ঢাকা, বুধবার 24 January 2018, ১১ মাঘ ১৪২৪, ৬ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ময়লা থেকে বিদ্যুৎ আসবে

আবু হেনা শাহরীয়া : মল-মূত্র, পয়ঃপ্রণালী, এ সবের কথা উঠলে আর যা-ই মনে পড়ুক নিজের মোবাইল ফোনের ব্যাটারি চার্জ করার কথা মনে করেন কি কেউ? কিন্তু লাইপসিগের বিজ্ঞানীরা ঠিক তাই নিয়েই গবেষণা চালাচ্ছেন? লাইপসিগের হেল্মহলট্স পরিবেশ গবেষণা কেন্দ্রের একটি শৌচাগার? এই খাটা পায়খানায় যা জমা হয়, তা লাগে গবেষণার কাজে?
গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির নাম ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্টাল মাইক্রোবায়োলজি? বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখছেন, ইলেক্ট্রোএ্যাকটিভ ব্যাকটেরিয়া দিয়ে মল থেকে বিদ্যুত উৎপাদন করা সম্ভব কিনা? এক্সপেরিমেন্টের আগে স্যাম্পল নিতে হয়? লাইপজিগের জার্মান বায়োমাস গবেষণা কেন্দ্রের গবেষক ইয়র্গ ক্রেট্সমার জানালেন, ‘গোড়ায় একটু ঘেন্না হতো বৈকি, কিন্তু দু-তিনবার করার পর অভ্যাস হয়ে যায়? আমরা এটাকে বলি সাবস্ট্রেট, এক্সপেরিমেন্টে যা কাজে লাগে? আমাদের সহকর্মীরা নিয়মিতভাবে এই পায়খানা ব্যবহার করেন, ফলে আমরা পর্যাপ্ত সাবস্ট্রেট পাই?’ মানুষের মলে প্রধানত জল, খাবার-দাবারের যে অংশ হজম হয়নি, সে অংশ, ‘রাফেজ বা ডায়েটারি ফাইবার, স্নেহজাতীয় পদার্থ ও স্বভাবতই জীবাণু থাকে? এই সব জীবাণু ভাসা সব পদার্থ থেকে পুষ্টি সংগ্রহ করে? সেক্ষেত্রে কিছু কিছু জীবাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন করে? বিশেষ বিশেষ জীবাণু যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে, সেটা এক শ’ বছরের বেশি সময় ধরে জানা? গত শতাব্দীর ষাটের দশকে নাসা মহাশূন্যে জীবাণুর মাধ্যমে প্রগ্রাম থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করার চেষ্টা করেছিল? এ জন্য জীবাণুদের ইলেক্ট্রন নিঃসরণ করার ক্ষমতা থাকা চাই? হেল্মহলট্স পরিবেশ গবেষণা কেন্দ্রের ড. ফাল্ক হার্নিশ বললেন, ‘জীবাণুরা সর্বত্রই আছে, যেমন পাকস্থলী কিংবা মলে, যে কারণে খাটা পায়খানাতেও জীবাণুরা থাকে? কিন্তু এই জীবাণুগুলোর বিশেষত্ব হলো এই, তারা নিজের অভ্যন্তর থেকে ইলেক্ট্রন বার করে তা কোষের ঝিল্লির মাধ্যমে বাইরে পাঠাতে পারে?’ জীবাণুগুলো যে সব ইলেক্ট্রন ছাড়ে, সেগুলোকে একটি ইলেক্ট্রোডে ধরা হয়? জীবাণুরা ভাসা পদার্থ খেয়ে ফেলে, অর্থাৎ বর্জ্য অপসারণ করে পানি পরিশোধন করে, অপরদিকে তারা ইলেক্ট্রন ছাড়ে, অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন করে? এভাবে যে বিদ্যুৎ তৈরি হয়, তা পরিমাণে খুব কম হলেও, ল্যাবরেটরিতে তার পরিমাপ করা যায়? বায়ো-ইলেকট্রো-কেমিস্ট ড. ফাল্ক হার্নিশ বলেন, ‘বর্তমানে আমরা মাত্র কয়েক মিলিএ্যাম্পিয়ার বিদ্যুত তৈরি করতে পারি? কিন্তু বাইরে যে শৌচাগার দেখেছেন, তার কথা ভাবলে বলতে হয়, আমরা একটা মোবাইল টেলিফোনের ব্যাটারি ১২ ঘণ্টার মধ্যে রি-চার্জ করে দিতে পারি?’ নেগেটিভ চার্জ যুক্ত ইলেক্ট্রনগুলো পজিটিভ চার্জযুক্ত ইলেক্ট্রোডের দ্বারা আকৃষ্ট হয়? এর থেকে যে কারেন্ট বা বিদ্যুৎ প্রবাহ সৃষ্টি হয়, তা মোবাইল ফোন চার্জ করে, মাইনাস পোলে তৈরি হয় জল? জীবাণুরা আরও ভাসা পদার্থ খাওয়ার ফলে জল ক্রমেই আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে? জীবাণুরা এইভাবে বিদ্যুৎ সৃষ্টি করলে একে বলা হয় একটি মাইক্রোবিয়াল ফুয়েল সেল অর্থাৎ জীবাণু-পরিচালিত-জ্বালানি-কোষ? এটা যাতে অপেক্ষাকৃত অনুন্নত দেশেও সম্ভব হয়, সেজন্য লাইপসিগের বিজ্ঞানীরা এই সংক্রান্ত প্রযুক্তিকে যতদূর সম্ভব সহজ রেখেছেন? ড. ফাল্ক হার্নিশ জানালেন, ‘আমাদের প্রযুক্তির বিশেষত্ব হলো, আমরা করোগেটেড কার্ডবোর্ড থেকে ইলেক্ট্রোড তৈরি করি, এখানে যেমন দেখছেন? অর্থাৎ বাজারে যেরকম পিচবোর্ড পাওয়া যায়, তা নিলেই চলে? পরে তা কাঠকয়লার মতো বাতাসশূন্য অবস্থায় পোড়ালেই ইলেক্ট্রোডের পদার্থ পাওয়া যায়? একটা কম খরচের লো-টেক পণ্য?’ জীবাণু-পরিচালিত-জ্বালানি-কোষের কথা ভাবলে পয়ঃপদার্থ সম্পর্কে ধারণাই পাল্টে যায়? কেননা এই কোষ পয়ঃপদার্থ থেকে জ্বালানি সৃষ্টি করে এবং পানিকে পরিশুদ্ধ করে শুধু শৌচাগারেই নয়, বড় বড় সিউয়েজ ওয়ার্কস-এও বটে?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ