ঢাকা, বুধবার 24 January 2018, ১১ মাঘ ১৪২৪, ৬ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কে পাগল? কে ভালো?

খান মুহাম্মদ ইয়াকুব আলী : আমার বন্ধু আসাদুল্লাহ। আমাকে বার বার বিরক্ত করেই চলছে। ‘আমাকে লেখা শিখাবেন না’। আমি বুঝতে পারছিলাম না লেখালেখি আবার শিখানো যায় কিনা। রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলকে কেউ লেখা শিখিয়েছিলেন কিনা তাও আমার জানা নেই। তবে লেখক সাহিত্যিকের জন্ম হয় কিভাবে? দেশে লেখক ফোরাম, সাহিত্য সংস্কৃতি কেন্দ্র, কবি ও নাট্যকার পরিষদ তারা ঐ সকল পেশার লোকদের সংগঠিত করে মাত্র। কেউ কোন দিন কাউকে কবিতা লিখা শিখিয়ে দিয়েছে এমনটি নয়। তবে কিভাবে কবি সাহিত্যিকের জন্ম হয়? আমার স্কুল জীবনের স্যার বলেছিলেন, ‘সমাজের সকল অসংগতি আর অনিয়ম দেখে তোমার মধ্যে যে বিদ্রোহী ভাব আর প্রতিবাদী মনোভাব সৃষ্টি হবে তাই তোমাকে লেখালেখি করতে উদ্বুদ্ধ করবে। দীর্ঘদিন পর স্যারের কথাটাই মনে পড়ছে। যেমন আমি লেখক, কবি বা সাহিত্যিক না হওয়ার পরেও কিছু মানুষের কথাবার্তা শুনে প্রতিবাদ বা প্রশংসা করতে মনে চায় তখন কি করবো তখনই কলম আর কাগজ নিয়ে বসে যাই। লেখা হলো কি হলো না মানটা কেমন, এতসব চিন্তা করলে কি আর লেখা যায়। যা হবার তা হবেই। যাক কিছু দিনপূর্বে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলেছিলেন, ‘গরুর গোশত খাওয়া মুসলমানদের অধিকার, পুজা, মহররম, ইফতার পার্টি সব অনুষ্ঠানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা আমার দায়িত্ব।’ মমতা ভালো নাকি মন্দ, তিস্তার পানি দিল কি দিল না সেটা ভিন্ন বিষয়, কিন্তু যেখানে হিন্দু ধর্মের ধারক ও বাহক দলের নেতা নরেন্দ্র মোদির প্রত্যক্ষ মদদে কেবল গরু জবাই করাই বন্ধ নয়, ফ্রিজে গোশত পাওয়ার পরও পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, সেখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নেত্রী মমতা ব্যানার্জির সাহসিকতাকে ধন্যবাদ জানানোর উপায় দু’কলম লেখা ব্যতীত আর কিইবা থাকতে পারে? আমাদের দেশের নেত্রী, জননেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন সাহসিকতার সাথে বলেন, ‘নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করবো এবং তিনি তা করছেনও। এখানে দুর্নীতি হল কি হল না সেটার চেয়ে আমার কাছে বড় হলো পদ্মাসেতু।
অতএব, আমি কোন্্ দলের সমর্থক সেটা না ভেবে তার এ সাহসিকতার প্রশংসাই করতে বাধ্য। তবে তিনি যখন তার পদমর্যাদার দিকে লক্ষ্য না রেখে কখনও আবার ওজন ছাড়া কথা বলেন, তখনও তার বিরোধিতা নয় বরং মনে করিয়ে দেয়া, ম্যাডাম আপনি কিন্তু সেই নেতার কন্যা, যার ৭ মার্চের ভাষণ সুন্দর করে লিখে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে প্রথম শ্রেণি লাভ করেছি। আপনি সেই মহান নেতার কন্যা, এদেশের অলেম উলামা তার দলে যোগদান না করলেও ব্যক্তি হিসেবে তাকে সম্মান করেছেন। আপনি এখন এক মহান নেতার সুযোগ্য কন্যা যিনি শত্রুদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে গিয়েও ৭ মার্চে একটি আপত্তিকর কথাও বলেননি। ফলে তার বক্তব্য জাতিসংঘেও আজ স্বীকৃতি লাভ করেছে। আপনি নিশ্চয়ই কামনা করেন, কেউ দয়া করে ডক্টরেট ডিগ্রি বা নোবেল না দিয়ে বরং আপনার পিতার মতই আপনাকে সম্মান করুক। তাহলে যেসব বক্তব্য থেকে বিরত থাকা উচিত তা হলো, জামায়াত প্রসঙ্গে আপনি বলেন, ‘এরা এক সময় সদরঘাটে আতর বিক্রি করতো এখন মন্ত্রী হয়ে ছেলেমেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান করে ফাইভস্টার হোটেলে’। একটি ইসলামী দলের নেতৃবৃন্দের ব্যাপারে এতটা তাচ্ছিল্য কি ঠিক হয়েছে? এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়ার বিক্ষোভ মিছিল বের হওয়ার কথা মতিঝিল থেকে, তিনি তাই করেছেন। অথচ জননেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘ঘরের বউ কি হোটেলে রাত কাটায়’। তিনি আরো বলেন, ‘জিয়া ইজ ড্রিয়িম বাট ফালুই বাস্তব।’ সচিবালয়ে এক মিটিংয়ে বলেন, ‘আমরা এখানে সাজগোজ করতে আসিনি, আমরা কাজ করতে এসেছি’। কদিন আগে বলেন, ‘এ মহিলার পা থেকে মাথা পর্যন্ত নকল।’ সর্বশেষ বলেন, ‘এ মহিলা পাগল।’ বেগম খালেদা জিয়া পাগল এটা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে আর এক সময় আমরা দেখেছি মহান সুপ্রিম কোর্ট থেকে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে বলা হয়েছিল ‘রং হেডেড নারী’। তবে কোনটা আমরা গ্রহণ করবো? ভারতীয় চ্যানেল স্টার জলসায় একটি নাটক দেখানো হয় ‘কে আপন কে পর’ সেখানে সংসারের আদর্শ বউকে অন্যসব নারীরা হিংসা করে সবার কাছে অপ্রিয় করতে চায়, অথচ সে নারী তার সততা আর দক্ষতা দিয়ে সকলের নিকট আপন হতে চায়। এক পর্যায়ে প্রকৃত সত্যই ফুটে উঠে। যারা চক্রান্ত করে সত্যকে মিথ্যা বানিয়ে ফায়দা লুটতে চেয়েছিল তাদের মুখোশ উন্মোচিত হয় আর আদর্শ নারী সকলের আপন হয়ে যায়। প্রমাণিত হয়, কে আপন কে পর। এখন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন বিগত তিনবারের প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, পাগল তখন প্রশ্ন জাগে একজন পাগল কিভাবে একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী হন তাও আবার তিনবার। কত প্রশ্নই মনের মাঝে উঁকি দেয়। আসলেই কি পাগল? নাকি পাগল বলা হচ্ছে, আর যদি তিনি পাগল না হন তবে যিনি পাগল বললেন তার কি হবে? অতএব ক্ষমতার দম্ভে কথা বলার সময় শালীনতা বা শিষ্টাচার ভুলে গেলে তাতে ক্ষতি কার? কার সম্মানের হানি হয়। সম্মানিত লোকেরা যদি নিজের সম্মান বজায় না রাখেন, তা হয় বড়ই বেদনার বিষয়। বর্তমানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মনে করছেন, তিনি আমরণ দাওয়াই খেয়েছেন, অর্থাৎ কখনই মরবেন না। আবার কোন দিনই ক্ষমতা ছাড়বেন না। এমনটি মনে হয়। মানুষকে যে মৃত্যুবরণ করতে হবে- এটা কখনও কখনও তারা ভুলেই যায়। মৃত্যু আর ক্ষমতা ছাড়ার কথা না হয় ভুলেই যান, আপনার দলের নেতাকর্মীদের মুচকি হাসি দেখলেই আমরা বুঝতে পারি এর অর্থ হলো আর কেউ বাংলার বুকে ক্ষমতায় আসতে পারবে না। বঙ্গবন্ধু যে বাকশাল প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলেন, তিনি তা পারেননি। আমরা সেই বাকশাল কায়েম করেছি। তার ছেলেকে সিএনসি বানাতে পারেননি, আমরা এমন সব সিএনসি জন্ম দিয়েছি যে, জীবনে আর কেউ ক্ষমতায় আসতে পারবে না। যদি এমন হয় তাও আপত্তি করি না, কেবল একটা আবেদন করতে চাই, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি আরো একটু সুন্দর করে কথা বলেন, অন্যদের সম্মানের হানি না ঘটান, তবে আমাদের ভালো লাগে। আপনার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ বেড়ে যাবে। অন্য দলের বা সাধারণ জনগণের মধ্যে চিন্তাশীল ও বিবেচক কিছু মানুষও রয়েছেন যারা আপনাকে সম্মানের চোখে দেখে। তবে কেন দু’চারটা কথার জন্য নিজের সম্মান কমাবেন? নিজের ওজনমত কথা বলাই ভালো নয় কি? এ বিষয়টি বিবেচনায় রাখলে আমাদের আর প্রশ্ন করতে হবে না ‘কে পাগল আর কে ভালো’।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ