ঢাকা, মঙ্গলবার 23 January 2018, ১০ মাঘ ১৪২৪, ৫ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রাজধানীতে হেলে পড়ছে ভবন কতটি ঝুঁকিপূর্ণ জানে না কেউ

# নির্মাণ ত্রুটিসহ ৮ কারণ তোফাজ্জল হোসেন কামাল : রাজধানীতে একের পর এক ছোট-বড় ভবন হেলে পড়ার ঘটনা বাড়ছেই। কোন কোন ঘটনায় হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। অপরিকল্পিত উন্নয়নের ঢামাঢোলে ভবন মালিক পক্ষের নকশা বহির্ভূত ভবন নির্মাণ, নিম্ম মানের মালামালের ব্যবহার, বিল্ডিং কোড না মানা, যথাযথ কতৃপক্ষের অনুমোদন না নেয়াসহ ৮ টি কারণে ভবন হেলে পড়ার ঘটনা বাড়ছে বলে নগরপরিকল্পনাবিদদের অভিমত। তারা জানান, ওই ৮ টি কারণ বিদ্যমান থাকাবস্থায় যে সকল ভবন নির্মাণ হবে বা হচ্ছে, তার সব ক‘টিই ঝুঁকিপূর্ণ ভবন। আর হেলে পড়া ভবনের তালিকা খুঁজলে দেখা যাবে, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হেলে পড়ে জনজীবনে আতংকের সৃষ্টি করছে। কোন প্রকার ভুমিকম্প ছাড়াই একের পর এক ভবন হেলে পড়ার ঘটনা বাড়ায় রাজধানীবাসীর মধ্যে ভবনে বসবাস নিয়ে আতংক ও আশংকা তৈরী হয়েছে। ভবন হেলে পড়ার ঘটনার সর্বশেষ উদাহরণ রোববার পুরান ঢাকার লালবাগ থানা এলাকার ২/ই আরএনডি রোডের ৫ তলা ভবনটি। এদিকে, গোটা রাজধানীতে গড়ে ওঠা কতগুলো ভবন ঝুঁকিপূর্ণ তার কোন সঠিক পরিসংখ্যান কারও হাতে নেই। সংশ্লিষ্ট এক এক কতৃপক্ষ এক এক সময়ে এক এক তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরী করে জানান দিলেও শেষ পর্যন্ত তা বিতর্কের মধ্যেই পড়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, রাজধানী উন্নয়ন কতৃপক্ষ (রাজউক), সিটি কর্পোরেশন (ডিসিসি), ফায়ার সার্ভিস কতৃপক্ষ পৃথক পৃথকভাবে তালিকা করেছে সমন্বয়হীনভাবেই। মূলত রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাসহ আট কারণে একের পর এক ভবন হেলে পড়ার ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন রাজধানীর ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা ৩২১ টির কথা জানান। গত বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীতে ১৫৫টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। অথচ এর আগে ২০০৯ সালে রাজধানীতে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা নির্ধারণ করে রাজউক। তখন তাদের জরিপে বলা হয়েছে, ৭২ হাজার ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। ২০১৬ সালের ১৭ মে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহাম্মেদ খাঁন এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের জানান, ‘নগরীতে ১১০টি ভবন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। হাইড্রোলিক মেশিনের শব্দে কাঁপতো লালবাগের হেলেপড়া ভবনটি : লালবাগের আরএনডি রোডের পাঁচ তলা ভবনটির বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত পাওয়া না গেলেও এটি হেলে পড়ার পেছনে কিছু কারণ দেখছেন স্থানীয়রা। তারা জানান, ভবনটির আশপাশে হাইড্রোলিক মেশিন সম্বলিত কয়েকটি কারখানা গড়ে উঠেছে। সেসব কারখানার শব্দে হেলেপড়া ভবনটিসহ পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। তাছাড়া, ভবনটি অনেক পুরনো ছিল। সরেজমিনে দেখা গেছে, আরএনডি সড়কের ২/ই নম্বর ভবনটির পেছন দিকেই গড়ে উঠেছে একাধিক হাইড্রোলিক মেশিন সম্বলিত কারখানা। দিনরাত এসব কারখানায় লোহা কাটাসহ ইঞ্জিনের শব্দে আশপাশের এলাকায় ভূ-কম্পনের মতো হতে থাকে। ভবনটি হেলে পড়ার পেছনে এসব কারণই দেখছেন বাড়ি মালিক ও স্থানীয় বাসিন্দারা। ভবন মালিক হাজী শওকত আলীর নাতি এহসানুল হক বলেন, ‘১৯৯২ সালে রাজউকের অনুমতি নিয়ে ভবনটি করা হয়েছিল। ভবনের পাশেই একটি লোহার কারখানায় হাইড্রোলিক মেশিন ব্যবহার করা হয়। সেখানে দিনরাত চারটি মেশিন চলে।’ ভবনটির কয় তলা পর্যন্ত অনুমোদন রয়েছে সে বিষয়ে তিনি কিছু জানাতে পারেননি। তবে রাজউকের একজন কর্মকর্তা জানান, এটির চার তলা পর্যন্ত অনুমোদন রয়েছে। এহসানুল হক বলেন,‘আমরা আজ সোমবার রাজউকে গেছি। সেখান থেকে বুয়েটের মতামত নেওয়ার জন্য আমাদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। আজ বুয়েট বন্ধ। আমরা কাল মঙ্গলবার বুয়েটে যাবো। বুয়েট যদি ভবনের ওপরের দুই তলা ভাঙার মতামত দেয়, আমরা তাতেও রাজি।’ রাজউকের অঞ্চল-৫ এর অথরাইজড অফিসার আশীষ কুমার সাহা জানান, ‘কী কারণে ভবনটি হেলে পড়েছে সে বিষয়ে প্রকৌশলগত মতামত ছাড়া কিছুই বলা যাচ্ছে না। আমরা বাড়ি মালিককে চিঠি দিয়েছি তিনি যেন বুয়েট থেকে ভবনটির বিষয়ে রিপোর্ট করে আনেন। বুয়েটের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী ভবনটি সম্পর্কে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আপাতত বাড়িতে আমরা তালা ঝুলিয়ে দিয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘একটি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। এর মধ্যে ত্রুটিপূর্ণ নকশা, ভবন পুরনো হওয়া, নিম্নমানের উপকরণও থাকতে পারে।’ বাড়িটি নির্মাণে বিল্ডিং কোড মানা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আসলে এটা কাগজপত্র না দেখে বলা যাচ্ছে না। এই বাড়িটি দেখে মনে হচ্ছে পুরনো। বাড়ি নির্মাণকালীন বিল্ডিং কোড আর বর্তমান বিল্ডিং কোড এক নয়।’ ভবনটির বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরেই এই বাড়িতে আমরা ভাড়া থাকছি। মালিক কোনও যতœই নেয়নি বাড়ির। তাছাড়া, এই বাড়ির একেবারেই দেয়াল ঘেঁষে উঠেছে আরেকটি বাড়ি। ওই বাড়ি নির্মাণের সময় এই ভবনের পাশে গভীর গর্ত করতে হয়েছে। ঝুঁকে পড়ার জন্য ওটাও একটা বড় কারণ হতে পারে।’ স্থানীয় বাসিন্দা গোলাম রহমান বলেন, ‘সত্যিকার অর্থে পুরান ঢাকার কোনও বাড়িই রাজউক বা সংশ্লিষ্ট অথরিটির নিয়ম কানুন মেনে গড়ে উঠেনি। এই এলাকার অধিকাংশ ভবনই ঝুঁকিপূর্ণ। এখনও যেসব বাড়ি হচ্ছে সেগুলোও বিল্ডিং কোড অনুযায়ী যথাযথভাবে নির্মাণ হচ্ছে না। একটি ভবন থেকে অন্য একটি ভবন যে পরিমাণ ফাঁকা থাকার কথা সেসবও অনুসরণ করা হয় না।’ হেলে পড়া ভবনের ঘটনা : ২০১৭ সালের ৫ এপ্রিল বুধবার হাতিরপুল বাজারের কাছে ১৫ তলা তৈরি পোশাকশিল্পের কারখানা ‘অনন্ত অ্যাপারেলস লিমিটেড’ হেলে পড়ে। ওই দিন বুধবার বিকেলে অতিবৃষ্টির ফলে মাটি নরম হয়ে এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। তবে, এতে কোনো প্রাণহানি বা হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। এর আগে ২০১৬ সালের ১৯ এপ্রিল কদমতলীর মোহাম্মদবাগ চৌরাস্তায় ৬ তলা একটি ভবন হেলে পড়ে। পরে ভবনটি খালি করার নির্দেশ দেয় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। ওই দিন দুপুর দেড়টার দিকে কদমতলী থানাধীন রায়েরবাগের মোহাম্মদবাগ চৌরাস্তায় একটি ছয়তলা ভবন পাশের চারতলা ভবনের উপর সামান্য হেলে পড়ে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা এসে বাড়ির বাসিন্দাদের হেলে পড়া ওই ভবন থেকে বের করে দেয়। এর আগে ১৩ এপ্রিল সন্ধ্যার ভূমিকম্পের পরই কদমতলীর এ ৪ তলা ভবনটি পাশের ৬ তলা ভবনের ওপর হেলে পড়ে বলে জানায় সংশ্লিষ্টরা। এর আগে ২০১৬ সালের ১২ এপ্রিল তেজগাঁওয়ে একটি গার্মেন্টস ভবন হেলে পড়ে। বিজয় সরণিতে কুপাস ভবনের পাশে অবস্থিত ওই গার্মেন্টস ভবনটি হেলে পড়ার খবর জানায় তেজগাঁও থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম। তিনি আরো জানান, ভবন হেলে পড়ার খবরে ওই গার্মেন্টস ভবনসহ আশেপাশের ভবনগুলোয় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হেলে পড়া ভবন থেকে লোকজন নিচে সড়কে নেমে আসেন। এর আগে একই বছরের ৯ জানুয়ারি মোহাম্মদপুর এলাকায় তাজমহল রোডে ৪ তলা ভবন হেলে পড়ে। তাজমহল রোডের সি-ব্লকে ১৯/৪ নম্বর চারতলা ভবনটি হেলে পড়ার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা গিয়ে উদ্ধার কাজ চালায়। এর আগে ২০১৫ সালের ১ মে যাত্রাবাড়ীর ধলপুর লিচুবাগান এলাকায় একটি সাত তলা ভবন হেলে পড়ে। বিপজ্জনক মনে হওয়ায় ভবনটি সিলগালা করে দেয় কর্তৃপক্ষ। লিচুবাগান এলাকায় ৩৫/৫ নম্বর ভবনটি হেলে পড়ার পর ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বাসিন্দাদের অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়। এর আগে একই বছরের ২৫ এপ্রিল ভূমিকম্পে রাজধানীতে ১০টি ভবন হেলে পড়ে। তবে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স সদর দপ্তর ওই সময়ে ৯টি ভবন হেলে পড়ার কথা নিশ্চিত করে জানায়, কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। ওই দিন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এতে, ‘ইসলামবাগে হেলে পড়া একটি ৫তলা ভবনকে সিলগালা করা হয়েছে।’ মোহাম্মদপুর, মিরপুর-১, ফুলবাড়িয়ার বরিশাল প্লাজা, নবাবপুর, লালবাগ ও বনানীর ইফাদ টাওয়ার হেলে পড়ার সংবাদ জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তর। এ ছাড়া, কুড়িল বিশ্বরোড এবং গুলশান-২ নম্বরে দুটি ভবন হেলে পড়ার সংবাদ গেলেও ঘটনাস্থলে গিয়ে এগুলোর কোনো সত্যতা পায়নি ফায়ার সার্ভিস। অন্যদিকে মধ্যবাড্ডায় লিলিকুঞ্জ নামে অপর একটি ভবন হেলে পড়ার কথা জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। ওই সময়ে ঢাকার এই ভবনগুলোসহ সারাদেশে প্রায় ১৮টি ভবন হেলে পড়ার সংবাদ নিশ্চিত করে ফায়ার সার্ভিস। ভূমিকম্প ছাড়াই হেলে পড়ছে ভবন : রাজধানীতে ভূমিকম্প না হলে যখন তখন ভবন হেলে পড়ছে। মূলত আট কারণে এভাবে ভবন হেলে পড়ছে। এর মধ্যে, ভবন নির্মাণের জায়গার আগে সয়েল টেস্ট করতে হয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা করা হয় না। জলাশয় ভরাট করা হলেও সেখানে মাননিয়ন্ত্রিতভাবে ভবন নির্মাণ হচ্ছে না। ভবনের নকশা কোনো নির্ভরযোগ্য স্থাপতি দিয়ে তৈরি করা হয় না। ভবন স্থানটি যথাযথ (৭০ ফুট) পাইলিং করা হয় না। ভবন কাঠামোর ডিজাইন নির্ভরযোগ্য কোনো কাঠামো প্রকৌশলীকে দিয়ে করানো হয় না। ভবন নির্মাণকাজে ব্যবহৃত কংক্রিট, সিমেন্ট ও রডের মাননিয়ন্ত্রণে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় না। ভবন নির্মাণে ওয়ার্কিং ড্রয়িং অনুসারে করা হয় না। ভবন নির্মাণ রাজমিস্ত্রির হাতেই ন্যস্ত থাকে সকল কাজ। ফলে প্রায় ঘটছে ভবন হেলে পড়ার ঘটনা। রাজউকের একটি সূত্রে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটির নিয়ম ভঙ্গ করে নগরীর প্রায় ৭০ শতাংশ ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এখন এসব ভবন নিয়ে বেকায়দায় পড়েছে রাজউক। ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে মারাত্মক বিপর্যয়ের প্রধান কারণ হতে পারে এই অপরিকল্পিত আবাসন ব্যবস্থা। ভূমিকম্প ছাড়াও গত কয়েক বছরে নগরীর তেজগাঁও, বেগুনবাড়ি, কাঁঠালবাগান, পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় বেশ কয়েকটি ভবন হেলে পড়েছে। রাজউকের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তাই স্বীকার করেছেন, নগরীর প্রায় ৭০ শতাংশ স্থাপনাই যথাযথ নকশা মেনে তৈরি হয়নি। তবে বিশেষজ্ঞরা এর জন্য রাজউককে দায়ী করেছেন। এদিকে, কিছুতেই কমছে না রাজউকে সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি। নগর পরিকল্পনা, নকশা অনুমোদন, উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ, এস্টেট ও আইনসহ প্রতিটি শাখাতেই গ্রাহক বিড়ম্বনা চরমে পৌঁছেছে। একের পর এক ভবন হেলে পড়ছে কেন? খুঁজতে গিয়ে আরো জানা গেছে, ভবনগুলোর অধিকাংশই ডোবা, পুকুর ভরাট করে অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। এভাবে দেশে অসংখ্য বাড়িঘর নির্মাণ করা হয়েছে এবং হচ্ছে। প্রতিদিন অপরিকল্পিতভাবে ভবন নির্মিত হচ্ছে। কেবল ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে ভবন নির্মাণই নয় ভবনগুলোতে যেসব সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে তা খুবই নিম্মমানের। দেশে নির্মাণকাজে প্রতিদিন যে পরিমাণ রড ব্যবহার করা হয় তার ৭০ ভাগই অতি নিম্নমানের। এর মধ্যে ১৫/২০ গ্রেডের রডও রয়েছে। এমনকি রডের বদলে বাঁশ দেয়ার ঘটনা তো এখন আলোচিত বিষয়। ভবন তৈরির ক্ষেত্রে ভেজাল সিমেন্ট, দুর্বল ইট ব্যবহার হচ্ছে হরহামেশাই। এ অবস্থায় ভূমিকম্প ছাড়াও তখর তখর ভবন হেলে পড়ছে। স্থাপতি ইকবাল হাবিব বলেন, রাজধানীর সমস্যা সমাধানে কোন সেবা প্রতিষ্ঠানই সঠিক দায়িত্ব পালন করছে না। বিশেষ করে অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে প্রায় ভবন হেলে পড়ছে। এ বিষয়ে রাজউকের প্রধান ভূমিকা রাখার কথা থাকলেও তারা অন্য কাজে ব্যস্ত। যে যার ইচ্ছেমত যেমন তেমন ভবন নির্মাণ করছে। ফলে প্রায় এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে। এ বিষয়ে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। না হয় ভূমিকম্প হলে চরম মাশূল গুণতে হবে আমাদের। রাজউকের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান বলেন, নানা জটিলতায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে জনবল সংকট থাকায় আমরা এসব ভবনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হিমশিম খাচ্ছি। তারপরেও আমরা এ সমস্যা সমাধানে কাজ করছি। কত ভবন ঝুঁকিপূর্ণ কেউ জানে না : রাজধানীর অতি ঝুঁকিপূর্ণ ৩২১টি ভবন ৩০ দিনের মধ্যে ভাঙতে গত ২০১৬ সালের ২৮ এপ্রিল নির্দেশ দেয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। এতটা মাস পার হলেও সব ভবন অপসারণ করতে পারেনি রাজউক ও দুই সিটি করপোরেশন। ঝুঁকিপূর্ণ সাইনবোর্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বসবাস চলছে। এই ৩২১ ভবনের তালিকার বাইরে আরও কত ভবন ঝুঁকিপূর্ণ, তার হিসাব নেই সরকারের কাছে। প্রায় এক দশক আগে করা জরিপের হিসাবে বলা হয়ে থাকে, রাজধানীর ৭২ হাজার ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। এগুলো ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। এ জরিপের পর আরও কত ভবন নিয়ম-নীতি না মেনে বানানো হয়েছে, হিসাব নেই তারও। জাতিসংঘের হিসাবে সর্বোচ্চ ভূমিকম্প ঝুঁকিতে থাকা দুটি শহরের একটি ঢাকা। এতটা ঝুঁকিতে থাকার পরও ভবন নির্মাণে ঢাকায় নিয়ম-নীতি মানা হচ্ছে সামান্যই। ২০০৯ সালে রাজধানীতে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা নির্ধারণ করে রাজউক। তবে এ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। জরিপে বলা হয়েছে, ৭২ হাজার ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন জানান, কোন ভবন কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, ভূমিকম্পে বা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, এ বিষয়ে বিশদ তথ্য নেই কারও কাছেই। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিতকরণ জরিপে যুক্ত বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেহেদী হাসান আনসারী জানান, মাত্র ১০টা ভবনের কারিগরি দিকসহ সবকিছু যাচাই করা হয়েছিল। বাকিগুলো চিহ্নিত করা হয় সাধারণ পর্যবেক্ষণে। তিনি জানান, ২০০৯ সালে তখন ঢাকায় ভবনের সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ২৬ হাজার। গড় হিসাবে বলা হয়, ৭২ হাজার ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে। ২০১১ সালে ফায়ার সার্ভিসের জরিপে বলা হয়েছে পাঁচ হাজার ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। তা নির্ধারণ করা হয় ভবনের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও ভৌত অবস্থার ভিত্তিতে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ) মেজর শাকিল নেওয়াজ জানান, দুর্যোগ-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিশেষত অগ্নিনির্বাপণে প্রধান বাধা নকশা না মেনে ভবন নির্মাণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেছেন, ভূমিকম্প-পরবর্তী দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে। সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের হাতে আধুনিক উদ্ধার যন্ত্র রয়েছে। সাধারণ মানুষ জানেন, কীভাবে ভূমিকম্পের সময় নিজেকে রক্ষা করতে হবে। ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টি হলেও, পরিকল্পিত ভবন নির্মাণ বন্ধ না হওয়ায় ঝুঁকি দূর হচ্ছে না। জানা গেছে, রাজধানীতে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সঠিক পরিসংখ্যান নিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং সরকারের সহযোগী দুই সংস্থা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও সিটি করপোরেশনের তথ্যে বিস্তর অমিল। ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রক্রিয়াও প্রশ্নবিদ্ধ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করতে সরকারের সহযোগী সংস্থাগুলোর উদ্যোগে সমন্বিত কারিগরি জরিপ করা দরকার। না হলে ভূমিকম্পের ঝুঁকি এবং এর ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে না। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ২০০৪ সালে পুরান ঢাকায় ভবন ধসে ১৭ জনের মৃত্যুর পর অবিভক্ত সিটি করপোরেশনের করা জরিপে রাজধানীতে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে পাঁচ শর মতো ভবন চিহ্নিত করা হয়। অন্যদিকে রাজউকের উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক বলেন, বছর তিনেক আগে পরিচালিত এক জরিপে ৩২১টি ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করা হয়। এই দুজনই বলেছেন, দুটো জরিপই ছিল চোখে দেখার ভিত্তিতে, কারিগরি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে নয়। এদিকে ২০১১ সাল থেকে জাইকার সহযোগিতায় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত অধিদপ্তর পরিচালিত চার বছর মেয়াদি এক জরিপে দেখা যায়, গণপূর্ত বিভাগের মাধ্যমে নির্মিত ঢাকার ২ হাজার ১৯৩টি সরকারি ভবনের ৫৯ শতাংশই ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অধিকতর ঝুঁকিতে রয়েছে। ভবনগুলোর বয়স ২০ বছরের বেশি ও ইটের গাঁথুনিতে তৈরি। এদিকে, কয়েক বছর আগে রাজউকের তালিকায় অতি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন দেখানো হয় ৩২১টি। রাজউকের এ তালিকা থেকে ৯৩টি ভবনকে প্রাচীণ-ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ভাগ হয়ে যাওয়ার আগে ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিসিসি) জিওডেসেক কনসালট্যান্টস অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তালিকা করে পুরান ঢাকার ৫৭৩টি ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছিলো। এর মধ্যে ৩২১টি ভবন অধিক ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা হয়েছিলো। বাকি ২৫২টি ঐতিহ্যবাহী ভবন হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ