায় গতকাল শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত ৩৫টি দেশের ২ হাজার ৫শ’ বিদেশি মুসল্লি অংশ নিয়েছেন। বিদেশি মেহমানদের জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
গাজীপুর জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীর বলেছেন, বিদেশী মেহমানদের জন্য পৃথক পাঁচটি ব্লক, পৃথক থাকার ব্যবস্থাসহ তাদের নিরাপত্তার জন্য সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বিদেশী মেহমানরা যাতে সহি-সালামতে বাংলাদেশের আতিথেয়তা এবং শুদ্ধ ইসলামের চর্চা করে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারেন সেই প্রত্যাশা করা হচ্ছে। বিদেশী মেহমানদের সকল সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি আরো জানান, ইজতেমা সফল করতে ৭৫টি দফতরের সাথে সমন্বয় করা হয়েছে। অবকাঠামো, ইউটিলিটি ও নিরাপত্তাসহ সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ইজতেমা ময়দানে অবস্থানরত মুসল্লিদের ২৮টি খিত্তায় ভাগ করা হয়েছে। এসব খিত্তার মুসল্লিদের জন্য পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, পয়ঃনিষ্কাসন ব্যবস্থাসহ সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ করে, মুসল্লিদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জল, স্থল ও আকাশ পথে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কে এম রাহাতুল ইসলাম জানান, বিদেশি মেহমানদের রান্নার কাজের জন্য ১৩৬টি গ্যাসের চুলা স্থাপন করা হয়েছে।
বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বে ঢাকা জেলার খিত্তা নং-১ হইতে ১০ এবং ১৮ ও ১৯), জামালপুর জেলা খিত্তা নং-১১ ও ১২, ফরিদপুর জেলা খিত্তা নং-১৩, ফরিদপুর জেলা খিত্তা নং-১৪, ঝিনাইদহ জেলা খিত্তা নং-১৫, ফেনী জেলা খিত্তা নং-১৬, সুনামগঞ্জ জেলা খিত্তা নং-১৭, চুয়াডাঙ্গা জেলা খিত্তা নং-২০, কুমিল্লা জেলা খিত্তা নং-২১ ও ২২, রাজশাহী জেলা খিত্তা নং-২৩ ও ২৪, খুলনা জেলা খিত্তা নং-২৫ ও ২৭, ঠাকুরগাঁও জেলা খিত্তা নং-২৬ ও পিরোজপুর জেলা খিত্তা নং-২৮ এ অংশ নিবেন। তবে ঢাকা জেলার মুসল্ল¬ীরা ইজতেমার দুই পর্বেই অংশ নিচ্ছেন। মুসল্লীদের সুবিধার্থে ময়দানের উত্তর দিক থেকে ক্রমানুসারে দক্ষিণ দিকে খিত্তার নম্বর বসানো হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ