ঢাকা, বৃহস্পতিবার 25 January 2018, ১২ মাঘ ১৪২৪, ৭ জমদিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ট্রাম্পের হঠকারী সিদ্ধান্তে ইসরাইলের পতন শুরু:হামাস

২৪ জানুয়ারি, আল জাজিরা, মিডল ইস্ট আই : ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের প্রধান ইসমাইল হানিয়া বলেছেন, পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাসকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ফিলিস্তিনি জনগণকে হুমকি দিতে চাইছে আমেরিকা ও ইসরায়েল। তিনি সতর্ক করে বলেন, বায়তুল মুকাদ্দাস ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই হঠকারী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ইসরাইলের পতন শুরু হলো। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের বায়তুল মুকাদ্দাস সফরের সময় হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়া এসব কথা বলেন।

হামাস প্রধান আরও বলেন, ইসরাইলকে স্বীকৃতি না দেয়া এবং প্রতিরোধ আন্দোলনকে সমর্থন করাসহ দুটি কৌশলকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে মারাত্মক প্রচেষ্টা চলছে। কিন্তু, সারা বিশ্ব যদি বায়তুল মুকাদ্দাসকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় তাহলেও ফিলিস্তিনিরা তাদের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আনবে না। চলমান পরিস্থিতিতে তিনি ফিলিস্তিনি জাতির মধ্যে ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

 জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে ট্রাম্পের ঘোষণা ফিলিস্তিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন হামাসের পলিটিক্যাল ব্যুরোর প্রধান ইসমাইল হানিয়া। তিনি ট্রাম্পের এই পদক্ষেপে আরেকটি গণ-অভ্যুত্থানের ডাক দিয়েছেন। গাজায় দেয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন, এই ঘোষণার মাধ্যমে ট্রাম্প ইসরাইল-ফিলিস্তিন শান্তি প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করে দিয়েছে।

তিনি বলেন, আগামীকাল শুক্রবার দিনব্যাপী বিক্ষোভ আন্দোলনে যোগ দিয়ে একটি নতুন গণ-অভ্যুত্থান শুরু করার জন্য আমরা ফিলিস্তিনের জনগণের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। হানিয়া আরো বলেন, আগামীকাল আমাদের লোকেরা দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ইন্তিফাদা (গণ-অভ্যুত্থান) শুরু করবে। বিজয়ী হওয়ার ব্যাপারে আমরা আত্মবিশ্বাসী।

তিনি বলেন, হামাসের সকল ইউনিটকে যে কোন ধরনের হুমকি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

তিনি মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়া ভেঙ্গে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

এদিকে, জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোলান্ড ট্রাম্পের কঠোর সমালোচনা করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোগান। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যকে আগুনের গোলায় মধ্যে ঠেলে দেবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

আজ বৃহস্পতিবার গ্রিস সফরের উদ্দেশ্যে রাজধানী আঙ্কারা ত্যাগ করার পূর্বে এসেবোগা বিমানবন্দরে সাংবাদিকদেরকে তিনি এই কথা বলেন। ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘হে ট্রাম্প, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে আপনি কী করতে চাচ্ছেন?’ তিনি বলেন, ‘এই ধরনের পদক্ষেপ এই অঞ্চলকে একটি আগুনের গোলার মধ্যে নিক্ষেপ করবে।’

গত কয়েক দশকের মার্কিন নীতির প্রথা ভঙ্গ করে বুধবার হোয়াইট হাউজের কূটনৈতিক অভ্যর্থনা কক্ষে দেয়া ভাষণে জেরুজালেমকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেন ট্রাম্প। একইসঙ্গে তিনি তেল আবিব থেকে মার্কিন দূতাবাসকে জেরুজালেমে স্থানান্তরের পরিকল্পনার কথাও জানান।

যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের ঘোষণায় ইসরাইল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠতে পারে। বুশ ও ক্লিনটন প্রশাসনের সাবেক উপদেষ্টা এবং উড্রো উইলসন সেন্টারের ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যারন ডেবিড মিলার বলেন, ‘জেরুজালেমের স্থিতাবস্থায় কোনো আঘাত করলে এটির জ্বলে ওঠার প্রবণতা রয়েছে।’

এরদোগান বলেন, ‘রাজনীতিবিদদের উচিৎ শান্তি প্রতিষ্ঠা করা, আগুন জ্বালিয়ে দেয়া নয়।’

জেরুজালেমকে খ্রিস্টানদের জন্যও একটি পবিত্র স্থান উল্লেখ করে তিনি বিষয়টি নিয়ে পোপ ফ্রান্সিসের সঙ্গেও কথা বলবেন বলে জানান।

এর আগে জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা করা নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন এরদোগান। তিনি জেরুজিালেমকে মুসলিমদের জন্য একটি রেড লাইন বলে তিনি সর্তক করে দিয়েছিলেন। এদিকে, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ নিয়ে করণীয় নির্ধারণে আগামী ১৩ ডিসেম্বর ওআইসির জরুরি বৈঠক ডেকেছে তুরস্ক। তুর্কি প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র ইব্রাহিম কালিন বুধবার বলেছেন, জেরুজালেম ইস্যুতে স্পর্শকাতর পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় আগামী ১৩ ডিসেম্বর ওআইসি'র সদস্য দেশগুলোর নেতারা ইস্তাম্বুলে বৈঠকে বসবেন। মুসলিম দেশগুলো জেরুজালেমের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপের ঘোষণা দিতে পারেন বলে জানা গেছে।

এদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের জেরুজালেম সফরের প্রতিবাদে সর্বাত্মক ধর্মঘট পালন করেছেন ফিলিস্তিনিরা। ইসরায়েল সফর শেষ করার আগে পেন্সে জেরুজালেম সফরের দিন গত মঙ্গলবার পশ্চিম তীর জুড়ে এ ধর্মঘট পালন করেন তারা। ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর আহ্বানে ধর্মঘট চলাকালে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভও অনুষ্ঠিত হয়। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম এ খবর জানিয়েছে।

ফিলিস্তিনে তীব্র আন্দোলনের মধ্যেই রবিবার ইসরায়েল সফর শুরু করেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স। সেখানে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করা ছাড়াও দেশটির পার্লামেন্টে ভাষণ দেন তিনি। সেখানে ২০১৯ সালের মধ্যেই জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেন। ইসরায়েল সফর শেষ করার আগে মঙ্গলবার জেরুজালেম সফরে যান তিনি। সেখানে পুরাতন নগরীর ওয়েস্টার্ন ওয়াল বা আল বোরাক ওয়াল পরিদর্শনে যান তিনি।

আল বোরাক ওয়াল পূর্ব জেরুজালেমে আল আকসা মসজিদের পাশেই অবস্থিত। একেশ্বরবাদী তিন ধর্মের অনুসারী মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদিদের কাছে এটা পবিত্র স্থান। আর পূর্ব জেরুজালেমকেই নিজেদের রাজধানী হিসেবে দাবি করে আসছে ফিলিস্তিনিরা। পেন্সের জেরুজালেম সফরের প্রতিবাদে মঙ্গলবার পশ্চিম তীর জুড়ে সর্বাত্মক ধর্মঘটের ডাক দেয় ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক দলগুলো। এ বিবৃতিতে তারা, ফিলিস্তিনি জনগণকে ধর্মঘটে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানায়।

আহ্বানের প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার পশ্চিম তীরের দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, রেস্টুরেন্ট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বন্ধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন ফিলিস্তিনিরা। এদিন স্বাভাবিক ব্যস্ত সড়কগুলোও খালি ছিল। মাইক পেন্সের ওয়েস্টার্ন ওয়াল পরিদর্শনের সময় জেরুজালেমের চারপাশে বিপুল সংখ্যক ইসরায়েলি সেনা মোতায়েন করা হয়। সে সময় বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীরা সড়ক অবরোধ করে। আর বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীদের উপর হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী।

ফিলিস্তিনি আন্দোলনকর্মী ও শিল্পী মালিহা মাসলিমানি মিডলইস্ট আইকে বলেন, ‘সর্বাত্মক ধর্মঘট প্রতিবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। পেন্সের ফিলিস্তিন সফরের প্রতিবাদে গত মঙ্গলবার আমরা ধর্মঘটে অংশ নিয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তাকে (পেন্স) বলতে চাই, ইসরায়েলি সরকার হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে নির্যাতন ও হত্যা করছে। তাই এখানে তাকে স্বাগত জানানো হবে না।’ তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা ভুয়া, তাতে ফিলিস্তিনি ভূখ-ে ইসরায়েলি দখলদারিত্বকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।’

ইসরায়েলি পার্লামেন্টে বক্তব্য প্রদানকালে পেন্স বলেন, ‘সামনের সপ্তাহে আমাদের প্রশাসন জেরুজালেমে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস খোলার পরিকল্পনা শুরু করবে। আগামী বছর শেষ হওয়ার আগেই সেখানে মার্কিন দূতাবাস খোলা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘জেরুজালেম ইসরায়েলের রাজধানী। আর সেজন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে সরিয়ে নিতে পররাষ্ট্র দফতরকে দ্রুত প্রস্তুতি শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন।’

তবে ইসরায়েলি আরব সংসদ সদস্যদের প্রতিবাদের মুখে অল্প সময়ের জন্য পেন্সের বক্তব্য বাধাগ্রস্ত হয়। প্রতিবাদকারীরা আরবি ও ইংরেজি ভাষায় লেখা প্ল্যাকার্ড দেখিয়ে প্রতিবাদ করতে থাকেন। তাতে লেখা ছিল, ‘জেরুজালেম ফিলিস্তিনের রাজধানী’। পরে আন্দোলনকারীদের বের করে দেওয়া হয়। পেন্স গোলযোগে সাড়া দিয়ে হাসিমুখে বলেন, ‘এমন অস্থির গণতন্ত্রের সামনে দাঁড়ানো আমার জন্য খুবই অপমানজনক’।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ