ঢাকা, মঙ্গলবার 23 January 2018, ১০ মাঘ ১৪২৪, ৫ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হচ্ছে না আজ

ফাইল ছবি

সামছুল আরেফীন : বহুল আলোচিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হচ্ছে না আজ। বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যকার স্বাক্ষরিত ‘অ্যারেঞ্জমেন্ট’ অনুযায়ী তা আজ মঙ্গলবার শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় আয়োজন অসম্পূর্ণ থাকায় তা শুরু হচ্ছে না। অবশ্য একদিন আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী নির্ধারিত তারিখে প্রত্যাবাসন শুরু হওয়া নিশ্চিত করতে পারেননি। তিনি শুধু বলেছিলেন, রোহিঙ্গারা কবে ফিরে যাচ্ছেন সেটার নির্দিষ্ট তারিখ বলা যাবে না। প্রত্যাবাসন কাজ শুরু হয়েছে। কাজ চলছে। তার একদিন পর শরণার্থী ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিষয়ক কমিশনার আবুল কালাম নিশ্চিত করলেন, পূর্ব নির্ধারত তারিখ অনুযায়ী আজ প্রত্যাবাসন শুরু হচ্ছে না। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তিনি বলেন, এখনও অনেক কিছু বাকি। যাদেরকে ফেরত পাঠানো হবে সেই তালিকা এখনও প্রস্তুত না। তাদের জন্য যাচাই-বাছাই ও ট্রানজিট ক্যাম্পও এখনও প্রস্তুত হয়নি। আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্যও মিয়ানমারকে চাপ দিচ্ছিল বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক বিশ্ব। গত ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য একটি অ্যারেঞ্জমেন্ট চুক্তিতে সই করেন। এরপর ১৯ ডিসেম্বর যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হয় এবং ১৬ জানুয়ারি ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট চুক্তি সই হয়। সর্বশেষ অ্যারেঞ্জমেন্ট অনুযায়ী দুই দেশের সীমান্তে অস্থায়ী ক্যাম্পে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা ছিল। অ্যারেঞ্জমেন্ট এর অধীনে বাংলাদেশ থেকে ফেরত যাওয়া রোহিঙ্গাদেরকে দুটি রিসেপশন সেন্টারের মাধ্যমে গ্রহণ করার কথা জানায় মিয়ানমার। এরপর এসব রোহিঙ্গাকে একটি অস্থায়ী ক্যাম্পে রাখার কথা বলা হয়। এ প্রক্রিয়া আজ শুরু হয়ে পরবর্তী দু’বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। রোহিঙ্গাদের মধ্যে উদ্বেগ: প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে কাজ করছে উদ্বেগ, উত্তেজনা। রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব করছেন এমন কয়েকজন বলেছেন, তাদেরকে হুমকি দেয়া হচ্ছে। তারা বলছেন, যদি তারা ( রোহিঙ্গারা) ফিরে না যান তাহলে তাদেরকে দেয়া খাদ্যের রেশন কার্ড কেড়ে নেয়া হবে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে উদ্ধৃত করে এ খবর দিয়েছে ভারতের অনলাইন দ্য টেলিগ্রাফ। এতে বলা হয়, বয়স্ক রোহিঙ্গারা বলেছেন, গত দু’দিনে হয় তাদেরকে ডেকে নিয়েছে ওই সংস্থার কর্মকর্তারা, না হয় তারা নিজেরা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করেছে। উল্লেখ্য, এই কার্ডটি রোহিঙ্গাদের দিয়েছে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির পক্ষ থেকে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের ওই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একজন মুখপাত্র বলেছেন, তার সংস্থার লোকজন এই কার্ড কেড়ে নেয়ার হুমকি দিয়েছেন বলে তার জানা নেই। এরই মধ্যে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় শিবিরগুলো পরিদর্শন করেছেন জাতিসংঘের বিশেষ দূত ইয়াংহি লি। তিনি রোহিঙ্গাদের বর্বরতাসহ নানা নির্যাতনের কথা শুনেন ও রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ফিরিয়ে যেতে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। প্রস্তুতির গলদ কোথায়?: বাংলাদেশের শরণার্থী প্রত্যাবাসন বিষয়ক কমিশনার আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, তারা প্রক্রিয়া শুরু করেছেন, তবে প্রকৃত প্রত্যাবাসন শুরু হতে আরও সময় লাগবে। তিনি বলেছেন, আমরা যদি প্রত্যাবাসন কে একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখি তাহলে একে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। একটি হলো ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা যে, কোন নীতির ভিত্তিতে প্রত্যাবাসন সম্পন্ন হবে, দ্বিতীয় হলো কাঠামোগত প্রস্তুতি ও তৃতীয় হলো শারীরিক বা মাঠ পর্যায়ে প্রকৃত প্রত্যাবাসন শুরু করা। তার মতে, তারা প্রথম ধাপটি অতিক্রম করেছেন। কারণ একটি ফ্রেমওয়ার্ক হয়েছে এবং ১৯শে ডিসেম্বর জয়েন্ট ওয়ার্কিং কমিটি হয়েছে। এরপর চলতি মাসে নেপিদোতে এ কমিটির বৈঠকে প্রত্যাবাসন সম্পর্কিত চুক্তিও সাক্ষরিত হয়েছে। তিনি বিবিসিকে বলেন, এখন দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করেছি। যেসব প্রস্তুতিমূলক কাজ দরকার প্রত্যাবাসনের জন্য সেটি হাতে নিয়েছি। এটা হয়ে গেলে প্রকৃত প্রত্যাবাসনের কাজে হাত দেয়া যাবে বলে আশা করছি। মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের কোন তালিকা দেয়া হয়েছে কি-না জানতে চাইলে আবুল কালাম আজাদ বলেন, কোন কোন গণমাধ্যমে লেখা হয়েছে যে এক লাখের তালিকা দেয়া হয়েছে। কিন্তু এটি আসলে এক লাখের বিষয় নয়। মিয়ানমারের অভিবাসী সবাই প্রত্যাবাসনের তালিকায় আসবে, যা প্রায় সাত লাখ ৬০ হাজার। তিনি বলেন, আমরা তালিকা তৈরির কাজ করছি। এটি হবে পরিবার ও গ্রাম ভিত্তিক। আমরা এখনো মিয়ানমারকে কোন তালিকা দেইনি। যেভাবে দিতে হবে সেভাবে তালিকা তৈরির কাজ চলছে। তিনি বলেন, ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করাটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিলো যার ভিত্তিতে সম্পূর্ণ প্রত্যাবাসন হবে। চুক্তিতে ছিলো দু'মাসের মধ্যে এ প্রক্রিয়া শুরু হবে। ভেরিফিকেশন ফরমেটসহ অনেক গুলো বিষয় ঠিক হয়েছে। বিষয়টি অনেক দুর এগিয়েছে, তবে একটু সময় লাগবে। অনেক কাজ আছে। যেমন ট্রানজিট ক্যাম্প তৈরি করতে হবে। ওখান থেকে প্রত্যাবাসন হবে। একই ভাবে মিয়ানমারে ফেরার পর তাদের কোথায় রাখা হবে, গ্রামে নিয়ে যেতে পারবে কি-না, নিরাপত্তার বিষয় আছে, প্রত্যাবাসনের আগে ও পরে খাদ্য সরবরাহের বিষয় আছে। সার্বিক এসব প্রক্রিয়ার ব্যাপার, কিছুটা সময় লাগতে পারে। তিনি জানান বিষয়গুলো ঠিক হলেই প্রকৃত প্রত্যাবাসন শুরু হবে। এ দিকে রয়টার্সকে মায়ানমারের সমাজকল্যাণ, ত্রাণ ও পুর্নবার্সন মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক কো কো নিং জানিয়েছেন, যারা ফেরত আসতে চায়, আমরা তাদের গ্রহণ করতে প্রস্তুত। আমাদের পক্ষ থেকে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন। রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন কূটনীতিকরাও: রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর আগে রাখাইনে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিক ও উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা। ব্রিফিংয়ে পূর্ব-পশ্চিম, দূর ও কাছের বিভিন্ন সব রাষ্ট্র ও সংস্থার জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিরা প্রায় অভিন্ন সুরেই বলেছেন, মিয়ানমার থেকে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা তাদের নিজ ভূমে ফিরে যাক, এটাই দেখতে চায় বিশ্ব। কিন্তু তাদের ফেরানোর আগে অবশ্যই রাখাইনকে রোহিঙ্গাদের বসবাসের জন্য নিরাপদ করতে হবে। তাদের প্রত্যাবাসনটি হতে হবে টেকসই। আর এটি করতে হলে অবশ্যই আগ্রহী রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নিরাপত্তা ও সম্মানের সঙ্গে ফেরত পাঠাতে হবে। বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শিয়া স্টিফেনস ব্লুম বার্নিকাট বলেন, আমি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরে গিয়ে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে যেটা জানতে পেরেছি তারা ওই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আর ফিরে যেতে চায় না। তাই রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে হলে রাখাইনে স্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা প্রয়োজন। আমরা সেটার ওপরই জোর দিচ্ছি। ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা সাংবাদিকদের বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করতে হলে রাখাইন রাজ্য টেকসই করা প্রয়োজন। রোহিঙ্গাদের ফেরার পরিবেশ নিশ্চিত করতে রাখাইন রাজ্যে টেকসই উন্নয়ন চায় ভারত। আর টেকসই উন্নয়ন হলেই রাখাইনে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন স্থায়ী হবে। বৃটিশ হাইকমিশনার অ্যালিসন ব্লেকও বলেন, তাদের ফিরে যাওয়ার বিষয়টি অবশ্যই টেকসই হতে হবে। আর এ জন্য তা ‘নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও সম্মানের’ সঙ্গে তাদের ফেরাতে হবে। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী নিশ্চিত করেছেন, জোর করে কাউকে ফেরত পাঠানো হবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ