ঢাকা, শনিবার 20 January 2018, ৭ মাঘ ১৪২৪, ২ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আরাকানে রোহিঙ্গা মুসলমানদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ : ॥ পঞ্চম পর্ব ॥
পরবর্তী শাসক নরপদিগ্যিও (১৬৩৮-১৬৪৫) মুসলিম নাম গ্রহণ করেছিলেন তবে তা দুষ্পাঠ্য ফারসি নাম বলে উল্লেখ করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া রাজা মিনবিন বা জবৌক শাহ (১৫৩১-১৫৫৩) ও রাজা দিখা (১৫৫৩-১৫৫৫) বা দাউদ খান এর পরে রাজা সৌহলা (১৫৫৫-১৫৬৪) ও রাজা মিনসিথিয়া (১৫৬৪-১৫৭১) পর্যন্ত দুইজন রাজার মুদ্রা না পাবার কারণে মুসলমানী নাম উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে এ কথা সত্য যে, আরাকানের ম্রাউক-উ-রাজবংশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৪৩০-১৬৪৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মোট ২১৫ বছর আরাকানের রাজাগণ বৌদ্ধ নামের পাশাপাশি মুসলমানী নাম ব্যবহার করেছেন। উল্লেখ্য ম্রাউক উ রাজবংশের ঐতিহ্য মন্ডিত স্থিতিশীল শাসনামলে (১৪৩০-১৬৮৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত) রাজাগণ তিন ধরনের উপাধি গ্রহণ করেছিলেন।
প্রথমত, ১৪৩০-১৬৪৫ খ্রিস্টাব্দ অর্থাৎ নরমিখলা থেকে নরপদিগ্যি পর্যন্ত শাসকগণ নিজেদের আরাকানী নামের সাথে মুসলমানি নাম উপাধি হিসেবে গ্রহণ করতেন এবং নামের সাথে শাহ, খান প্রভৃতি উপাধিও ধারণ করতেন। সেইসাথে তাঁদের প্রচারিত মুদ্রার এক পীঠে আরবি অক্ষরে গ্রহণকৃত মুসলমানি নাম এবং অন্যপীঠে কালেমা উৎকীর্ণ করতেন।
দ্বিতীয়ত, ১৫৯৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৬৪৫ খ্রিস্টাব্দ অর্থাৎ মিন রাজাগ্যি থেকে নরপদিগ্যি পর্যন্ত এ বংশের পাঁচজন রাজা সৌভাগ্যের প্রতীক শ্বেত হস্তির মালিক হয়ে নিজেদের আরাকানী নাম ও মুসলমানি নামের সাথে শ্বেত গজেশ্বর উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের প্রচারিত মুদ্রায় এক পীঠে মুসলমানি নাম ও উপাধি অন্য পীঠে কালেমা উৎকীর্ণ করতেন। কিন্তু রাজা থদো (১৬৪৫-১৬৫২ খ্রি:) মুসলমানি নাম, উপাধি ও আরবি অক্ষরে মুদ্রা উৎকীর্ণ করার প্রথা বাতিল করে শুধু শ্বেতরক্ত গজেশ্বর উপাধি গ্রহণ করেছিলেন।
তৃতীয়ত, রাজা সান্দা থু ধাম্মা (১৬৫২-১৬৮৪) পৈত্রিক ও পূর্বোক্ত উপাধি বাদ দিয়ে ’সুবর্ণ প্রাসাদের অধীশ্বর’ নামক একটি নতুন উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। এরপর আর কারো কোন উপাধি গ্রহণের কথা জানা যায় না।
সোলায়মান শাহের আরাকান পুনরুদ্ধার ও বাংলার মুসলমান সৈনিকদেরকে রাজধানী শহরসহ আরাকানের বিভিন্ন স্থানে বসবাসের ব্যবস্থাকরণের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় মুসলমানদের তৎপরতা যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি আরাকানের নদীনির্ভর ব্যবসা বাণিজ্যও সম্পূর্ণরূপে মুসলমানদের আওতায় চলে আসে। ফলে অল্প কিছু দিনের মধ্যেই আরাকানের উপকূলীয় অঞ্চলসহ নদীগুলোর দু’ধারে মুসলিম বসতি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। এগুলোর মধ্যে লেম্রু নদীর দু’তীরবর্তী সরা আও বন্দর, কোয়ালং, রাজার বিল, বল্দি পাড়া (পারিঁ), পংডু, কমবাওঁ, শিশারেক, মেলাতুডাইং, বটং, শান্ড, পিপারাং, দাসপাড়া, মেয়ংবুয়ে, বুতলুহুঁলিখং, হালিমপাড়া, পুরানপাড়া, ছিত্তাপাড়া, কত্তিপাড়া, পাইকপাড়া, চম্বলি, ক্কাইম ও বারবচ্চা প্রভৃতি অঞ্চল; মিংগান নদীর দুইধারে - জিচা, পাডং, জোলাপাড়া বাবুডাং অঞ্চল; কালাদান নদীর তীরবর্তী - চন্দমা, মিউরকুল, কাইনিরপরাং, ক্বাইমরপরাং, শোলি পেরাং, টংফরু, আকিয়াব, ডবে, আফকন চানকেরিঁ, কাজীপাড়া, কেয়দা, রমজুপাড়া, আমবাড়ি, টংটং নিরং, পল্লান পাড়া ও মেওকটং প্রভৃতি অঞ্চল; মায়ু নদীর দুই তীরে মচ্চায়ি, আংপেরাং, বাজার বিল, রৌশন পেরাং, জোপেরাং, ছমিলা, রোয়াঙ্গাডং, আলীখং, মিনজং, ছুয়েফ্রংডং, মরুছং, খোয়াচং, গওলাঙ্গ, লোয়াডং এবং নাফ নদীর তীরবর্তী- মংডু, ওলীডং, কাজীপাড়া, বলিবাজার, নাগপুরা, বুড়া, শিকদার পাড়া, কানরিপাড়া, হাবসি পাড়া, রাজার বিল, নূরুল্লাপাড়া, আলীছাঞ্জু প্রভৃতি অঞ্চল মুসলিম অধ্যুষিত হয়ে পড়ে। এ সময় এ সমস্ত অঞ্চলে মুসলিম প্রভাব তো প্রাধান্য বিস্তার করেই পাশাপাশি বাংলা ভাষাভাষীরও প্রভাব পরিলক্ষিত হয়; পাড়াকেন্দ্রীক আঞ্চলিক নামগুলো যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
আরাকানে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামের প্রসার -২
সোলায়মান শাহের মৃত্যুর পর ১৪৩৪ খ্রিস্টাব্দে স্বীয় ছোট ভাই মিনখারী বা নারুনু, আলী খান বা আলী শাহ নাম ধারণ করে আরাকানের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। তিনি ক্ষমতা গ্রহণ করেই বিশিষ্ট মুসলমানদের সমন্বয়ে একটি সংসদ গঠন করেন। স্থানীয় প্রভাবশালী আলিম ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত এ সংসদের কাজ হলো রাজার মুসলমানী নাম নির্বাচন করা এবং অভিষেকের সময় রাজাকে শপথ বাক্য পাঠ করানো। যেহেতু সংসদটি উলামা ও বিশিষ্ট মুসলিম নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল সেহেতু সহজেই অনুমান করা যায় যে, সংসদ কর্তৃক রাজার মুসলিম নাম নির্বাচনের পর উক্ত শপথ অনুষ্ঠান ইসলামিরীতি অনুযায়ী সম্পন্ন করা হতো। কেননা বৌদ্ধ রীতিতে শপথবাক্য পাঠ করানোর জন্য নেতৃস্থানীয় মুসলমান ব্যক্তিসহ শীর্ষস্থানীয় উলামা সংসদ গঠনের প্রয়োজন পড়ে না। আরাকানের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হবার পূর্বে রাজাকে ইসলাম সম্পর্কে সম্যকজ্ঞান লাভ করতে হতো। এমনকি আরাকানী লেখকগণ উল্লেখ করেন- ‘রাজাদের ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা এতদুর এগিয়ে ছিল যে, কোন রাজাকে সিংহাসন আরোহণের পূর্বে অভিজ্ঞ আলেমের নিকট দশ বছরকাল কুরআন-হাদিস ও ইসলামি জ্ঞানে বিশেষজ্ঞ থাকতে হতো’। এ মন্তব্যের কোন যৌক্তিক উপাত্ত পাওয়া যায়নি। তবে ইসলাম সম্পর্কে যে তাদেরকে সম্যক জ্ঞান রাখতে হতো এতে কোন সন্দেহ নেই।
আলী খান সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়ে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের মুদ্রা অংকন পদ্ধতিসহ বাংলার অনুকরণে শাসনকার্য চালালেও বাংলার সুলতানদের সাথে অনুগত কিংবা সামন্ত সম্পর্ক রাখতে চাননি। তিনি অচিরেই সামরিক বাহিনীকে সুসজ্জিত করে বাংলার অধীনতা অস্বীকারপূর্বক আরাকানের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং চট্টগ্রাম আক্রমণ করে রামু পর্যন্ত দখল করে নেন। তবে রামু দখলের সুনির্দিষ্ট সময় ও বাংলার শাসকের নাম পাওয়া যায় না। কোন কোন গবেষক সুলতান জালালউদ্দীন মুহাম্মদ শাহের পুত্র সুলতান শামসুদ্দীন আহমদ (১৪৩২-১৪৩২) এবং কেউ কেউ পরবর্তী ইলিয়াস শাহী বংশীয় শাসক সুলতান নাসিরউদ্দীন মাহমুদ শাহের (১৪৩৫-১৪৩৬) সময়কে উল্লেখ করেন। তবে যে শাসকের সময়েই হোক না কেন তা যে আলী খান সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হবার পর মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই এ কথা সহজেই বলা যায় ।
আলী খানের মৃত্যুর পর স্বীয়পুত্র বসপিয়ু কালিমা শাহ নাম ধারণ করে ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দে আরাকানের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। তিনিও বাংলার সাথে আক্রমণাত্মক দৃষ্টিভংগীই পোষণ করতে থাকেন। তিনি ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দে বাংলার চট্টগ্রাম অঞ্চলের কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ-পূর্ববর্তী সমস্ত ভূভাগটি দখল করে আরাকান রাজ্যভুক্ত করেন। কক্স বাজারের রামুসহ অধিকৃত চট্টগ্রামের শাসনকর্তা হিসেবে তার কোন ভাই বা নিকট আত্মীয়কে মনোনীত করেন। চট্টগ্রামের মনোনীত শাসকের অধীনে সৈন্যবাহিনী ও যুদ্ধাস্ত্রসহ একশখানা যুদ্ধ জাহাজ রাখা হতো এবং প্রতি বছরই দায়িত্বপ্রাপ্ত বাহিনীকে সরিয়ে নতুন বাহিনী পাঠানো হতো। বাংলার সুলতান কর্তৃক প্রেরিত সাবেক সেনাসদস্যগণ উক্ত বাহিনীর আওতাভুক্ত ছিল কিংবা তাদেরই বংশধরগণ সেনা সদস্য হিসেবে ছিল হেতু তারা যাতে বাংলার সাথে আত্মীক সম্পর্ক না গড়তে পারে তাই হয়তো প্রতি বছর সৈন্য বাহিনীর সদস্যদের পরিবর্তন করা হতো।
কালিমা শাহ কর্তৃক চট্টগ্রাম দখল নিয়েও মতবিরোধ দেখা দেয়। কারণ ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম দখলের তথ্য পাওয়া যায় এবং সে সময় বাংলার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন পরবর্তী ইলিয়াছ শাহী বংশের সুলতান নাসিরউদ্দীন মাহমুদ শাহের পুত্র সুলতান রুকন উদ্দীন বরবক শাহ (১৪৫৯-১৪৭৪ খ্রিস্টাব্দ)। তাঁর চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানার জোবরা গ্রামে প্রাপ্ত শিলালিপি দ্বারা প্রমাণ হয় যে, চট্টগ্রাম পর্যন্ত তাঁর শাসন অক্ষুন্ন ছিল। তবে রুকন উদ্দীন বরবক শাহের আমলে চট্টগ্রামের কোন অঞ্চল শাসনাধীন ছিল তার কোন বিশদ বিবরণ পাওয়া যায় না। যেহেতু উত্তর চট্টগ্রাম বাংলার সুলতানের অধীনে ছিল। সুতরাং ধরে নেয়া যায় যে, কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ-পূর্ব তীরবর্তী অঞ্চল আরাকানের অধীনে গেলেও উত্তর চট্টগ্রাম তাঁর শাসনাধীনে ছিল এবং শিলালিপি দ্বারা নির্ণেয় চট্টগ্রাম বলতে উত্তর চট্টগ্রামই ধরে নেয়া সংগত হবে।
কালিমা শাহের (১৪৫৯-১৪৮২ খ্রিস্টাব্দ) মৃত্যুর পর তার পুত্র মিনদৌলিয়া ১৪৮২ খ্রিস্টাব্দে মুখু শাহ নাম ধারণ করে আরাকানের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন এবং ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর চাচা বসাপিউ ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে মোহাম্মদ শাহ বা মাহমুদ শাহ নাম ধারণ করে আরাকানের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। মাত্র ২ বছর রাজত্বের পর কালিমা শাহের পুত্র ইয়েননাউং নূরী শাহ পদবী নিয়ে পিতৃ সিংহাসন দখল করেন। কিন্তু তিনি এক বছরও শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকতে পারেন নি। ঐ বছরই তার মৃত্যু হলে চাচা সলিংথু শেখ আবদুল্লাহ শাহ নাম ধারণ করে আরাকানের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়ে ১৫০১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। দীর্ঘ চল্লিশ বছর (১৪৫৯-১৫০১ খ্রি.) শাসনকালের মধ্যে ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলার হাবশী শাসনের সময় রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগে মুখু শাহ (১৪৮২-১৪৯২) কর্তৃক চট্টগ্রাম আক্রমণের কথা জানা যায়। তিনি চট্টগ্রাম দখল করে ক্ষমতা নিজের করায়ত্ব রাখতে পেরেছিলেন কিনা সে বিষয়টি সন্দেহ মুক্ত নয়।
সামুদ্রিক বাণিজ্য বন্দর হবার কারণে আরাকানে ইসলামের প্রচার, প্রসার ও সামগ্রিকভাবে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের ব্যাপক ভূমিকা ছিল। শুধু তাই নয়, চট্টগ্রাম অঞ্চলটি বাংলা, ত্রিপুরা এবং আরাকান রাজ্যের ত্রিসীমানায় অবস্থিত হবার কারণে এ অঞ্চল নিয়ে বিভিন্ন সময় দ্বিমূখী ও ত্রিদলীয় যুদ্ধও সংঘটিত হতো। এ কারণে চট্টগ্রামের কোন স্থিতিশীল দীর্ঘ স্বাতন্ত্রিক ধারাবাহিক ইতিহাস পাওয়া কঠিন। এটি কখনো বাংলা, কখনো আরাকান, কখনো ত্রিপুরার অংশ হিসেবে আবার কখনো বা স্বাধীন চট্টগ্রামরূপে শাসিত হতো। সেই একই ধারাবাহিকতায় শেখ আবদুল্লাহ শাহের মৃত্যুর পর যখন ১৫০১ খ্রিস্টাব্দে মিংয়াজা (১৫০১-১৫২৩ খ্রিস্টাব্দ) ইলিয়াস শাহ (প্রথম) নাম ধারণ করে আরাকানের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন তখনও  চট্টগ্রাম অঞ্চল নিয়ে বাংলা, ত্রিপুরা ও আরাকান -এ ত্রিশক্তির মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা যায়। ১৫১৩ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরার রাজা ধন্য মানিক্য চট্টগ্রাম জয় করে ‘চাটিগ্রাম বিজয়ী’ উপাধি সম্বলিত মুদ্রা জারী করলেও বিজয়কে পুর্ণাঙ্গ করতে পারেননি। তাই তিনি পরের বছর ১৫১৪ খ্রিস্টাব্দে আবার চট্টগ্রাম আক্রমণ করলে বাংলার সুলতান হোসেন শাহ কর্তৃক প্রেরিত হৈতন খানের নেতৃত্বে পরিচালিত সেনাবাহিনী এবং ছুটি খানের যৌথ প্রতিরোধে ত্রিপুরা রাজা পরাজিত হন এবং বাংলার সেনাপতি ত্রিপুরা রাজ্যের কিছু দূর্গও দখল করেন। চট্টগ্রামকেন্দ্রিক ত্রিপুরা-বাংলা যুদ্ধ হবার ফলে আরাকানও এ যুদ্ধ থেকে পিছপা ছিলনা। কেননা দক্ষিণ চট্টগ্রাম অর্থাৎ কর্ণফুলি নদীর পূর্ব-দক্ষিণ অঞ্চল থেকে শুরু করে আধুনিক কক্স বাজার অঞ্চল পর্যন্ত আরাকান রাজের রাজ্যসীমা রক্ষার জন্যও ত্রিপুরার রাজা ধন্য মানিক্যের সাথে যুদ্ধ করতে হয়েছিল। ত্রিপুরা রাজ্য থেকে চট্টগ্রাম রক্ষা করতে পারলেও বাংলার সুলতান হোসেন শাহ চট্টগ্রামকে বেশিদিন শান্ত রাখতে পারেননি। আরাকানী শাসক ইলিয়াস শাহ ১৫১৬-১৫১৭ খ্রিস্টাব্দে শক্তি সঞ্চয় করে ১৫১৮ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম দখলের জন্য স্থল ও জলপথে বাহিনী প্রেরণ করেন। বাংলার অধীনে তৎকালীন চট্টগ্রামের শাসক মুরাসিন বা মীর ইয়াসিন পরাজিত হয়ে চাঁদপুর ঘুরে সোনারগাঁ বা নারায়ণগঞ্জে এসে আশ্রয় গ্রহণ করেন। আরাকানের দিগি¦জয়ী বাহিনী দক্ষিণ চট্টগ্রাম হয়ে সন্দ¦ীপ, হাতিয়া, লক্ষ্মীপুর ও ঢাকা অঞ্চল জয় করে লক্ষ্মীপুর অঞ্চলে শাসনকেন্দ্র স্থাপন করেন এবং আরাকানী শাসক ইলিয়াস শাহ হাতির উপর সওয়ার হয়ে সন্দীপ, হাতিয়া, ঢাকাসহ চট্টগ্রামের বিজয়ী অঞ্চলসমূহ পরিদর্শন করতে আসেন। আরাকানের শাসক ইলিয়াস শাহ ১৫২০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ঢাকায় অবস্থান করেন বলে জানা যায়। ১৫১৮ খ্রিস্টাব্দে চাকমা রাজা চনুই আরাকানের বশ্যতা স্বীকারপূর্বক ২টি শ্বেতহস্তিসহ ৪ জন মন্ত্রীকে আরাকান শাসকের নিকট প্রেরণ করলে চট্টগ্রামের আরাকানী শাসক ছেন্দু উইজা লক্ষ্য করলেন যে, হাতিগুলো সাদা নয় বরং হাতির গায়ে চুন মেখে সাদা করা হয়েছে।
এতে প্রতারনার দায়ে ছেন্দু উইজা চাকমা মন্ত্রীদেরকে বন্দী করেন। চাকমাদের মধ্য থেকে কারণ দর্শানো হলো যে, শ্বেত হস্তি ছাড়া আরাকানী রাজার উপঢৌকন হয়না অথচ এ অঞ্চলে শ্বেতহস্তি পাওয়া যায় না। সুতরাং বাধ্য হয়েই এটি করা হয়েছে। ছেন্দু উইজা মন্ত্রীগণসহ হাতিকে ঢাকায় প্রেরণ করলে রাজা তাদেরকে ভৎসনাপূর্বক রাজনীতিমালা শিক্ষা গ্রহণের নির্দেশ দেন। অতঃপর ১৫২০ খ্রিস্টাব্দে চাকমা রাজার কন্যা ছাজাং ইয়ুকে রাজার হাতে তুলে দিলে রাজা ঢাকা থেকে আরাকানে প্রত্যাবর্তন করেন। এতে অনুমিত হয় যে, এ সময় চট্টগ্রাম আরাকান রাজার অধীনে ছিল। কিন্তু পর্তুগীজ বণিক জোঁআ-দ্যা-সিলভেরা ১৫১৮ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রামকে বাংলার সুলতান হোসেন শাহের অধীনে দেখেছিলেন। যদি তাই হয় তবে, আরাকানের রাজা কর্তৃক চট্টগ্রাম দখল এবং ঢাকায় দুই বছর অবস্থান নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। তবে উত্তরে বলা যায় যে, হয়তো পর্তুগীজ বণিকের বিবরণের পরে অর্থাৎ ১৫১৮ খ্রিস্টাব্দের শেষ দিকে আরাকান রাজা চট্টগ্রাম জয় করেছেন কিংবা তারা শুধুমাত্র দক্ষিণ চট্টগ্রামই জয় করেছিলেন - উত্তর চট্টগ্রাম নয়। এ অঞ্চল বাংলার অধীনেই ছিল।
বাংলার সুলতান ও আরাকানী শাসকের খ-িত চট্টগ্রাম পুনরায় ত্রিপুরা রাজা কর্তৃক আক্রান্ত হয়। ১৫১৯ খ্রিস্টাব্দে সুলতান হোসেন শাহের মৃত্যুর পর সুলতান নসরত শাহ সালতানাতের অধিকর্তা হলে বাংলার ক্ষমতা কিছুটা হ্রাস পায়। এ সুযোগে ত্রিপুরার রাজা হোসেন শাহ কর্তৃক দখলকৃত ত্রিপুরার দূর্গসমূহ পুনরুদ্ধার করে নেন এবং ১৫২২ খ্রিস্টাব্দে মহারাজা দেবমানিক্য চট্টগ্রাম দখল করে আরাকানীদের বিতাড়িত করেন। এ সময় আরাকানীরা এত দ্রুত পলায়ন করেছিল যে, তাদের প্রোথিত অর্থ সম্পদও নিয়ে যাবার সময় পায়নি। এরপর যখনই সময় সুযোগ পেত তখনই এসে প্রোথিত সম্পদ খনন করে নিয়ে যেত। মাত্র দু’বছরের মাথায় বাংলায় সুলতান নসরত শাহ পুনরায় চট্টগ্রাম দখল করেন। ত্রিশক্তি কর্তৃক আরাকান দখল পুনর্দখলের মধ্য দিয়ে বিশেষত ত্রিপুরা রাজা কর্তৃক আরাকান বিজিত হলে এখানকার অনেক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবার আরাকানে পাড়ি জমায় এবং পরবর্তীতে প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও দায়িত্ব পালন করেন।
ইলিয়াস শাহের মৃত্যুর পর স্বীয় পুত্র কাসাবাদি ইলিয়াস শাহ (দ্বিতীয়) নাম ধারণ করে ১৫১৩-১৫১৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত গতানুগতিক পদ্ধতিতে আরাকান শাসন করেন। অতঃপর আরাকানের প্রাক্তন শাসক শেখ আবদুল্লাহ শাহের ভাই জালাল শাহ নাম ধারণ করে ১৫১৫ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়ে কয়েক মাস রাজত্ব করেন। তার মৃত্যুর পর আরাকানের প্রাক্তন শাসক মুখু শাহের পুত্র থাটাসা আলী শাহ নাম নিয়ে ১৫১৫-১৫২১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আরাকান শাসন করেন এবং মিং খং রাজা (গরহ কযড়ঁহম জধুধ) ১৫২১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৩১ পর্যন্ত ইল শাহ আজাদ (ঊষ-ঝযধয অুধফ) নাম ধারণ করে আরাকান রাজত্ব করেন। তারা মুসলিম নাম গ্রহণ করেছিলেন এবং পূর্বের ধারাবাহিকতায় ইসলাম ও মুসলমান রীতিনীতির প্রতি তাদের সহযোগী মনোভাব বিদ্যমান ছিল।
আরাকানে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামের প্রসার -৩
ষোড়শ শতাব্দীর আরাকানী শাসকদের মধ্যে অন্যতম প্রভাবশালী ছিলেন রাজা মিন বিন ওরফে সুলতান জবৌক শাহ (১৫৩১-১৫৫৩ খ্রি.)। তিনি নিজেকে সুলতান হিসেবে ঘোষণা করেন। তার সময়ও আরাকান-বাংলার সম্পর্ক তেমন ভাল ছিল না; বিশেষত চট্টগ্রাম নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল চরমে। এ সময় সম্রাট হুমায়ুন ও শেরশাহের মধ্যকার দ্বন্দ্বের এক পর্যায়ে বক্সার নিকটবর্তী চৌসার যুদ্ধে (২৭ জুন ১৫৩৯ খ্রি.) হুমায়ুন শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। হুমায়ুনের সঙ্গে যুদ্ধে সাফল্য লাভের পর আফগান বীর শেরশাহ সূর বাংলার দিকে রওনা হন এবং অবিলম্বেই গৌড় পুনরাধিকার করেন। সম্রাট হুমায়ুন কর্তৃক নিযুক্ত গৌড়ের শাসনকর্তা জাহাঙ্গীর কুলী বেগ ১৫৩৯ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে শেরশাহের পুত্র জালাল খান ও হাজী খান বটনী কর্তৃক পরাজিত ও নিহত হন। শেরশাহের সৈন্যদল বাংলার অন্যান্য অঞ্চলে মোতায়েনকৃত মোগল সৈন্যদেরও পরাজিত করে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল দখল করে। কিন্তু চট্টগ্রাম অঞ্চল তখনও সুলতান গিয়াস উদ্দীন মাহমুদ শাহের কর্মচারীদের অধীন ছিল এবং এদের মধ্যে সেনাপতি খোদা বখশ খান ও হামজা খান চট্টগ্রাম অধিকার নিয়ে বিবাদ করছিলেন। এ সুযোগে শেরশাহের সেনাপতি নোগাজিল চট্টগ্রাম অধিকার করে নেন। কিন্তু তিনিও চট্টগ্রামকে নিজ দখলে রাখতে ব্যর্থ হন। কেননা চট্টগ্রামের পর্তুগীজ শুল্ক সংগ্রহায়ক নুনো ফার্নান্দেজ ফ্রিয়ার নোগাজিলকে বন্দী করেন। এক পর্যায়ে নোগাজিল চট্টগ্রাম থেকে পলায়ন করেন। পর্তুগীজ নেতা নুনো ফার্নান্দেজ নোগাজিলকে বন্দী করলেও চট্টগ্রামের কর্তৃত্ব গ্রহণ করতে পারেননি। সুলতান গিয়াস উদ্দীন মাহমুদ শাহের জামাতা ভাটি অঞ্চলের শাসক সোলায়মান বাইশিয়ার ফার্নান্দেজ এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। চতুর্মুখী দ্বন্দ্বের সুবাদে আরাকান রাজা মিন বিন ওরফে জবৌক শাহ ১৫৩৯ খ্রিস্টাব্দের শেষ দিকে অথবা ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দের সূচনালগ্নে চট্টগ্রাম জয় করেন। এরপর থেকে ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে শায়েস্তা খান কর্তৃক চট্টগ্রাম জয়ের পূর্ব পর্যন্ত এটি আরাকানের অধীনেই ছিল। কিন্তু ঐতিহাসিক আবদুল করিম এ বক্তব্যের সাথে ঐক্যমত্য প্রকাশ করেননি। তাঁর মতে মিনবিন বা জবৌক শাহের মত একজন দূর্বল আরাকানী শাসকের পক্ষে পরাক্রমশালী সুলতান শেরশাহের সময় চট্টগ্রাম জয় করার তথ্য বিশ্বাসযোগ্য নয়। তবে একথা বলা যায় যে, শেরশাহ পরাক্রমশালী শাসক হলেও চট্টগ্রাম নিয়ে ত্রিমূখী দ্বন্দ্বের সময়ে জবৌক শাহ কর্তৃক সুযোগমতো চট্টগ্রাম দখল হতেও পারে।
জবৌক শাহ ১৫৫৩ খ্রিস্টাব্দে পরলোক গমন করলে স্বীয়পুত্র মিনদিখা দাউদ খান নাম ধারণ করে আরাকানের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। তিনি চট্টগ্রামে পুর্ণ আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় সফল হবার জন্য পর্তুগীজদের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে তাদের সহযোগিতা কামনা করেন। এতে তার ক্ষমতা ও প্রভাব প্রতিপত্তির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কিন্তু এ সময় দিখা’র চেয়ে বাংলার সুলতানকেই শক্তিশালী বলে উপস্থাপনের প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। বাংলার সুর বংশীয় স্বাধীন সুলতান শামস উদ দীন মুহাম্মদ শাহ গাজী ১৫৫৪ খ্রিস্টাব্দে আরাকান টাকশালের নাম উৎকীর্ণ করে মুদ্রা জারী করেন। এমনকি সুলতান শামস উদ দীনের পুত্র গিয়াস উদ্দীন মাহমুদও আরাকান টাকশাল উৎকীর্ণ করে মুদ্রা জারী করেন বলে অভিমত পাওয়া যায়। ফলে লেনপুল, রজার্স রাইট প্রমুখ বিশেষজ্ঞগণ মত প্রকাশ করেন যে, বাংলার সুলতান সে সময় আরাকান জয় করে ঐ মুদ্রা জারী করেছিলেন। কিন্তু প্রফেসর এ বি এম হবিবুল্লাহ বাংলা কর্তৃক আরাকান জয় করে মুদ্রা জারীর ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেন। তাঁর মতে, মুদ্রায় অংকিত টাকশালের নাম ‘আরাকান’ স্পষ্ট নয় বরং ওটাকে রিকাব পরাই যুক্তিযুক্ত। দ্বিতীয়ত; তৎকালীন সময়ে আধুনিক আরাকান নামটি মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত ছিলনা, বরং মুসলমানগণ রাখাং বা রোখাং উচ্চারণ করতেন। সর্বোপরি তৎকালীন আরাকান ছিল খুব শক্তিশালী রাজ্য। বাংলার দূর্বল সুলতানের পক্ষে প্রভাবশালী আরাকান রাজ্যকে জয় করা সম্ভব ছিলনা। তবে এন. বি. স্যান্যাল, প্রফেসর হবিবুল্লাহর মতকে খ-ন করে বলেন, মুদ্রার আরাকান পাঠ সঠিক এবং ত্রিপুরা, বাংলা ও আরাকান এ ত্রিমূখী শক্তির মধ্যে বাংলাই সবচেয়ে শক্তিশালী রাজ্য ছিল। স্যান্যাল এর দ্বিতীয় কথাটি গ্রহণযোগ্য হলেও মুদ্রার আরাকান পাঠকে সঠিক হিসেবে ধরে নেয়া যায়না। কেননা ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগে পর্তুগীজ ওলন্দাজ’রা আরাকান শব্দের ব্যবহার করলেও মুসলিম মণীষীগণ একে রাখাং বলে আখ্যায়িত করতেন। সুতরাং টাকশালে ব্যবহৃত নামটি রিকাব হওয়াই যুক্তিযুক্ত এবং বাংলার সুলতান কর্তৃক আরাকান জয়ের বিষয়টিও সত্যায়ন করা দূরূহ।
আরাকানী রাজা দিখা ওরফে দাউদ খান ১৫৫৫ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করলে স্বীয় পুত্র সৌহলা আরাকানের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। রাজা মেং সৌ-লা বা সোহনা মুদ্রিত কোন মুদ্রা না পাবার কারণে তার মুসলিম নাম জানা যায় না। এমনকি তিনি যে মুসলমানী নাম গ্রহণ করেছিলেন সে ব্যাপারে সন্দেহের কারণও রয়েছে। কেননা তার পিতা কিংবা পরবর্তী শাসক ভ্রাতা মিন সিথিয়ারও মুসলিম নাম পাওয়া যায় না। তবে পরবর্তী শাসকগণ মুসলিম নাম গ্রহণ করেছিলেন। যা হোক, সোহলার রাজত্বকালেও বাংলার সাথে সংঘর্ষ বাঁধে এবং বাংলার সুলতান গিয়াস উদ্দীন বাহাদুর শাহ ৯৬৫ হিজরী মোতাবেক ১৫৫৭-৫৮ খ্রিস্টাব্দে আরাকান জয় করে সেখান থেকে মুদ্রা জারী করেন বলে জানা যায়। তবে অল্প সময়ের ব্যবধানে রাজা সৌহলা আরাকান পুনরাধিকার করে চট্টগ্রামসহ জয় করেন। তখন চট্টগ্রামের শাসনকর্তা ছিলেন হোসেন শাহী আমলের উত্তর চট্টগ্রামের শাসনকর্তা হামজা খাঁর পুত্র নসরত খাঁ বা নসরত শাহ। তিনি পরাজিত হয়ে প্রয়োজনীয় উপঢৌকন দিয়ে আরাকানের রাজা সৌহলার আনুগত্য স্বীকার করে আরাকান অধিকৃত চট্টগ্রামের উজির পদে নিযুক্ত হন। কিন্তু অন্যকোন তথ্য থেকে সুলতান গিয়াস উদ্দীন বাহাদুর শাহ কর্তৃক আরাকান দখলের কথা জানা যায় না। এমনকি ইতিহাসবিদ আবদুল করিমও এ ব্যাপারে কোন মন্তব্য করেননি। সুতরাং বাংলার সুলতান আরাকান দখল করেননি বরং আরাকানী শাসক কর্তৃক দখলকৃত চট্টগ্রামের কিয়দংশ তিনি পুনরুদ্ধার করেছেন বলে ধরে নেয়া যায়। কেননা ১৫৬৪ খ্রিস্টাব্দে রাজা সৌহলার মৃত্যুর পর স্বীয় ভ্রাতা মিনসিথিয়া আরাকানের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবার পর চট্টগ্রামের শাসনকর্তা উজির নসরত শাহের সাথে মিনসিথিয়ার দ্বন্দ্ব হয়। ফলে মিনসিথিয়া গোপনে পর্তুগীজদের দ্বারা ১৫৬৭ খ্রিস্টাব্দে নসরত শাহকে হত্যা করেন। মূলত বাংলার সুলতান আরাকান অধিকৃত চট্টগ্রাম পুনরুদ্ধার করে মুদ্রা জারী করেছিলেন এবং আরাকানের রাজা সোহলা তা পুনর্দখল করেন। চট্টগ্রামের শাসক নসরত শাহ সোহলার অনুগত হয়ে চট্টগ্রাম শাসন করলেও মিনসিথিয়ার সময় এসে বিদ্রোহ করার চেষ্টা করলেই তিনি আরাকানী রাজার নির্দেশে পর্তুগীজদের হাতে নিহত হন। সেইসাথে চট্টগ্রাম আরাকানের হাতে চলে যায়।
আরাকানরাজ মিনসিথিয়ার মৃত্যুর পর মিনবিন ওরফে জবৌক শাহের পুত্র মিং ফালং সিকান্দর শাহ নাম ধারণ করে ১৫৭১ খ্রিস্টাব্দে আরাকানের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। তিনি ছিলেন আরাকানের একজন প্রভাবশালী শাসক। তার সময়কালেও বাংলার সাথে সম্পর্ক ভাল ছিলনা। সমসাময়িককালে ত্রিপুরাতেও অমর মানিক্য নামক একজন পরাক্রমশালী শাসকের অভ্যূদয় হয়। তিনি ১৫৭৭ থেকে ১৫৮৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ত্রিপুরায় রাজত্ব করেন। আরাকানের রাজা ও ত্রিপুরার রাজা অমর মানিক্য উভয়েই সমসাময়িক এবং উভয়েই আফগানদের পতন এবং মোগল আধিপত্য বিস্তারের সমকালীন রাজনৈতিক বিশৃংখলার সুযোগে কক্সবাজারসহ পুরো চট্টগ্রামে স্বীয় শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। ত্রিপুরার রাজমালার উদ্ধৃতি দিয়ে ঐতিহাসিক আবদুল করিম এ যুদ্ধের বিবরণী উল্লেখ করেন। বিবরণীতে উল্লেখ করা হয় যে, ত্রিপুরার রাজা অমর মানিক্য আরাকানে এক অভিযান প্রেরণ করেন, তিনি তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র রাজধর নারায়ণকে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করেন। রাজধরের ছোট ভাই অমর দূর্লভ নারায়ণ, সেনাপতি চন্দ্রদর্প নারায়ণ, চন্দ্র সিংহ নারায়ণ এবং ছত্রজিত নাজীরকে প্রধান সেনাপতির সহকারী নিযুক্ত করা হয়। এ যুদ্ধে ত্রিপুরার রাজা অমর মানিক্য বাংলার বার ভূঁইয়াদের নিকট থেকেও সাহায্য লাভ করেন। ত্রিপুরা বাহিনী চট্টগ্রামে পৌঁছে কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ তৈরী করে নদী পার হয় এবং আরাকান অধিকৃত ছয়টি থানা জয় করে রামুতে এসে শিবির স্থাপন করে। অতঃপর ত্রিপুরা বাহিনী দিয়াঙ্গ এবং উড়িয়া রাজ্য আক্রমণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। উল্লেখ্য, উড়িয়ার রাজা প্রসঙ্গে ড. আবদুল করিম কালী প্রসন্ন সেনের উদ্ধৃতি দিয়ে উল্লেখ করেন উড়িষ্যা হতে আগত কোন ব্যক্তি আরাকান রাজ্যের অধীনে দেয়াঙ নামক স্থানে রাজ্য স্থাপন করেছিলেন। রাজা উড়িষ্যাবাসী ছিলেন বলে তাকে উড়িয়া রাজা বলা হত। কিন্তু কালীপ্রসন্ন সেন উড়িষ্যাবাসী ছিলেন বলে তাকে উড়িয়া রাজা নাম দিয়ে দেয়াঙ্গ ও উড়িয়া একস্থান বলে চিহ্নিত করলেও জোওয়াও ডি, বেরসের মানচিত্রে কক্সবাজারের সমুদ্র উপকূলে ‘উড়িয়াতন’ নামে একটি বিস্তীর্ণ এলাকা চিহ্নিত আছে। মূলত এ উড়িয়াতনের রাজাকে উড়িয়া রাজা বলা হয়েছে।এ সময় আরাকানের সৈন্য বাহিনী ত্রিপুরার সৈন্য বাহিনীকে আক্রমণ করে। কিন্তু ত্রিপুরা বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সৈন্য দেখে আরাকানীরা হতভম্ব হয়ে পড়ে এবং সম্মুখ যুদ্ধে বিজয় হওয়া কঠিন ভেবে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ত্রিপুরার ভাড়াটিয়া পর্তুগীজ সৈনিকদের বশীভূত করে। ফলে পর্তুগিজ সৈনিকগণ তাদের অধিকৃত থানাগুলো আরাকানীদের হাতে ছেড়ে দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করে এবং থানাগুলো দখলে পেয়ে তারা সর্বশক্তি নিয়ে ত্রিপুরা বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। যুদ্ধের মধ্যেই আরাকানীরা গুপ্তচর মারফত সংবাদ পায় যে, ত্রিপুরার বিশাল বাহিনীর হাতে পর্যাপ্ত রসদ মজুদ নেই। এ সুযোগে বাহিনীর কাছে রসদ পৌঁছানোর ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়। ফলে ত্রিপুরা বাহিনী খাদ্যাভাবে অনাহারে অর্ধাহারে কিছুদিন যুদ্ধ করে অবশেষে পশ্চাদ পলায়ন করে উত্তর চট্টগ্রামে ফিরে আসে এবং পুন:শক্তি সঞ্চয় করে আরাকানী বাহিনীতে হামলা চালিয়ে বহু আরাকানী সৈন্যকে হত্যা করে এবং আরাকানীরা পরাজিত হয়। এ প্রেক্ষিতে আরাকানের রাজা নিজের সামন্ত উড়িয়াতনের ‘উড়িয়া’ রাজার মাধ্যমে ত্রিপুরার রাজার কাছে সন্ধির প্রস্তাব পাঠান। অমর মানিক্যও অভিযানে ব্যর্থতার দরুণ যুদ্ধ বন্ধের জন্য ইচ্ছুক ছিলেন। তাই তিনি প্রধান সেনাপতি যুবরাজ রাজ্যধর মানিক্যকে যুদ্ধ বন্ধ করে ত্রিপুরায় ফিরে আসার আদেশ দেন।
আরাকানের রাজা সিকান্দার শাহ কর্তৃক সন্ধির প্রস্তাব ছিল ছলনা মাত্র। তারা এ সুযোগে পর্তুগীজ ভাড়াটিয়া সৈন্যের সাহায্যে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করে এবং পুনরায় উত্তর চট্টগ্রামে আক্রমণ চালায়। ত্রিপুরার রাজা সিকান্দার শাহের ছলনা বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গেই যুদ্ধ করার নির্দেশ দেন এবং আবারও যুবরাজ রাজ্যধর মানিক্যের নেতৃত্বে রাজকুমার অমর দূর্লভ, ঝুঝা মানিক্য ও অন্যান্য সেনাপতিগণ যুদ্ধে যাত্রা করেন। ত্রিপুরার রাজা কর্র্তৃক যুদ্ধের প্রস্তুতির খবর পেয়ে আরাকানের রাজা চিন্তিত হয়ে পড়েন এবং যুদ্ধের প্রস্তুতির খবর নেবার জন্য স্বর্ণম-িত একটি হাতির দাঁতের মুকুট উপহারসহ একটি চিঠি দিয়ে একজন দূত প্রেরণ করেন। তিন রাজকুমারের উপস্থিতিতে আরাকানী দূত রাজ্যধর মানিক্যের হাতে মুকুট ও রাজকুমার অমর দূর্লভের হাতে চিঠি খানি দেন। মুকুটটির প্রতি কনিষ্ঠ রাজপুত্র ঝুঝা মানিক্যের লোভ ছিল। তিনি কিছু না পেয়ে রাগান্বিত হয়ে বলেন - ‘আমি মগদের শৃগালের মত হত্যা করে হাজার মুকুট ছিনিয়ে আনব।’ দূত মারফত এ কথা শুনে আরাকানের রাজা ক্রুদ্ধ হয়ে যুদ্ধ শুরু করার আদেশ দেন। যুদ্ধের শুরুতেই ত্রিপুরা রাজকুমার ঝুঝা মানিক্য হাতির পায়ের নিচে পিষ্ট হয়ে নিহত হন এবং প্রধান সেনাপতি রাজ্যধর মানিক্য আরাকানীদের শেলের আঘাতে আহত হন। এ ঘটনায় ত্রিপুরা বাহিনীর মধ্যে আতংকের সৃষ্টি হয় এবং সৈন্যরা দিকবিদিক পলায়ন করে। ফলে আরাকানী বাহিনী বিজয়ী হয়। ত্রিপুরার সাথে বিজয়ের পর রামুর আরাকানী সামন্ত শাসক আদম শাহের সাথে আরাকানের রাজার মত বিরোধ দেখা দেয়। আদম শাহ আরাকান রাজার ভয়ে পলায়ন করে ত্রিপুরায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। আরাকানের রাজা অমর মানিক্যকে পত্র মারফত আদম শাহকে ফেরত চান। কিন্তু অমর মানিক্য আশ্রিত আদম শাহকে ফেরত পাঠাতে অস্বীকৃতি দিয়ে স্বসৈন্যে স্বয়ং যুদ্ধ করার জন্য চলে আসেন। আরাকানী বাহিনীর দুলক্ষ সৈন্য সমাবেশ দেখে ত্রিপুরা বাহিনীর সৈন্যরা যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে পলায়ন করে। যুদ্ধে ত্রিপুরা রাজা পরাজিত হয়ে অপমানে ত্রিপুরায় ফিরে পাহাড়ের আশ্রয় নিয়ে আফিম খেয়ে আত্মহত্যা করেন। আরাকানী বাহিনী ত্রিপুরার রাজধানী উদয়পুর অবরোধ করে পনের দিন ধরে লুন্ঠন চালায়। অতঃপর মেঘনার তীর অবধি ত্রিপুরা ও নোয়াখালী অঞ্চল অধিকার করে। এ যুদ্ধে সিকান্দার শাহের চট্টগ্রামের সামন্ত শাসক উজির জালাল খা গোপনে অমর মানিক্যের সহায়তা করেছিলেন। অমর মানিক্যের পরাজয়ে জালাল খাঁ ভয়েই প্রাণ ত্যাগ করেন। অতঃপর সিকান্দার শাহ ঢাকা পর্যন্ত স্বীয় প্রভাব বিস্তার করে ঢাকা পরিদর্শনে আসেন।  (চলবে)
(লেখক : প্রফেসর, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, mrakhanda@gmail.com)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ