ঢাকা, মঙ্গলবার 23 January 2018, ১০ মাঘ ১৪২৪, ৫ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

২০৪০ সালে শতভাগ আমদানি নির্ভর হবে জ্বালানি খাত

এইচ এম আকতার: চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে মহাপরিকল্পনা করছে সরর্কা। কিন্তু বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা। এ মহাপরিকল্পনা নিয়ে বস্তাবায়ন হলে বিপাকে পড়বে দেশের বিদ্যুৎ খাত। এতে দেখা গেছে,২০৪০ সাল নাগাদ শতভাগ আমদানি নির্ভর হয়ে উঠবে দেশের জ্বালানি খাত। যা দিয়েই তৈরি করতে হবে প্রায় ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। আর এটি করতে গেলে, বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার চাপ নিতে হবে অর্থনীতিকে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, চেষ্টা না করে, শতভাগ আমদানি নির্ভরতার দিকে চলে যাওয়া হবে ভবিষ্যতের জন্য বড় বিপজ্জনক। আর এ নিয়ে উন্নত দেশগুলোর উদাহরণ টানা হলেও, সে যুক্তিকে একেবারেই খোঁড়া বলছেন সরকার। বিশাল আকারের বেশ কয়েকটি কেন্দ্র নিয়ে দাঁড়িয়ে দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ হাব আশুগঞ্জ। যেখানে শতভাগ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে দেশীয় গ্যাস। কিন্তু, ধীরে ধীরে চাপ এবং সরবরাহ কমতে থাকায়, উৎপাদনের লক্ষ্য পূরণ করতে হিমশিম খেতে হয় প্রায়ই। বন্ধ রাখতে হয় কোনো কোনো কেন্দ্রও। কিন্তু, তারপরও এ এলাকাকে ঘিরেই, ভবিষ্যতের জন্য নেয়া হচ্ছে গ্যাসভিত্তিক আরো বড় বড় প্রকল্প। আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ হাব ঘিরে গ্যাস সরবরাহের প্রত্যাশা থাকলেও, অন্য কেন্দ্রগুলোর ভবিষ্যত আটকে, আমদানি করা জ্বালানিতে। কারণ, গ্যাস খাতের মহাপরিকল্পনা বলছে, ২০৩০ সাল নাগাদ দেশের জ্বালানিতে বিদেশি নির্ভরতা থাকবে প্রায় ৯২ শতাংশ। যা, ২০৪০-এ গিয়ে দাঁড়াবে শতভাগে। অথচ, সেই বছর থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা ৬০ হাজার মেগাওয়াট। যার আবার ৮৪ শতাংশই আসবে প্রধান তিন জ্বালানি গ্যাস, কয়লা এবং তেল থেকে। বিদেশ থেকে জ্বালানি কিনে বিদ্যুৎ তৈরি করতে গেলে বড় চাপ পড়বে অর্থনীতিতে। কেননা, হিসাব বলছে, ২০৩০ থেকেই আমদানি বাবদ বাড়তি খরচ করতে হবে বছরে ১৬ বিলিয়ন ডলার করে। যা ২০৪০ নাগাদ ছাড়িয়ে যেতে পারে ৩০ বিলিয়ন। ফলে, এই টাকা যোগাড় করাও হবে বড় চ্যালেঞ্জের। এছাড়া, কয়েকগুণ উৎপাদন খরচ বাড়লে সে প্রভাবও পড়বে জনজীবনে। তবে, এ বিষয়ে সরকার থেকে শতভাগ জ্বালানি আমদানি নির্ভর দেশগুলোর উদাহরণ টানা হলেও, বিশ্লেষকরা মনে করেন- সেটি একেবারেই অযৌক্তিক। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এখনই আমদানিকে একমাত্র অবলম্বন হিসেবে না নিয়ে, বরং আরো চেষ্টা করা উচিৎ দেশের ভেতরে সম্পদ অনুসন্ধানের। বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনা নিয়ে সরকার এগুলেও চাহিদা আর উৎপাদনে গড়মিল থেকেই যাচ্ছে। এতে করে উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দেশের বিদ্যুৎ-জ্বালানি নিজস্ব নির্ভরতা অপরিহার্য। অথচ রেন্টাল, কুইক-রেন্টাল বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরও প্রতিবেশী দেশ ভারতের ওপর বিদ্যুৎ নির্ভরতা যেন বেড়েই চলছে। দেশের বিদ্যুৎ খাতে ভারতের অতিমাত্রার এই প্রভাব সরকারের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞরা। এই অবস্থা মোকাবিলায় এখন থেকেই আগাম কর্মকৌশল নির্ধারণ করা না হলে বিদ্যুৎখাত পুরোপুরি ভারত নির্ভর হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন তারা। বিদ্যুত উৎপাদনের মহাপরিকল্পনা সাল মোট বিদ্যুৎ চাহিদা (মেগাওয়াট) ২০১৬ ৯৫৮৩ ২০২১ ১৪৪৬০ ২০২৬ ২১৩২৮ ২০৩১ ২৯২৫০ ২০৩৬ ৩৯৩১৫ ২০৪১ ৫০৯৭৯ ইতোমধ্যেই ভারত থেকে প্রতিদিন ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত আনা হচ্ছে। আরও ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির প্রক্রিয়া চলছে। যে কোন সময় আন্তঃগ্রীড সংযোগের মাধ্যমে আরও ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রীডে যুক্ত হবে। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরকালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার আরও ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে। এর পাশাপাশি ভারতের বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী আদানি ও রিলায়েন্সের কাছ থেকে ২ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ক্রয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার। প্রতিষ্ঠান দু’টির কাছ থেকে যে বিদ্যুৎ ক্রয় করা হবে তা দেশীয় বিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুতের তুলনায় অনেক বেশি দাম পড়বে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আদানি ও রিলায়েন্স প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম প্রস্তাব করেছে প্রায় সাত টাকা। দেশে গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুতের তুলনায় এই দাম অনেক বেশি। এমনিতেই বিদ্যুৎ উৎপাদনে ভাড়াভিত্তিক অস্থায়ী ব্যবস্থা নিয়ে সরকার দিশেহারা। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরকারকে চড়াদামে বিদ্যুৎ ক্রয় করতে হচ্ছে। আর ভাড়াভিত্তিক এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করতে হচ্ছে লোকসানী মূল্যে জ্বালানি তেল ও গ্যাস। এ অবস্থায় সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে না তুলে দেশের বিদ্যুৎখাতকে অতিমাত্রায় ভারত নির্ভরশীল করা হলে তা সরকারের জন্য মারাত্মক সংকট সৃষ্টি করবে। সরকার কোনভাবেই রেন্টার আর কুইক রেন্টাল থেকে বেরুতে পারছে না। এতে করে বিদ্যুতের দাম বাড়ছেই। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগুলোও এই পরিকল্পনার গোড়ায় গলধ বলে মনে করছেন বিশেসজ্ঞরা। এতে দেখা গেছে পর্যায়ক্রমে বিদুতের উৎপাদন বাড়লেও জ্বালানী আমদানিও বাড়নো হয়েছে। অবস্থা এমন যে ২০৪০ সালে তা শতভাগে দাড় করানো হয়েছে। এতে করে জ্বালানী খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। রেন্টাল আর কুইক রেন্টালের হাত থেকে বাচতে সরকার বড় বড় বিদ্যু কেন্দ্র নিমানের উদ্যোগ নিলেও সব কয়টিই বিদেশি আমদানি নির্ভর জ্বালানী ভিত্তিক। এতে করে জ্বালানী খরচ বাড়বে। এজন্য দিকে আমদানি ব্যয় যোগানে সমস্যা হলে বড় ধরনের সংকটে পড়তে পাড়ে দেশ। এমনিতেই দেশের বিদ্যুৎ সঙ্কট মোকাবেলায় সরকার ‘কুইক রেন্টাল’ তথা জরুরি ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু করে। কিন্তু এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রে যে ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে তা বড় সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আশঙ্কা রয়েছে, এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভর্তুকি বন্ধ হয়ে গেলে কিংবা হিসাবে না পোষালে এসব কোম্পানি যে কোন সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এছাড়া, সরকার বদল হলে কুইক রেন্টাল কেন্দ্রের ভবিষ্যত কী হবে সে বিষয়টিও স্পষ্ট নয়। যদিও কুইক রেন্টালের বিষয়ে জবাবদিহিতা থেকে রক্ষা পেতে সংসদে ইনডেমনিটি আইন পাস করা হয়েছে। ফলে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাথে জড়িতরা থেকে যাবে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ভারতের প্রতিষ্ঠান আদানি ও রিলায়েন্সের ক্ষেত্রেও একই সুরক্ষা দেয়া হবে বলে বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পিডিবি’র সাবেক চেয়ারম্যান বলেন, আদানি ও রিলায়েন্সের কাছ থেকে সরকারকে অনেক বেশি দামে বিদ্যুৎ ক্রয় করতে হবে। এই কর্মকর্তার মতে, এই দু’টি ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের দেশের বাইরে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে বড় ধরনের কোন অভিজ্ঞতা নেই। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, আদানি ভারতে তাদের মালিকানাধীন কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রে উৎপাদিত মোট ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশে সরবরাহ করার প্রস্তাব দিয়েছে। এ জন্য প্রয়োজনীয় সঞ্চালন লাইন আদানিই নির্মাণ করবে। রিলায়েন্সের প্রস্তাবনায় বলা হয়, নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাটে মোট তিন হাজার মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র করবে কোম্পানিটি। এর মধ্যে প্রথমটি হবে ৭৫০ মেগাওয়াটের। এই কেন্দ্রটির জন্য রিলায়েন্স সরকারের কাছে দীর্ঘ মেয়াদে গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা চেয়েছে। পাশাপাশি মহেশখালীতে একটি স্বতন্ত্র ভাসমান টার্মিনাল (ফ্লোটিং স্টোরেজ এন্ড রি-গ্যাসিফিকেশন ইউনিট বা এফএসআরইউ) স্থাপন করে এলএনজি আমদানি করে তা দিয়ে ২ হাজার ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা তাদের। বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর চলমান ভারত সফরেই রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে এক্সিম ব্যাংকের সাথে ঋণচুক্তি, ত্রিপুরা থেকে আরো ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি, নেপাল ও ভূটান থেকে বিদ্যুৎ আমদানি, বাংলাদেশ-ভারত-ভুটান-নেপাল চতুর্দেশীয় বিদ্যুৎ গ্রীড, ঝাড়খন্ডে অবস্থিত আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ আমদানির জন্য সঞ্চালন লাইন করা এবং ভারতের রিলায়েন্সের এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনার বিষয়ে চুক্তি ও সমঝোতা হবে। ভারতের ত্রিপুরার সূর্য মণিনগর বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিশালগড় মহকুমার কৈয়াঢেপা সীমান্ত হয়ে বর্তমানে প্রতিদিন ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসছে। এই পথে আরও ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হবে। এর দাম নিয়ে এতদিন দুই দেশ সমঝোতায় পৌঁছতে পারেনি। এখন তা ঠিক হয়েছে। প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতের দাম ধরা হয়েছে ৫ রুপি ৫৪ পয়সা। যা বাংলাদেশী মুদ্রায় ছয় টাকা ৩১ পয়সা। আর ভারতের আদানি গ্রুপ ঝাড়খন্ড প্রদেশে এক হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ বাংলাদেশে প্রতি ইউনিট ছয় টাকা ৯৩ পয়সা দরে বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে। যা অনেক বিশে বলে মনে করছেন বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞরা। জানা গেছে,সরকার একের পর এক বিদেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে আগ্রাহ দেখাচ্ছে। অন্যদিকে দেশে যেসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মান করা হচ্ছে তাও বিদেশি জ¦ালানী নির্ভর। এভাবে একটি দেশ বিদেশি নির্ভর নীতির সমালোচনা করেছেন খাত সংশ্লিষ্ঠরা। তারা বলছেন,সরকার চাইলেই আরও অনেক কম মূল্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। কিন্তু সরকার তা না করে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে শতভাগ বিদেশ নির্ভর হয়ে পড়ছে। এতে করে উৎপাদন ব্যয় এবং জনজীবনের ব্যয় অনেকাংশ বেড়ে যাবে। একই সাথে বড় কোন আর্ন্তজাতিক সংকট কিংবা ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে রফতানি খাতও পিছিয়ে পড়বে। এব্যাপারে প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা সরকারের এই মহা পরিকল্পনা বিরোধীতা করে আসছি। বিদেশ থেকেআমদানি নির্ভর জ¦ালানী নিয়ে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে। একটি দেশ এভাবে পর নির্ভরশীল মেনে নেয়া যায় না। আমাদের সব ধরনের প্রযুক্তি রয়েছে তাহলে কেন আমরা এভাবে বিদেশ নির্ভর হবো। এই পরিকল্পনা থেকে সরকারকে বেরিয়ে আসতে হবে। তা না হলে বড় ধরনের সংকটে পড়বে দেশ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ